গাড়িতে উত্তর-বঙ্গ সফর – ১

সৌমেন খাঁ

ট্রেনে টিকিট কনফার্ম না হওয়াটা একপ্রকার শাপে বর হয়ে গেল।চার বন্ধু আমি, অনুষ্টুপ পাল, সুমন দাস, অপূর্ব কুমার রায় মিলে হঠাৎ ঠিক করলাম গ্রীষ্মের ছুটিতে একটু ঠান্ডা হয়ে আসা যাক।যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। কিন্তু বাধ সাধলো ট্রেনের টিকিট। সব ট্রেনেই ওয়েটিং লিস্ট। তবু্ও জেদ করে একটা ট্রেনে টিকিট কেটেই ফেলা হল। দেখা যাক কনফার্ম হয় কিনা!!! যাইহোক যত দিন এগিয়ে আসছে টেনশন তত বাড়ছে। কনফার্ম না হলে শেষে তৎকাল এ যেতে হবে।সে ও চাপের ব্যাপার। যথারীতি কনফার্ম তো হলইনা, আরএসি ও পাওয়া গেলনা।

এদিকে যাওয়ার জেদ চেপে গেছে।আফটার অল ইটস পাহাড় কলিং। কিন্তু উপায় কী??আমার মনেও ইচ্ছেটা সুপ্ত ছিলো।বন্ধু সুমন বলেই ফেলল, “চ-দেখি, চারজনে আছি, গাড়িটা বের কর,ঘুরে আসি।” যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। অগত্যা নিজেদের গাড়িতেই বুক ঠুকে বেরিয়ে পড়লাম চার বন্ধুতে পাহাড় দর্শনে।চার বন্ধুর মধ্যে আমার ( Renault – Renault Kwid )এবং সুমন (Maruti-WagonR) এর গাড়ি আছে,দুজনেই ড্রাইভিং টা পারি। কিন্তু সুমন এর গাড়ির চাকার টায়ার কমজোরি থাকার কারণে আমার টা নিয়েই বেরোনার সিদ্ধান্ত হলো।

আমাদের বাহন

প্রথমদিন যথারীতি শনিবার মানে ১৮ই মে ২০১৯ সকাল ৭.৩০ নাগাদ রওনা দিলাম শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে। টার্গেট শিলিগুড়ি পর্যন্ত যদিও ছিলনা, কিন্তু আমাদের এক পুরানো বন্ধু দিগবিজয় কুণ্ডু কর্মসূত্রে থাকে শিলিগুড়িতে। সে শুনে বললো,”একটু টেনে চলে আয়, আমার বাড়িতে থেকে যাবি।” বন্ধু খুবই হেল্প করেছিল রাস্তায় জ্যাম থেকে বাঁচার জন্য, যেমন ডালখোলা,মালদা টাউন,শিলিগুড়ি সিটি সেন্টার ইত্যাদি। যাইহোক দুই বন্ধু মিলি জুলি করে ড্রাইভ করে রাত ৯.৩০ নাগাদ শিলিগুড়িতে বন্ধুর বাড়ি পৌঁছলাম। রাস্তায় অবশ্য টি-ব্রেক,লাঞ্চ-ব্রেক ইত্যাদি ছিলো।

দ্বিতীয়দিন – পরদিন সকাল সকাল বন্ধুপত্নীর হাতে বানানো ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের প্রথম গন্তব্যের দিকে — লাভা,রিশপ। গাড়িতে পর্যাপ্ত পানীয়জল এবং শুকনো খাবার তুলে নিয়েছিলাম। গাড়ি চালু করলো প্রথমে সুমন। বললো, “আমি এদিকটায় চালিয়ে নিই,তুই পাহাড়ে তুলবি।” সেভক রোড ধরে এগোতে লাগলো আমাদের গাড়ি; “শুধু গাড়ি নয়,বলো লাল গাড়ি।” ঘন সবুজ বনানীর মাঝখান দিয়ে কালো পিচে ঢাকা হাইওয়ের বুক চিরে ছুটে চলেছে আমাদের KWID। অপূর্ব সে দৃশ্য, অপরূপ সে অনুভূতি। ধীরে ধীরে করোনেশন ব্রীজ পার হয়ে মংপং – ওয়াশাবারির দিকে এগিয়ে চললাম শহুরে ব্যস্ততা কে পিছনে ফেলে এক নির্জন পাহাড়ি নির্মলতায় শরীর মন শীতল করতে।

ওথলাবারি – ডামডিম হয়ে আমাদের গাড়ি যখন সিলি চা বাগানের মধ্যে দিয়ে যেতে থাকলো, তখন আমাদের হৃদয় জুড়িয়ে যেতে লাগলো। গাড়ির কৃত্রিম ঠান্ডা বাতাস বন্ধ করে জানালার কাচ নামাতেই এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে সারা শরীরে হাত বুলিয়ে যেন কানে কানে বলে গেল “স্বাগতম, আমার শীতল ছোঁয়ায় সতেজ হয়ে নাও পথিক।” আর চারিদিকে সবুজের সমারোহে আমাদের মনও হয়ে উঠলো সবুজ সতেজ। সে এক অপরূপ দৃশ্য চারিপাশে। দূরে পাহাড়ের অমোঘ হাতছানি, মেঘ রোদের লুকোচুরি, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমারোহ, আর মাঝে মাঝে নাম না জানা পাখিদের পথভোলানো ডাকে উড়ে যাওয়া। মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্নে আছি। শুধু মাঝে মধ্যে নিজেদের মধ্যে গল্প – হাসি – ঠাট্টা তে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলাম নিজেরাই।

একসময় গোরুবাথান হয়ে ধরলাম ঋষি রোড, যেটা চলেছে সোজা আমাদের গন্তব্য, সুন্দরী লাভা। এর মাঝে স্টিয়ারিং এ হাত বদল হয়ে গেছে। এদিকে বেশ কয়েক কিমি রাস্তা খুবই খারাপ। রাস্তার কাজ অবশ্য হচ্ছে। রাস্তার চড়াই-উতরাই টা একটু বেশিই। হয়ত আমরা প্রথমবার গাড়ি চালিয়ে এদিকে এসেছি বলে মনে হতে পারে। যাইহোক, প্রথম পাহাড়ে গাড়ি চালানো, বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার।

প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সজাগও থাকতে হচ্ছিলো। তখন ভাবছি ধরো স্টিয়ারিং শক্ত হাতে, ভয় কী পাহাড়েতে!! যাইহোক যত উপরে উঠতে থাকলাম, বাতাস যেন তার শীতল উপস্থিতি জানান দিতে লাগলো। আর মেঘেরা! আমাদেরকে স্বাগত জানাতে আর আমাদের সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে আমাদের গাড়িতেই চেপে বসলো।

আমাদের জড়িয়ে ধরে আপন করে নিলো। “মন মোর মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিগ্ দিগন্তের পানে” – না উড়ে যাইনি,  মেঘেদের সঙ্গী করে এসে পৌঁছলাম লাভা।

আমাদের রাত্রিযাপন ছিলো রিশপ এ। লাভায় পৌঁছে ওখানে রিশপ যাওয়ার রাস্তা জানতে চাইলে সবাই যেন কেমন করে আমাদের দিকে আর গাড়িটার দিকে তাকালো।

পরে জানলাম লাভা থেকে রিশপ যাওয়ার দুটি পথ। একটি পায়ে হেঁটে ট্রেক করে,যে রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব না কোনোভাবেই। যদিও সেটা মাত্র ৪-৪.৫ কিমি। আর অন্যটি একটু ঘুর পথে সিক্স মাইল হয়ে গাড়ির রাস্তা। আমাদের গাড়ি হয়তো চলে যাবে,কিন্তু খুবই রিস্কি। কারণ প্রায় ৩ কিমির মতো রাস্তা নাকি খুবই খারাপ। ভেঙে-চুরে গেছে। তা ছাড়াও আমাদের হোমস্টে পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবেনা। আবার রাস্তায় পার্কিং করাও বিপজ্জনক। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম লাভা স্ট্যান্ড এ আমাদের গাড়ি পার্কিং করে ওখানকার গাড়ি ভাড়া করে রিশপ পৌঁছবো। সত্যি পাহাড়ি মানুষজন কতো বিশ্বস্ত হয়! বললো, “রাস্তার ধারে যে কোনো জায়গায় গাড়ি পার্ক করে লক করে রেখে যান, গাড়িতে একটা আঁচড়ও পড়বে না।” সত্যিই তাই।

লাভা পৌঁছেছিলাম তখন প্রায় দুপুর ২ টো। খুব খিদে পেয়েছিলো তাই লাভাতে চিকেন মোমো উইদ স্যুপ খেয়ে ওখানকার এক গাড়িতে চেপে বসলাম। ট্রেক করার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু ব্যাগপত্র একটু বেশি ছিলো বলে (নিজেদের গাড়িতে গেলে যা হয় আর কি) গাড়িই নিলাম। গাড়ি কিন্তু আমাদের ট্রেকিং রুট দিয়েই নিয়ে গেলো। রাস্তা দেখে আর গাড়িতে বসে অনুভব করলাম ওরা ভুল কিছু বলেনি। আমাদের গাড়ি না নিয়ে এসে ভালোই করেছি। অবশেষে পৌঁছলাম রিশপ – আমাদের ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনের গন্তব্যস্থলে।

পাহাড়ের কোলে শান্ত,নির্জন,পরিষ্কার,পরিচ্ছন্ন,অতিথিবৎসল নেচার কটেজ। কেয়ার টেকার কৈলাস দা।সুমনের কয়-লাস দা।আমরা ঘর পেয়েছিলাম উপরে। রুম এর বিছানা থেকে শুয়ে শুয়ে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।যদিও মেঘে ঢাকা থাকায় তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা র কোন অংশই দৃশ্যমান ছিল না। যাইহোক রিসর্টের বারান্দা থেকে প্রকৃতির সুন্দরী রূপ দেখে সব ক্লান্তি,খিদে যেন পাহাড়ের কোলে,জঙ্গলের গহীনে, মেঘেদের আড়ালে হারিয়ে যেতে লাগলো।

লাঞ্চ আগে থেকেই বলা ছিলো। খাওয়ার সময় কৈলাস দা বললো, “গত একমাস ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা মেঘে ঢাকা।দেখুন আপনাদের দেখার সৌভাগ্য হয় নাকি!” ভাবলাম মেঘেরা যখন আমাদের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়েইছে, তখন কি আর এই বন্ধুদের নিরাশ করবে! শুনেছি নাকি বন্ধুত্বে কিছু চাইলে তাকে না বলা যায় না। আমরাও চাইলাম আমাদের নতুন বন্ধুর কাছে। মেঘ তুমি বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ো শুষ্ক পাহাড়ের বুকে,তার পিপাসা মেটাও, সাথে আমাদেরও মনস্কামনা পূর্ণ করো।

বিকেলে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।বাইরে ঠান্ডা বেশ ভালোই ছিলো। সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে চা আর চিকেন পকোড়া সহযোগে খোশ মেজাজে গল্প চলতে লাগলো। মেঘেরা বোধহয় আমাদের চাওয়া শুনেছিলো। মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি হচ্ছিল,  আর সেই সাথে আমাদের মনও খুশিতে ভরে উঠছিল। রাতে রুটি আর দেশি পাহাড়ি মুরগির ঝোল, আহ– কি স্বাদ!! অবশেষে নতুন বন্ধু আমাদের চাওয়া অনুযায়ী তার কথা রাখবে এই বিশ্বাসে ঘুমাতে গেলাম।উইন্ডো বেড টা দখল করলো অনু দা; বললো ভোরে ডেকে দেবে সকলকে।শুনে অপুর সে কি হাসি,”যে কিনা বেলা ৯ টার আগে ঘুম থেকে ওঠেনা,তাও আবার মা এর ধ্যাতানি খেয়ে, সে ভোরে উঠে আমাদের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাবে!”তবে অনু দা কিন্তু বারবার বলেছিল স্লিপিং বুদ্ধ অবশ্যই দেখা যাবে।ওর সাথে সাথে সেই বিশ্বাস টা আমাদেরও গড়ে উঠছিল,কারণ আমাদের নতুন বন্ধু, যতই হোক পাহাড়ি মেঘ তো, খুবই বিশ্বাসী হয়।  (…চলবে)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *