তেজ সিংয়ের গপ্প

গৌরব বিশ্বাস

যে সময়ের কথা বলছি, সেটা নব্বইয়ের দশক। সালটা সম্ভবত সাতানব্বই কি আটানব্বইয়ের গ্রীষ্ম। প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা। আমার বয়স তখন বছর পাঁচেক। আমার মাসতুতো বোনটি আমার থেকেও ছোট। মাসতুতো দিদিটির বছর বারো তখন। আমাদের ‘বাচ্চা ব্রিগেডে’ও একটু বড়। খুব অস্পষ্ট ভাবে মনে পড়ে সে দিনগুলোর কথা। একটু বড় হয়ে ফটোগ্রাফ দেখে, মা, মাসি, দিদির কাছে সে গল্প শুনে গল্প কথা তৈরি হয়েছে মনে। সে গল্পই বলি।

সেবার স্কুলের গরমের ছুটিতে পাড়ি জমিয়ে ছিলাম হিমাচলপ্রদেশ। প্রায় দিন পনেরোর ট্যুর। ধরমশালা, ডালহৌসি, ভারমোর, খাজিয়ার হয়ে অমৃতসর পাঠানকোট। শীতে জমে গরমে পুড়ে কলকাতায় ফেরা। হিমাচলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে নতুন করে বলবার কিছু নেই। সে রূপের রানী। ‘ দ্য কুইন অফ দি হিল’। আহা, খাজিয়ার যেন এক টুকরো সুইডেন। প্ৰকৃতি যতই রূপসী হোক, সেখানকার খাওয়ার দাওয়ার কোলকেতে বাঙালীর জন্যে সুখকর নয় মোটেই। খুব সাধারণ রান্না, ডাল, ভাত, তরকারি, তাতেও বিশ্রী বোটকা এক গন্ধ। একটু তেল ঝাল খাওয়ার!  অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসে। সে গন্ধের তীব্রতা কেমন, এতদিন পর তা মনে নেই। তবে অভিজ্ঞতা যে সুখকর নয় সে স্মৃতিটুকু আছে। পরে শুনেছি ওরা নাকি রান্নায় ভেড়ার তেল দেয়, তাই ওমন বোটকা গন্ধ। সত্যি মিথ্যে জানিনা। ওমন গন্ধে আমাদের খাওয়া প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। আমাদের ড্রাইভার তেজ সিং বেশ করিৎকর্মা লোক। ও পাউরুটি, শুকনো খাওয়ার, বাদাম , ফল এসব জোগাড় করে রাখত। ওতে শুধু সকালের টিফিন আর দুপুরে আধপেটা চলত। রাতে আবার সেই বোটকা গন্ধের সম্মুখীন। কোলকাতা থেকে যে দুটি বাঙালি পরিবার গেছিলাম বেড়াতে, সপ্তাহ খানেক আধপেটা খেয়ে তারা সবাই ক্ষীণকায়।

দিন দশেক কাটিয়েছি তখন। একদিন তেজ সিং তার বাড়িতে আমাদের নেমন্তন্ন করল। তেজ সিং সম্ভবত চাম্বার লোক। বছর পয়ত্রিশ বয়স। ছিপছিপে গড়ন। মোটা কালো গোঁফ আর ঝকঝকে দুপাটি দাঁতের অধিকারী। তেজ সিংয়ের একটা ফটো আমাদের অ্যালবামে আছে। গাড়ির গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন ঘোড়ার সাথে ঘোড়সওয়ার। গাড়িতে স্টার্ট দেওয়ার আগে গাড়ির গায়ে হাত বুলিয়ে দিত তেজসিং। গাড়িও পাহাড়ি রাস্তায় তার কথা শুনত। তেজ সিং আমাদের ড্রাইভার-কাম-গাইড। সে ‘মুস্কিল আসান’ও বটে। পাহাড়ী দেশে বিপাকে পড়লে তেজ সিং ভরসা। খাড়াই বেয়ে উঠতে হবে। দলের বড়রাই বেসামাল। আমরা ছোটরা উঠব কিকরে! মুস্কিল আসান তেজ সিং। সে বলবে-“আপ আগে যাইয়ে, বাচ্চে লোগকো ম্যায় সমালতা হু”। তারপর বোনকে আর আমাকে দুই কাঁখে জাপ্টে ধরে আকর্ন হেসে বলবে-“বাচ্চো ডরো মত”। তারপর, তরতরিয়ে উঠে যাবে পাহাড় বেয়ে। আরেকদিনের ঘটনা। তখন খাজিয়ারে রয়েছি দিনকয়েক। ওখানে ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা আছে। আমি আর মাসতুতো দিদি ঘোড়ায় চড়ে গিয়েছি বনের ভিতর। সাথে সহিস আছে। বনের ভিতর ঘোড়া হাঁটছে দুলকি চালে। ওদিকে ঘোড়া এখনও ফিরছেনা দেখে বড়রা চিন্তায় অস্থির। ডাক পড়ল তেজ সিংয়ের। মিনিট কয়েকের মধ্যেই তেজ সিং আমাদের নিয়ে হাজির। সেই বয়সে তেজ সিংকে আমার সুপার হিরো মনে হত।সে সব পারে।

এসব গুণ ছাড়াও তেজ সিংয়ের আরও একটি গুণ ছিল। সে অসম্ভব পত্নী প্রেমিক। তেজ সিংকে আমরা যখন দেখেছি, ততদিনে তার দাম্পত্য জীবন সাত বছর অতিক্রান্ত। দুই সন্তানের বাবা। দিন দশেক আমাদের সাথে ঘুরে যেদিন সে ফিরছে নিজের বাড়ি, বাচ্চাদের জন্যে কিনেছে টফি, আর পত্নীর জন্যে গাঢ় নীল রংয়ের উলের সালোয়ার। গাড়ির সাইড মিরর দেখে তার সাজগোজ এখনও মনে আছে আমার। বাবা জিজ্ঞেস করে-“কি ব্যাপার তেজ সিং আজ এত সাজগোজ?”। লজ্জায় লাল হয়ে তেজ সিং উত্তর দেয়-” আজ মেরে সাদিকা সাত বরষ পুরা হুয়া স্যার”। এতক্ষণে আমাদের নেমন্তন্নের কারণ বোঝা গেল।

পাহাড়ের উপর যে রঙ বেরঙের বাড়ি গুলো, ওর মধ্যে একটা  তেজ সিংয়ের। বাপ ভাইয়েরা থাকে আশেপাশেই। বাড়ির সামনে গুটিকয়েক ফুলগাছ। বাড়িতে উঠতে হলে পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে। পায়ে চলার একটা রাস্তা আছে বটে, কিন্তু তার চড়াইয়ে সমতলের বাসিন্দারা কুপোকাৎ। এছাড়া মেহমান পাহাড় চড়ে বাড়িতে উঠবে সেটা তেজ সিংয়ের না পসন্দ। ও আমাদের ঘন্টাখানেক ঘুরে আসতে বলল। তার মধ্যেই ও নাকি ব্যবস্থা করে ফেলবে। কাছেই একটা ছোট মত বাজার। টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। আগামী দিন কয়েকের মতো শুকনো খাওয়ার, তেজ সিংয়ের পরিবারের জন্যে ছোটো খাটো উপহার কেনা হল। ঘন্টা খানেক পর ফিরে আমরা তাজ্জব। এইটুকু সময়ের মধ্যে কাঠ পেরেক জোড়া লাগিয়ে একটা সিঁড়ি গোছের বানিয়ে ফেলেছে তেজ সিং!  তেজ সিং সুপার হিরোই বটে।

অবশেষে উঠলাম তেজ সিংয়ের বাড়ি। ওর বাপ ভাইয়েরাও জমায়েত হয়েছে ওদের বাড়ি। একটু বসতেই লালরংয়ের সরবতের গ্লাস হাতে দিয়ে গেল তেজসিংয়ের স্ত্রী। সরবতের গন্ধটা সিরাপের মতো। সম্ভবত ওটা রু-আফজা ছিল। বেলা পড়লে নোনতা স্বাদের চা, সাথে ভাজাভুজি। তারপর হাতমুখ ধুয়ে সবাই এসে বসা গেল বারান্দায়। তেজ সিং ছুটল বাজারের দিকে। সঙ্গে বাবা আর মেসো।

তেজ সিংয়ের ছেলে-মেয়ে দুটো আমারই বয়সী। ওমন ঠান্ডায় ওদের ফর্সা গাল গুলো চেরি ফলের  মতো লাল হয়ে থাকে সবসময়। আসার পর থেকে ওরা আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, আমিও ওদের দিকে। বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছুক কিন্তু কেউ কারুর ভাষা বুঝিনা।

সন্ধ্যের পর বাজার সেরে ফিরল ওরা। আরেক প্রস্ত চা পর্ব শুরু হল। ভরসন্ধ্যেয় কম্বল মুড়ি দিয়ে জমে উঠেছে আড্ডা। এমন সময় তেজ সিং এসে মা আর মাসিকে বলল-“আজ আপ দোনো খানা পাকাইয়ে”। এতো মেঘ না চাইতেই জল। সঙ্গে সঙ্গেই মা মাসি রসুই ঘরে হাজির। ওদের সাথে হাত লাগিয়েছে তেজ সিংয়ের স্ত্রী ববি। তেজ সিংয়ের মতো করিৎকর্মা লোকের যোগ্য দোসর। ববি কিন্নর দেশের মেয়ে। ওখানকার মেয়েরা নাকি অসম্ভব রূপসী। স্বর্গের অপ্সরাদের মতো নাকি তাদের রূপ। বড় হয়ে ববির ফটো যখন দেখেছি আমাদের এলবামে কথাটা একবর্ণও অত্যুক্তি মনে হয়নি। তেজ সিংয়ের পাশেই লাজুক মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ববি। পরনে তেজ সিংয়ের উপহার দেওয়া সালোয়ার। গাঢ় নীলের উপর রং-বেরঙয়ের সুতোর কাজ। স্নো পাউডার মাখা অতিরঞ্জিত শহুরে সুন্দরী সে নয়। ‘দ্য হিমালয়ান বিউটি’।

পাত পড়তে একটু রাত হল। ততক্ষণে আমি ঘুমে ঢুলুঢুলু। মাসতুতো বোনটি ঘুমিয়ে কাদা। তার মধ্যেই খেতে বসলাম। সরু চালের গরম ভাত। ঘি। বেগুনভাজা। রাজমা। দিশি মুরগির ঝোল। রাজমা রান্না করেছে ববি। তেজ সিংয়ের প্রিয় ডিশ। বাকি গুলো মা আর মাসি। সে সময় রাজমা ততটা মুখে রোচেনি আমার। মাংস দিয়ে অনেকদিন পর পেট পুরে ভাত খেয়েছিলাম।

মাসতুতো ভাই বোনেরা যখনই বেড়াতে যাওয়ার গল্পগুজব করি, তেজ সিংয়ের প্রসঙ্গ ওঠে প্রায়শই। দিনকয়েক আগেই বাবার একটা ডায়রিতে তেজ সিংয়ের ঠিকানা আর ফোন নম্বর পেয়েছিলাম। তেজ বাহাদুর সিং, চাম্বা ডিস্ট্রিক্ট, হিমাচল প্রদেশ। ল্যান্ডফোন নম্বরটা এখন আর উপলব্ধ নেই। নম্বরটা সম্ভবত তেজ সিংয়ের গ্রামের কারও। আজকাল অনেক পঞ্চাশ উর্ধ ব্যক্তিই ফেসবুকে প্ৰোফাইল খুলছেন। ওকে খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম ফেসবুকে। পাইনি। আমরাও অনেক বড় হয়েছি। তোমারও  তো চুলে পাক ধরেছে তেজ সিং, তাইনা!

ছবি প্রসঙ্গে- কালো জ্যাকেট পরা সদা হাস্য ভদ্রলোকটি তেজ সিং। ছুট দেওয়ার ভঙ্গিতে যে বাচ্চাটা, সেটি আমি। কোলে যে বাচ্চাটি, সে আমার মাসতুতো বোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *