পার্বণ প্রসঙ্গ

সাগ্নিক ভট্টাচার্য

সদ্য কেটে গেলো Halloween।  যারা ব্যাপারটা বুঝলেন না তাদের জন্য সংক্ষেপে বলি: Halloween হলো ভূত-চতুর্দশীর সাহেবি সংস্করণ। প্রতি বছরের ৩১সে অক্টোবর নাকি পূর্ব পুরুষদের আত্মারা নেবে আসেন মর্ত্যলোকে। আজ এই বিশ্বাস এবং হ্যালোইনের পরব প্রায় সারা পৃথিবীতে পালিত হলেও, হ্যালোইন কিন্তু মূলত ইংরেজদের উৎসব। এই দিনে আমেরিকা এবং উত্তর ইউরোপের প্রায় সব শহরেই ছোট ছোট বাচ্ছাদের দেখা যায় নানান রকম ভূত-প্রেত-ডাইনি-পেত্নী সেজে দরজায় দরজায় গিয়ে বলছে “Trick or Treat” আর মুঠো ভোরে ভোরে চকলেট-ক্যান্ডি নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আর যেটা দেখা যায়, তা হলো, জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন: যা হলো কুমড়ো বা শালগমের গা কেটে নানারকমের ভূত প্রেতের মুখের আকৃতি করে ভেতরে প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া। নৃতাত্বিকরা বলেন যে আলেয়ার প্রতি  ভীতি থেকেই নাকি ভূতের আকৃতিতে লন্ঠন বানানোর কথা প্রথম মাথায় আসে মানুষের।

সে যাই হোক, আজকের আড্ডা হ্যালোইন নিয়ে। আগেই বলেছি যে হ্যালোইন আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হলেও তা আসলে ইংরেজ উৎসব। কথাটা আসলে একটু ভুলই বলা হয়েছে। প্রকৃত তত্ব হলো এই: আজ যে ভূখণ্ড ‘ইংল্যান্ড’ নামে পরিচিত, আজ থেকে হাজার বছর আগে তার ওপর ফরাসি-ভাষী Norman-দের আক্রমণ ঘটে (১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে) এবং এই ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রাক-নর্মাণ যুগে যারা বাস করতো ইংল্যান্ডে তাদের বলা কেল্টিক (Celtic) জনগোষ্ঠী।  পরবর্তী কালে (খ্রিষ্টীয় ৮০০ সাল নাগাদ) আগমন ঘটে  Angles (যাদের থেকে ভূখন্ডের নাম হয় England) এবং Saxon-দের (যাদের প্রাচীন বসতিস্থানগুলি এখনো Essex, Wessex, Sussex  ইত্যাদি নাম থেকে চিহ্নিত করা যায়)।

এবার এই কেল্টিকরা ছিল আগাগোড়া কৃষিজীবী–তাই শীত-গ্রীষ্মের প্রভাব ছিল তাদের জীবনে প্রবল। গ্রীষ্ম এবং শীতের সন্ধিক্ষনে তারা ফসল কাটার উৎসব Samhein (স্যাম-হেইন) পালন করতো মহাসমারোহে। এই উৎসবে অংশগ্রহণ করার জন্যই নাকি দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণে অন্ধকারের রাজপুত্র মৃত্যুর দেবতার কাছে আবেদন করতেন এবং দুজনে মিলে সকল পরলোকগত আত্মাদের আহ্বান জানাতেন পৃথিবীতে অবতরণ করার জন্য।

পরবর্তীকালে নর্মাণরা যখন এই সব জনগোষ্ঠীদের পুরোপুরি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী করার চেষ্টা করে তখন এই আনন্দোৎসব হয়ে ওঠে পথের কাঁটা। ঠিক কবে তা জানা যায় না, তবে এই স্যাম-হেইন-কেই খ্রীস্টিয়ানাইজ  করার প্রকল্পে কোনো এক সময় প্রবর্তন করা হয় “All-Hallows-Eve” যার বর্তমান রূপ হলো এই Halloween ।

এই গল্পে আমরা বার বার দেখেছি হেমন্ত, সাঁঝ ইত্যাদি সন্ধিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা। আসলে আদীম মানুষ এই বিশেষ মুহূর্তগুলোকে খুবই  গুরুত্বপূর্ণ মনে করতো। হেমন্ত হলো গ্রীষ্মের পরে শীতের প্রস্তুতির সময়; যেমন সাঁঝ বা twilight হলো দিনের পর রাতের। খেয়াল করলে দেখা যাবে পৃথিবীতে অনেক উৎসবই প্রবর্তিত হয়েছে এই বিশেষ মুহূর্তগুলোকে উজ্জাপন করার জন্য। রামচন্দ্রের অযোধ্যায় ফেরার গল্পে যতই ভোলানো হোক না কেন, দীপাবলি যে আসলে এইরকমই এক সন্ধি-পার্বণ তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে বিশেষ সন্দেহ নেই। যেমন বিজয়া দশমী হলো স্যাম-হেইন-এর মতো ফসল কাটার উৎসব; যে ফসল পূর্ণিমার দিন মা লক্ষীর কাছে উৎসর্গ করা হতো।

সাঁঝ নিয়ে একটা গল্প বলে শেষ  করবো।  এই গল্প হয়তো আপনাদের অনেকেরই অজানা। জাপানের উপকথায় আছে যে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির আদিম মুহূর্তে সৃষ্ট হয়েছিলেন দুই দেবতা। ইজানাগী (Izanagi) এবং ইজানামী (Izanami)–পুরুষ এবং নারী। তারাই অন্যান্য সকল দেব-দেবীদের জন্মদাতা। তবে অগ্নিদেবের প্রসবকালে ইজানামীর শরীর ভস্বিভূত হয়ে তিনি পাতাললোকে প্রবেশ করেন। শোকাকুল ইজানাগী স্ত্রীকে ফিরে পেতে এক উপায় ভেবে বার করেন। দিন এবং রাতের সন্ধিক্ষণে–সাঁঝবেলায়, তিনি ইহলোক এবং পরলোকের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন। যার মধ্য দিয়ে দু-জগতের মধ্যে যাতায়াতের একটা সুড়ঙ্গ তৈরী হয়ে যায়। যদিও শেষ অবধি নানান কারণে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারেন নি, তবুও জাপানি মানুষের বিশ্বাস যে এই সাঁঝবেলাই (যাকে জাপানি ভাষায় বলে Kataware-doki) নাকি মৃত আত্মাদের পৃথিবীতে প্রবেশ করার জন্য প্রশস্ত সময়। তাই ওরা আবার সাঁঝের সময় ভূত দেখে – মধ্যরাতে নাকি ওদের ভয়-টয় করে না। রূপকথার কি ক্ষমতা ভেবে দেখুন তাহলে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *