পাকাদেখা

শেলী নন্দী

—ফুলদানির গোলাপগুলো এক্কেবারে শুকিয়ে গেছে রে। আজ রজনী গন্ধা নিয়ে আসবি ওবেলা।
—বৌদি আজ ওবেলায় আসবো নাগো। মেয়ের পাকা দেখা আজ।
—ও হ্যাঁতো বলেছিলি বটে কিন্তু মনে থাকেনা রে আজকাল।

অভ্যস্ত হাতে ঝপাঝপ ঘর মুছতে থাকে পারুল। দত্তদের বাড়ীতে বেশ কয়েকবছরের ঠিকে কাজের লোক। বিশ্বস্ত আর চটপটে। কামাই টামাই খুব একটা করে না। তবে অভাবী আবদারের দায় মেটাতে হয় মাঝে মধ্যে।

দত্তবাড়ীর দুই ছেলেই বাইরে। একজন চেন্নাই আরেকজন আবুধাবি। কালেভদ্রে তাদের পা পড়ে এই মস্ত বাড়ীতে।

মফস্বলের সম্ভ্রান্ত বনেদি পরিবারটি এখন বড়ই একলা। বুড়োবুড়ীর বাস এই পেল্লাই বাড়ীতে। কর্তাবাবুর নেশা হল গল্পের বই। নাটক ফাটক করতে ভালবাসেন এখনও রীতিমতো।

গিন্নীমার তেমন একটা সময় কাটেনা আজকাল। হেঁশেল আর ঘর সাজানোয় কেটে যায় কিছুটা। বাকীটা পুজো আচ্চায়। একাকিত্ব গ্রাস করে ক্ষয়াটে বার্ধক্য ।

ছোট ছেলে আসছে পরশু। সাথে বৌমা আর একমাত্র নাতি। মনটা খুব খুশী তাই। সাজো সাজো রব একেবারে। দিন পনেরো বরাদ্দ ছুটির দিনগুলো কেমন যেন এক নিমেষে ফুরিয়ে যায়।

মনে মনে ছবি আঁকছিলেন গিন্নীমা। নাতির জন্য শিখেছেন পিৎজা বানানো। ছেলেটা এলেই পায়েস করতে মন চায়। মা এর হাতের মুড়িঘন্ট আর কাতলা কালিয়া খুব প্রিয় ছেলের ।

—বৌদি মশলাপাতি গুলো সব কৌটোয় ভরে রেখেছি। তেজপাতা কিন্তু ছিলনা।
—সে কিরে?
—আর কিছু করতে হবে?
—না না। আজ একটু আগেই যা। ঘরদোর গোছগাছ করে নে।

মুচকি হাসে পারুল।
—বৌদি চৌকি পাতা মাটির ঘর। উপরটা টিন গো। দুটো ট্রাংক আর ঠাকুরের সিংহাসন। এর আর কি গোছগাছ করবো?

কথাগুলো কি অনায়াসে বলে ফেলল পারুল। গিন্নীমার দামী আসবাব গুলো কোথায় যেন বিদ্রূপ মাখলো হঠাৎ ।

—ছেলে কী করে রে?
—ছেলে একটা কুরিয়ার কোম্পানীতে কাজ করে। একটাই ছেলে। বাড়ীঘর পাকা। আমার বাবলীকে ওদের পছন্দ। কিচ্ছু চায়নি ওরা।
—বাঃ খুব ভাল।
—আর বোলো না বৌদি কালকের ঝড়ে রান্নাঘরের টালি গেছে ফেটে নারকেল পড়ে। আকাশের মুখ দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।

গিন্নীমা দেখে নিলেন আকাশটা। একরাশ কালো মেঘ উত্তর দিকটায়।
মোবাইল টা বাজতে থাকে বসার ঘরে।
গিন্নীমা হাসি মুখে ফোনটা ধরেন। ছোট ছেলের ফোন। মিনিট পাঁচেক পর ফোন রাখলেন গিন্নীমা। আকাশের মেঘ টুকুর ছায়া তার চোখেমুখে।

ছেলেরা পরশু আসছেনা। ব্যাঙ্গালোরে বৌমার বোনের বাড়ী হয়ে তিনদিন পর এখানে। পনেরো থেকে তিন বিয়োগ গেল মনের ক্যালেন্ডারে।

পারুলের তেলচিটে কাপড়টায় চোখ গেল গিন্নীমার। কতই বা বয়স। দারিদ্র্যের ক্লান্তিতে অকাল বার্ধক্য নামে এদের চোখেমুখে।

—লোকজন এলে কী দিবি রে পারুল?
—চা বিস্কুট আর সিঙাড়া মিষ্টি। চার জন মতো আসবে।

গিন্নীমা বেশ জানেন ধারে চলে পারুলদের জীবন। আগের দিন ই বলছিল বরটা ঘরে বসা এক হপ্তা ধরে। পা ভেঙেছে বাস এর ধাক্কায়।
চার বাড়ীর ঠিকে কাজে আর কপয়সাই বা হয়?

পারুল চলে যাচ্ছিল কাজ সেরে। পিছন থেকে ডাক দেন গিন্নীমা।
—মেয়েকে নিয়ে আজ বিকেলে এখানে চলে আসিস। ছেলের বাড়ীর লোককে বলে দিস ঠিকানা।

থতমত পারুলের চোখে অবিশ্বাস আর মুগ্ধতা দুই ই। কিছু মুহূর্ত মানুষকে ভ্যাবাচাকা করে তোলে। গিন্নীমা কে ধুপ করে প্রণাম করে পারুল।

গিন্নীমা আবার ছবি আঁকেন—তাঁর পেল্লাই বাড়ীর একটা ঘরে পাকাদেখার উৎসব চলছে। আপ্যায়নে বেশ ব্যস্ত তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *