মর্নিং ওয়াক

নিলয় বরণ সোম

মিস্টার রায় রিটায়ার করেছেন দেড় দশক হলো । সুতরাং , নারীদের বয়সের উল্লেখ খুব ভদ্রোচিত না হলেও অনুমান করা যায় , শ্রীমতী রায় ষাটের বালাই পেরিয়ে গেছেন । কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন, সুতরাং অফিসথেকে ফেরার সময় ওনাকে স-কেট্স হাঁটতে দেখে ভালোই লাগলো । কুশল বিনিময়ের পর বললেন, ডাক্তার বলেছেন মর্নিং ওয়াক করতে । কিন্তু সকালে হাজারো কাজ – ছেলের অফিস, কর্তার পার্ট টাইম, ছেলেমানুষ শুভা কতোদিক সামলাবে ! তাই মর্নিং ওয়াক তা সন্ধের দিকেই করে নেই । যুক্তি অকাট্য !

যাই হোক, মর্নিং ওয়াক গড় বাঙালীর মধ্য চল্লিশের অবসেশন । বাড়ির রান্নার ভোজনবিলাস ও এদিক সেদিক ইটিং আউটের ধাক্কা সামলে , ভুঁড়ি যখন স্ফীত হয়ে ওঠে আর পলিক্লিনিকে বুকিং যখন ঘন ঘন হতে থাকে , গড় বাঙালীর তখন মর্নিং ওয়াক শুরু । আরো উৎসাহী বা সক্রিয় ভাই সকল জিমের দিকে পা বাড়ান , কিন্তু একটা বড় অংশ, ফর্টি টু এইটি , এগারো নম্বরেই আস্থা রাখেন বেশী । মহিলাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আরেকটু গূঢ় – বিশেষত নবীনাদের ক্ষেত্রে ( বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – পৃথিবীর নব্বই ভাগ মহিলা নবীনা), ডাক্তারের সঙ্গে সঙ্গে আয়নার পরামর্শও সমান গুরুত্বের ।

চুল চেরা বিশ্লষন থাক। মোটামুটি ব্যাপারটি এরকম – কলকাতার শহর ও শহরতলীতে জনগণ পার্ক বা ফাঁকা জায়গাগুলিতে চরৈবতি,চরৈবতি করে মর্নিং ওয়াকের সাধু উদ্দেশ্যে বেরোচ্ছেন । লাফিং ক্লাব, যোগাসন সমিতি এসব ধরলে জনসংখ্যা আরো বেশী । কারো সাদামাটা পোশাক, কারো বা বাহারি টি শার্ট , সর্টস বা স্লাক্স , স্পোর্টস শু , কারো কারো গলায় সোনার চেন দৃশ্যমান । কেউ কেউ নিজের মনে হাঁটেন, অনেকেরই কানে গান শোনার সরঞ্জাম , আর দল বেঁধে যারা হাঁটেন তাদের স্বাস্থ্যোদ্ধার কতটুকু হয় কে জানে, কিন্তু তারা দেশোদ্ধার অনেকটা করেন তা কান পাতলেই শোনা যায় । এছাড়া গড়ের মাঠে মূলত অবাঙালী ব্যবসায়ীরা যে গাড়ি করে হাওয়া খেতে আসেন , তা নিয়ে গড় বাঙালী শ্লেষ করলেও বেচারাদের আর উপায় কি!

এবার আপনি আমায় থামাবেন । বলবেন , থামুন তো ! ইনবক্স ছেড়ে আপনার হাঁটার পাঁচালী শুনবো কেন ? লিপিকার হিসেবে তাই আমার দায়িত্ব আপনাকে একটু অন্য স্বাদের কিছু বলার, মর্নিং ওয়াক টপিককে না টপকে !

ঘটনাটি, আমার এক ‘সেলফ এমপ্লয়েড ‘ বন্ধুর, মধ্য চল্লিশেই । পঞ্চব্যঞ্জনের তৃপ্তি অন্তে , হেলতে দুলতে নিজের অফিসে সেই এগারোটায় গিয়ে অভস্ত বাবু আবিষ্কার করলো, শরীরের বারোটা বাজছে !তার প্রতিবেশী ডাক্তার বন্ধু উৎসাহ দিলো, চল একসাথে বেরোই ! সুতরাং শুভ দিনে ভোর পাঁচটা নাগাদ দুজনের হাঁটি হাঁটি ব্রিস্ক ওয়াকিং ! প্রথোমক্ত বন্ধু যাবার সীমানা নির্ধারণ করতেই ডাক্তার বন্ধুর প্রতিক্রিয়া ! এটুকু হেঁটে কি করবি – আয় আমার সাথে ! প্রথমোক্ত এক কালে খেলা ধুলা করতো, সুতরাং সেও উৎসাহই পেলো, কিন্তু দেখলো হাঁটতে হাঁটতে তারা বাইপাসের হাসপাতাল পাড়ার কোনো একটি হসপিটালের সামনে উপস্থিত হয়েছে । ডাক্তার বন্ধুটি তাকে বললো, তুই একটু দাঁড়া , আমি একটু আসছি ! প্রথমোক্ত স্বাস্থ্যের জন্য হেঁটে ক্লান্ত, সুতরাং ক্লান্তি নিবারণের জন্য একটি ধূমায়িত পথ বেঁচে নিল। ঠিক আধঘণ্টা বাদে ডাক্তার বাবুর আগমন, বায়ুসেবনের সঙ্গে সঙ্গে ওনার হাসপালের মর্নিং রাউন্ডটিও সেরে এসেছেন যে ! এমন অর্থকরী মর্নিং ওয়াকের উদাহরণ বোধহয় খুব বেশী নেই ।

পরের ছেলেটির নাম ধরুন , খোকন । পেশায় সে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার , নিন্দুকের ভাষায় দালাল । মর্নিং ওয়াকের শুভ উদ্দেশ্যে সেও বেরোয় বটে, তবে পথে চার পাঁচটি দোকানে চা পান, এখানে সেখানে একটু সিগারেট বা বিড়িতে সুখটান, তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক জনসংযোগ তার যখন শেষ হয়, তখন সে ঘামতে থাকে রীতিমতো । হাঁটার বেগে নয়, রোদের তাপে!

এরপরের বাল্যখিল্য কাহিনীটি বলেই ফেলি । সময়কাল আশির প্রারম্ভ – জোড়া মুখ্য চরিত্র সতু ও তাপস । নায়িকা সুজাতা ওরফে বাবলি । বাঙালী শাক্ত হলেও খুব হিংস্র নয়, সুতরাং ক্লাস নাইনের সতু ও ক্লাস টেনের তাপসের মধ্যে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি হল- ওদের দুজনের মধ্যে একজন বাবলিকে ‘তুলতে ‘ পারলে আরেকজন ব্যাট ছেড়ে দেবে । কম্পিটিটিভ কোলাবোরেশন । দুজনে একমত হলো- বাবলির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে । ভোরবেলা জানালার পর্দা তুলে সে পড়তে বসে, সুতরাং সকালে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে কয়েক বার জানালার দিকে পাক খেলে কেমন হয় ? পরিকল্পনা মতো দুই বন্ধু হাঁটা শুরু করলো । তারপর সাব্যস্ত হলো, শুধু না হেঁটে একটু দৌড়লে কেমন হয় ? সালমান খান তখন মার্কেটে বেরোন নি, কিন্তু লিকলিকে সতু বা তাপস বুঝলো, একটু মাসল ডেভেলপ করলে বেশ হয় ! অনেকক্ষন পরে দুজনেরই বোধদয় হলো – তাদের মর্নিং ওয়াক কাম ম্যারাথন দৌড়ের সময়দৈর্ঘ্য বাবলির সৌন্দর্য্যের মতোই অসীম ও অপার -ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু টাইপের অবস্থা হলেও তখন সূর্য মুখ দেখাচ্ছে না -পর্দার ফাঁকে বাবলির মুখও অমিল । কারণটা অনুমেয় – প্রেমের জোয়ারে বড়ে মিয়া চোটে মিয়া মধ্যরাতে বেরিয়ে পড়েছিল!

এবার আপনি বলবেন -সবকথায় তৃতীয় পুরুষে কেন ? এবার পৌরুষ জাহির করতে নিজেই আসরে নামি । আসলে মর্নিংওয়াক জিনিসটি আমার জীবনে খানিকটা জোয়ার ভাঁটার মতো – বিশেষত বাইরে পোস্টিং হলে বা ট্যুর এ গেলে মর্নিং ওয়াকের কদর যেন বেশী বেড়ে যায় ! একবার নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে গুজরাটের এক  মফস্বলে সার্কিট হাউসের চত্বরে প্রাতঃভ্রমণ করতে বেরোলাম , হঠাৎ দেখি সশস্ত্র প্রহরী আমার সঙ্গে হাঁটা শুরু করেছে । নির্ঝঞ্ঝাট সেই মফস্বলে কোন দুষ্কৃতী আমার মত প্যাংলা পর্যবেক্ষককে মারতে আসবে না, সে কথা তাকে বোঝায় কে !

যাই হোক , চেন্নাই  পোস্টিং এর সময় বিশাল এক ক্যাম্পাসে বাস ছিল আমার । পীচ ঢালা রাস্তা , দুপাশে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার সারি, সময়কালে লাল আর হলুদ ফুলে রাস্তা চেয়ে যেত । এহেন মনোরম পরিবেশে আমরা ক’জোড়া দম্পতি রোজ বেরোতাম, কখন একত্রে, কখন খানিকটা ব্যবধানে । মর্নিং ওয়াক শেষে, আমার ডিউটি ছিল, ডেয়ারি বুথ থেকে দুধ সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরা । কদিন এমন হলো, মর্নিং ওয়াকে আমি ও এক বন্ধুপত্নী ছাড়া সকলেই গরহাজির । সুতরাং আমরা দুজনেই গল্প করতে করতে হাঁটা চালিয়ে লাগলাম । দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিন, ডেয়ারির মালকিন ভদ্রমহিলা থমথমে মুখ করে বললেন , ম্যাডাম ইল্লিয়া (তামিলে “ইল্লিয়া” মানে কিন্তু “না” বা “নেই”)? ক্যালকাটা ? অর্থাৎ আমার স্ত্রী কলকাতায় গেছেন কিনা এবং তার অনুপস্থিতির সুযোগে আমি এরকম গর্হিত প্রাত:ভ্রমনে প্রবৃত্ত হয়েছি কিনা !

তবে প্রাত:ভ্রমনের সঙ্গে প্রেম অপ্রেম পরকীয়া এসব যে একেবারে বিযুক্ত তা নয় । কোনো এক মর্নিং ওয়াকর ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত এক অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোককে আক্ষেপ করতে শুনেছিলাম, ” জানেন আমাদের পঁচিশ বছরের গ্রূপ ভেঙে গেলো ! হল ভাড়া করে পঁচিশ বছর পালন করবো ভাবছিলাম ,এমন সময়ে এমন ঘটনা ঘটলো, কি বলব, আপনি অনেক জুনিয়র !

আমি বললাম, কী এমন হয়েছিল?
বক্তা বললেন , ” আমরা চোদ্দ জন লোক নিয়ে ক্লাব শুরু হলেও সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল পঁয়ত্রিশ ! কিন্তু শেষ অব্দি কী হলো, এক ভদ্রমহিলা মেম্বার হলেন, ভাবতে পারেন, উনি লিভ টুগেদার করেন ! এরকম ব্যাপার মেনে নেয়া যায় ! আমি প্রতিবাদ করলে এমনকী পুরোনো মেম্বাররাও এক দুজন ব্যাপারটিকে সমর্থন করলেন – কী সাংঘাতিক ব্যাপার মহিলা বলুন তো !”
বুঝলাম, পবিত্রতা রক্ষা হেতু গ্রূপটির গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটান হয়েছে – লিভ টুগেদার বোধকরি ছোঁয়াচে !

প্রগলভতা শেষ করে আসি আমার সবথেকে প্রিয় উদ্যানের কথায় -মর্নিং ওয়াকের জন্য । কাবুন পার্ক , বেঙ্গালুরু। পার্কের বিস্তৃতি , বিশালতা , পুরোটাই অবাক করা। শহরের ঠিক মাঝখনে সবুজের বাসা । হেঁটে যাও হেঁটে যাও ওই গাছের মাঝখানে – পাখিরা তোমাকে দেখে গান গাইবে, হাসবে । সময় যেন তার গাম্ভীর্য নিয়ে থেমে আছে এখানে -আবার লোকের পদশব্দে, পাখির ডাকে, প্রানচ্ছল পৃথিবীর টুকরো একখানি । গাছের ফাঁকে, সূর্য যেখানে আটকে যায়, লুকিয়ে আছে কী আরো কোনো বিস্ময়? হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যায়, বিভূতিভূষণের বনমর্মর গ্রন্হের সেই কল্পনায় – এখানে হয়তো কোনকালে রাজপাট ছিল- কোনো অশ্বারোহী ঘোড়া ছুটিয়ে গেছে কবে !

আর এ সময় মনে হয়,”ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে,দেখা হবে চন্দনের বনে!”
এই ডাকের জন্য কত ক্রোশ হাঁটা যায় !..

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: