মিসেস মার্পেল

গৌরব বিশ্বাস

পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা , গতানুগতিকের বাইরে অন্যরকম ভাবতে পারা- এই সব কিছু একসাথে না থাকলে পারফেক্ট গোয়েন্দা হওয়া চলে না। হোমস, ফেলুদা বা সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ, এই সব মানসিক গুণাবলী না থাকলে এতসব জটিল রহস্যের সমাধান এদের দ্বারা হত না। তবে পুরুষ গোয়েন্দাদের দশ গোল দিতে পারে, আগাথা ক্রিস্টির মিস মার্পেল। অশীতিপর বৃদ্ধা। ক্রাইম স্পটে বিশেষ যান না। শুধুমাত্র তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অসাধারণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা দিয়েই কুপোকাৎ করেন অপরাধকে। সেই সাথে নারী স্বভাবজাত সিক্সথ সেন্স আর ইনট‍্যুশন।  আমার মা, অশীতিপর বৃদ্ধা মোটেই নন।মাঝে মাঝে মনে হয় আগাথা ক্রিস্টি মনে হয় আমার মাকে দেখেই মিস মার্পেলকে গড়েছিলেন। সেই দুইয়ে দুইয়ে চার না হয়ে ভেবে পাঁচ কিংবা সাতও হতে পারে এমন ভাবনা আমাদের পরিবারে আর কাউকে ভাবতে দেখিনি। ধরা যাক, কোনো একটা পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যখন ভাবছি, এর পরে তো এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক, মা বলবে-‘উহু দেখে নিস, এমনটা নয়, ওমনটা ঘটবে’। আমরা হেসে উড়িয়ে দিলাম-‘ ধুস, কি যে বলো তুমি!” কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে মা এর কথা মতো ওমনটাই ঘটে গেল! মা মুচকি মুচকি হাসল। এই যেমন, আমার মাসতুতো বোনটির যার সাথে বিয়ে হবে, সেই ছেলেটির সাথে তার বহুবছরের রিলেশনশিপ। গোড়ার দিকে আমরা  আত্মীয়েরা এসবের কিছুই জানতাম না। সবাই জানে দুজনে খুব ভালো বন্ধু। আমিও জানতাম তাই। মা একদিন হঠাৎ  ওদের দুজনকে দেখে আমায় বলল-‘  ওদের দুজনকে কিন্তু বেশ মানিয়েছে..”।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মায়ের প্রেডিকশন আশ্চর্য ভাবে মিলে যায়। আত্মীয় স্বজনেরা বলেন-তুমি তো জ্যোতিষী হে.. ত্রিকালদর্ষী”। আমি অবশ্য আড়ালে ডাকি-মিসেস মার্পেল।

ব্যাক টু মাই ছোটবেলা। মিসেস মার্পেলের গোয়েন্দা প্রতিভার প্ৰথম সাক্ষাৎ পাই আমি। এক সন্ধ্যায় মিসেস মার্পেল আমায় পড়াতে বসিয়ে রান্না ঘরে সামলাচ্ছে। রিডিং টেবিলে বই গুছিয়ে রাখা। অঙ্ক বই থেকে অঙ্ক করে নিয়ে দেখাতে হবে। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। যে অঙ্কগুলো করতে দিয়েছিল মিসেস মার্পেল, সেগুলো আগেও একবার করেছি খাতায়। আবার বই খুলে অঙ্ক করে কে! পুরনো খাতা খুলেই টুকে দিলাম। একটু বাদে মিসেস মার্পেল এসে জিজ্ঞেস করল-” কি রে? অঙ্ক হল”। দেখালাম অঙ্ক। একটু ক্ষণ ভ্রু কুঁচকে মিসেস মার্পেল বলল-” তুই এগুলো খাতা থেকে দেখে টুকেছিস”। আমি তো ভ্যাবলার মতো চেয়ে রইলাম। জানল কী করে রে! মিসেস মার্পেল চোখ কুঁচকে বলল-‘ কালকেই আমি এই ঘরটা পরিষ্কার করেছি। তোর অঙ্ক বইটা দেখতে নীচে নিয়ে গেছিলাম। সেটা তো নিচের বেডরুমে, আর তুই এখানে বসে অঙ্ক করে ফেললি, কিরে??”

জাম্প টু আমার জন্মের আগে। মিসেস মার্পেল তখন সদ্য বিবাহিত। তার বর, মানে আমার বাবার সাথে গিয়েছে অফিসের এক পার্টিতে।  এক সুন্দরী রমণী সে পার্টির মধ্যমণি। সবার চোখ তার দিকে। মুখশ্রী যত না সুন্দর, তাঁকে আরও সুন্দরী দেখাচ্ছে, ঠোঁটের উপর ছোট্ট একটা কালো তিলের জন্য। বিউটি স্পট। মিসেস মার্পেলের কেমন একটা সন্দেহ হল। মিসেস মার্পেল দিব্যি ভাব জমালেন সেই মহিলার সাথে। তারপর সুযোগ বুঝে সেই মহিলাকে বললেন-” দিদি আপনার ঠোঁটের উপর কী যেন লেগে”। এই বলে, মিসেস মার্পেল নিজেই মুছে দিলেন মহিলার ঠোঁট। ওমা, ঠোঁটের উপর সেই বিউটি স্পট নিমেষে উধাও। মহিলার তো কাঁদো কাঁদো অবস্থা। বিউটি স্পট যে অরজিনাল নয়, কালি দিয়ে আঁকা মিসেস মার্পেল ধরতে পেরেছিলেন আগেই।

ব্যাক টু মাই বড়বেলা। ক্লাস নাইন কী টেন। সবে পাকতে শুরু করেছি। সেসময় রাতের বেলা, এগারটার পরে, ফ‍্যাশন টিভিতে একটা ন্যুড শো হত। ওই বয়সে এসব দেখতে খারাপ লাগার তো কথা নয়। মিসেস মার্পেলকে বললাম-” রাতে ঘরে বসে পড়লে ঘুম পায়। বারান্দায় বসে পড়ব”।  মিসেস মার্পেল রাজিও হল। এক সপ্তাহ দিব্যি কাটল। হঠাৎ একদিন সকালে মিসেস মার্পেল একটু গম্ভীর হয়ে বললে-” আজ থেকে রাতে ঘরেই পড়বি। ঘুম পেলে আমি জাগিয়ে দেব”। বুঝলাম মিসেস মার্পেলের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছি। কিন্তু কী ভাবে ধরা পড়েছিলাম সেটা বুঝেছি বহু পরে। বারান্দা লাগোয়া আমাদের বেডরুম। বারান্দায় টিভি চালালে বেডরুমের কয়েকটা জানালার ফ্রেমে টিভি স্ক্রিনের রিফ্লেকশন ধরা পড়ে। মিসেস মার্পেল হয়ত সেখান থেকেই কিছু আন্দাজ করেছিল। কলেজ পাশ করার পর, প্রাইভেট টিউশন শুরু করলাম। একটি মেয়ে আমার বাড়িতে  পড়তে আসত। পড়াতে গিয়ে তারই প্রেমে পড়লাম। শুরু হল রাত জেগে কথাবার্তা ইনবক্স। অবশ্যই মিসেস মার্পেলকে এড়িয়ে। মিসেস মার্পেলের ধরতে কিন্তু সময় লাগল না। এই প্রসঙ্গে মিসেস মার্পেলের প্রখর স্মৃতিশক্তির একটু পরিচয় দিই। এখনও কোনো অঙ্ক বা অরগ্যানিক কেমিস্ট্রির ফর্মুলায় ফেঁসে গেলে মিসেস মার্পেলের শরনাপন্ন হই। মিসেস মার্পেল সব শুনে বলেন-” একটু সময় দে”। তারপর নিজেই সেই অঙ্ক বা কেমিস্ট্রির স্ট্রাকচার লিখে দেন খাতায়। সেই কলেজে এসব পড়েছেন। তাও মনে আছে দিব্যি।

একরাতে মিসেস মার্পেলের কাছে ত্রিকোনামিতির কিছু অঙ্ক বুঝছিলাম। একটু বাদে মিসেস মার্পেল ঘুম পেয়েছে বলে শুতে গেল। ব্যস, ওমনি নতুন প্রেমিকার সাথে গপ্প শুরু। পরদিন সকালে চা খেতে খেতে মিসেস  মার্পেল জিজ্ঞেস করল-” কাল রাতে কেউ ফোন করেছিল? মনে হল তুই কারও সাথে কথা বলছিস!” বললাম-” না তো”। মিসেস মার্পেল কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে বলল-” তুই রাতে আদৌ অঙ্ক করিস? নিয়ে আয় তো খাতাটা। দেখি কতটা করেছিস অঙ্ক?” ছোটবেলার সেই বদ বুদ্ধি খেলে গেল। আগে করা ত্রিকোনামিতির একটা পাতা খুলে ধরলাম মিসেস মার্পেলের সামনে। মিসেস মার্পেল কিছুক্ষণ পাতাটার দিকে চেয়ে বললেন-” তুই মিথ্যে বলছিস”। পুরো ব্যোমকে গেলাম। মিসেস মার্পেল বললেন-”  তুই যে পেনটা নিয়ে কাল অঙ্ক করতে বসেছিলিস, সেটা কালো কালির পেন। আমি ওটা দিয়ে কালই চেক সই করেছি।  তোর এই পাতায় কালো কালির একটা আচড়ও নেই। আর এ পাতার নীল কালি দিয়ে লেখা গুলো কয়েক জায়গায় একটু ঝাপসা হয়ে গেছে। মানে, বেশকিছুদিন আগের লেখা এগুলো। কাল রাতের তো নয়ই”। দাগী অপরাধীর মতো মুখ নীচু করে রইলাম আমি। মিসেস মার্পেল বললেন-” এই আমার দিকে তাকা। তুই কি প্রেম করছিস নাকি রে?” বুকের মধ্যে কেউ যেন হাতুড়ি মারল। চোখ বুজে বললাম-” হ্যাঁ”।  মিসেস মার্পেল এ নিয়ে কিন্তু বকাঝকা করেনি। বরং, প্রেম করছি জেনে খুশিই হয়েছিলেন। যদিও সে প্রেম টেকেনি বেশিদিন। মিসেস মার্পেল সাবধান করেছিলেন আগেই। আমিই শুনিনি।

গেলবার বেড়াতে গিয়েছিলাম তিনচুলে। প্রচন্ড শীতে মিসেস মার্পেল খুব কাবু হয়ে গেছিল। সন্ধ্যের দিকে একটু হুইস্কি ব্র্যান্ডি না খেলে টেকা মুস্কিল। হোটেল থেকেই এক বোতল রয়াল স্ট‍্যাগের ব্যবস্থা হল। মিসেস মার্পেল শীতে কাঁপছে কিন্তু ওসব খেতে রাজি নয়। অনেক বুঝিয়ে ছোট এক পেগ খাওয়ানো হল তাকে।  মিসেস মার্পেল চোখ বুজে তেতো ওষুধ গেলার মতো গিলে নিল। এরই ফল পেলাম মাস চারেক পর। বন্ধুদের সাথে একদিন বেরিয়ে একটু মদ্যপান করেছি। আগে ওরা খেত মদ। আমার জন্য লেবুজল আর চাট বরাদ্দ। সেদিন এক বন্ধু জোর করায় প্ৰথম মদ ছুলাম। তাও নিজের লিমিট বুঝে। বিয়ার হলে এক গ্লাস। হুইস্কি বা ভদকা হলে দু পেগের বেশী একফোঁটাও নয়। সেদিন বন্ধুদের সাথে দু পেগ হুইস্কি খেয়েছিলাম। হুইস্কি খেলে একটা সমস্যা হয় আমার। অনেকক্ষণ ধরে ঢেঁকুর ওঠে। তাতেই হল বিপত্তি। বারে গিয়েছিলাম দুপুরে।  নানা কাজ সেরে বাড়ি ফিরলাম যখন, তখন রাত। নেশা তো হয়ইনি। মুখেও গন্ধ নেই কোনোরকম,  মিসেস মার্পেলের বোঝার কোনো সুযোগ নেই। রাতে খেতে বসে মিসেস মার্পেল প্রশ্ন করে বসল-” তুই ড্রিংক করেছিস?” বিষম খাচ্ছিলাম। সামলে নিয়ে বললাম-” তুমি বুঝলে কী করে?” লুকিয়ে লাভ নেই। তাই স্বীকার করেই ফেললাম। মিসেস মার্পেল বলল-” একটু আগে যে ঢেঁকুর তুললি, তাতে হুইস্কির গন্ধ পেলাম। তিনচুলেতে গিয়ে যে হুইস্কি খাইয়েছিলি, ঠিক তার গন্ধ”।

সিগারেট খাওয়া ধরেছি, এই মাস কয়েক হল। ঘরে খাইনা। বাইরে বেরোলে এক আধটা খাই। তাও বাড়ি ফেরার বহু আগে। মিসেস মার্পেল সন্দেহ করেছে ঠিকই। যদ্দিন নিজে কিছু না বলে, চুপ থাকাই শ্রেয়।

কিছুদিন আগেই দক্ষিণ কোলকাতার দিকে একটা অনুষ্ঠানে গেছিলাম। সাথে এক বান্ধবীও ছিল। ফেরার সময় আর বাসে গুঁতোতে ভালো লাগল না।  উবার ডাকলাম একটা। ভাড়াটা আমরা দুজনেই শেয়ার করব। তাই অসুবিধে হবে না। মিসেস মার্পেলকে  ফোনে বললাম, বাসে করে ফিরছি। ক্যাবে ফিরছি জানলে এমনি কিছু বলবে না। কিন্তু ফালতু খরচ পছন্দ করেনা মিসেস মার্পেল। তাই ঢপ মারলাম। বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসব। মিসেস মার্পেল টেবিলের উপর আমার রিস্টওয়াচ, মোবাইল গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল-” তোরা তো ক্যাবে ফিরলি”। বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম মিসেস মার্পেলের দিকে। মিসেস মার্পেল মুচকি হেসে বলল-” তোর ঘড়ির চেইন, ওয়ালেট, মোবাইল এখনও ঠান্ডা হয়ে আছে”।

এভাবেই প্রতিদিন নিত্যনতুন খেল দেখিয়ে যাচ্ছেন মিসেস মার্পেল। এই তো আজ সকালে, বাজার থেকে ফিরে পেপার নিয়ে বসেছি। মিসেস মার্পেল কাজের দিদিকে দোকান থেকে কী আনতে দেবে, আমার ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে দিতে গিয়ে দেখে, পঞ্চাশ টাকার একটা নোট একটু ছেড়া। “কে দিয়েছে এমন টাকা। তুই দেখে নিস নি কেন?” মিসেস মার্পেল বলল। সত্যি, কে যে এমন ছেড়া টাকা গছিয়ে দিল! একটু বাদে মিসেস মার্পেল বলল-” তুই আজকে মাছ কিনেছিস কার কাছ থেকে”। বললাম সে কথা। ” ছেড়া টাকাটা সেই মাছ ওয়ালা দিয়েছে”। আমি অবাক-” কী করে বুঝলে?” মিসেস মার্পেল বলল-” নোটটায় এখনও একটা ভেজা ভাব। এককোণে ছোট একটা মাছের আঁশ শুকিয়ে”।

মিসেস মার্পেল পুলিশের সাব ইন্সপেক্টরের পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু রেজাল্ট দেখতে যায়নি। তার আগেই বাবার সাথে বিয়ে হয় তেনার। এ ব্যাপরটা নিয়ে আমার বড় আক্ষেপ। যার সত্যান্বেষণের ক্ষমতা সহজাত, সে এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করল!  মিসেস মার্পেলকে কখনো আক্ষেপ করতে শুনিনি এ ব্যাপারে। মিসেস মার্পেল বলেন-” ধুর, ছাড়তো ওসব কথা। এ সংসারে আসার পর ওদিকে মন দেওয়ার সময়ই পাইনি”। সত্যিই কি মিসেস মার্পেলের সে নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই! এ এক জটিল রহস্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *