মাতৃরূপেণ

অর্চনা পাল

“ভবানী – ভবানী – ভবানী – ভবানী” আবার সেই অচ্ছেদ্য গগনভেদী চিৎকার শুরু হলো। এক কানে হাত দিয়ে করবী আর এক কানে বালিশ চাপা দিয়ে দেয়। বাকি সবাইও কানে হাত চাপা দিয়ে বা পাশ ফিরে শুয়ে চাদর চাপা দিয়ে সেই বিকট চিৎকার থেকে বাঁচবার চেষ্টা করে।…….

একটা ছোট বেসরকারি হাসপাতাল, নাম “বিবেকানন্দ সেবা কেন্দ্র”। পুরুষ, মহিলাদের কেবিন আর জেনারেল ওর্য়াড মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ৩০ টার বেশি বেড হবে না। দোতলা পুরনো একটি বিল্ডিং। বাইরে ধূসর রঙের প্লাস্টার করা। নিচের তলায় একটা ছোট রিসেপসন আর মেল ওয়ার্ড। উপরের তলায় ফিমেল ওয়ার্ড আর কিছু ছোট কেবিন। হাসপাতালের সামনে  সবুজ অল্প অংশ পেরিয়ে গেট। এই মফস্বল অঞ্চলে এই হাসপাতালটুকুর অনেক দিনের প্রয়োজন ছিল। নাহলে রাতবিরেতে অসুখ হলে লোককে ছুটতে হতো অনেকটা পথ। বছর পাঁচেক হলো একজন স্হানীয় সহৃদয় ডাক্তারবাবু, কিছু গভর্নমেন্ট ফান্ডিং এর সাহায্যে তৈরি করেছেন এটিকে। চিকিৎসা খরচা নেহাতই কম শহরের হাসপাতালের তুলনায়। আবার চিকিৎসাও যাতে সুষ্ঠু ভাবে হয় তাতেও উনার বিশেষ নজর আছে। আউটডোরে রবিবার বেজায় ভিড় হয়। ডাক্তার ঘোষ ও অন্যান্য ডাক্তাররা ওদিন বিনামূল্যে রোগী দেখেন।

করবী এই চিকিৎসালয়ে আজকে নিয়ে তিন দিন ভর্তি। তিনদিন আগের রাতে তার পেটে মোচড় দিয়ে যন্ত্রণা ওঠে হঠাৎই। সবে নতুন মাস দুয়েক হয়েছে বিয়ে তার। শশুর বাড়ীর লোকজন তাকে সেদিন রাত্তিরেই ভর্তি করে দেন এখানে। ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দিয়ে রাতটুকু কাটানো হয়। পরদিন খুব সকালে তার একটা অপারেশন হয়। এখন একটু ভালো আছে সে। উঠতে পারছে, হাঁটছে ধরে ধরে। ডাক্তার জানিয়েছেন তাকে এক-দু দিন হয়ত আরও থাকতে হতে পারে, তারপর ছুটি। তার রুমের বাইরে উল্টো দিকেই রয়েছে চারটে সিঙ্গেল কেবিন। সেই একটা কেবিন থেকেই এই আওয়াজটা আসে রোজ রোজ যখন তখন, তবে মধ্যে মাঝে কোনো কোনো দিন আবার একদম পুরো শান্তও থাকে নাকি, আয়া মাসিরা ওকে বলেছে।

বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কেউ একটা দৌড়ে যাচ্ছে কেবিনের দিকে। শুয়ে শুয়ে করবী ঠিক আন্দাজ করতে পারে। এবারে সেই ডাকটা বন্ধ হয়ে গেল।…..
আয়া মাসিদের থেকে করবী জেনেছে যে ভবানীকে ডাকেন একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক যিনি ওই কোনার দশ বাই দশ কেবিনটাতে রয়েছেন। কিন্তু ডাকার কারণ কি সেটা তারা সঠিক বলতে পারে নি। একজন বলল ,” ও এক পাগল দাদুর কান্ড, ছাড়ুন দিদিভাই ওসব”।  আর একজন বলল,”বয়েস হলে হয় ওরকম, বুঝলে দিদি…” বলে হেসে গড়িয়ে গেলো। করবীর মনে মনে ভবানীকে একবার দেখার ইচ্ছা হলো। 

পরের দিন সকালের ভিজিটিং আওয়ার্সের পরে করবী বিছানা ছেড়ে উঠে পরে। বেরিয়ে আসে রুম থেকে, করিডোরটায় হাঁটতে থাকে আস্তে আস্তে। একটু দূরেই করিডোরের এক প্রান্তে নার্সদের একটা ছোট কাউন্টার আর ঠিক তার উল্টো দিকে আরেক প্রান্তে সেই চারটে কেবিন। করবী আস্তে আস্তে করিডোরের কোনের দিকের প্রথম কেবিনটার সামনে পৌছায়।দরজাটা স্লাইডিং সিস্টেমের। অর্ধেকটা বন্ধ করা আর ভেতর থেকে সবুজ রঙের পর্দা টানা। করবীর খুব ইচ্ছা হলো পর্দাটা সরিয়ে একটু দেখে ভেতরটা। খানিক ইতস্তত করে পর্দাটা অল্প সরিয়ে ভিতরটা একটু দেখার চেষ্টা করল সে। ভেতরে এক বৃদ্ধ ঘাড় নিচু করে বসে আছেন। শনের মতন খরখরা সাদা সাদা চুল মাথায়, ধবধবে গায়ের রং। মুখের ও হাতের চামড়া খুব বেশি রকমের কোঁচকানো। একটা ফতুয়া আর লুঙ্গি পরে ভদ্রলোক বেডের থেকে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। বাঁ-হাতটা একটা পাতলা লাঠির উপর ভর দিয়ে রাখা। শরীরটা হালকা কাঁপছে আর মুখটা অনবরত কিছু বিরবির করে নিজের মনে বলে চলেছে।

করবী আরও লক্ষ করে যে কেবিনটা অত‍্যন্ত ছোট। বেডের পাশে এক ফালি একটু জায়গা। হাঁটাচলা করা প্রায় দূরহ ব‍্যাপার। সেখানে আবার একটা ছোট টেবিলের উপর ওষুধ আর জলের গ্লাস রয়েছে একটা। একটা ছোট রাইটিং প্যাড আর পেন্সিলও চোখে পড়ল। উনি বেডের উল্টো দিকে জানলার সামনাসামনি বসে আছেন। যদিও জানলায় পর্দা টানা। করবী ভালো করে সব নিরীক্ষণ করছিল হঠাৎই সম্বিত ফিরল একটা আওয়াজে। -“কি দাদুকে দেখতে এসেছেন?”করবী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পাশের কেবিনের সামনে এক নার্স দাঁড়িয়ে হাসছে। -“এখন শান্ত আছে, যান না গিয়ে কথা বলুন।”বলে সেই নার্সটি পাশের কেবিনে ঢুকে পড়ল। করবী এবার নির্দ্বিধায় ভালো করে কেবিনের পর্দাটা সরালো।

বাইরের আলো চোখে পরতেই বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকালেন। কাঁপা গলায় ডাকলেন “ভবানী…”। করবী তাড়াতাড়ি বলল, “না মেসোমশাই, আমি ভবানী নই, আমার নাম করবী”। বৃদ্ধ মাথা নামিয়ে নিয়ে বললেন, ” না না, তোমাদের কাউকে চাই না। ভবানীকে আসতে বলো।” করবী কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে যাবে যখন এমন সময় বৃদ্ধ মুখ তুলে আবার বললেন,” তুমি কি জার্মানির ঘটনাটা শুনেছ? বলেছি তোমায়?” করবী বলল, “না শুনিনি তো, কি হয়েছিল সেখানে?” করবী আবার দাঁড়িয়ে যায়। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন, কথাগুলো কাঁপা কাঁপা, করবী খুব মন দিয়ে শুনতে চেষ্টা করল।-” আমি বার্লিনে চাকরি করতাম জানো… বার্লিন জানো তো কোথায়? জার্মানিতে… একটা গাড়ির কারখানায় ছিল… আর কতো বড় ছিল জায়গাটা আর কতো গাড়ি তৈরী হতো জানো সেখানে?”-” ও আচ্ছা! … তারপর ..”-“আমি তখন সেই দেশের সাহেবদের সাথে কাজ করছি। গাড়ির নক্সা্ আঁকছি। ওই ওই খাতাটায় আঁকি এখনও , ….” একটানা কথাগুলো বলে একটু দম নিলেন তিনি। আঙুল তুলে টেবিলের উপর রাখা রাইটিং প্যাডটা দেখালেন।-“এসো, এসো বসো এখানে…. অনেক কথা আছে ,বলবো তোমায়…”।-” আমি শুনছি মেসোমশাই আপনি বলুন”। বৃদ্ধ ব্যস্ত হয়ে খাতাটা দেখাবার জন্য টেবিলের দিকে হাত বাড়ান।

-“সরে দাড়ান দিদি, সরে দাড়ান…আমি দাদুকে এখন গা স্পন্জ করাবো।” এক আয়া মাসি একটা ছোট বালতি আর তোয়ালে নিয়ে কেবিনে ঢোকে। করবী একটু সরে দাঁড়ায়। -“আর শুনুন… আপনিও না ওই এক জায়গায় দাড়িয়ে থাকবেন না, হাঁটা চলা করুন। যান যান পরে আসবেন।”  বলে সে কেবীনে ঢুকে দরজাটা দুম করে  টেনে বন্ধ করে দিল। করবী চলে আসতে থাকে তার রুমের দিকে। ওদিকে কেবিনের ভিতর থেকে তখন আয়া মাসির  কাজের বিরধীতায়, বৃদ্ধের শিশু সুলভ চিৎকার ভেসে আসতে থাকে….ছেড়ে দাও আমায়….ভবানী, ভবানী…অসভ‍্য, বাজে, বজ্জাত সব …ভবানী….”।

বিকেলের ভিজিটিং আওর্য়াসের পর ভবানী নার্স আসে। রাত আটটায় তার ডিউটি শুরু। এই সপ্তাহে পুরোটাই তার নাইট ডিউটি। ওদিকে বাড়ির লোকজন চলে যাওয়ার পর করবী বেড থেকে আবার নেমে পড়লো। ধীর পায়ে গেল নার্সদের কাউন্টারে। ভবানীর সাথে কথা বলতে চায় সে। একজন সিনিয়র নার্স জানালেন ভবানী নীচের তলায় পুরুষ ওর্য়াডে গেছে। একটু পরেই সে উপরে আসবে। করিডোরে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে করবী। করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে জানলার গ্ৰিল ধরে সে বাইরের আকাশটা দেখে। মেঘে ঢাকা আকাশ, চাঁদের দেখাও মিলছে না। হঠাৎ হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে কড় কড় আওয়াজ করে বাজ পড়ছে। এরই মধ্যে একটা তারাকে মাঝে মাঝেই চোখ খুঁজে নিচ্ছে। জ্বলজ্বল করে দেখা যাচ্ছে সময়ে সময়ে। বেশ লাগছে দেখতে। -“আমায় খুঁজছিলেন দিদি?”গলা শুনে ঘুরে দাঁড়ায় করবী। -“আমি ভবানী, ওই দিদি বললো আপনি আমায় খুঁজছিলেন, তাই…”করবী এই প্রথম ভবানীকে দেখল।-“হ‍্যাঁ মানে সেরকম বিশেষ কোনো প্রয়োজনে নয়…”-“বলুন না কি বলবেন..”তামাটে রঙের শুকনো চেহারার মায়া ভরা চোখের চাউনিতে সে করবীকে শুধায়।  -“ওই এক নম্বর কেবিনের বয়স্ক ভদ্রলোকটির একটু খোঁজ নিচ্ছিলাম। তোমাকেই তো খোঁজেন উনি সব সময়।”এবারে ভবানী একটু হাসল। -“হ্যাঁ আমাকেই খোঁজেন উনি সব সময়। কি করবেন আর সবাই বড্ডো জ্বালায় যে উনাকে। হাসাহাসি করে উনার আঁকা ছবি দেখে। বহু বছর বিদেশে ছিলেন তো সেই সব গল্প বলেন। আমার তো ভালোই লাগে শুনতে জানেন।”-” আচ্ছা। তা উনার বাড়ির লোকজন?”-” ভদ্রলোকের স্ত্রী মারা যাবার পর আর দেখার কেউ নেই। এক ছেলে দুই মেয়ে আছে উনার, কিন্ত তারা আর খোঁজ রাখেনা। আসেও না। জানেন, প্রায় চার বছর হতে চলল এই কেবিনে বন্দি ভদ্রলোক!”-“কি বলছো!”-” হ্যাঁ দিদি তাহলে আর বলছি কি। বছর চারেক আগে জ্বর গায়ে উনি এখানে ভর্তি হন। সেরে ওঠেন হপ্তাখানেকের মধ্যেই। কিন্তু বাড়ির আর কেউ আসে নি উনাকে নিয়ে যেতে। সেই থেকেই রয়েছেন এখানে। এমনকি একবারের জন্য কেউ ফোন করেও কথা বলেন না।….প্রতি মাসে যদিও একটা নির্দিষ্ট পরিমানে টাকা আসে উনার খরচা বাবদ। তিন মাস আগে শুনেছিলাম একবার ফোনে নাকি জানতে চেয়ে ছিলেন উনার ছেলে যে বাবা এখনও বেঁচে আছেন কিনা।”

একটু চুপ থেকে ভবানী আবার বলতে থাকে, “জানেন তো উনাকে আমি প্রথম দিন থেকেই দেখছি। একটু খুত্খুতে। খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসেন। আর সবাইকে ডেকে খালি ওই সব বিদেশের গল্প শোনাবেন। আমি বারবার শোনা গল্পগুলোও মন দিয়ে শুনিতো তাই খালি আমায় খোঁজেন। অন্য নার্স, আয়াদের দুচোক্ষে দেখতে পারে না। ওরা যে হাসাহাসি করে উনাকে নিয়ে আর কখনও আমাকে নিয়েও…।”-“হুম….”।-“এই ভাবেই চলছে আর কি। ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রাখা হয় উনাকে। না হলে সব সময় আমাকে উনার মুখের গোড়ায় বসে থাকতে হবে…! মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হবে আর উনি তখন শান্ত হয়ে সব জমানো কথা বলে যাবেন একের পর এক। কিন্তু আমার তো আরো পেসেন্ট কে দেখতে হয় বলো? কত কাজ আরও থাকে হাসপাতালে। তারপর বাড়ি যেতে হয়… ঘর সামলাতে হয়…” একটানা কথাগুলো বলে ভবানী একটু থামল। করবী সব শুনছিল তার কথা মন দিয়ে। -“আমি এবার যাই দিদি, আবার পরে কথা হবে, রাতের খাবার দিয়েছে তোমাদের রুমে। যাও খেয়ে নাও গিয়ে।” _”হ্যাঁ যাচ্ছি… খুব ভালো থেকো তুমি ভবানী।”ভবানী একটু হেসে গটগট করে জুতোর আওয়াজ তুলে মহিলা ওয়ার্ডের দিকে চলে গেল।

করবী আস্তে আস্তে তার রুমে চলে আসে। রাতের খাবার খেতে শুরু করে সে। ভবানীর থেকে শোনা কথাগুলো খালি মনে আসছে তার। ভারি অদ্ভুত এ জীবন। ভদ্রলোকের সবচেয়ে রঙিন দিনগুলোর আবছা স্মৃতি আজকের ধূসর জীবনের বেঁচে থাকার একমাত্র খোরাক এখন। আর সাথে একাকিত্তের একমাত্র সঙ্গী হলো এই ভবানী নার্স। নিজের কাউকে বোধহয় আর মনেও করতে পারেন না উনি। আর এই মেয়েটি যার সে ভাবে কোনো দায়বদ্ধতা নেই উনার প্রতি অশেষ ধৈর্য্য, স্নেহের পরশ আর সুন্দর একটা মন নিয়ে প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখছে বৃদ্ধকে। রাত হয়েছে, শুয়ে পরে করবী। বিপরীত দিকের জানলার বাইরে চোখ যায় তার। এক পশলা জোর বৃষ্টির পর আকাশটা এখন একটু পরিস্কার, দুটো, তিনটে তারা জ্বলজ্বল করছে। দূরে কোথাও কি মাইক বাজচ্ছে! কি জানি হবে হয়তো। করবীর আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। “ভবানী-ভবানী-ভবানী….” আবার সেই ডাক শুরু হল।কিন্তু করবীর কানে যেন ভেসে আসছে সেই খুব চেনা একটা শ্লোক…ইয়া দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্হিতা…। এবার কারোর পায়ের শব্দও শুনতে পাচ্ছে সে। সেই শব্দ ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে, আরও দ্রুত হচ্ছে সে শব্দ, ক্রমশ তা চলে যাচ্ছে কোনের ওই কেবিনটায়। …… হঠাৎ এই রাতের পৃথিবীতে নেমে আসে এক অপার শান্তি! না! আর কোনও আওয়াজ নেই, আবার সব নিশ্চুপ। টুপ করে জানলার গ্ৰিল থেকে এক ফোঁটা জল পরার আওয়াজটাও তাই শোনা গেল। সত্যিই এর আগে কারোর নামের এরকম সার্থকতা দেখে নি সে। রাত অনেক, খুব ঘুম পাচ্ছে করবীর আর মনের মধ্যে একটা আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছে তার, নার্স এসে খবর দিয়ে গেছে – কাল তার ছুটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *