কিলার যখন পেইনকিলার

ডাঃ ইন্দ্রনীল আইচ

১৯৮৬ সালের ১১ই জুন…স্থান ওয়াশিংটন ডি সি, আমেরিকা। রোজকার মতো ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠেছেন সুজান স্নো। তিনি স্থানীয় একটি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। বোর্ড মিটিং থাকার জন্য অফিসে পৌঁছানোর তাড়া রয়েছে সুজানের। মেয়ে হেলি’ কে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে অফিসের জন্য তৈরী হতে লাগলেন সুজান। হেলি বাথরুমে ঢোকার আগে দেখলেন, তাঁর মা বাথরুমের বাইরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আই লাইনার লাগাচ্ছেন।

শাওয়ারের নীচে দাঁড়ানোর পরেই, বাথরুমের বাইরে “ধপ” করে একটি শব্দ পেলেন হেলি। তাড়াহুড়ো করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখতে পেলেন, তাঁর মা সুজান ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছেন…দু চোখ খোলা…চোখের মণি স্থির! সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী হার্বারভিউ হাসপাতালে ফোন করলেন হেলি, ফোন করলেন তাঁর বাবা পল’কে। সুজানকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে আনার পরে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষনা করেন!

কিন্তু মৃত্যুর কারণ কি? হার্ট অ্যাটাক? স্ট্রোক? মাত্র চল্লিশ বছর বয়স্ক সুজানের আকস্মিক মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে ব্যর্থ হলেন চিকিৎসকরা…সুজানের দেহ পাঠানো হলো ময়নাতদন্তের জন্য। লাশকাটা ঘরে সুজানের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত শুরু হলো। সুজানের মৃতদেহের পেট চেরার পরেই একটি অদ্ভুত গন্ধ পেলেন ফরেনসিক মেডিসিনের চিকিৎসক। মাস্ক নামিয়ে ভালো করে গন্ধটা বোঝার চেষ্টা করলেন…সহকারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমিও কি গন্ধটা পেয়েছো?” সহকারী উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ স্যার…বাদামের গন্ধ… পটাশিয়াম সায়ানাইড।”

পটাশিয়াম সায়ানাইড! তীব্র বিষ…যে বিষের প্রভাবে মৃত্যু আসে মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু যে মহিলা সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলেন…তাঁর শরীরে সায়ানাইড এলো কোথা থেকে? সুজানের পাকস্থলী থেকে চিকিৎসকরা উদ্ধার করলেন আধগলা একটি ক্যাপসুল। সেই ক্যাপসুলটিকে এবং সুজানের বিভিন্ন ভিসেরাকে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠালেন চিকিৎসকরা। পরদিন রিপোর্ট এলো…সুজানের শরীরের বিভিন্ন ভিসেরার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে পটাশিয়াম সায়ানাইড এবং সুজানের পাকস্থলীতে পাওয়া সেই ক্যাপসুলটিই সায়ানাইডের সম্ভাব্য “সোর্স”!

তদন্তে নামলো এফবিআই। প্রথমেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো সুজানের স্বামী পল এবং মেয়ে হেলিকে। পল জানালেন, সেদিন ভোরে উঠে সুজান তাঁকে বলেছিলেন… “ভীষণ মাথা ধরেছে”। একইসঙ্গে জানালেন, ‘মর্নিং হেডএক’ অর্থাৎ ঘুম থেকে ওঠার পরেই মাথার যন্ত্রনার সমস্যা ছিলো সুজানের। এই সমস্যার জন্য প্রায়শই ‘এক্সেড্রিন’ ক্যাপসুল (পেইন কিলার) খেতেন সুজান। এই ক্যাপসুলের কৌটোটা রাখা থাকতো যে আয়নার সামনে সুজান প্রসাধন করছিলেন…তার পাশের লকারে।

সঙ্গে সঙ্গে এফবিআই সেই ক্যাপসুলের কৌটোটি বাজেয়াপ্ত করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠায়। পরীক্ষার রিপোর্টে জানা যায়…ওই কৌটোর ভিতরের বেশ কয়েকটি এক্সেড্রিন ক্যাপসুলের সঙ্গে মিশে রয়েছে তিনটি সায়ানাইড ক্যাপসুল! অর্থাৎ…কৌটোতে যদি দশটি ক্যাপসুল থাকে…তবে সাতটি ক্যাপসুলে রয়েছে এক্সেড্রিন ওষুধ…এবং বাকি তিনটিতে এক্সেড্রিনের জায়গায় রয়েছে পটাশিয়াম সায়ানাইড…মারক বা লিথাল ডোজের চাইতে অনেক বেশী পরিমাণে! অর্থাৎ হেলি যখন বাথরুমে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ছিলেন…প্রসাধন শেষ করে সুজান তখনই ওই কৌটো থেকে একটি ক্যাপসুল খান, যে ক্যাপসুলে এক্সেড্রিনের জায়গায় ছিলো সায়ানাইড…এবং মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যু হয় সুজানের।

কে কিনেছিল এই এক্সেড্রিনের কৌটো? পরক্ষণেই গ্রেপ্তার হন সুজানের স্বামী পল, কারণ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে তিনিই এই এক্সেড্রিনের কৌটো কিনে এনেছিলেন। কিন্তু মোটিভ? পল সুজানের দ্বিতীয় স্বামী হলেও সুখী পরিবার ছিলো তাঁদের। সুজানের মৃত্যুতে পল বা হেলির কোনো লাভ হয়নি। উপরন্তু পল নিজের আর্থ্রাইটিসের ব্যাথার জন্য সেদিন সকালে ওই কৌটো থেকেই একটি ক্যাপসুল খেয়েছিলেন…তাঁর কিছুই হয়নি। কোর্টে দাঁড়িয়ে পল নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবার জন্য নিজের লাই ডিটেক্টর টেস্ট এবং নারকোঅ্যানালিসিসের দাবী জানান। তাঁর উপর এই দুটি টেস্ট করা হয় এবং তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। এফবিআই পল’কে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

এদিকে “এক্সেড্রিন ক্যাপসুলের মধ্যে সায়ানাইড পাওয়া যাচ্ছে”…এই খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা আমেরিকায়। লোকে এক্সেড্রিন কেনা বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে আমেরিকার সমস্ত দোকান এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে এক্সেড্রিনের সমস্ত কৌটো নিজেদের হেপাজতে নেয় এক্সেড্রিনের নির্মাতা ব্রিস্টল-মেয়ার ওষুধ কোম্পানি এবং প্রত্যেকটি ক্যাপসুলকে পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। সেই পরীক্ষার ফলে, আরও কয়েকটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের এক্সেড্রিনের কৌটোর মধ্যে সায়ানাইড ক্যাপসুলের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে! বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয় ব্রিস্টল-মেয়ার কোম্পানি। যে বা যারা এই অপকর্মের জন্য দায়ী…তাদের নাগাল পাওয়ার জন্য তিন লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করে ব্রিস্টল-মেয়ার!

অপরদিকে এফবিআই ব্রিস্টল-মেয়ারের ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে হানা দেয় এবং সেখানকার কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করে। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও তাঁরা সেখানকার কোনো কর্মীকেই দোষী সাব্যস্ত করতে অক্ষম হয়। উপরন্তু, সেই প্ল্যান্টে এক্সেড্রিন ড্রাগটির মধ্যে সায়ানাইডের অস্তিত্বের কোনরকম প্রমাণ মেলে না।

দিশেহারা এফবিআই এরপরে খবরের কাগজ, রেডিও এবং টিভিতে বিজ্ঞাপন দেয়। এক্সেড্রিন খেতেন এমন যেসব ব্যাক্তির গত তিনমাসের মধ্যে আকস্মিক মৃত্যু ঘটেছে…তাঁদের আত্মীয়দের এফবিআইয়ের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়। এই বিজ্ঞাপনের তিনদিন পরে, স্টেলা নিকেল নামক একজন মহিলা এফবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান…তাঁর স্বামী ব্রুস নিকেল নিয়মিত এক্সেড্রিন খেতেন। যেদিন সুজান মারা যান…তাঁর ঠিক সাতদিন আগে সন্ধ্যাবেলায় একটা এক্সেড্রিন ক্যাপসুল খাওয়ার পরে পরেই মারা যান ব্রুস! ব্রুস এমফাইসিমায় ভুগছিলেন…সেইজন্য করোনার ব্রুসের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন এমফাইসিমার কথা…যা স্বাভাবিক মৃত্যু! ব্রুসের মৃতদেহের কোনো ময়নাতদন্ত হয়নি।

এফবিআই মৃত ব্রুসের দেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং স্টেলার কাছ থেকে এক্সেড্রিনের বাকি ক্যাপসুলগুলি নিয়ে সেগুলি ল্যাবরেটরিতে পাঠায় পরীক্ষার জন্যে। পরদিন ময়নাতদন্তের এবং এক্সেড্রিনের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট আসে। দেখা যায় ব্রুসের মৃতদেহে এবং ব্রুস যে কৌটো থেকে এক্সেড্রিন ক্যাপসুল খেয়েছিলেন সেই কৌটোর বাকি ক্যাপসুলের মধ্যে দুটি ক্যাপসুলে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সায়ানাইড! অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে সুজানের মৃত্যু এবং ব্রুসের মৃত্যুর কারণ একই…এক্সেড্রিন ক্যাপসুলের মধ্যে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড!

রহস্য আরও ঘনীভূত হয় দু’দিন পরে। হঠাতই ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে ডেকে পাঠানো হয় এই কেসের তদন্তকারী অফিসার মাইকেল ডানবারকে। “ক্যাপসুলের মধ্যে রাখা সায়ানাইডের সঙ্গে কিছু একটা মিশে রয়েছে অফিসার”…মাইকেলকে জানালেন ফরেনসিক এক্সপার্ট। মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে মাইকেল দেখতে পেলেন… সত্যিই তো, সাদা রঙের পটাশিয়াম সায়ানাইড পাউডারের সঙ্গে মিশে রয়েছে সবুজ রঙের কিছু ক্রিস্টাল…অত্যন্ত কম পরিমাণে! “কি এগুলো?” …জিজ্ঞাসা করলেন মাইকেল। উত্তর এলো, “ক্রিস্টালগুলো আলাদা করে পরীক্ষা করা হয়েছে অফিসার। এই সবুজ রঙের ক্রিস্টালগুলির মধ্যে রয়েছে চারটি যৌগ…অ্যাট্রাজিন, ডাইক্লোন, সিমাজিন এবং মনিউরন…এই চারটি যৌগের আলাদা আলাদা কোনো ব্যবহার নেই…কিন্তু এই চারটি যৌগ একত্রে অ্যালগিসাইড তৈরী করতে কাজে লাগে”। “অ্যালগিসাইড! সেটা আবার কি?”… জিজ্ঞাসা করলেন মাইকেল। ফরেনসিক এক্সপার্ট জানালেন, “অ্যালগিসাইড হলো শ্যাওলা মারার বিষ। ছোট পুকুর, চৌবাচ্চা বা অ্যাকোরিয়াম…যেখানে মাছ চাষ বা পোষা হয়…সেইসব জায়গায় অবাঞ্ছিত শ্যাওলা মারার কাজে লাগে এই বিষ। মানব শরীরের ক্ষেত্রে এই বিষ মোটেই মারক নয়”। কিন্তু সায়ানাইডের মতো তীব্র বিষের সঙ্গে শ্যাওলা মারা বিষ মেশানো হয়েছে কেন? ফরেনসিক এক্সপার্টরা উত্তরে বললেন যে এর কারণ তাঁদের জানা নেই। তাঁরা আরও জানালেন, বাজারে এই সবুজ ক্রিস্টালটি কিনতে পাওয়া যায়…নাম “অ্যালগি ডেস্ট্রয়ার”।

মাথার চুল খাঁড়া হয়ে গেল এফবিআইয়ের। খুন হয়েছেন দুজন…সুজান স্নো এবং ব্রুস নিকেল…তাঁরা কেউ কাউকে চিনতেন না। খুনের কারণ সায়ানাইড…যা ছিলো বাজারে বহুল প্রচারিত পেইনকিলার ক্যাপসুলের মধ্যে। কিন্তু খুনী ওষুধের কৌটোর সমস্ত ক্যাপসুলে সায়ানাইড মেশায়নি…মিশিয়েছে মাত্র তিনটে করে ক্যাপসুলে। কেবলমাত্র তাই নয়…আরও তিনটে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ওই একই ব্র্যান্ডের ক্যাপসুলের মধ্যেও সায়ানাইড পাওয়া গেছে…সুতরাং খুন হওয়া দুই ব্যক্তিই যে খুনির টার্গেট ছিলেন…সেটাও জোর গলায় বলা যায় না। ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে ক্যাপসুলের মধ্যে সায়ানাইড মেশানো হয়নি…হয়েছে সেই ক্যাপসুল বাজারে আসার পরে…কিন্তু উদ্ধার হওয়া ওষুধের সমস্ত কৌটো ছিলো সিলড। সর্বোপরি ক্যাপসুলের মধ্যে সায়ানাইডের সঙ্গে মেশানো হয়েছে শ্যাওলা মারা বিষ…কেন…জানা নেই।

অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা তো দুরস্ত… সন্দেহের তালিকায় পর্যন্ত কাউকে আনতে পারলো না এফবিআই। সিরিয়াল কিলার, সাইকো কিলার, ত্রিকোণ প্রেম…কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই কোনোভাবে এগোতে পারলো না তারা। তাদের মনে হল…এটা হয়তো একটা “পারফেক্ট ক্রাইম”…যেখানে অপরাধী কোনো সূত্র রেখে যায়নি! আমেরিকার মিডিয়া হাত ধুয়ে পড়ে গেল এফবিআইয়ের পিছনে। “কাগুজে বাঘ”, “অকর্মার ঢেঁকি” …খবরের কাগজে এমনই সব বিশেষণ দেওয়া হলো এফবি আইয়ের নামের সঙ্গে…দাবী করা হলো এফবিআইয়ের কর্তাব্যাক্তিদের ইস্তফা! কেটে গেল দু- দুটো মাস।

ঘরে বাইরে চাপের মধ্যে পড়ে এক সপ্তাহের ছুটির আবেদন করলেন এই কেসের তদন্তকারী অফিসার মাইকেল ডানবার। ছুটি মঞ্জুর হওয়ার পরে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে চলে এলেন মিচিগান হ্রদের ধারে। সুন্দর সকাল… মাইকেলের স্ত্রী তাঁদের সন্তানদের নিয়ে খেলায় মত্ত… একটা সিগারেট জ্বালিয়ে মিচিগান হ্রদের জলের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে রইলেন বিধ্বস্ত মাইকেল।

একটু পরে হ্রদের ধারে এসে বসলেন এক বৃদ্ধ। তাঁর গালে সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি, মুখে পাইপ, হাতে মাছধরার ছিপ। কোনদিকে না তাকিয়ে ছিপের বড়শির সঙ্গে টোপ লাগিয়ে ছিপের দড়ি জলে ফেললেন বৃদ্ধ। ফাতনার ওজনে হয়তো কিছু গন্ডগোল হয়েছিল…পুনরায় ছিপটি জল থেকে তুলে ফেললেন… একবার মুখের পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়লেন…আবার ছিপটি জলে ফেললেন। একটু পরেই আবার ছিপটি জল থেকে তুললেন…পাইপের ধোঁয়া ছাড়লেন…আবার ছিপটি জলে ফেললেন।

ছিপ জলে ফেলা…পুনরায় তুলে ফেলা…মুখের পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়া…এই ঘটনা বা দৃশ্য একটু দূর থেকে লক্ষ্য করছিলেন মাইকেল। শরীরের মধ্যে একটা অস্বস্তি হচ্ছিল তাঁর…মনে হচ্ছিল…এই দৃশ্য তিনি কিছুদিন আগে কোথাও দেখেছেন। কিন্তু কোথায়? কিছুতেই মনে পড়ছিলো না মাইকেলের। চোখ বন্ধ করে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বিদ্যুৎঝলকের মতো মাইকেলের মনে পড়ে গেল যে কোথায় তিনি এই দৃশ্য দেখেছেন…সারা শরীর শিউরে উঠলো তাঁর!

আপনাদের যাদের বাড়ি মাছের অ্যাকোরিয়াম আছে তাঁরা আশা করি জানেন যে অ্যাকোরিয়ামের জলের মধ্যে মাছের বৃদ্ধির জন্য সবসময় অক্সিজেন সাপ্লাই দিতে হয়। এই অক্সিজেন একটি পাম্পের মাধ্যমে অ্যাকোরিয়ামের জলের মধ্যে চালনা করা হয়। প্রায়শই দেখা যায়, অ্যাকোরিয়ামের জলের মধ্যে যে স্থানে অক্সিজেনের বুদবুদ বার হয়…সেখানে একটি সুদৃশ্য পুতুল লাগানো থাকে। মাইকেলের মনে পড়লো, এই কেসের সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব ব্যাক্তির বাড়ি তিনি তদন্তের স্বার্থে গিয়েছিলেন…তাঁদের মধ্যে কোনো একজনের বাড়ি তিনি একটা মাছের অ্যাকোরিয়াম দেখে ছিলেন…যে অ্যাকোরিয়ামে অক্সিজেন সাপ্লাই করবার মুখটিতে বসানো ছিলো একটা পুতুল…যেটাকে দেখতে অবিকল এই বৃদ্ধের মতো। সেই পুতুলটি ছিলো একটি বৃদ্ধের পুতুল…গালে দাড়ি…হাতে ছিপ…মুখে পাইপ। পুতুলটি একবার করে ছিপ নামাচ্ছিল…পরক্ষণেই তুলে ফেলছিল…তুলে ফেলবার সময় মুখের পাইপ থেকে বার হচ্ছিলো অক্সিজেনের বুদবুদ। মাইকেল যার বাড়ি এই অ্যাকোরিয়ামটি দেখেছিলেন…তাঁর নাম…স্টেলা নিকেল…খুন হয়ে যাওয়া ব্রুস নিকেলের বিধবা স্ত্রী! ! ! একইসঙ্গে মাইকেলের মনে পড়লো ফরেনসিক এক্সপার্টদের কথা…সায়ানাইডের সঙ্গে মিশে রয়েছে সবুজ রঙের শ্যাওলা মারা বিষের ক্রিস্টাল যা অ্যাকোরিয়ামে শ্যাওলা মারার কাজে ব্যবহৃত হয়!

ছুটি বাতিল করলেন মাইকেল। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে তৎক্ষনাৎ বাড়ির পথ ধরলেন। একরাশ চিন্তা ঘিরে ধরলো তাঁকে। সুজানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে নামার পরে নিজের স্বামী ব্রুসের তথাকথিত “স্বাভাবিক” মৃত্যুর তদন্ত করার অনুরোধ করেন স্টেলা। যদি তিনিই খুনী হবেন তবে ব্রুসের মৃত্যুর তদন্ত করতে এফবিআইকে অনুরোধ করবেন কেন? সুজানকে স্টেলা চিনতেন না… তাহলে সুজানের ক্যাপসুলে তিনি সায়ানাইড মেশাবেন কেন? কিভাবেই বা মেশাবেন? কেনই বা সায়ানাইডের সঙ্গে মেশাবেন শ্যাওলা মারা বিষ?

প্রশ্ন…অনেক প্রশ্ন…কিন্তু কোনটারই উত্তর ছিলো না মাইকেলের কাছে। কিন্তু ডুবন্ত মানুষ যেমন বাঁচার জন্য খড়কুটোকেও আঁকড়ে ধরেন…অন্ধকারের মধ্যে ঘুরতে থাকা মাইকেলও তেমনইভাবে আঁকড়ে ধরলেন এই সামান্য সমাপতন বা কোইনসিডেনসকে…সায়ানাইডের মধ্যে শ্যাওলা মারা বিষ যা অ্যাকোরিয়ামে ব্যবহৃত হয়…এবং স্টেলার বাড়িতে রয়েছে অ্যাকোরিয়াম!

বাড়িতে স্ত্রী সন্তানদের নামিয়ে দিয়েই মাইকেল চলে এলেন স্টেলার পাড়ায়। ওই এলাকায় মাছ ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত যতগুলো দোকান ছিল…প্রত্যেক দোকানের মালিককে স্টেলার ছবি দেখালেন মাইকেল। একটি দোকানের মালিক স্টেলাকে চিনতে পারলেন…স্টেলা সেই দোকান থেকেই প্রায়শই নিজের অ্যাকোরিয়ামের জন্য “অ্যালগি ডেস্ট্রয়ার” কেনেন!

এরপর মাইকেল গেলেন স্টেলার বাড়িতে…তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। কথায় কথায় জানতে চাইলেন…স্টেলার হবি কি? স্টেলা জানালেন, তিনি বই পড়তে ভালোবাসেন…স্থানীয় লাইব্রেরীর সদস্য তিনি।

সেই লাইব্রেরীতে ছুটলেন মাইকেল। লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে দেখা করে বললেন, “স্টেলা নিকেল গত ছয় মাসে কোন কোন বই পড়েছেন বা বাড়ি নিয়ে গেছেন…রেজিস্টার দেখে এখনই আমাকে জানান”। রেজিস্টারে দেখা গেল, গত ছয় মাস ধরে স্টেলা যত বই পড়েছেন…তার সবকটিই “টক্সিকোলজি” বা “বিষবিদ্যা” সংক্রান্ত! এমনকি প্রত্যেকটি বইতে সায়ানাইডের চ্যাপ্টারটির কিছু জায়গা থেকে নোট নিয়েছেন তিনি! ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টদের লাইব্রেরীতে ডেকে পাঠালেন মাইকেল…ওইসব বইয়ের পাতা থেকে স্টেলার আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করলেন তিনি।

কিন্তু মোটিভ? মোটিভ কোথায়? আবার স্টেলার বাড়ি গেলেন মাইকেল। স্বামী মারা যাওয়ার পরে কিভাবে চলছে স্টেলার…কথায় কথায় জানতে চাইলেন মাইকেল। স্টেলা বললেন, “ব্রুসের জীবনবিমা করা ছিলো…সেই বিমার টাকাতেই আপাতত চলছে”।

টাকা! এই অ্যাঙ্গেলটাতো আগে ভাবেননি মাইকেল। পরদিনই ছুটলেন বিমা কোম্পানির অফিসে। সেখানকার আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে ব্রুস নিকেলের জীবনবিমা সম্পর্কিত খুঁটিনাটি জানতে চাইলেন। দেখলেন…মাত্র ছয় মাস আগেই করা হয়েছে সেই বিমা। বিমার শর্ত…যদি ব্রুসের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে তবে স্টেলা পাবেন ২৫০০০ ডলার। কিন্তু যদি কোনভাবে ব্রুসের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে…সেক্ষেত্রে স্টেলা পাবেন ১,৫০,০০০ ডলার! পুনরায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টদের ডেকে পাঠালেন মাইকেল। বিমার কাগজে ব্রুসের সই মাইক্রোস্কোপের নীচে ফেলে পরীক্ষা করা হলো। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ব্রুস ও স্টেলার সই এবং বিমার কাগজে ব্রুসের সই পরীক্ষার পরে…S এবং N অক্ষরের টান দেখে এক্সপার্টরা নিশ্চিত হলেন যে বিমার কাগজে সইটা ব্রুসের নয়…সেটা আসলে স্টেলার…ব্রুসের অজান্তেই স্টেলা তাঁর নামে জীবনবিমার পলিসি করান…ব্রুসেরই সই জাল করে!

মাছের দোকানীর বয়ান, লাইব্রেরীর রেজিস্টার এবং জীবনবিমার কাগজের উপর ভিত্তি করে স্টেলার নামে ওয়ারেন্ট বার করেন মাইকেল। পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় স্টেলা নিকেলকে। তাঁর বাড়ির বেসমেন্ট থেকে পাওয়া যায় একটি হামানদিস্তা…যা স্টেলা নিজের অ্যাকোরিয়ামের শ্যাওলা মারা বিষ গুঁড়ো করবার জন্য ব্যবহার করতেন। এক্সেড্রিন ক্যাপসুলের মধ্যে সায়ানাইড ঢোকানোর আগে এই হামানদিস্তায় ফেলেই গুঁড়ো করেন সেই সায়ানাইডকে। এই “অলমোস্ট পারফেক্ট ক্রাইম” এ একটিই ভুল স্টেলা করেছিলেন…হামানদিস্তায় ফেলে সায়ানাইড গুঁড়ো করবার আগে স্টেলা ওই হামানদিস্তাটিকে জল দিয়ে ধুতে ভুলে যান…যার ফলে ক্যাপসুলের সায়ানাইডের সঙ্গে মিশে যায় অ্যাকোরিয়ামের জন্য আগে গুঁড়ো করা শ্যাওলা মারা বিষ যা ওই হামানদিস্তার গায়ে আগেই লেগে ছিলো… সেই গুঁড়োই শেষ অবধি ধরিয়ে দেয় স্টেলাকে! হিসাব মিলে গেল মাইকেল ডানবারের। মনে পড়লো অপরাধবিজ্ঞানের প্রথম সূত্রের কথা…”পারফেক্ট ক্রাইম বলে কিছু হয় না…অপরাধী কোনো না কোনো সূত্র ছেড়েই যায়”।

জেরার মুখে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন স্টেলা। তাঁর জবানবন্দি শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান এফবিআইয়ের ধুরন্ধর অফিসার এবং বিচারকরা।

সুখী জীবনযাপন করতেন ব্রুস, স্টেলা এবং তাঁদের সন্তানরা। হাই প্রোফাইল জীবনযাত্রার জন্য একসময় দেনায় ডুবে যান তাঁরা…নিজেদের বাড়িও বন্ধক রাখতে হয়। খরচ কমানোর জন্য মদ্যপান ছেড়ে দেন ব্রুস। কিন্তু হুল্লোড়পূর্ণ জীবনযাত্রায় এই অস্বাভাবিক ছেদ মানতে পারেননি স্টেলা…তাঁর প্রয়োজন ছিলো টাকার…আরও টাকার। সেই টাকা যোগাড় করবার জন্য অভিনব প্ল্যানিং করেন স্টেলা। ঠিক করেন, নিজের স্বামী ব্রুসকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবেন!

প্রথমেই সই জাল করে ব্রুসের নামে একটি জীবনবিমা করান স্টেলা। উপার্জন কম থাকার জন্য বিমার প্রিমিয়াম কম রাখেন…সাম অ্যাসিউরড মাত্র ২৫০০০ ডলার। কিন্তু বিমার অ্যাক্সিডেন্টাল বেনিফিট রাখেন অনেক বেশী… ১,৫০,০০০ ডলার! অর্থাৎ…ব্রুস যদি দুর্ঘটনায় মারা যান…বিমা কোম্পানির থেকে স্টেলা পাবেন প্রায় ছয় গুণ টাকা!

ব্রুস ‘মর্নিং হেডএক’ এর রোগী ছিলেন…তাঁর ঘুম থেকে ওঠার পরেই মাথা ধরতো…মাঝেমাঝেই এক্সেড্রিন ক্যাপসুল খেতেন ব্রুস। ব্রুসের এই অভ্যাসটাকেই কাজে লাগান স্টেলা। লাইব্রেরীতে গিয়ে টক্সিকোলজির বই থেকে পটাশিয়াম সায়ানাইড সংক্রান্ত সবকিছু জেনে নেন স্টেলা…তারপর কোনভাবে কিছু পরিমাণ সায়ানাইড জুটিয়েও ফেলেন।

এলাকার সমস্ত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ঘুরে ঘুরে কিছু এক্সেড্রিনের কৌটো কেনেন তিনি। ডিসেকটিং ফরসেপ এবং জলের সাহায্যে খুলে ফেলেন কৌটোর সিল। প্রত্যেক কৌটো থেকে তিনটি করে ক্যাপসুল বার করে সেগুলোকে খুলে ফেলেন। ভিতরের ওষুধ ফেলে দিয়ে ভরে দেন পটাশিয়াম সায়ানাইড! এরপরে পুনরায় ক্যাপসুলগুলিকে কৌটোয় ভরে আঠা দিয়ে সিল আটকে দেন। কৌটোর বাইরের প্লাস্টিক সিল আটকান আগুনের উত্তাপ কাজে লাগিয়ে।

তিনি এই কৌটোগুলির একটি রাখেন ব্রুসের লকারে। বাকি কৌটোগুলি নিয়ে স্টেলা ফিরে যান ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলিতে। অন্যান্য জিনিস কেনার অছিলায় একসময় সকলের অলক্ষ্যে ডিসপ্লে সেলফে রেখে দেন সায়ানাইড ক্যাপসুল মেশানো কৌটোগুলিকে…যেখান থেকে দুদিন আগে তিনি কৌটোগুলি কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন! প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য…তখনও হয়তো বার কোড রিড করে জিনিসপত্র বেচার চল আমেরিকাতে শুরু হয়নি।

প্ল্যানিং এবং ব্যাকআপ প্ল্যানিং দুটোই তৈরী ছিলো স্টেলার। তিনি জানতেন, কোনো না কোনোদিন ব্রুসের হাতে কৌটো থেকে সায়ানাইড ক্যাপসুলটাই উঠবে। একদিন উঠলো…মারা গেলেন ব্রুস। কিন্তু কপালে মন্দ…করোনার মৃত্যুর কারণ হিসাবে লিখলেন “এমফাইসিমা”…যা একটি স্বাভাবিক কারণ…অ্যাক্সিডেন্টাল নয়। বিমা কোম্পানির থেকে মাত্র ২৫০০০ ডলার পেলেন স্টেলা।

এমনটা যে হতে পারে…স্টেলা সেটা আগেই ভেবে রেখেছিলেন। বিমা কোম্পানি থেকে ১,৫০,০০০ ডলার হাসিল করবার জন্য স্টেলার দরকার ছিলো আর কয়েকটি মৃত্যুর। সেইজন্যেই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে সায়ানাইড ক্যাপসুল মেশানো কৌটোগুলি সাজিয়ে রেখেছিলেন তিনি। তিনি জানতেন, কেউ কেউ না ওই ক্যাপসুল খাবে এবং মরবে। বারংবার এক্সেড্রিন ক্যাপসুল খেয়ে মৃত্যুর জন্য আজ না হোক কাল এফবিআই তদন্ত শুরু করবেই এবং এক্সেড্রিনের মধ্যে সায়ানাইডের উপস্থিতি ধরা পড়বে। দোষ চাপবে ওষুধ কোম্পানির উপরে এবং তখনই তিনি ব্রুসের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা এফবিআইকে জানাবেন…ব্রুসের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হবে…এবং সেই ময়নাতদন্তে ব্রুসের শরীরে সায়ানাইডের উপস্থিতি ধরা পড়বে…সঙ্গে সঙ্গে ব্রুসের “অস্বাভাবিক মৃত্যু”র কথা বিমা কোম্পানিকে জানিয়ে ১,৫০,০০০ ডলার দাবী করবেন স্টেলা! শুধু তাই নয়…ওষুধ কোম্পানির উপরে নেগলিজেন্সের অভিযোগ এনে তাদের থেকে মোটা টাকার ক্ষতিপূরণ দাবী করার মতলব ছিলো স্টেলার! এমনকি করোনার যদি প্রথমেই ব্রুসের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করতেন…সেক্ষেত্রেও প্রথমে সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকলেও, সায়ানাইডজনিত পরবর্তী মৃত্যু (এক্ষেত্রে সুজানের মৃত্যু) হলেই সন্দেহের বাইরে চলে যেতেন স্টেলা…অভিযোগের তীর সেক্ষেত্রেও ওষুধ কোম্পানির দিকেই ঘুরতো! নিখুঁত এবং ফুলপ্রুফ প্ল্যানিং…অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই!

একটাই ভুল করেছিলেন স্টেলা নিকেল…হামানদিস্তায় সায়ানাইড গুঁড়ো করবার আগে তিনি সেটা জল দিয়ে ধুয়ে নেননি!

এই একই কথা বলেছিলেন মাইকেল ডানবারও…”স্টেলা যদি হামানদিস্তাটি একবার ধুয়ে নিতেন…কিংবা সেই বৃদ্ধ মানুষটি যদি সেদিন মিচিগানের ধারে মাছ ধরতে না আসতেন…হয়তো এই রহস্যের কিনারা কোনদিনই হতো না”।

সুজান স্নো’র অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত করতে নেমেছিল এফবিআই। তদন্ত শেষে দেখা যায়…সুজানের মৃত্যু আসলে স্টেলার প্ল্যানিংয়ের “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” বা “পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া”! সুজানের মেয়ে হেলি…যিনি চোখের সামনে নিজের মা’কে মরতে দেখেছিলেন…তিনি শেষ অবধি মানুষ হন এক আত্মীয়ের কাছে। তাঁর সৎবাবা পল সুজানের মৃত্যুর পরেই তাঁকে ছেড়ে চলে যান। একটি ইন্টারভিউতে হেলি বলেছিলেন, “খুব ভালো মানুষ ছিলেন আমার মা…একজন ভীষণ ভালো মা…একজন ভীষণ ভালো স্ত্রী…উঁনি কেন মারা গেলেন সেটা জানার পর আমি বিস্মিত…স্তম্ভিত! স্টেলাও তো একজন মা…কি করে এমন কাজ করলেন উঁনি?”

আর স্টেলা নিকেল…কি হলো তাঁর? আপনারা শুনলে অবাক হবেন…তিনি আজও জীবিত আছেন। পুরো ঘটনা শোনার পরে এবং প্রমাণ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়ার পরে হতভম্ব আমেরিকান কোর্ট এই ঘটনাকে “বিরলের মধ্যে বিরলতম” এবং স্টেলাকে “সমাজের জন্য ক্ষতিকারক” আখ্যা দিয়ে তাঁকে ৯০ বছরের অর্থাৎ আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে! নিজের জেদ এবং স্ট্যাটাস বজায় রাখবার জন্য নিজের স্বামীকে হত্যা করেছিলেন তিনি…হত্যা করেছিলেন এমন এক নারীকে যাকে তিনি চিনতেন না…সেই মহিলা স্টেলার কোনো ক্ষতি করেননি…অর্থের প্রতি অমোঘ আকর্ষণে দুটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তিনি…নিজের এবং সুজানের। স্টেলার নিজের ছেলেমেয়েরা তাদের বাবার নির্মম হত্যার কথা জানতে পেরে নিজেদের মা’র অর্থাৎ স্টেলার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষী দেন। সেদিনের ৩৯ বছরের স্টেলা আজ ৭২ বছরের বৃদ্ধা…বন্দী আছেন আমেরিকার একটি কারাগারে…দিন গুনছেন সেইদিনটির জন্য যেদিন তাঁকে দাঁড়াতে হবে অন্য আরেকটি কোর্টে…যেখানে প্রমাণ পেশ হয় না…আদালত মুলতুবি হয় না…সওয়াল জবাব হয় না…সরাসরি ফয়সালা শোনানো হয়।

আমার গল্প শেষ। শেষে একটা কথাই আপনাদের বলতে চাই। এই পৃথিবীটা খুব সুন্দর। বাঁচুন…প্রাণ ভরে বাঁচুন। কিন্তু আরও ভালোভাবে বাঁচতে চেয়ে অন্যের ক্ষতি ডেকে আনবেন না। মানুষ আইনের চোখে ধুলো দিতে পারে… সমাজের চোখে ধুলো দিতে পারে…কিন্তু দিনের শেষে নিজের বিবেককে আর জীবনের শেষে সেই অসীম শক্তিকে জবাবদিহি আমাদের প্রত্যেককেই করতে হবে। এই বিশ্বসংসারে দুটি জায়গায় মিথ্যার কোনো স্থান নেই…প্রথমটা অন্তরাত্মা…দ্বিতীয়টা পরমাত্মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *