খুব সহজে তাঁকে নবনীতাদি বলা যায়

শতরুপা বোস রায়

“দাঁড়াও শতরূপা ! একটু লিপস্টিক লাগিয়ে আসি। তোমরা ছবি তুলবে, টিভি তে দেখানো হবে, একটু সাজবো না? ” এরকম একটা শিশুসুলভ দিক যে নবনীতাদির ছিল সেটা হয়তো অনেকেই জানেন। তবে তার ক্ষমতা শৈলীর বিশালত্বের সামনে দাঁড়িয়ে বার বার মনে হয়েছে এই মানুষটাই কি চেতনার গভীর অতলে গিয়ে রচনা করে গেছেন সম্পর্কের চরম কিছু সত্য ? 

কাছে থাকো । ভয় করছে ।
মনে হচ্ছে এ মুহূর্ত বুঝি সত্যি নয় ।
ছুঁয়ে থাকো ।  শ্মশানে যেমন থাকে দেহ ছুঁয়ে একান্ত
স্বজন, এই হাত, এই নাও হাত….
কে দেবে হাত? কে বাড়াবে এই প্রজন্মের দিকে হাত? বলবে, আয় কাছে, এসে ক্ষণেক দাঁড়া। বড় ছোটাছুটি তোদের আজকাল”। জানি না সত্যি “অনন্ত আগামী” কখনো অসত্য হয় কিনা তবে এই অনন্তের সত্য মিথ্যা বিচার করতে ইচ্ছে করেনা আর । নিদারুণ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পরপারের অদৃশ্য ছায়াটাকে ঘিরে যে রোমাঞ্চ, কৈ সেই রোমাঞ্চ আজকাল আর বিহ্বল করেনা তো ? বেদনা বুঝি এমনই অতলস্পর্শী। বেদনার রং নীল তবুও এই অন্ধকারে সে যে তার কালো করাল ছায়া বিস্তার করেছে। আজ সত্যি বড়ো ভয় করছে। কাছে যে কাউকে পাইনা আর, একে  একে  অন্ধকারে ঝরে গেছে সব । বড়ো  ভয় হয়।  

নবনীতাদির সাক্ষাৎকার একবার নয়, কয়েকবার নিয়েছি। এক একবার এক একরকম ভাবে। প্রথম একটা শুটিংয়ে। ” ভলোবাসা “য় ওনার বাড়িতে গিয়ে। ক্যামেরা ম্যান ক্যামেরা সেট করে, একে একে পুরস্কারের ছবি তুলছে, পদ্মশ্রী, সাহিত্য একাডেমি। আমি বসার ঘরেই অপেক্ষা করছি, উনি তৈরী হতে গেছেন। কঙ্কাবতী দত্ত এবং বাণী বসুর ওপরে অনুষ্ঠান, কলকাতার একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে। অনুষ্ঠানের নাম “পরম্পরা”। ওনাকে বাণী বসুর সম্পর্কে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন আমাদের ডিরেক্টর অভীক মুখোপাধ্যায়, যিনি সেই সময় ঋতুপর্ণ ঘোষের সহ পরিচালক হয়ে কাজ করতেন। সেই ডিরেক্টরিয়াল আজ্ঞা মেনেই আমি সহ পরিচালক হিসেবে নবনীতাদির সাক্ষাৎকার করতে গিয়েছিলাম। 

আমাদের সকাল ১০ টায় সময় দিয়েছিলেন নবনীতাদি । আমরা সময়ের একটু আগেই পৌঁছে গিয়ে দরজায় বেল বাজিয়েছি। ওপর থেকে চাবি ফেলে দিলেন বাড়িতে যিনি নবনীতাদির দেখাশোনা করতেন। তখন বয়েস কম ।  অভিজ্ঞতাও কম । সুতরাং নক্ষত্রের সামনে এসে দাঁড়ালে কেমন যেন মনের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য অনুভব করতাম। তারওপর ওই বাড়ি “ভালোবাসা”,  সেখানে পা দেওয়া মাত্র সমস্ত শরীর জুড়ে  আলোড়ন সৃষ্টি হয় ।  কে না এসেছেন এই বাড়িতে, বুদ্ধদেব বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাস ।  মনে মনে নিজের প্রফেশনটাকে কুর্নিশ জানিয়ে বসে আছি চুপ করে. চারিদিকে যা দেখছি তার সবটা আহরণ করবার মতো পরিণত নই আমি তখনও । কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে এই প্রহর বন্দী সময়টাকেও যদি পারতাম চিরকালের জন্য বন্দী করতে। 

বাণী বসু সম্পর্কে নবনীতাদি বলবেন, আমরা শুধু সেই টুকুই রেকর্ড করে নিয়ে চলে আসবো। হয়তো বা ১০ মিনিটের রেকর্ডিং। অপেক্ষা করছি বসার ঘরে. বইয়ের স্তুপ। অগোছালো ঘর. সামনে একটা টেবিলে লেখার খাতাটা খোলা, কলমটাও যে কিছুক্ষন আগেই ব্যবহার করা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে বেশ. ডট পেনের রিফিলটা তখনও বের হয়ে আছে ।  ঔৎসুক্য বাগ মানে না ।  উঠে টেবিলের ধারে গিয়ে খাতায় কি লেখা আছে সেটা দেখার সাহসও কুলিয়ে উঠতে পারছিনা। হঠাৎ, জল আর প্লেটে সন্দেশ নিয়ে এসে হাজির হলেন নবনীতাদির বিশ্বস্ত লোক ।  “দিদি স্নানে গেছেন, আপনারা একটু অপেক্ষা করুন।” বলা তখনও শেষ হয়নি, আমাদের ক্যামেরাম্যানও সবে সন্দেশটি তুলে মুখে পুড়বে এমন সময় হঠাৎ নবনীতাদি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, হাতে তিনটে শাড়ি, “শতরূপা, তুমিই তো ফোন করেছিলে। এই দেখো না কোন শাড়িটা পড়ব?” আমি কেমন যেন তখন দিশাহারা। থতমত খেয়ে বললাম, “আপনার যেটা পছন্দ, তিনটেই তো বেশ সুন্দর রং” ।  উনি ওনার স্বভাবজাত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমায় তো সব রং মানায় না!” এমন সাবলীল ভঙ্গিতে উনি কথা বললেন যে মনে হলো যেন কতদিনের চেনা। এক চেনা ভালোবাসার গ্রন্থি যেন সেই মুহূর্তে বেঁধে ফেলেছিলো আমায় সেদিন নিজের অজান্তেই। তিনটে টেকে শুটিং শেষ হলো, টিভিতে প্রোগ্রামটাও টেলিকাস্ট হলো ।  তারপর বছর ঘুরে গেলো।  একদিন হঠাৎ ফোন । “একবার এসো” ।  ততদিনে আমি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ছেড়ে দিয়ে খবরের কাগজে চাকরি করেছি । ইংরিজি খবরের কাগজে বিশেষ করে যেখানে আমি যুক্ত ছিলাম সেখানে পেজ থ্রি করে নবনীতা দেব সেনের স্টোরি করার অবকাশ ছিল কম. বরং ওনার মেয়ে নন্দনা তখন পেজ থ্রিতে তে বেশ চেনা মুখ. আমি অফিস শেষ করে ওনার বাড়ি গেলাম। উনি বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। আমিও একটা মোড়া নিয়ে ওনার পাশে এসে বসলাম। হতাশা জড়ানো সুর, কিন্তু বড্ডো আদুরে। কাছে গেলেই মনে হতো এখুনি জড়িয়ে ধরবেন। অনেক কথা হলো ।  এমনি গল্প। তারপর কাজের কথা ।  আমার একটা লেখা, শ্যামাসুন্দরীর ডায়েরি ওনাকে পড়তে দিয়েছিলাম। সেটি একটি নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি বাঙালি বিধবার রোজনামচা, আমার মাস্টার্স করার সময় জেরাল্ডিন ফোর্বস এর সঙ্গে কাজ করেছিলাম সেই ডায়রি নিয়ে। সেই থিসিসটা তখন ছাপানোর জন্য জেরি আমায় ইনসিস্ট করেছিল। আমি নবনীতাদিকে অনুরোধ করেছিলাম একবার লেখাটি ভালো করে পড়ে বলার জন্য যে সত্যি লেখাটির কোনো সাহিত্যিক মূল্য আছে কিনা। সাহস জুটিয়ে বলেছিলাম ঠিকই কিন্তু ভাবিনি উনি আমার মতো নাম না জানা এক সামান্য সাংবাদিকের লেখা এতো মন দিয়ে পড়ে তার বিশ্লেষণ করবেন। প্রশংসা কুড়িয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু আপ্লুত হয়েছিলাম যে ভাবে উনি পুরোটা পড়েছিলেন, সময় নিয়ে, যত্ন করে. জেরক্স করা কাগজের ওপরে লাল কালি দিয়ে ওনার হাতের লেখাটা এখনও  স্পষ্ট। সেই পেনের কালিটা হয়তো বা শুকিয়ে গেছে আজ. লেখাটি শেষ অবধি নানা কারণে আর প্রিন্টে দেওয়া হয়নি। এখন বইয়ের ট্রাঙ্কে তোলা রয়েছে, মাঝে মাঝে হয়তো শুকনো লঙ্কা আর কালো জিরের পুঁটলি পাল্টে দিতে মা ওই ট্রাঙ্ক খুলে থাকেন কলকাতায়। আর আমারও পরবাসে সেটি এখন একটি সুখকর স্মৃতি। প্রাত্যহিকতায় সাহিত্যের ধার কমে এসেছে, সেই উদ্যমও আর নেই। 

২০১৭ তে কলকাতা গিয়ে দেখা হয়েছিল শেষ বারের মতো. তারপর আর বিশেষ কারুর সঙ্গে দেখা করতেন না। শরীরটাও তবে থেকেই খারাপ। তবে তখনও বড় আপন করে কথা বলেছিলেন উনি। বলেছিলেন, “মাঝে মাঝে ফোন করো. লেখা থামিও না । “
স্মৃতির ভার বড় সাংঘাতিক। ওনার কাছ থেকেই একটা কথা শিখেছিলাম, “নিজের দুর্বলতা, ক্ষমতা যা কিছু ভালো মন্দ সবটা ফুটে ওঠে নিজের রচনায়। তোমার কলম তোমার অন্তরের ছবি আঁকে তোমারই অজান্তে।” আজ কেন জানি না বারবার সেই কথাটাই মনে হচ্ছে। এই নক্ষত্র পতনে শূণ্য কি শুধু আকাশের বুক? আজ জানতে ইচ্ছে করছে, কোথায় যায় সেই সব নক্ষত্ররাশি? যে শেষ আলোর রোশনাই রেখে দিয়ে যায় শূন্যে কৈ সেই আলোকস্পর্শ? অমোঘের অন্ধকারে আজ যে বড়ো আবছা দেখায় সব ।  

 এতদিন জেনে এসেছি অনন্ত অর্থাৎ চির শান্তি, চির নির্ভরতা, অনন্তেই সেই মিলনের পূর্ণতা। তবুও আজ বলতে ইচ্ছে করছে, অনন্ত আজ মিথ্যা হোক । 

One thought on “খুব সহজে তাঁকে নবনীতাদি বলা যায়

  • November 9, 2019 at 10:12 am
    Permalink

    Ashadaron,tomar sotty onek vaggo eto vhabe onake chena.Ami allpo onar lekhar sathe chena,ar ajj o mone achye Buya amar chele Sunny ke tuitions e diye amra bondhu ra onar barir rock e bose thaktam . ekdin hya matro ekdin oni oei somoy bari firchen,amra sobai thotomoto kheye uthe porechi,oni ekgall heshe amader bollen sob maa to ?bose porun uthte hobe na ,mukhe ekgall hashi , sotty bolchi emon kichu boro ghotona na hoyto ,tobuo oei din ta ar oei hashi ta ajj o vulte pari na,tui toke janalam.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *