বাজি বিভ্রাট

গৌরব বিশ্বাস

সুকুমার রায় যদি কোনোদিন পাগলা দাশুর ‘লেডি সংস্করণ’ লিখতেন, আমি নিশ্চিত তাঁর অনুপ্রেরণা হত আমার মাসতুতো বোনটি। চেহারাটি অবশ্য তার পাগলা দাশুর মতো বিটকেল নয়। ভালো নাম যাই হোক না কেন, চেহারা ছবির মতো তার ডাকনামটি-‘মিঠাই’। ছোটবেলার আদর করে দেওয়া নাম। কথায় কথায় ‘মিঠাই’ থেকে ‘মেঠাই’ হয়ে গেছে। এ কাহিনীতে আমরা অবশ্য তাকে ‘লেডি দাশু’ বলেই ডাকব। তবে নামটি যতই ‘মিঠাই’ হোক, এমন নামের আড়ালে সর্বদা দুষ্টু বুদ্ধি কিলবিল করে। মামাতো মাসতুতো ভাই বোনেদের মধ্যে আমি আর এই বোনটি প্রায় পিঠোপিঠি। ওর অনেক দুষ্কর্মের সাক্ষী আমি। সেই একবার ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে এসেছে আমার বাড়ি বেড়াতে। দুপুরে  বাড়ি পুরো শুনসান। সব ঘুমোচ্ছে। লেডি দাশুর শখ হল, এক বোতল ঠান্ডা জল খাবেন। ওদিকে ফ্রীজে ঠান্ডা জল নেই। ডিপ ফ্রীজের ঝুরো বরফেও সাধ মেটে না। লেডি দাশু উপায় বাতলে দিলেন-‘ দেশলাই জ্বেলে ডিপ ফ্রীজে ফেলে দে। সব বরফ জল হয়ে যাবে’। ‘লেডি দাশু’র আদেশ কি আর অমান্য করা চলে! তাই করতে যাচ্ছিলাম আমি, এমন সময় বাবা এসে ধরে ফেললেন। লেডি দাশু ছোটো বলে পার পেয়ে গেল। যত দুর্ভোগ আমার কপালে।

এই কিছুদিন আগে, আমার এক আত্মীয়ের পোষা মাছটাকে এক খাবলা হজমি গুলি খাইয়ে দিয়েছিল লেডি দাশু। তারপর একসপ্তাহ ধরে মাছটার পেট ছেড়েছে।

এই তো এই পুজোতেই পঞ্চমীর দিন বেরিয়েছিলাম একসাথে ঠাকুর দেখতে। শ্রীভূমির ওমন ভীড়ে এক বেআক্কেলে মহিলা  ঠাকুরের সাথে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। ছুটে এল লেডি দাশুর বাক্যবান-‘ দিদি ছবিটা ঠাকুরকেও ট্যাগ করে দেবেন’।

আরেকবার পুজো দেখতে বেরিয়ে  এক ট্রাফিক পুলিশকে যা নাস্তানাবুদ করেছিল না লেডি দাশু!

 যদি কোনো আধবয়সী খুড়ো লেডি দাশুকে ম্যাসেঞ্জারে পাঠায় প্রেম প্রস্তাব, লেডি দাশু সুন্দর করে তার রিপ্লাই দেয়-‘হরি বলে মন রসনা, খেঁজুর গাছে পোঁদ ঘষোনা’। এমন উত্তরে খুড়োই উল্টে লেডি দাশুকে ব্লক করে দেন।

লেডি দাশুর এসব কাহিনী ফুরাবার নয়। এসব না হয় অন্য কোনোদিন শোনাবো আপনাদের। যে কাহিনী বলতে  এত গৌরচন্দ্রিকা করা, সেটিই বরং বলি-

বছর দুই আগের কথা। তখনও মাসীদের দক্ষিণেশ্বরের বাড়িটা ভাঙা পড়েনি। ভাইফোঁটার দিনকয়েক বাদে গিয়েছি মাসিবাড়ি বেড়াতে। সন্ধ্যা নাগাদ লেডি দাশু বলল-‘ কিছু বাজি আছে। চল, ছাদে গিয়ে ফাটাই’।

বড়রা আড্ডায় মশগুল। আমি আর লেডি দাশু বাজির প্যাকেট নিয়ে চললুম ছাদে। পুরনো বাড়ির বিশাল ছাদ। একপাশে জলের ট্যাঙ্কি। বাকিটা ফাঁকাই। সন্ধ্যে বেলা ছাদ পুরো শুনসান।  এক কোণে শুধু লেডি দাশুর বড় কাকীমার চুড়িদার পাজামা  শুকোতে দেওয়া। কবন্ধের মতো দড়ি থেকে ঝুলছে ।

আলো জ্বালিয়ে বাজির প্যাকেট খোলা হল। তারাবাতি, রংমসাল, তুবড়ি, ইলেকট্রিক তার, রকেট, চরকি, চুটপুট, সাপবাজি, রংদেশলাই বাদ নেই কিছু। একটা একটা শুরু হল ফাটানো। লেডি দাশু বাজি ফাটানোয় আমার থেকেও বড় ওস্তাদ। তুবড়ি গুলো ওর জন্য বরাদ্দ। আমার ওই তারাবাতি রংমশালই ঠিক আছে।  একেক করে সব বাজি শেষ। মুশকিলে পড়া গেল রকেট গুলো নিয়ে। ব্যাটাদের ধড় নেই। ডান্ডি ভাঙা। রয়েছে শুধু মুন্ডু। মুন্ডুর নীচ দিয়ে সলতে উঁকি মারছে। ওগুলো ছাড়ব কী ভাবে! ঠিক হল, ট্যাঙ্কির স্ল্যাবের উপর শুইয়ে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছাড়া হবে। ওদিকে কোনো বাড়ি ঘর নেই, তাই সমস্যা হবেনা।

দুটো রকেট সাঁ করে ধেয়ে গেল নির্ভুল নিশানায়। সাহস করে তিন নম্বরের পেছনেও আগুন দিলাম। এবার যে কী কান্ড ঘটল বুঝে উঠতে পারলাম না। শোঁ করে আওয়াজ শুনলাম বটে, কিন্তু রকেট বাবাজি দ্বিগবিদিক জ্ঞানশূন্য  হয়ে কোথায় যে ল্যান্ড করলেন বুঝে পেলাম না। ওসব নিয়ে না ভেবে নীচে নামার সিঁড়িতে পা দিয়েছি, হঠাৎ একটা তীব্র পোড়া গন্ধ নাকে এল। ছাদের দিক তাকিয়ে আমাদের চক্ষুস্থির। ছাদের কোণে  বড় কাকীমার  শুকনো জামা কাপড়ে আগুন লেগেছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে।

লেডি দাশুর বড় কাকীমা খুব জাঁদরেল। এসব জানতে পারলে বাড়ি মাথায় করবেন। চোখের সামনে চুড়িদার পাজামা মায়  পুড়ে গেল। পড়ে রইল একমুঠো ছাই। কিন্তু এখন কী করা!  উপায় বাতলালেন লেডি দাশু। ছাদের কল এক বালতি জল ভরে ঢেলে দিল ছাইয়ের গাদায়। সব ছাই ধুইয়ে ড্রেন দিয়ে বেরিয়ে গেল।  অপরাধের প্রমাণ লোপাট। পাততাড়ি গুটিয়ে  নেমে এলাম নীচে। ড্রেনের অ্যামিবা  ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পোকারা তখন ছাইয়ের দানা নিয়ে ভলিবল খেলছে। পুরো ব্যাপরটাই চেপে গেলাম বেমালুম। বড়কাকীমা এ ব্যাপরটা নিয়ে দিনকতক  গোলমাল করেছিলেন বটে । তাঁর নতুন চুড়িদার পাজামা  কিনা রাতারাতি ভ্যানিশ হয়ে গেল! তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্তে এসেছেন- এসব ওই বদমাশ কাকটার কাজ। তবে বাড়ির লোকের ধন্ধ কাটেনি। চুড়িদার পাজামা নিয়ে কাকের কী কাজ, সে এক অপার রহস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *