রাশিফল

অঙ্কুশ

বাজার থেকে ফিরে ব্যাগটা রেখেই হাঁক পাড়লো অনন্ত।

-হ্যাঁ গো,আজকের পেপার দিয়েছে?
-হ্যাঁ দিয়েছে,দেখো যেখানে থাকে ওখানেই রেখেছি। পড়ে আবার ওখানেই রেখো,যেখানে সেখানে রেখে দিয়োনা যেনো।
-ঠিক আছে।

প্রতি রবিবার সকালবেলা পেপারে রাশিফল দেখা বহুদিনের অভ্যাস অনন্তের। আজও অন্যথা হলোনা।

প্রথমেই চোখ গেলো প্রতিমার মেষরাশিতে। অর্থলাভের সম্ভাবনা রয়েছে।

এর মধ্যেই কখন ড্রয়িংরুমে এসে গেছে প্রতিমা।

-জানো আজ কি হয়েছে?
-আমি কিকরে জানবো
-শোনো তবে। সকালের নোংরা ফেলার গাড়ী এসেছে। আমি বালতিটা ফেলে দিয়ে ফিরছি,দেখি সামনেই ২০০ টাকার একটা নোট পরে! আমি ভাবলাম তোমার হতে পারে,তাই নিয়ে এলাম। তোমার নাকী দেখোতো?

অনন্ত পার্স চেক করে। না হিসাব তো ঠিকই আছে।

-তবে না জানি কার। রেখে দি তবে। বাজারে গরীব কাউকে পেলে দিয়ে দেবো।
-হুম।

আবার পেপারে মুখ গোঁজে অনন্ত। এরমানে প্রতিমার ক্ষেত্রে মিলে গেলো!

এবার ওর নিজের সিংহরাশিটা দেখে। ব্যাপক সাংসারিক অশান্তি!

চাপে পড়ে যায় অনন্ত। অশান্তি হতে যাবে কেনো? সকাল থেকে তো প্রতিমার মন খুব ভালো দেখছে,কাল মেয়ের বাড়ী যাবে তাই। নাতির জন্য কী নিয়ে যাবে,জামাইয়ের জন্য কী-এসবই বলে চলেছে। হঠাৎ অশান্তি হতে যাবে কেনো!

এদিকে কাল থেকে যে এতোদিন পর দুদিন প্রতিমা থাকছেনা,ওর সব প্ল্যানও কমপ্লিট। হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ বানিয়ে সব বন্ধুদের জোড় করে রাজি করিয়েছে কতো সেন্টিমেন্টাল কথা বলে বলে। ব্যাচেলার লাইফটা ফেরত পাওয়া যাবে কতোদিন পর। একপেটি বিয়ার অলরেডি তুলে এনে পুরোনো সেল্ফটার নীচে রেখে দিয়েছে। সেগুলো প্রতিমা দেখে ফেললো না তো?

গিয়ে চেক করে। নাহ ঠিকই তো আছে। তবে?

মনে করার চেষ্টা করে কী কী কারনে ঝগড়া হতে পারে। আজ ঝগড়া হলে খুব মুস্কিল,দুদিন শান্তিতে থাকতেও পারবেনা,আর প্রতিমার সন্দেহটাও বেড়ে থাকবে। নাহ,শান্তিতে মেয়ের বাড়ী পাঠাতে হবে।

উমম,কী কী কারনে ঝগড়া হয় ওর আর প্রতিমার? যাহ,কোনো কারনই মনে পড়েনা। অথচ রোজই ঝগড়া হয়। তোয়ালেটা শুকোতে কে দেবে,অফিস থেকে এসে মোজাটা আলাদা করে রাখোনা কেনো,পটলগুলো দেখে কিনতে পারোনা-সব বুড়ো পটল তুলে এনেছো! এসবই,নিরীহ ঝগড়া। কখনো কখনো সেটা বাড়াবাড়িতে পৌছয়। কিন্তু বেশিরভাগ দিন এমনিই থেমে যায়। বিল ও তো আজকাল মোবাইলেই মেটায়,ফলে বিল না দেওয়ার জন্য আগের মতো ঝগড়া হবেনা।

ইউরেকা! মনে পড়েছে। মনে পড়েছে।

তাড়াতাড়ি করে স্কুটির চাবিটা নিয়ে বেড়োতে যায় ও। প্রতিমা হাঁক পাড়ে,ওগো শুনছো কালকের যাওয়াটা….

-এসেই শুনছি থামো। একটা কাজ পড়ে গেছে,সেরেই আসছি।

কাল রাতেই ওর তৎকাল টিকিট করার কথা ছিলো। মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ি। শিলিগুড়িতে। কিন্তু বিয়ার কেনার চক্করে বেমালুম ভুলে গেছে।

নাহ,কোনো সুযোগ দেওয়া যাবেনা।

তৎকাল টিকিট শেষ! বাধ্য হয়ে ৩ গুন বেশী দাম দিয়ে প্রিমিয়াম তৎকাল করে। লাগুক টাকা।

ফেরার সময় একটা আলাদাই উত্তেজনা অনুভব করে যেনো অনন্ত। যেনো আবার শরীরে সেই জোড়,সেই আনন্দ। আহা। কাল থেকে ২ দিনের জন্য স্বাধীন ও! অফিসও ছুটি নিয়েছে অনেক কষ্ট করে।

ঘরে ঢুকতেই প্রথম চমকটা লাগে।

প্রতিমা ফোনে কথা বলছে।
-শোন টিকেটটাও তো হয়ে গেলো। আর চাপ নাই। বুঝতেই তো পারছিস,বয়স বাড়ছে,অতোক্ষন ট্রেনে বসে থাকা!

গম্ভীরমুখে প্রতিমার দিলে চেয়ে থাকে অনন্ত। প্রতিমা ফোন রাখে।

-শুনলে গো,আমি কাল যাচ্ছিনা। ওরাই আসছে কাল। জামাই ছুটিও পেয়ে গেছে। টিকেটও করে নিয়েছে। তোমাকে বলার জন্য ডাকলাম এতো,তুমি তো স্কুটি নিয়ে কোথায় আবার তাড়াহুড়ো করে গেলে..

অনন্তের বুকে বাজ পড়ে। এত্তো প্ল্যান করলো এতো কষ্ট করে,সব জলে? চুপ করে থাকে। কিচ্ছু বলেনা। পেপারখানা সামনেই পড়েছিলো। হাতে নিয়ে নাড়ানাড়ি করে।

-কী গো,কালকের পেপার পড়ছো কেনো তুমি?
-মানে?
-হ্যাঁ এটাতো কালকের পেপার। এই তো আজকের পেপার,পড়ছিলাম একটু আগে। দেখি তোমার রাশিতে আজ কী লেখা আছে। অ্যাঁ? গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যান ক্যানসেল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা! কী সব লিখেছে গো? তোমার আবার কী প্ল্যান ক্যানসেল হলো? প্ল্যান তো ক্যানসেল হলো আমার!

অনন্ত পুরোনো সেলফটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে,আমি কিকরে জানবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *