প্রবাসে ওলন্দাজের পাশে

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

দুর্গাপুজো শেষ​, কিন্তু তাই বলে বাঙালী, তথা ভারতবাসীর উৎসব শেষ ন​য়। কাহানি অভি বাকি হ্যায়​, মেরে দোস্ত​! নেদারল্যান্ডসের কথাই ধরুন​, দুর্গাপুজোর পরেই আমরা হৈচৈ-এর পক্ষ থেকে নিয়ম মেনে লক্ষ্মীপুজো করলাম​। কালীপূজা, এবং দিওয়ালি আগতপ্রায়​। যদিও বারোয়ারী কালীপূজা এখনো নেদারল্যান্ডসে হ​য় না, কিন্তু দিওয়ালি পালন করা হ​য় বিভিন্ন জায়গায়​। নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন অফিসেও হোলি আর দিওয়ালি পালন করা হ​য়​, ডাচরাও সেই উৎসবে যোগ দেন সানন্দে।

নেদারল্যান্ডসে লক্ষ্মীপূজা

কিন্তু, আজ থেকে দশ​-বারো বছর​ আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। বাঙালীদের কথা তো ছেড়েই দিলাম​, সেই সম​য়ে নেদারল্যান্ডসে বসবাসকারী ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল নগণ্য​। যাঁরা অনেকদিন ধরে এই দেশে আছেন​, তাঁদের সাথে আমরা, যারা চাকরীসূত্রে এই দেশে এসেছি, তাদের যোগাযোগ খুব বেশী ছিল না। তাই, তখন কম্যুনিটি মানে ওই অফিসের সহকর্মীরাই। ভাগ্যক্রমে, আমি যে প্রজেক্টের সূত্রে নেদারল্যান্ডসে এসেছিলাম​, সেখানে বেশীরভাগ সহকর্মীই বাঙালী, তাই বিদেশেও বঙ্গ​-কানেকশনটা টিকে গিয়েছিল​। কিন্তু অনেকের সেই ভাগ্য হ​য়নি।

আগেও কোন লেখায় হ​য়তো উল্লেখ করেছিলাম​, এই লেখার সূত্রে আর​-একবার উল্লেখ প্র​য়োজন – নেদারল্যান্ডসে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ বাস করেন যাঁদের পূর্বপুরুষরা এই দেশে এসেছিলেন সুরিনাম থেকে। সুরিনাম দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ​, যেখানে একসম​য়ে ওলন্দাজ উপনিবেশ ছিল​। এই প্রসঙ্গে সুরিনামের কথা লিখলাম​, তার কারণ ডাচেরা ভারত থেকে অনেক শ্রমিক সুরিনামে নিয়ে গিয়েছিল​, যাঁরা সম​য়ের সাথে সাথে পুরুষানুক্রমে সেখানেই থেকে যান এবং পরবর্তীকালে (অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনকালের পরে) নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন​। সেই সূত্রে বেশ ব​ড় সংখ্যায় সুরিনামী নাগরিকদের শিক​ড় আদতে ভারতীয়​। ওনারা সেই ঐতিহ্য এখনো বহন করে চলেছেন​, এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে নিজেদের যুক্ত রাখার চেষ্টা করে চলেছেন​।

আমস্টেলভীনে ভারতীয় এক্সপ্যাট সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছে জাপানীদের

অর্থাৎ, যেমন আপনারা বুঝতে পারছেন​, নেদারল্যান্ডসে ভারতীয় অভিবাসন নতুন কোন ঘটনা ন​য়​। কিন্তু, মানসিক বা সাংস্কৃতিক দিক থেকে সেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের সাথে আমাদের, অর্থাৎ প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী বা মাইগ্রেন্টদের কিছু মৌলিক পার্থক্য থেকেই যায়​।

ধীরে-ধীরে যখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীরা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মোহ ত্যাগ করে কন্টিনেন্টাল ইয়োরোপের দিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করে, মানে ২০০১ সাল বা তার পরেই আমাদের অভিবাসনের সূত্রপাত​। সুতরাং, আমরা যখন নেদারল্যান্ডসে পৌঁছালাম​, তখনকার ভারতবর্ষের সাথে আমাদের পূর্বসূরী নেদারল্যান্ডস​-প্রবাসী ভারতীয়দের মননের ভারতবর্ষের বিস্তর ফারাক​। বিশেষতঃ, যাঁরা বা যাঁদের পূর্বপুরুষরা সুরিনাম থেকে নেদারল্যান্ডসে এসেছিলেন​, তাঁদের সাথে যদি আপনি কথা বলেন​, তাহলে এই পার্থক্যটা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন​।

সংস্কৃতিগত পার্থক্য তো আছেই, খাওয়াদাওয়াতেও সেই পার্থক্য বেশ চোখে প​ড়ার মতো। ভারতীয় খাবারের ওলন্দাজীকরণ ওনাদের হাতে কিছুটা হলেও পূর্ণতা লাভ করেছে। ওলন্দাজ খাবারের বৈশিষ্ট হলো – সম​য়ের অপচ​য় না করে তাড়াতাড়ি পেট ভরানো, আর ভারতীয় খাবারের বৈশিষ্ট – স্বাদ​। এই দুইয়ের সঠিক মিশ্রণে সুরিনাম-প্রবাসী ভারতীয়দের খুব প্রিয় লাঞ্চ – রোটি রোল​। অর্থাৎ, আলুসেদ্ধ​, চিকেন টিক্কা বা অন্য স্বাদু কোন মাংসের পদ​, কিছু সব্জি ইত্যাদি একসাথে একটা রুটির মধ্যে দিয়ে রোলের মতো খাওয়া। স্বল্প সম​য়ে স্বাদু এই খাদ্যপ্রস্তুতি অনেক ওলন্দাজেরও খুব প্রিয়​।

রোটি রোল: অনেকের প্রিয় লাঞ্চ

তবে, সম​য়ের সাথে সাথে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকল​। এখন যদিও পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টেছে, কিন্তু প্রথম​-প্রথম বেশীরভাগের বাসস্থান হতো আমস্টেলভীনে। আমস্টেলভীন​, যেমন আগেও লিখেছি, আমস্টারডাম-সংলগ্ন এক ছোট শহরতলী। আমস্টেলভীনে থাকার প্রধান কারণ ছিল​, তখন বেশীরভাগ আই-টি কোম্পানীর ক্লায়েন্ট অফিস ছিল আমস্টারডাম বা ত​ৎসংলগ্ন এলাকায়​। তাই, যাতায়াতের সুবিধা এবং বাড়িভাড়ার সুবিধার্থে আমস্টেলভীন ছিল সকলের পছন্দের বাসস্থান​। এখন সম​য় পাল্টেছে, আমস্টেলভীনের বাড়িভাড়া আকাশছোঁয়া, আর আই-টি কোম্পানীরা তাঁদের ক্লায়েন্ট বেস বাড়াচ্ছেন অন্যান্য শহরেও। তাই, এখন উত্রেখ্ত​, আইন্দোভেন​, দেন হাগ, রটারড্যামের মতো ব​ড় শহর তো বটেই, অনেক ছোট শহর বা শহরতলীতেও গ​ড়ে উঠছে ভারতীয় বসতি।

তবে, ভারতীয় অভিবাসনে আমস্টেলভীন এখনো অনেকের প্রথম পছন্দ​। আমরা প্রথম যখন নেদারল্যান্ডসে আসি, তখন মূলতঃ জাপানীরাই আমস্টেলভীনে প্রধান এক্সপ্যাট কম্যুনিটি ছিল​। এখন ভারতীয়রা সংখ্যায় জাপানীদের ছাড়িয়ে না গেলেও, সমতুল্য তো বটেই। আমি ২০০৯ সালে যখন নেদারল্যান্ডসে আসি, তখন রাস্তায় বাঙালী তো দূরস্থান​, ভারতীয় চেহারাই খুব কম দেখতে পেতাম​। আর এখন​? বাইরে বেরিয়ে বাঙলায় কথা শুনব না, এমন দিন খুব কমই আসে।

আমস্টেলভীনে ভারতীয় এক্সপ্যাট সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছে জাপানীদের

ভারতীয় কম্যুনিটি সংখ্যায় বাড়ার সাথে সাথেই নেদারল্যান্ডসে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে ভারতীয় দোকানপাট​, রেস্টুরেন্ট​, হোম ডেলিভারি, সাংস্কৃতিক সংগঠন​, এবং আরো অনেক কিছু। এখন ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে গেলেই আপনি দেখতে পাবেন ভারতীয় হিসাবে, বা অনেকক্ষেত্রে বাঙালী হিসাবে আপনার মনোরঞ্জন এবং নিত্যনৈমিত্তিক দিনযাপনের সবকিছুই নেদারল্যান্ডসে মজুত​। আর​, বেশীরভাগ পরিসেবাই পরিচালনা করছেন প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা। এখন অনেকে অফিসেও ভারতীয় লাঞ্চ সার্ভিস শুরু করেছেন​, এবং অনেক ডাচ কর্মীও সেই পরিসেবা গ্রহণ করছেন। ভারতীয় শাক​-সব্জি, মশলা, এমনকি পুজোসামগ্রীও আপনি অনায়াসে পেয়ে যাবেন আজকের নেদারল্যান্ডসে।

এক বন্ধুর থেকে শুনেছিলাম​, লন্ডনের কিছু জায়গায় নাকি রীতিমতো উচ্চমানের​ মিষ্টির দোকান আছে, যেখানে সকালে কচুরী-ছোলার ডাল পাওয়া যায়​। সেই দিন আর বেশী দূর ন​য়​, আমস্টেলভীনেও আমরা সেই সুবিধা পেয়ে যাব​।

যাঁরা এই পরিসেবা সুচারুভাবে পরিচালনা করছেন​, এই সুযোগে তাঁদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। দেশের বাইরেও দেশের সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ আপনারা আমাদের দিয়েছেন এবং দিয়ে চলেছেন​, তার জন্যে আপনাদের অসংখ্য সাধুবাদ প্রাপ্য​। শুধু একটাই অনুরোধ​, যেমন আগেও এক প্রতিবেদনে লিখেছিলাম​, আপনাদের ব্যবসা ডাচ চেম্বার অফ কমার্সে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিন​। প্রক্রিয়া খুব সহজ​, এবং খরচও যৎসামান্য​। কেমনভাবে করবেন​, কি কি প্র​য়োজন ইত্যাদি খুঁটিনাটি চেম্বার অফ কমার্সের ওয়েবসাইটে (https://www.kvk.nl/english/) পেয়ে যাবেন।

ভারতীয়​, তথা বাঙালীর সংখ্যাবৃদ্ধির সুবাদে আমরা নেদারল্যান্ডসে পেয়েছি অনেক সাংস্কৃতিক সংস্থা। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তেই কোন​-না-কোন সংস্থা আয়োজন করে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের​। আর​, উৎসব​-আনন্দের কথা তো ছেড়েই দিলাম​। আমার লেখার পাঠকমাত্রেই জানেন​, নেদারল্যান্ডসে দুর্গাপুজো হ​য় চারটে। তা ছাড়াও, দিওয়ালি, হোলির মতো জাতীয় উৎসবের পাশাপাশি লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতী পুজো, প​য়লা বৈশাখ ইত্যাদি বাংলার উৎসব তো আছেই, এমনকি গণেশ চতুর্থী বা পোঙ্গালও পালিত হ​য় ধুমধাম করে। আর​, সেই সূত্রে গড়ে উঠেছে বহু শিল্পী সংগঠন​। নাচ​, গান​, নাটক ইত্যাদি রীতিমতো পেশাদারীত্বের সাথে মঞ্চস্থ করেন সেই কলাকুশলীরা।

নেদারল্যান্ডসের বুকে বাংলা সংস্কৃতির বাহক

এই এক্সপ্যাটদের সংখ্যাবৃদ্ধি অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে ওলন্দাজদের অসুবিধার কারণ হ​য়ে ওঠে। বিশেষতঃ, যাঁরা একটু ব​য়স্ক​, স্বাভাবিক কারণেই তাঁদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা একটু কমে যায়​। আপনাদের মধ্যে অনেকেই এমন কিছু ঘটনার বিবৃতি শুনেছেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন​। তবে, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এমন ঘটনা বিরল। হয়তো কিছু মানুষ আছেন যাঁরা বিভিন্ন কারণে বিরক্ত অভিবাসীদের উদ্দেশ্যে, কিন্তু বেশীরভাগ ডাচই ভারতীয় সংস্কৃতি, খাওয়াদাওয়া, সাজপোষাক ইত্যাদিকে খুব উদার মনে গ্রহণ করেন এবং সক্রিয়ভাবে যোগদানের চেষ্টা করেন​।

তবে, এই দেশে এক্সপ্যাট হওয়া কি চ্যালেঞ্জ​-মুক্ত​? একদমই ন​য়​। সেই প্রসঙ্গে আসব আগামী প্রতিবেদনে। অপেক্ষায় থাকুন​, এবং অবশ্যই নেদারল্যান্ডসে আপনার ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা আমাদের জানান​। আপাততঃ এইটুকুই, ভালো থাকবেন​, প​ড়তে থাকবেন​।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *