প্রবাস দীপাবলি

মনামী রায়

উৎসব এর মরশুমে পরিবার ও কাছের বন্ধুদের মিস করেননা এমন মানুষ খুব কম। বিশেষ করে আজকাল যেনো ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে বড্ড বেশি করে এগুলো চোখে পড়ে। আমার ছোটবেলায় আমরা দুগ্গা পুজোর পর দুগ্গা নাম লিখে পড়াশুনো শুরু করে দিতাম। পুজোর ছবি ফেসবুকে দেবার চাপ থাকতো না, চাপ থাকতো স্কুল খুলে পরীক্ষার। ভাইফোঁটায় ছুটি থাকলেও একটা দিন ভাই বোনেরা হৈ হৈ করে আবার নিজের পড়াশুনো জগতে ডুবে যেতাম।

কালীপুজোয় ট্রাফিক এর মেলায় দাদাদের দেওয়া টাকায় খেলনা কিনে বাড়ি ফিরতাম। সেই কাজও আধবেলায় শেষ। এবং দিয়া জ্বালিয়ে কালীপুজো বা দীপাবলির শুরু হতো আর কিছু তারা বাতি দিয়ে শেষ। মানে মধ্যবিত্তের যৎসামান্য আয়োজন ও আনন্দ বলতে যতটুকু বোঝায় আর কি। এই দিওয়ালি পার্টি বা তানিশক এর দোকানে ভীড় করা (যদিও তখন তনিশক মার্কেটে আসেনি ) এগুলো আমাদের তালিকার থেকে বহু দূরে, যাকে বলে স্বপ্নাতীত। আমাদের তাগিদটা থাকতো নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর একটু ভালো করে বাঁচার। বড়ো হবার। বাবা মার এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করার। প্রতিযোগিতা থাকতো স্কুল এ, স্কুল এর বাইরে কার কিরকম স্ট্যাটাস সমাজে এই নিয়ে প্রতিযোগিতার অবকাশ বা ইচ্ছে থাকতো না। বিপদে পড়লে পাশের বাড়ির কাকু কাকিমা অবলীলায় সাহায্য করতেন।

পছন্দের খাবার হলে পাঁচিল পেরিয়ে ভাতের থালা চলে আসতো এই বাড়ি থেকে পাশের বাড়ি। পাটিসাপটা থেকে কচুরি কিছুই বাদ যেতনা এই আদান প্রদান এ। সঙ্গে অদৃশ্য যেটা পারাপার হতো সেটা হলো নিখাদ ভালোবাসা। তো সে যাই হোক, দীপাবলি পেরিয়ে গেলে মন খারাপ হতো এই ভেবে যে পুজোর পালা শেষ। আবার এক বছরের অপেক্ষা। সহজ সরল ভাবে কেটে যেত দিন গুলো। মাসতুতো পিসতুতো দাদা-দিদিরা কখনো কখনো পুজোতে আসতে পারতেন না বাড়ি দেশে থাকা সত্বেও। ছুটি পেত না বা অন্য কোনো অ্যাসাইনমেন্টের চাপে। তাদের অবশ্য ফেসবুক এ আপডেট দেবার সুযোগ ছিলো না, মানে ওই হ্যাশ ট্যাগ মিসিং হোম টাইপ ব্যাপার বলছি আর কি। এখন যেনো ব্যাপারটা একটা সোশ্যাল স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাড়িয়েছে।

২০০০ সালে আইটি বুম একটা ছক্কা হাঁকানোর স্বাদ দিলো আমাদের সাদা মাটা জীবনে। তারপর শুরু হলো ভালো সুযোগ ও ভালো চাকরির সন্ধানে বিদেশে পাড়ি। দূরত্ব আরো বেড়ে গেলো । পাঁচিল গুলো আরো উঁচু হয়ে উঠলো। ছুটিতে বাড়ি যাওয়া আরো মুশকিল হয়ে উঠলো । কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার যে সবটাই কিন্তু নিজের একটা সিদ্ধান্ত। দেশে চাকরি নেই এমনটা কিন্তু নয়। তবে যোগ্য মানুষের কদর নেই। এটা বোধ হয় অস্বীকার করা যায়না। তার কারণ করাপশন কিম্বা পপুলেশন যাই বলি না কেনো, এই রিকগনিশন বা অ্যাম্বিশন এর টানে ঘর ছাড়া হয়েছেন বহু মানুষ। অবশ্য এখানে নিজের ইচ্ছে বা তাগিদটাই কিন্তু সবার আগে। তাই অনেক মেধাবী মানুষ কিন্তু মাটির টানে দেশে রয়েছেন আম্বিশন টাকে একটু রেখে ঢেকে।অনেকে আবার তাদেরই মধ্যে অর্থ মান যশ খুঁজে পেয়েছেন দেশের মাটিতে।

তাই আমি আফসোস করার কারণ দেখিনা। মন খারাপ হলে দেশে ফেরার উপায় একেবারে নেই এমন তো নয়। উৎসব এর সময় দেশের জন্য হা হুতাশ না করে এখানে বন্ধুদের সাথে কাটানো যায় বা ছুটি নিয়ে বাবা মার কাছে চলে যাওয়া যায়। যারা দেশে থাকেন তারাও অনেকে উৎসব সাদা মাটা ভাবে কাটান এবং কাজের মধ্যে থাকেন। কাজেই পুরোটাই নিজের ওপর। আজকাল ফেসবুক এ অভিব্যক্তির বাড়াবাড়িটা মাঝে মাঝে চোখে লা গে। গ্লোবাল সিটিজেন তো আমরা এখন সবাই, একটু মাছ ভাত কম্প্রোমাইজ করতে লাগে। তাতে অসুবিধা হলে দেশের চাকরি তো আছেই। দু নৌকোয় পা দিয়ে চলা যায়না। দেশে থাকলে রাস্তার গর্ত , জলাভাব, জল জমা, ট্রাফিক, ট্রেন লেট, ডোনেশন এসব নিয়ে চলতে হয় ঠিক তেমন দু ঘণ্টার ফ্লাইটে মেয়ের কাছে পৌঁছব এটা ভাবার সুখ আছে, কাজের মাসিকে এটা সেটা অর্ডার করার সুখ আছে, রোদে জামা শুকনোর সুখ আছে।

আবার নদীর এপারে, ভালো জীবনযাত্রা, পরিষ্কার রাস্তা, ভালো পরিবহন এগুলো যেমন আছে তেমন মা এর জন্য মন কেমন হলেও যাবার সহজ উপায় নেই, বরফ ঢাকা মাস গুলো তে একটু রোদের জন্য আকুতি , মূলত পাউরুটি চিবিয়ে দিন শেষ করার কষ্ট ও আছে। তাই নদীর কোনো পারেই সুখ নেই যখন , বা দুদিকেই আছে হয়ত, তখন তর্ক না করে সবাই কে বলি কি, যেটুকু পেলে সেটা আগলে মনের আলো জ্বালিয়ে দীপাবলি তে আনন্দ করো। আসল আনন্দ তো মনে। আর যেটা পেলে না ? সেই আক্ষেপ না থাকলে কি গদ্য পদ্য রচনা হতো? ভেবে দেখো তো। তাই সেটাও আগলে রাখার। সুখ দুঃখের মাঝেই জীবনের জয়োগান হোক। অনুপম রায় এর কথা ধার করে বলতে ইচ্ছে হয় সব পেলে নষ্ট জীবন!
তাই, সবাই ভালো থেকো আর সবাই কে ভালো রেখো ।
হ্যাপি দিওয়ালি l

The following two tabs change content below.
Avatar

Manami Roy

Avatar

Latest posts by Manami Roy (see all)

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: