অবসরযাপনের সাতসতেরো

মিহিররঞ্জন মন্ডল

ফেসবুকে আমি একটা ষাটোর্ধ গ্রুপের সদস্য। তো তাতে দেখলাম এক ভদ্রলোক বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তাঁর জুতোর কারবার, সেইজন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত এমন একজন কর্মচারি খুঁজছেন যিনি হবেন বেশ এনার্জিটিক। কাজ করবেন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছ- টা পর্যন্ত। আমি ভদ্রলোকের পোস্টে মন্তব্যে লিখলাম ‘ তিনি তো একজন শিক্ষিত তরুণকে এই কাজের জন্য নিতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত বয়স্কদের কাছ থেকে তিনি তাঁর কাজের আউটপুট কতটা আশা করেন? ‘ কিন্তু  সবচেয়ে আমার অবাক লাগল  ওই গ্রুপের বেশ কিছু অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক সদস্য চাকরিটা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে মোটামুটি অনেকেই একসময় ভাল চাকরি করেছেন। একজন ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত ব্রাঞ্চ ম্যানেজারও আছেন দেখলাম।

অবসরের পরেও ষাটোর্ধ কিছু মানুষকে সময়বিশেষে চাকরি করতে হয়। সংসারে হয়ত টাকা পয়সার অভাব, সেটাকে সামাল দেওয়ার জন্য সুযোগ পেলে এটা করতে হয়। তবে অনেকেই এটা চান কাজের মধ্যে দিয়ে অবসর সময় কাটাতে। আসলে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কীভাবে তাঁরা বাঁধা রুটিনের বাইরে সময় কাটাবেন এ নিয়ে আগে থেকে তাঁরা ভাবেন না। কোন পরিকল্পনাও করেন না।     

আমার কাছে অবসর জীবন মানেই কিন্তু নবলব্ধ স্বাধীনতা। চাকরি করার জাঁতাকলে পড়ে  মনের মধ্যে যে সুপ্ত ইচ্ছাগুলো এতদিন চাপা পড়েছিল সেটার সদ্ব্যবহার করাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। তার জন্য বেশ কিছু আগে থেকে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আমার বয়স এখন ৭৯ বছর। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি ১৯৯৮ সালে। অবসরের পর তাই কীভাবে সময় কাটবে তার জন্য আমার কখনও  কোন চিন্তা ছিল না।     

ফটোগ্রাফি  আমার কাছে  একসময় ছিল প্যাশন। সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও একসময় চুটিয়ে ফটোগ্রাফি করছি, অবশ্যই ফিল্ম ক্যামেরায়। আমার ছিল নিজস্ব ডার্করুম। ফিল্ম ডেভেলাপ থেকে আরম্ভ করে ফটোপ্রিন্ট সবকিছু নিজের হাতেই করতাম। ফটোগ্রাফি নিয়ে বিশেষ করে ফটোজার্নালিজম নিয়ে নিজের মতো করে একসময় পড়াশোনা করেছি। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাদেমির অর্থানুকূল্যে একটা বইও প্রকাশ করেছিলাম। যাইহোক, অবসরের কিছুকাল পরে দেখলাম অ্যানালগ ফিল্ম ক্যামেরার যুগ শেষ। এল ডিজিটাল ক্যামেরা। ফটোগ্রাফি আর করতাম না। কিন্তু ওই বিষয় নিয়ে তখনও আগ্রহ কিছু কমেনি। আমার আঠাত্তর বছরে হাতে এল একটা স্মার্টফোন।  তাতে দেখলাম ক্যামেরা রয়েছে। ওই নিয়ে নেমে পড়লাম স্ট্রিট ফটোগ্রাফিতে। এই অশক্ত শরীর নিয়েও জনজীবনের কিছু ছবি তুলতে চেষ্টা করছি এখনও। ফেসবুকে street photography in the world, Best black & white photography ইত্যাদি গ্রুপে আমার তোলা কিছু কিছু ছবি বার হচ্ছে। তাতে সময় কাটছে বেশ আনন্দেই।     

ছবিআঁকাটা ছেলেবেলায়  শিখতে পারিনি। একটা আপশোস ছিল বরাবরের। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তখন বয়স একুশ কি বাইশ। ইন্টার মিডিয়েট পাশ করে অ্যাপ্রেনটিশ হিসাবে শিবপুরের একটা বড় কারখানায় ঢুকেছি। তিনটে শিফটে কাজ হত। তখন শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের কাছে আমার এক বন্ধুুর বাড়িতে  থাকতাম। সকালের দিকে গার্ডেনের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে খুব ভাল লাগতো। একদিন দেখি কী এক ভদ্রলোক ক্যানভাসের উপর তেলরঙে ছবি আঁকছেন। আমি অনেকক্ষণ ধরে তাঁর ছবি আঁকা দেখতে লাগলাম। একসময় ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন আমি ছবিটবি আঁকি কি না। আমি বললাম আঁকি না। তখন ভদ্রলোক আমাকে বলেছিলেন যদি কখনও ছবি আঁকেন তবে এর মতো আনন্দ আর কিছুতে পাবেন না। ভদ্রলোকের নামটা আমার আজও মনে আছে। মধুমোল্লা খান।     

অবসরের পর আমার স্থানীয় এক বন্ধুর স্টুডিওতে আড্ডা দিতে যেতাম। তাঁর ছবি আঁকা দেখতাম। একদিন আমারও আঁকার শখ হল। কিছুদিন নিজের মনে আঁকিবুঁকি করতে করতে শেষে রঙ, তুলি, ক্যানভাস, ইজেল ইত্যাদি কিনে ফেললাম। শুরু করে দিলাম নিজের মতো করে ছবি আঁকা। তবে এ হল সাধনার জিনিস। চট করে ধরা দেয় না। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে করে আঁকতে আরম্ভ করলাম।  নিজে তেলরঙে একটা কিছু এঁকে পেতে লাগলাম অপার আনন্দ। একঘেয়েমি কোন কিছু কাছে ঘেঁষার সুযোগ পায়নি। এ ছাড়া কার্টুন আঁকায় আগ্রহ ছিল। পাঞ্চ পত্রিকার কিছু বুদ্ধিদীপ্ত কার্টুন তখন ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়াতে বার হতো। ওটা  দেখতাম। এ ছাড়া ছেলেবেলায় ‘সচিত্র ভারত’ পত্রিকায় কার্টুন দেখতাম। কাফি খাঁ, রেবতীভূষণ, চন্ডী লাহিড়ী, ওমিও, নারায়ণ দেবনাথ, আর কে লক্ষ্মণ  এঁদের কার্টুনও ভাল লাগত। তাই অবসরের পর অল্পসল্প কার্টুন কিছু নিজের মতো করে আঁকতে চেষ্টা করেছি।     পড়াশোনাটাও করেছি নিজের খেয়ালে। না, পাশের পড়ার কথা বলছি না। প্রথাগত শিক্ষা আমার বলার মতো নয়। মনের আনন্দে পড়া। বাংলা সাহিত্য কিছু কিছু পড়েছি। তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ,  শরদিন্দু এখনও পড়ি। কন্টিনেন্টাল সাহিত্য কিছু পড়েছি। এ সব পড়ে আগ্রহ জন্মেছে অনুবাদ করায়। অবসরের পরে বেশ কিছু বিদেশী গল্প অনুবাদ করেছি। এখনও করছি। এতে অবসর সময় ভালো কাটে।      এখন হয়েছে ফেসবুক, গুগুল এইসব। গুগুল সার্চ করে নিমেষে অনেককিছু আজ জানতে পাচ্ছি। এটা বড় কম নয়। তবে এই বয়সে এতে আসক্ত হয়ে পড়ছি। এটা ক্ষতিকর। এটা এখন যে করে হোক কমাতে হবে। এ ছাড়া বিদেশি ফিল্ম একসময় প্রচুর দেখেছি। এখন এ নিয়ে একটুআধটু লেখালিখি করছি।      

গান আমি গাইতে পারি না। তবে শুনেছি প্রচুর। আমাদের সময়টা ছিল গানের স্বর্ণযুগ। কাকে ছেড়ে কার নাম করবো। অখিলবন্ধু ঘোষ, অপরেশ লাহিড়ী,  বাঁশরী লাহিড়ী, হেমন্ত, মান্না, সতীনাথ, মানবেন্দ্র, শ্যামল, তরুণ, সনৎ সিংহ আর এদিকে সন্ধ্যা, লতা, গীতা দত্ত, উৎপলা, নির্মলা মিশ্র, আশা, আরতি, হৈমন্তী শুক্লা, মহম্মদ রফি, তালাদ মামুদ, মুকেশ এঁদের গান শুনে নিজে সমৃদ্ধ  হয়েছি। ঠিক করেছি যখন আর কিছুই করতে পারবো না, তখন গানই শুধু শুনবো।      

এইসব নিয়েই অবসর কাটছে। এখন জীবনের শেষের দিকে এসে পড়েছি। আর কিছুদিন বাদে হয়ত পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এখন প্রতিদিন নিজের মতো করে বাঁচতে হবে। আমি তরুণদের খুব পছন্দ করি। তাদের তারুণ্য আমি  উপভোগ করি। এ সব নিয়ে থাকলে অবসরজীবন যাপনে আর অসুবিধা কোথায়? সংসারে দুঃখ কষ্ট, রোগভোগ,  জ্বালা যন্ত্রণা, শোক এ সব তো আছেই। এ নিয়েই জীবন। তবে এটাও ঠিক জীবন একটাই। তাই  Drink life to the lees এটাই এখন আমার বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র। তাই অবসরে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের বলি নিজের মতো করে দিন কাটান। পুরানো যে সব শখ ছিল, সেগুলো আবার শুরু করুন। যাতে আপনার আগ্রহ  তাই করুন। বইপড়া, গান, ছবিআঁকা, হাতের কারুকাজ,  বাগান করা, পশুপাখি পোষা, প্রকৃতির রূপ- রস- গন্ধ উপভোগ করা, ভ্রমণ এসবের মধ্যে থাকলে পাবেন অপার আনন্দ। কোন একঘেঁয়েমি আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না। 

The following two tabs change content below.
Avatar

Mihir Ranjan Mondal

One thought on “অবসরযাপনের সাতসতেরো

  • Avatar
    October 17, 2019 at 7:34 am
    Permalink

    This kind of passion and energy is essential to live and appreciate life everyday!
    Wonderful!! Inspired!!

    Reply

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: