মজাদার মেডিক্যাল

ডাঃ অনুপম ব্রহ্ম

আমি তখন সবে সবে ইন্টার্নশিপ শুরু করেছি। এই সময় বেশ একটা বিধান রায়-বিধান রায় ভাব আসে, সকালে হাসপাতালে বেরনোর সময় মনে হয় একটা বার্ট-হগ-দুবে সিনড্রোম তো ডায়াগনসিস করবই, সি পি আর দিয়ে একটা বন্ধ হওয়া হার্ট তো চালু করবই।

মেডিসিন দিয়ে শুরু। কয়েকদিনের মধ্যেই বোঝা গেল, একটা সমস্যা আমাদের সবার হচ্ছে। আমরা রোগীর হিস্ট্রি নেওয়ার সময় বাওয়েল-ব্লাডার হিস্ট্রি নিতে সমস্যায় পড়ছি। কারণ কিছু বাংলা শব্দ আমাদের “শিক্ষিত” জিভে আসছে না। আর ‘ইউরিন’ বা ‘স্টুল’ বললে অনেক রোগীই সেটা বুঝতে পারছেন না।

একদিন সমস্যা চরমে উঠল। এই হিস্ট্রি ঠিকমতো না নেওয়ায় ইন্টেস্টিনাল অবস্ট্রাকশনের একজন রোগীর খবর হয়ে যাচ্ছিল আরেকটু হলেই।

আমাদের মেডিসিনের হেড ছিলেন ডঃ সুভাষ হাজরা। কিংবদন্তি। উনি একদিন আমাদের ডাকলেন।
বললেন, “তোমরা সকালে উঠে ভগবানের নাম কর?”
কেউ হ্যাঁ, কেউ না বলল।
স্যার বললেন, “সকালে ভগবানের নাম কর না কর, কোনো অসুবিধে নেই; কিন্তু ঘুম ভাঙলেই তিনটে শব্দ পাঁচবার করে জোরে জোরে বলবে। পায়খানা, পেচ্ছাপ, মাসিক। পায়খানা-পেচ্ছাপ-মাসিক। বল সবাই মিলে।”
আমরা তিরিশ জন প্রবল উৎসাহে বললাম, “পায়খানা-পেচ্ছাপ-মাসিক।”
পাশের ঘর থেকে টাইপিস্ট দৌড়ে এল।

মেডিক্যাল কলেজে এরকম সব ঘটনা ঘটতেই থাকে।

আরেকটা ঘটনা শুনেছিলাম পেডিয়াট্রিকসের ডঃ সুকান্ত চৌধুরীর কাছ থেকে। স্যারের ছাত্রজীবনের ঘটনা। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের।
পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের লম্বা করিডর। অনেকটা অংশেই আলো নেই।
তো একদিন বিভাগীয় প্রধান সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ রাউন্ডে এসে ওই আলো-অন্ধকারের মধ্যে দু’জন ছাত্র-ছাত্রীকে খানিকটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখতে পেলেন।
“Hey, what are you two doing there?”
ছেলেমেয়ে দু’জন থতমত খেয়ে গেল। তারা “Nothing Sir, Nothing” বলতে বলতে কোনোরকমে পালাল।
কিছুদিন পর আবার একই ঘটনা। সেই করিডর, সেই অন্ধকার, সেই এইচ ও ডি এবং সেই বাঁধ-না-মানা প্রেম।
“Hey, what are you two doing there?”
আবার “Nothing Sir, nothing” বলতে বলতে পলায়ন।
পরদিন সেই করিডরে দু’টো নোটিস পড়ল।
“If you have NOTHING to do, please go to Library.”
এবং
“Doing NOTHING is Strictly Prohibited.”

সেই পায়খানা-পেচ্ছাপ-মাসিক বলা প্র্যাকটিস শুরু হওয়ার মাসখানেক পরের ঘটনা। সার্জারি পোস্টিং। রাউন্ড চলছে। পোস্ট অপারেটিভ পেশেন্ট। অবাঙালি।
স্যার বেডের পাশে গিয়ে খুব কায়দা করে জিজ্ঞেস করলেন, “প্যায়খ্যানে কী রাস্তেসে হাওয়া নিকালতা হ্যাঁয়?”
যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা ডাক্তার নন, তাঁদের জন্যে বলে রাখি অপারেশনের পরে রোগী কেমন আছেন জানতে, এটা খূব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তো সেই রোগী বেচারা কথাটা বুঝতেই পারলেন না। ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। স্যার একবার গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে আরেকটু জোরে আবার বললেন, “প্যায়খ্যানে কী রাস্তেসে হাওয়া নিকালতা হ্যাঁয়?”

তিনি আবার বুঝলেন না। তাকিয়েই রইলেন। আমার এক বন্ধু দেখল অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। অনেক পেশেন্টের রাউন্ড দেওয়া বাকি। এর মধ্যে সে আবার পায়খানা-পেচ্ছাপ ইত্যাদি বলা প্র্যাকটিস করেছে।
সে খানিকটা অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞেস করল, “আরে মশাই পাদেন, পাদেন?”
উনি এবার ঘাড় নাড়লেন।
শিক্ষা পেলাম। অহেতুক জটিলতা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। Keep it simple.

আমার বাবা এন আর এস মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। তাঁদের একজন সিনিয়র রাজনীতি নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকতেন। তাই উনি ফাইনাল এম বি বি এস পরীক্ষা তাঁর জুনিয়র ব্যাচের সাথে দিচ্ছিলেন।
তো মেডিসিন ভাইভা পরীক্ষাতে পরীক্ষক ওনাকে জিজ্ঞেস করেছেন “what is pleural effusion?” (সহজভাবে এর মানে হল ফুসফুসের ওপর জল জমা।)
উনি যথারীতি জানেন না। তো সেখানে উপস্থিত এক আর এম ও ভাবলেন, আহারে বেচারাকে একটু সাহায্য করা যাক। উনি নিজের বুকে একটা আঙুল রাখলেন এবং পরীক্ষার হলের বাইরে একটা পুকুরের দিকে আরেকটা হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন।
এই অসাধারণ বুদ্ধিমান ছাত্রটি ইশারাটা বুঝল; এবং জোর গলায় বলল, “Sir, Pleural effusion means pond in chest.”

বাবা বলতেই আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল। বাবারা যখন ইন্টার্ন বা হাউসস্টাফ, তখন রক্তের কিছু রুটিন পরীক্ষা ওয়ার্ডের পাশের একটা ঘরে নিজেরাই করে নিতেন, প্যাথলজি ল্যাবে আর এটুকু কাজের জন্য রক্ত পাঠানো হত না।
একজন রোগীর খুব কৌতূহল হয়েছিল ডাক্তারবাবুরা রক্ত সংগ্রহ করে কী করেন দেখার জন্য।
এবার ESR বলে একটা পরীক্ষা আছে। এই পরীক্ষাটা করার জন্য একটা লম্বা নলের একদিকে মুখ লাগিয়ে রক্তটাকে টেনে, ওই নলের মধ্যে দাঁড় করাতে হয়।
কৌতূহলী রোগীটি দরজার আড়াল থেকে ব্যাপারটা চোখ গোল গোল করে দেখলেন। তারপর ওয়ার্ডে ফিরে গল্প করলেন, “জানো, ডাক্তাররা আমাদের রক্ত নিয়ে কী করে? ওই ঘরে নিয়ে গিয়ে চুষে চুষে খায়।”
ব্যাস্‌! ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রটে গেল। দু-একজন বিরোধিতা করেছিলেন, বাকিরা তাঁদের ধমকে চুপ করিয়ে দিল। ইভনিং রাউন্ডের সময় সে কী অশান্তি।

আর একবার ই এন টি আউটডোরে অশান্তি। আমাদের HOD ছিলেন ডঃ এস পি বেরা। ইনিও খুব বিখ্যাত সার্জেন। কিন্তু একটাই সমস্যা। খুব তাড়াতাড়ি রেগে ওঠেন। আর বকাবকি শুরু করলে থামা মুশকিল। স্যারের আউটডোরে কোনো ইন্টার্ন স্যারের টেবিলে বসতে চাইত না।
তো একবার আমাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে হটসিটে। একজন রোগী এসেছেন। কানে শুনতে পাচ্ছেন না। হিস্ট্রি নেওয়ার একটা পর্যায়ে স্যার জানতে চাইলেন, এর আগে কোনো পরীক্ষা করানো হয়েছে কিনা।
রোগী বললেন, “হ্যাঁ ডাক্তারবাবু। ওই যে অডিওমেটিরি হয়েছে। আর বেরা করানো হয়েছে।”
BERA বলে কানের কর্মক্ষমতা সংক্রান্ত একটা পরীক্ষা আছে। ভদ্রলোক ওটার কথাই বলছিলেন বোধহয়। কিন্তু আমাদের বেরা স্যার বোধহয় ঠিকমতো শুনতে পাননি।
স্যার গলা তুলে বললেন, “সে তো আমাকে দেখাতে এসেছেন। কিন্তু এর আগে পরীক্ষা কী করিয়েছেন?”
উনি আবার বললেন, “ওই তো স্যার বেরা।”
স্যার রেগে উঠলেন, “আরে মশাই, পরীক্ষা কী করিয়েছেন?”
ওই ভদ্রলোকও রেগে বললেন, “আরে বেরা বেরা বেরা!”
স্যারের এবার সব রাগ এসে পড়ল আমার উপর। “এই যে তোমরা ঠিকমত হিস্ট্রিও নিতে পারো না। কে পাশ করায় তোমাদের? কমন সেন্স নেই। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলে কীভাবে। তোমার তো আবার মাধ্যমিক দেওয়া উচিত। গেট আউট।”
আমি পালিয়ে বাঁচলাম।

এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি। নমস্কার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *