কালীশঙ্করের কালীপূজা

গৌরব বিশ্বাস

এই যে মশাইয়েরা , তা করছেন কী আজ? কী বলছেন?  ছুটির দুপুরে দুটি খেয়ে একটু গড়িয়ে নেব। বিকেলে বৌ বাচ্চাকে নিয়ে একটু  কালী ঠাকুর দেখতে যাব। বাজি পোড়াব।

ও,  বাড়িতে পুজো, তাহলে অবশ্য নাওয়া খাওয়ার সময় নেই।

ও, আপনি বুঝি কেলাবের পুজোর মাথা? তাহলে তো বাতেলার ফুলঝুড়ি- ‘ আমরা যা কালীপুজো করেছি না, আশে পাশের কেউ আমাদের পাশে জাস্ট দাঁড়াতে পারবে না’।

আপনাদের দেখে স্বগ্গ কিংবা নরক থেকে কালীশঙ্কর মিচকি হাসেন। কালীশঙ্কর কেলাবের পুজোকে দুয়ো দেয়। হ্যাঁ, পুজো একটা করতেন বটে কালীশঙ্কর। সে পুজোর রকম দেখলে আপনারা ভীরমি খাবেন।

এখনকার যেখানে শোভাবাজার, তারই আশেপাশে একসময় থাকতেন বাবু কালীশঙ্কর। সেসময় ওই শোভাবাজার বাগবাজার ইত্যাদি এলাকা তো কলকেতে বাঙালী ‘বাবু’দের ডিপো। তবে আর পাঁচটা বাবু দের থেকে কালীশঙ্কর ছিলেন আলাদা। ভর সন্ধ্যেবেলা আতর মেখে হাতে বেলফুলের মালা জড়িয়ে বাঈজী বাড়ি যাওয়া, ওমন শৌখিনতার ধাত ছিল না কালীশঙ্করের। কালীশঙ্করদের পদবী ছিল ঘোষ। লোকে আড়ালে বলত- ব্যাটারা চোপার ঘোষ। ঘোর তান্ত্রিকের বংশ। সামনা সামনি এসব কথা বলার সাহস নেই কারও। চোপার ঘোষের মুখের উপর চোপা করলে চপার দিয়ে মুন্ডু নামিয়ে কখন যে  মায়ের ভোগে দিয়ে দেবে তা কি কেউ বলতে পারে!

 ঘোষ বাড়ির সামনেই দালান। দালানে প্রায় সাত হাত ভীষণ দর্শন দেবী মূর্তি। সেই কালী মূর্তির পুজো করতেন কালীশঙ্কর তান্ত্রিক মতে। সন্ধ্যে হতেই কালীশঙ্কর সহ বাড়ির মেয়ে বউ, বাড়ির গুরু পুরোহিত মায় চাকরটা অবধি সুরা পান করে উন্মত্ত। সুরাপান ব্যতীত মায়ের পূজা অসম্পূর্ন। সেই সঙ্গে চলত পুজোর জোগাড়। বাড়ির উঠোন বলির রক্তে পিচ্ছিল। নর্দমা দিয়ে বয়ে যেত রক্তিম স্রোত। সে রক্ত যে শুধু চারপেয়ে জানোয়ারের এমন নিশ্চয়তা নেই। আশপাশের এলাকা থেকে বহুলোক জড়ো হত পূজা দেখতে। কেউ ভক্তি কেউ বা ভয়ে চোখ বুজে থাকে। পাছে, ভিড়ের মধ্যে কখন কাকে কালীশঙ্কর পাঁঠা মোষ বা ভেড়া মনে করে হাঁড়িকাঠে টেনে নিয়ে আসেন! তবে পুজো শেষে পাঁঠার ঝোল আর বড়বড় মন্ডা মেঠাইয়ের আকর্ষণ জীবনের থেকে কম কিছু নয়! কালীশঙ্করের পূজা দেখতে আসতেন সাহেবরাও।  এমন বীভৎস সব ব্যাপার স্যাপার দেখে সাহেবদেরও পিলে চমকে যেত।  শ্রীরামপুরের পাদ্রী ওয়ার্ড সাহেবের তো কালীশঙ্করের কালী পুজোর বহর দেখে প্রায় দাঁত কপাটি লেগে গেছিল।

একবারের কালী পুজোর রাত্রে আরেকটু হলেই ঘটে যেত ভয়ঙ্কর এক ঘটনা।

সে রাত্রে কারনসুধা একটু বেশিই সুধাবর্ষণ করেছিল। বাড়ির মেয়ে বউ চাকর সবাই ঢুলু ঢুলু। কেউ উন্মাদের মতো হাসছে। কেউ বা তারস্বরে গান ধরেছে।  উঠোনে বাঁধা পাঁঠা গুলো আপন মনে পাতা চিবোচ্ছে। কামারেরা রাম দাতে শান দিচ্ছে। কেউ হাঁড়িকাঠে তেল সিঁদুর মাখাচ্ছে। কামারেরা খুব একটা নেশা করেনি।  নেশার ভান করছে খুব। বেশী নেশা করলে বলির সময় হাত ফস্কাবে। আর এক কোপে পাঁঠা মোষের ধড় মুন্ডু আলাদা করতে না পারলে পরের কোপটা পড়বে নিজের ঘাড়ে। ওদিকে নেশা  হয়নি এটা কালীশঙ্কর ধরতে পারলে আস্ত রাখবে না। নেশা না ধরেই মায়ের ভোগের আয়োজন! সে যে ঘোর অনাচার।

 বাড়ির মেয়ে বউয়েরা নেশায় ঢুলতে ঢুলতেই পুজোর গোছগাছ করছে। ঢাকিরা গিন্নি মার কাছে জলপানের প্রার্থনা করলে, ঘোষ গিন্নি খিল খিল করে হেসে বললেন-‘ তোরা আমার কাছে জলপান চাহিতেছিস? মিঠাই খা। মোমবাতি মাখ’।

কালীশঙ্কর উঠোনে হাত পা ছড়িয়ে বসে ছিলেন। চাকরটা ঢুলতে ঢুলতে বাবুর পা টিপছিল। হঠাৎ সে ডুকরে কেঁদে উঠল। কালীশঙ্করের নেশাটা সবে ধরেছিল। চাকরটা কেঁদে ওঠায় বিরক্ত হয়ে খিচিয়ে বললেন-‘ কি রে হতভাগা, মেয়েছেলের মতো কান্না জুড়লি কেন?’

চাকরটা কাঁদতে কাঁদতে বলে-‘ বাবু এতদিন চাকরি করেছি, কোনো অপরাধ করিনি। আজ আপনার একটা পা হারিয়ে ফেলেছি, খুঁজে পাচ্ছি না’।

কালীশঙ্কর সব শুনে একটুক্ষণ গুম মেরে বসে রইলেন। তারপর ঢুলতে ঢুলতে বললেন-‘ ও, এই ব্যাপার। মনে হয় জলখাবারের জায়গায় ফেলে এসেছি। খুঁজে নিয়ে আয়’। চাকর অন্দরমহলে গেলেন বাবুর পা খুঁজতে। কিন্তু পেল না। ফিরে এসে গিন্নি মাকে ধরল। গিন্নি মা নেশার ঘোরে বলেন-‘ ও মলো যা, ওনার পা আমি কী জানি। যা, আহ্নিকের জায়গায় একটিবার দেখে আয় দেখি!’ আহ্নিকের জায়গায় বাবুর পা খুঁজে পেল না সে। বাবু কালীশঙ্কর বললেন-‘ তাহলে মনে হয় নৈবেদ‍্যর সাথে পুরোহিত মশাইয়ের বাড়ি গেছে। ওনার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ কর’।

পুরোহিত মশাই বললেন-‘ খুঁজে দেখি বুঝলি। কালীশঙ্করের পা যদি আমার বাড়ি এসে থাকে। তবে কাল আমি পৌঁছে দেব’।

অবশেষে অনেক খোঁজাখুজির পর, বাবু কালীশঙ্করের পা স্বস্থানেই পাওয়া গেল।

চাকর যখন পা খুঁজে অস্থির, কালীশঙ্করের মনে বুদ্বুদের মতো গজগজ করছে বদ মতলব। একেই বাবু মানুষের খেয়াল তার উপর নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন, একটা বদ খেয়াল চাপল মাথায়। কালীশঙ্কর উদাস হয়ে ভাবলেন- প্রতিবার মা কে ছোট ছোট পাঁঠা মোষ এসব উৎসর্গ করি। হায় রে, মা কি তাতে তুষ্ট হন! যাবার বয়স তো হয়ে এল আমার। এখনও  পরকালের পুন্য সঞ্চয় করা হল না! আজ মাকে তুষ্ট করে পরকালের পুন্য সঞ্চয় করতে হবে। কিন্তু কাকে তাহলে উৎসর্গ করব আজ! কালীশঙ্করের মনে হল বৃদ্ধ গুরু পুরোহিতের কথা। পুরোহিত এতদিন যাবৎ বহু পুন্য সঞ্চয় করেছেন। এমন পুন্যবান মানুষকে মায়ের পায়ে উৎসর্গ করলে অনেক পুন্য হবে নিশ্চই। তলব পড়ল গুরু পুরোহিতের। তিনিও ছিলেন নেশায়। এমন প্রস্তাব শুনে তিনি আনন্দে গদগদ। সোজা এসে হাঁড়িকাঠে গলা দিয়ে দিলেন। হাঁড়িকাঠে গলা দেওয়ার আগে নিশ্চই স্নান করিয়ে খেতে টেতেও দেওয়া হয়েছিল ওনাকে। কাঁঠাল পাতা নিশ্চই দেওয়া হয়নি। মিষ্টি দেওয়াই হয়েছিল হয়ত।

যা হোক, গুরুদেব তো আনন্দ চিত্তে হাঁড়িকাঠে গলা ঝুলিয়ে বসে আছেন। কামার পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। সে খুব একটা নেশা করেনি। তাই তালজ্ঞান কিছু রয়েছে এখনও। কামার ভাবল- এতো ভারী বিপদ। বহু সাহেব সুবো লোক এসেছেন পুজোয়, গুরুদেবকে বলি দিলে মানুষ খুনের দায়ে  সাহেবরা ফাঁসি দেবে। আর, বলি দিতে অসম্মত হলে বাবু কালীকিঙ্কর গর্দান দেবেন। কী যে করবে ভেবে পায় না সে।

গুরুদেবের তর সয় না। মনে ফুরফুরে ভাব। কতক্ষণে নিজের মুন্ডুখানা  মায়ের পায়ে স্থান পাবে এ চিন্তায় বিভোর রয়েছে মনটা। অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেলেন গুরুদেব। হাঁড়িকাঠে ঘাড় ঘোরাতে পারছেন না। চিঁচিঁ স্বরে বলেন-‘ বাপ এতক্ষণ অপেক্ষা করাচ্ছিস কেন? বুড়ো বয়সে এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগে! তাড়াতাড়ি নামিয়ে দে গলাখানা’।

কামারের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। সে  সাহস করে এগিয়ে যায় কালীশঙ্করের কাছে। বলে-‘ বাবু একটু কথা ছিল’। কালীশঙ্কর হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন-‘ এখন আবার কী কথা শুনি?’ কামার মিনমিন করে বলে-‘ আজ্ঞে হুজুর। আমাদের  যতগুলো খাঁড়া, ওসব দিয়ে তো পাঠা মোষ জন্তু জানোয়ার বলি দেই। ওসব দিয়ে গুরুদেবকে বলি দিলে মা কী ভালো মনে নেবেন? হাজার হোক গুরুদেব পুন্যি করা মানুষ’। কালীকিঙ্কর কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন-‘  হুম। কথাটা মন্দ বলিসনি। তা কী করব এখন?’

কামার সাহস করে বলে-‘ আজ্ঞে হুজুর বলছিলাম, এবার গুরুদেবকে ছেড়ে দিন। সামনের বছর দেখা যাবে। নতুন করে খাঁড়া তৈরী করতে বলির সময় পেরিয়ে যাবে হুজুর’।

কালীকিঙ্কর একটু ভেবে বললেন-‘ তাহলে থাক এবার। পুন্য না হয় সামনের বার হবে। নে হাঁড়ি কাঠটা খুলে দে’।

কামার দৌড়ে গিয়ে হাঁড়ি কাঠ খুলে দেয়। সমস্ত লোকজন হতবাক হয়ে এসব কান্ডকারখানা দেখছিল। এতক্ষণে বুকে বল পায় তাঁরা। গুরুদেবকে তাড়তাড়ি সরিয়ে নিয়ে যায় তাঁরা। গুরুদেবের কান্না অবশ্য থামে না। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি মাথায় তোলেন-‘ এ তোমার কেমন লীলা মা… তোমার পায়ে স্থান দিলে না… আশা জাগিয়েও এমন করে ফিরিয়ে দিলে মা….

ঋণ স্বীকারঃ কলিকাতার ইতিবৃত্ত, প্রাণকৃষ্ণ দত্ত।

 Memoire of the Rev. William Ward

কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়ির কালীপুজোর ভয়ানক রীতিনীতির কথা উল্লেখ করে গেছেন সেকালের অনেক কোলাকতা গবেষক। তবে সুরার নেশায় বুঁদ হয়ে  এমন ঘটনাবলীর কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা হয়ত নেই। সম্ভবত এটা সেকালের কলকাতার একটা লোকশ্রুতি মাত্র। সেটাকেই একটু গল্পের আকার দিলাম।

Gourab Biswas

Gourab Biswas

গৌরব বিশ্বাস। স্নাতকোত্তর পাশের পর আপাতত লেখালেখি নিয়েই আছে। বইপড়া খাওয়া দাওয়া আর লেখা এই নিয়েই আপাতত রয়েছেন। দেবীপ্রণাম, প্রসাদ, পথের আলাপ, ভূত তত্ত্ব এর মতো পত্রিকার পাশাপাশি লেখালেখি করেন বিভিন্ন ওয়েবজিনেও।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: