বিশ্ব অনুবাদ দিবস

মিহিররঞ্জন মন্ডল

বেশ কিছুদিন আগে একটা আলোচনা সভায় গিয়েছিলাম। কবিতার অনুবাদ বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন এক কবি অধ্যাপক। বেশ আগ্রহ নিয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রায় সোয়া একঘন্টা ধরে যা বললেন তাতে বোঝা গেল কবিতার অনুবাদ হয় না, এমনকি গল্প উপন্যাসেরও অন্য ভাষায় অনুবাদ হয় না। প্রায়ই বলতে লাগলেন ইতালীয় ভাষায় নাকি একটা শব্দবন্ধ আছে, তার মানে হল অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক। গ্রেগরি রাবাসার বই পড়ে জানতে পারলাম ইতালীয় শব্দবন্ধটি হল ” Traduttore, traditore ” ( translator, traitor) । ওটা মজা করেই বলা হয়।

যাইহোক, এটা ঠিকই মূল ভাষায় লেখা সাহিত্য পড়লে তার রসগ্রহণ যতটা করা যায়, অনুবাদে তা হয় না। হয়ত অনেকটা খামতি থেকে যায়। তবুও আমাদের মনন ও চিন্তন অনেকটাই সমৃদ্ধ হয় মূল ভাষা থেকে তার অনুবাদ পড়ে। গুটিকয়েক মানুষের বিভিন্ন ভাষার উপর দখল থাকে। সাধারণত মাতৃভাষা ছাড়া, ইংরেজি বা দু একটি আঞ্চলিক ভাষায় দখল থাকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের। অনুবাদের মাধ্যমেই আমাদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এটাও বড় কম নয়। তাই যতই হোক, অনুবাদের চাহিদা কিন্তু থেকেই যায়।

এক একটা ভাষার নিজস্ব কিছু ঐশ্বর্য আছে। দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে তা জড়িত। তার সন্ধান হয়ত অনুবাদক তেমন পান না। প্রত্যেক ভাষায় এমন কিছু শব্দবন্ধ আছে যা অন্যভাষায় অনুবাদ করা শক্ত। অনেক ভেবেচিন্তে তা অনুবাদে প্রকাশ করতে হয়। এখন একটা কথা এখানে আসে। অনুবাদ কি তাহলে মূলানুসারি হবে? না, সময় বিশেষে অনুবাদক নিজের মতো উপলব্ধি করে তার আর একটা পাঠ দেবার চেষ্টা করবেন? যাইহোক না কেন অনুবাদে এই অসুবিধাটা থেকেই যায়। মূল ভাষা ও যে ভাষায় অনুবাদ হবে এ’দুটোর মধ্যে অনুবাদকের স্বছন্দ যাতায়াত না থাকলে অনুবাদ কর্ম ব্যাহত হবে। আসলে অনুবাদের জন্য উপযুক্ত অনুবাদকের প্রয়োজন। আমাদের বাংলা সাহিত্যে অনুবাদের কাজটা, পেশাদার কয়েকজন বাদে, লোকে ভালবেসেই করে। কিন্তু সত্যি বলতে কী অনুবাদক তাঁর কাজের স্বীকৃতি সে ভাবে পান না। আমি এমনও দেখেছি পত্রিকায় বেশ বড় অনুবাদ ঘটা করে ছাপা হয়েছে, কিন্তু অনুবাদকের নাম ছাপা হয়েছে একবারে শেষে, ক্ষুদ্র হরফ স্মল পাইকায়।

আজ গ্রেগরি রাবাসার মতো অনুবাদক না থাকলে গ্যাব্রেয়েল গার্সিয়া মার্কেসের বইগুলি বিশ্বে এত জনপ্রিয় হতো না। ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে বলে তা বিশ্বের বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর কাছে এতটা পৌঁছেছে। এ কথা মার্কেস স্বয়ং স্বীকার করেছেন। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা কিছু গল্প উপন্যাসও বিদেশে জনপ্রিয় করে তুলেছেন গায়ত্রী স্পিভাক চক্রবর্তী ইংরেজিতে অনুবাদ করে। শ্রীমতী গারনেটের ইংরেজি অনুবাদে বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রুশ লেখকদের রচনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে।

আজ বিশ্ব অনুবাদ দিবস (৩০ এ সেপ্টেম্বর)। অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটুক। এতে আমাদের বাংলা সাহিত্য যে সমৃদ্ধ হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *