হল্যান্ডে পুজোর পাঁচদিন

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

সাধারণতঃ আমার লেখা দ্বিসাপ্তাহিক বুধবার করে ‘সম​য়’​-এ প্রকাশিত হ​য়​, কিন্তু এই লেখাটা একটু ব্যতিক্রম হ​য়ে গেল​। সম্পাদক মশাইয়ের থেকে আগেভাগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি, কিন্তু নিজের মনে একটা যুক্তি সাজিয়েছি – ওই কনসেন্স ক্লিয়ারেন্স-টাইপ​। কথিত আছে, দুর্গাপূজার প্রকৃত সম​য় বসন্তকাল​। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা-বিজ​য়ের উদ্দেশ্যে যাত্রারম্ভে মা দুর্গার আরাধনা করেছিলেন অসম​য়ে – শর​ৎকালে। সেই অকালবোধনের ধারা মেনেই আমাদের এখনকার দুর্গাপূজার সূচনা। অর্থাৎ, যে পুজোর সম​য়ই অসম​য়​, তার উদ্দেশ্যে লেখাটা অসম​য়ে হলে আশা করি ‘সম​য়’​-এর সম্পাদক মশাই এবং পাঠককূল রাগ করবেন না।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন​, এইবারের লেখা হল্যান্ডে দুর্গাপুজোয় আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে।

যেমন আগেও লিখেছিলাম​, দুজন বাঙালী এক জায়গায় থাকলে দুর্গাপুজো হবেই, আর তিনজন বাঙালী এক জায়গায় থাকলে দুটো দুর্গাপুজো হবে। সেই ধারা মেনে নেদারল্যান্ডসে সাকুল্যে চারটে দুর্গাপুজো হ​য়​।

তার মধ্যে সবচেয়ে পুরানো পুজো কল্লোল​-আয়োজিত​, অকুস্থল দ্য হেগ-সংলগ্ন ভুরস্কোটেন​। এই বছর কল্লোলের পুজো দশ বছর পূর্ণ করল​। তবে, যখন থেকে আই-টি কোম্পানীরা যুক্তরাষ্ট্রের মোহ ত্যাগ করে কন্টিনেন্টাল ইয়োরোপের দিকে মনোনিবেশ করলেন​, তখন থেকে নেদারল্যান্ডসে বাঙালীর সংখ্যা বাড়তে থাকল​। বেশীরভাগ বাঙালী, তথা ভারতীয়দের নিবাসস্থল হ​য়ে উঠল আমস্টারডাম​-সংলগ্ন ছোট্ট লোকাল​য় – আমস্টেলভীন​। সেই সূত্রে আমস্টেলভীনে গ​ড়ে উঠলো দুটো বাঙালী সংগঠন – হল্যান্ডে হৈচৈ এবং আনন্দধারা। আর​, সেই দুই সংগঠন বিগত তিন বছর ধরে আমস্টেলভীনে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে। আর​-একটা পুজো হ​য় এই তিন পুজোর থেকে একটু দূরে – আইন্দোভেন শহরে। আয়োজনে, বং-হোভেন​।

এই চারটে পুজোর নিজস্ব বিশেষত্ব আছে, যা একে অপরের থেকে অনন্য​। তাই, কেন চারটে পুজো, কি চারটে পুজো ইত্যাদি আলোচনায় না গিয়ে প​য়েন্টে ফেরা যাক​। অন্ততঃ চারটে পুজো হওয়ার দরুণ নেদারল্যান্ডবাসী বাঙালীরা দেশের মতো প্যান্ডেল​-হপিং-এর সুযোগ পেয়ে যান​, তাই বা কম কি?

আমি যেহেতু হৈচৈ-এর পুজো কমিটির সাথে যুক্ত, সুতরাং প্রবল ব্যস্ততার মাঝে আমার ওই প্যান্ডেল​-হপিং-এর সুযোগ আসে না। চেষ্টা করি প্রত্যেক বছর পড়শী আনন্দধারার পুজোতে একবার ঢুঁ মেরে আসার​, কিন্তু এই বছরে সম​য়ের অভাবে সেটাও করা হ​য়ে ওঠেনি। আনন্দধারার বন্ধুরা, দোষ নিও না!

হল্যান্ডে হৈচৈ-এর পুজোর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। মা দুর্গাকে স্বর্গলোক থেকে আমস্টেলভীনে নিয়ে আসার যাত্রা, হল্যান্ড​-প্রবাসী বাঙালীর পাতে একটুকরো পুজোর স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার যাত্রা। আর সেই সুযোগে পূজো-বিরহে কাতর সব্বাইকে একটু আনন্দ দেওয়ার যাত্রা।

তারপর, আমস্টেল নদী দিয়ে অনেক জল গ​ড়িয়েছে। লালমোহনবাবু এই যাত্রায় সামিল থাকলে হ​য়তো লিখে ফেলতেন ‘হোয়াটস্যাপে হারাকিরি’, বা ‘মিটিঙে মারকাটারি’, বা একান্তই ‘পুজোসামগ্রীর পাকদন্ডিতে’। মতভেদ হ​য়েছে, পরিশ্রম হ​য়েছে, কিন্তু অর্জুনের লক্ষ্য সেই পাখির চোখ – মা আসছেন​।

২০১৭-তে মা এলেন​, এবং বেশ হৈচৈ করেই এলেন​। ২০১৮-তে তার পুনরাবৃত্তি হলো। পায়ে-পায়ে এসে গেলো – দুর্গাপুজো ২০১৯। দু-বছরে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করেছে হৈচৈ-এর দুর্গাপুজো, তাই এই বছরে পারফরমেন্স প্রেশারের পারদ ছিল আকাশছোঁয়া।

যেমন আগেও বলেছি, হৈচৈ-এর পুজোয় আমাদের লক্ষ্য থাকে একটুকরো বাংলাকে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে আসা। বনেদিবাড়ির পুজোর আন্তরিকতা ও নিয়মনিষ্ঠা, কলেজ স্কোয়ারের বা সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের ভীড়​, পাড়ার পুজোর আমেজ কিংবা ম্যাডক্সের আড্ডা – সবই চাই এক ছাদের তলায়​। এই বছরেও তার কোন ব্যতিক্রম করার ইচ্ছা বা সাহস আমাদের ছিল না। তাই, প্রায় পাঁচ​-ছ​য় মাস আগে থেকে শুরু হ​য়ে যায় আমাদের পুজো-প্রস্তুতি।

নেদারল্যান্ডসে তো আর রাস্তার মাঝে প্যান্ডেল বেঁধে পুজো করার সুযোগ নেই, তাই অগত্যা কোন এক কম্যুনিটি হলেই হ​য় মাতৃ-আরাধনা এবং আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকলাপ​। প্রতিবারের মতো এইবারেও আমস্টেলভীনের ডায়ামান্ট পার্টি-সেন্ট্রামে হৈচৈ-এর পুজো আয়োজিত হ​য়​। এই হলের প্রধান বৈশিষ্ট্য দুটো – এক​, প্রায় ৯০০ লোকের ধারণক্ষমতা, এবং দুই, ত​ৎসংলগ্ন রান্নাঘর​, যেখানে আমরা দিনের দিন রান্না করে গরম​-গরম পরিবেশন করতে পারি।

তবে, এইবার কিছু ব্যতিক্রম ছিল​। যেমন​, আমরা এইবার ঠিক করেছিলাম যে থিম-পুজো করব​। এইবারের পুজোর থিম ছিল – গ্রামবাংলা। প্রায় তিন​-চারমাস আগে থেকে শুরু হ​য়ে যায় সজ্জা-প্রস্তুতি। পঞ্চমীর দিন প্রায় সারারাত জেগে যা জোড়া দেওয়া হ​য় আমাদের ভেন্যুতে।

হৈচৈ-এর পুজোয় একটুকরো গ্রামবাংলা

দ্বিতীয় ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ​, আমরা এইবার ঠিক করেছিলাম যে পূজাবার্ষিকী প্রকাশ করব​। নেদারল্যান্ডসের প্রথম ভারতীয় ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন ইন্ডিয়ানা নামক এক সংস্থা, আমরা তাঁদের সাথেই একযোগে পূজাবার্ষিকী প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম​। নেদারল্যান্ডসের, তথা সম্ভবত কন্টিনেন্টাল ইয়োরোপের প্রথম পূজাবার্ষিকী ম্যাগাজিন​, নাম রাখা হলো – ‘বিদেশ’​। অনেকেই হ​য়তো ভুরু কুঁচকাবেন​, যে পূজাবার্ষিকী তো নেদারল্যান্ডসে আগেও প্রকাশ হ​য়েছে, তাহলে প্রথম পূজাবার্ষিকী ম্যাগাজিনের দাবীটা একটু বাড়াবাড়ি হ​য়ে যাচ্ছে না? হ্যাঁ, পূজাবার্ষিকী আগেও প্রকাশ হ​য়েছে, কিন্তু টেকনিক্যালি সেটা ম্যাগাজিন ন​য়, স্যুভেনিয়ের​। মানে, কিউরেটরের দ্বারা ক্রমানুসারে সাজানো একরাশ প্রবন্ধ​-গদ্য​-পদ্য​-ইত্যাদি। কিন্তু, ‘বিদেশ’ সেই অর্থে প্রকৃত ম্যাগাজিন​, যেখানে এডিটরের দ্বারা নির্ধারিত পত্রাঙ্কন ও বিষ​য়​-নির্বাচনের উপরে ভিত্তি করেই কোন লেখা ছাপানো হ​য়। যাক​, টেকনিক্যাল কচকচিতে বেশী যাব না। প্রধান বক্তব্য​, পুজোর সম​য়ে প্রকাশিত হলো আমাদের পূজাবার্ষিকীর প্রথম সংস্করণ​, যেখানে আছে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা চপল ভাদুড়ির মতো ব্যক্তিত্বের আন্তরিক সাক্ষাৎকার​, নেদারল্যান্ডসের পুজো নিয়ে বিশদ বিবরণী, খাওয়াদাওয়া, সাজগোজ এবং আরো অনেক কিছু।

হৈচৈ এবং ইন্ডিয়ানার প্রচেষ্টা – প্রথম পূজাবার্ষিকী

তা ছাড়া, প্রতিবারের মতো প্রচলিত পূজাবার্ষিকী ও অন্যান্য বইয়ের সম্ভার নিয়ে হাজির ছিলেন ‘পূজাবার্ষিকী-ইন​-নেদারল্যান্ডস​’। আনন্দমেলা, শুকতারা, দেশ​, নবকল্লোলের মতো পূজাবার্ষিকীর পাশাপাশি ছিল বিভিন্ন বইয়ের পশরা। আমি নিলাম নবকল্লোল​, যেখানে বিশেষ আকর্ষণ বিনোদ ঘোষালের লেখা সত্য​-ঘটনা অবলম্বনে এক নরপিশাচের হাড়​-হিম করা উপন্যাস​, আর নিলাম অতীশ দীপঙ্করের জীবনের উপরে লেখা ‘নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা’, এবং অমিশ ত্রিপাঠির রাম​-সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস – ‘রাবণ​, দ্য এনিমি অফ আর্যাবর্ত’​। সবে নবকল্লোলের উপন্যাসটা শুরু করেছি, ইচ্ছা রইল বইদুটো নিয়ে কিছু রিভিউ আপনাদের কাছে প্রস্তুত করার​, একটু সম​য় দিন​।

পূজাবার্ষিকী-ইন​-নেদারল্যান্ডস​: আমার কলেজস্ট্রীট​

আর​, প্রতিবারের মতোই হৈচৈ-এর পুজোয় বেশ কিছু নতুন চমক পেয়েছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য​, নবমীর সন্ধ্যায় ‘FOLK-ইর’-এর অনুষ্ঠান​। অন্যান্য দিনগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হ​য়নি আমার, কিন্তু নবমীর সন্ধ্যায় আমার অ্যাঙ্করিং থাকার সুবাদে ব্যাকস্টেজ থেকে FOLK-ইরের অনুষ্ঠান চেটেপুটে উপভোগ করেছি। লোকসঙ্গীত এমনিতেই আমার খুব প্রিয়​, আর তার উপরে এই ব্যান্ড নিয়ে এসেছিল কিছু ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রানুসঙ্গ – যেমন খমক​, য়াম্বু, ঘুঙুর ইত্যাদি। তাই, প্রথম থেকেই একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল​, আর তারপর সেই যন্ত্রের সুরের সাথে যখন অসাধারণ কন্ঠ মিলেমিশে গেল​, আর কে কি পেল জানিনা, আমি অন্ততঃ পেলাম একটি অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা। একটা কথা তো বলতে ভুলেই যাচ্ছিলাম​, হৈচৈ-এর মঞ্চেই প্রথমবার আত্মপ্রকাশ করল এই অসামান্য ব্যান্ড​।

FOLK-ইর​: শুনতে হ​য়​, নাহলে আক্ষেপ করতে হ​য়​

গানা তো হুয়া, লেকিন খানা ক্যায়া হ্যায়​? খুব ইম্পর্ট্যান্ট প্রশ্ন​, খাওয়াদাওয়া ছাড়া পুজো হ​য় নাকি? খাওয়ার মেন্যু তো আগের আর্টিকেলে লিখেইছিলাম​, এইবার পুজোয় সেটা উপভোগও করলাম​। তবে, যেমন বলেছিলাম​, যেকোন খাদ্যের মূল মশলা হচ্ছে – আন্তরিকতা। হৈচৈ-এর বন্ধুরা যে-ভাবে আন্তরিকতার সাথে খাবার পরিবেশন করলো, তাতে সেই খাদ্যের স্বাদ শতগুণ বেড়ে গেল​। সবচেয়ে ভালো লাগলো, প্রত্যেক টেবিলে গিয়ে কার কি লাগবে না লাগবে, সেই অনুযায়ী ত​ৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা করা। এই ব্যবহার মনে হ​য় কলকাতার কোন বারোয়ারী পুজোতেও পাওয়া দুষ্কর​।

দাদা, আর​-একটু?

তবে, প্রত্যেক বছরের মতোই এই বছরের পুজোয় সবচেয়ে ব​ড় প্রাপ্তি – বন্ধুত্ব​। পুজো মানে মিলনমেলা। বিভিন্ন কারণে ও বিভিন্ন ব্যস্ততায় যে-সব বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ বিরল​, পুজোয় তাদের কাছে পাওয়া এক অবিস্মরণীয় মূহুর্ত​। হাসি-মস্করার কষ্টিপাথরে যাচাই করে অবাক হ​য়ে যাই, এতোদিনের অসাক্ষাতেও সেই বন্ধুত্ব এখনো একই রকম অমলিন​, একই রকম খাঁটি। পুরানো বন্ধুদের পাশাপাশি পাই অনেক নতুন বন্ধু।

আবার কবে দেখা হবে, জানা নেই, তবে আশা রাখি এই সুদূর প্রবাসে আনন্দের ওম নিতে কখনো না কখনো মুখোমুখি হবই।

পুজোর সেরা পাওনা: বন্ধুত্ব

আত্মপ্রচারের মতো শোনাবে, কিন্তু এখন একটু-আধটু লেখালেখির সুবাদে দেখলাম অনেকেই আমার লেখা প​ড়েন​, এবং আমার লেখা ভালোবাসেন​। পুজোয় তাঁদের অনেকের সাথেই আলাপ হলো, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ আমার মতো আনকোরা লেখকের লেখাকে এতো ভালোবাসা দেওয়ার জন্যে। আশা রাখি আপনারা আমার এই সামান্য চেষ্টাকে একই রকম ভালোবাসবেন​, এবং উৎসাহ দিয়ে যাবেন​।

পুজো শেষ​, কিন্তু পুজোর রেশ এখনো মন থেকে কাটেনি। অফিস​-স্কুল​-বাজার​-দোকান সম্বলিত নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে ফিরে এসেছি। তবু এখনো কান পাতলে শুনতে পাচ্ছি ঢাকের শব্দ​, নিঃশ্বাসে আসছে ধুনোর গন্ধ​, আর চোখ বন্ধ করলে পৌঁছে যাচ্ছি সেই আনন্দ​-নগরীতে। আসছে বছর আবার হবে, আর এই সুযোগে আপনাদের সবাইকে জানাই শুভ বিজ​য়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন​।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *