ডায়মন্ড প্যাকেজ

অঙ্কুশ

স্টেশনে নামতেই গা টা কেমন ছমছম করে উঠলো। সন্ধ্যে নামতে এখনও বিস্তর দেরী,এর মধ্যেই অদ্ভুত শান্তভাব। কোনো কোলাহল নেই,গুটিকতক দোকান আর কিছু লোক। হোটেল থেকে আমার গাড়ী আসার কথা। খুব সহজেই সেটা খুঁজে বার করা গেলো। গাড়ীতে গিয়ে উঠে বসলাম।

বেগুনকোদর। ভূতুড়ে জায়গার ন্যুনতম খবর যারা রাখেন তারা এই জায়গার নাম দিব্যি শুনে থাকবেন। বাংলার অন্যতম হন্টেড প্লেসের একটা।

ও নিজের পরিচয়ই দেওয়া হয়নি।

আমি দিলীপ মিত্র। লেখালেখি করি। গোটাবারো উপন্যাস বেড়িয়েছে এই অধমের। বলা বাহুল্য,বাজারে রমরমিয়ে চলেছে বেশিরভাগই। লেখালেখিতে থিতু হওয়ার পর বেসরকারী চাকরীটা ছেড়েছি কবছর হলো। এখানে লেখালেখিটাই নেশা-পেশা সব।

আমি প্রধানত রহস্য গল্পই লিখি। তবে এবার বিখ্যাত এক পত্রিকা ডিসেম্বরে ‘ভুতসংখ্যা’ বার করবে স্থির করেছে। কলকাতার ভীড়ে ভূত কি একটু দম খুলে শ্বাস নিতে পারে? শ্বাস নিতে না পারলে ভয় দেখাবে কীকরে? ভয় না দেখালে ভূতের গল্প বেরোবে কীকরে?

তাই পুজোর কদিন এবার ভাবলাম অন্যভাবে কাটাই। চলে আসলাম এখানে। বেগুনকোদর ষ্টেশনে নেমে গাড়িতে আধঘন্টা,তারপরে একটা গেস্টহাউস রয়েছে। জায়গাটা বিখ্যাত হওয়ার পর বেশ খরচা করে গেস্টহাউসটা বানিয়েছে। কিন্তু সেভাবে জমে উঠেনি এখনো।

আমার স্ত্রী অপলাই আমার সেক্রেটারি বলতে পারেন। পাবলিসার দের সঙ্গে কথা বলা,রেভেন্যু,প্রিন্টিং,কভার ডিসাইন-সব নিজের হাতে সামলায়। আমাকে এগুলো নিয়ে ভাবতে হয়না। ফলে আমি নিশ্চিন্তে গল্পের দুনিয়ায় ডুব দিতে পারি। ও ই অনলাইনে এই গেস্টহাউস বুক করেছে দুদিনের জন্য।

গাড়ী থামলো। সন্ধ্যে নামবো নামবো করছে। গাড়ী থেকে নেমে অবাক হয়ে গেলাম। এরকম একটা জায়গায় তিনতলা সুসজ্জিত গেস্টহাউসটা দেখে অবাকই হলাম।

ড্রাইভারদাদা বেশ বয়স্ক। ওই সব দিক চেনালো। পূব দিকে সোজা গেলে একটা মরা নদী। পশ্চিমদিকে যেতে মানা করলো। শ্মশান। এই এলাকার একমাত্র শ্মশান।

রিসেপশনে কথা হলো। বনমালী বেশ চালাক চতুর ছেলে। ও রিশেপশন সামলায়। মালিকের বাড়ি কলকাতায়। কদাকিঞ্চিৎ আসে। কুক-কাম-কলবয় বাদল শক্তিশালী ছেলে। ব্যাগদুটো ঘাড়দাবা করে রুমে নিয়ে এলো। দোতলার একটা ডিলাক্স রুম বুক করেছে অপলা।

রুম দেখে তো চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। বিশাল রুমে সব পুরোনো জিনিস এতো যত্ন করে সাজানো যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সুন্দর বিছানা,কাঠের চেয়ার টেবিল,ছোট্ট ব্যালকনি,ব্যালকনি থেকে বাগান-সত্যিই জায়গাটা অপূর্ব। ব্যাগ থেকে লেখার খাতা-নিব পেন বার করে টেবিলের উপর গুছিয়ে রাখলাম। অপলাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম। ঘুরতে এসে আমি ফোন অফ ই রাখি খুব কোনো ইমারজেন্সি না পড়লে।

স্নান সেরে একটু রেস্ট করে ট্রাকসুট পরে কিচেনে এলাম। কলকাতায় রাত বারোর আগে খাইনা। কিন্তু এখানে রাত বারোটা মানে মধ্যরাত। তাই আটটা বাজতে না বাজতে ডিনার। অবশ্য খিদেও পেয়েছিলো খুব। বাদল দারুন পাঁচমেশালি সবজি বানিয়েছিলো। সঙ্গে কাতলা মাছ ভাজা। খুব আয়েস করে খেলাম।

ঘরে এসে গা এলিয়ে দুটো সিগারেট খেলাম পরপর। নাহ,এবার লিখতে বসতে হবে।

টেবিলে আয়েশ করে বসেছি কিনা,হঠাৎ উপরের তলা থেকে নুপূরের শব্দ…

প্রথমে খুব আস্তে। আর বেশ কিছুটা ব্যবধানে। আমি মনের ভুল ভেবে লেখায় মন দিচ্ছি আবার। নাহ,এবার বাড়ছে ক্রমাগত…। হিন্দী সিনেমায় এরকম করেই ভূত আসেনা? হাসি পায়। নিশ্চয় একা থাকার ফলে এরকম ভুল মনে হচ্ছে। উপরে থোড়াই ড্যান্স ক্লাস হবে রাত ১০ টায়! অদ্ভুত।

কিন্তু না। আওয়াজ ক্রমাগত বাড়ছে। ভয় লাগছেনা। কিন্তু উৎসাহ লাগছে।

দেখাই যাক না।

টর্চ নিয়ে বেরোলাম রুম থেকে। হালকা চাঁদের আলো পড়ছে। তাতে অল্প টের পাওয়া গেলেও টর্চ ছাড়া চলা মুস্কিল।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে এলাম। সিড়িটা বেশ ছোট। হোঁচট খেতে খেতে কোনোরকমে বাঁচলাম। এদিকে আওয়াজ বাড়ছে। তবে এবার বুঝতে পারছি কোনদিক দিয়ে আওয়াজ আসছে। সেদিকে হাঁটা লাগালাম।

কিছু বোঝার আগে হঠাৎ সাদা কাপড় পড়া একজন মহিলা বেরিয়ে এলো। ঘটনার আকম্মিকতায় হাত থেকে টর্চটা মাটিতে পড়ে গেলো ভেঙে। কিন্তু তাও যেটুকু আলো পড়ছে তাতে স্পষ্ট দেখলাম মুখ পুরো কালো।

আশাকরি পাঠকের বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয় আমার অবস্থা কেমন তেমন! কিন্তু আসল কান্ড তো তখনও বাকি!

এরপরে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। মহিলাটি নুপুর পায়েই হাঁটা লাগালো পরিত্যক্ত একটা সিঁড়ির দিকে। আমিও জানিনা কেনো,মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকে ফলো করলাম।

হোটেলের পিছনের গেটটা দিয়ে বেরিয়ে মহিলাটা হাঁটা লাগালো পশ্চিমের দিকে। আমিও ভুলে গেলাম ড্রাইভারদাদার সাবধানিবানী। পশ্চিমে যে শ্মশান! আমি তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফলো করে চলেছি।

১০ মিনিট মতো হাঁটলাম ঐভাবেই। হটাৎ দেখলাম মহিলাটি গায়েব। চতুর্দিকে চেয়েও দেখতে পেলাম না। কিন্তু যা দেখলাম,তাতে রক্ত হিম হয়ে গেলো।

শ্মশানের একেবারে মাঝে দাঁড়িয়ে আমি। দুটো মরা এখনো জ্বলছে। চারিদিকে ভশ্ম ছড়িয়ে,আধপোড়া কাঠ।

ঐসময়ে আমার কি অবস্থা সেটা পাঠক কখনোই পড়ে টের পাবেননা,যতক্ষননা ওরকম পরিস্থিতির সত্যিকারের মুখোমুখি হন।

তো আমি তখন চোখে সর্ষেফুল দেখছি। হঠাৎ ফিসফিস করে কথা বলা শুরু হলো। কিছু বুখতে পারছিনা কি বলছে,কে বলছে কিন্তু বলছে বুঝতে পারছি।

আওয়াজ বাড়ছে। দুদিক থেকে আসছিলো আগে,এবার চারিদিক দিয়ে ঘিরে ধরছে। আমার সব শক্তি শেষ হয়ে আসছিলো। হঠাৎ কোনদিক দিয়ে সেই সাদা শাড়ী পড়া কালো মুখের অদ্ভুত মহিলাটা বিশ্রী আওয়াজ করে হাজির হলো…

তারপরে আমার আর কিছু মনে নেই।

চোখ যখন খুললাম দেখি আমি হোটেল রুমে। বনমালী আর বাদল চিন্তিত মুখে দঁড়িয়ে।

আমি তখনও শকে। বললাম,বনমালী বনমালী ভূতটার মুখ কেমন কালো…খুব ভয় করছে,আমি বাড়ি যেতে চাই এক্ষুনি…

বনমালী কানে হাত দিয়ে বলে,ভুল হয়ে বাবু,এই বাদলটা এতো বাড়াবাড়ি করবে কে জানতো..!

আমি তো অবাক,মানে?

জিজ্ঞেস করায় বনমালী যা বললো তাতে আমি হাসবো না কাঁদবো না মাথা কুটবো বুঝে পেলাম না।

‘দেখুন বাবু,এমনিতে ভূতকে আজকাল কেউ পাত্তা দেয়না। তাও এক-আধবার যা শোনা গেছে যে নুপূরের আওয়াজ পাওয়া গেছে তিনতলা থেকে,ব্যস এটুকুই। তো এতো বড়ো গেস্টহাউস বানিয়ে যদি ভূতই না থাকে তো লোক আসবে কেনো? আর লোক না থাকলে মালিক রাখবে কেনো?

তো আমিই বুদ্ধিটা দি মালিককে। এখন তো ডিজিটাল এর জমানা,তো ভূত কে ডিজিটাল করলে কেমন হয়?’

ভূতের ডিজিটালাইজেশন? মানে?

‘হ্যাঁ,মালিকও এটাই জিজ্ঞেস করেছিলো।
তো আমরা ভৌতিক এক্সপেরিন্সের জন্য প্যাকেজ চালু করেছি। গোল্ড প্যাকেজে আমরা কাস্টমারদের নুপুরের আওয়াজ শুনিয়ে ভয় দেখাই সারারাত। সিলভার প্যাকেজে নুপূর প্লাস সাদা শাড়ি পরা কালো মুখের ভূত। ওই তো বাদলের বোন,ওকে কালো রঙ মাখিয়ে সাদা শাড়ি জড়িয়ে দাঁড় করানো হয়।

আর থাকলো ডায়মন্ড প্যাকেজ। এটায় নুপুর,সাদা শাড়ির মেয়ে,শ্মশান,সাউন্ড বক্স বসিয়ে ভূতের আওয়াজ-সব কিছু রয়েছে। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য এই প্রিমিয়াম প্যাকেজটাই নিয়েছিলেন। সত্যি বলতে আমাদের প্রিমিয়াম প্যাকেজের প্রথম কাস্টমার আপনিই। কিন্তু বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা এতোদূর গড়াবে।’’

এসব শোনার পর আমার তখন রাগে তখন গা জ্বলছে। রক্ত মাথায় নাচানাচি করছি। চিৎকার জুড়লাম।

‘এক্ষোনি বেরোবো আমি। ইউ স্কাউন্ড্রেলস,থানায় কমপ্লেইন করবো আজই। মরে গেলে কি হতো? এক টাকাও দেবো না,থাকার টাকাও দেবো না। ইয়ার্কি হচ্ছে?’

‘স্যার স্যার এরকম করবেন না প্লিজ। ঠিক আছে আপনাকে প্যাকেজের উপর ৫০% ডিস্কাউন্ট দিচ্ছি,তাও না দিলে শাড়ী,রঙ,বক্স ভাড়ার খরচ টুকুও দিন,নাহলে মালিক আমাদের তাড়িয়ে দেবে। প্লিজ স্যার প্লিজ।’’

আমিও ছাড়ার পাত্র নয়। রাগে মাথা ফুটছে পুরো।

অবশ্য কিছুক্ষন যেতেই বেশ হাসিই পেলো ব্যাপারটা। ওরাও যা জোড়াজোড়ি করতে লাগলো,রাগ করা থাকা মুশকিল। বললো,এখানকার খুব বিখ্যাত বনমোরগের রোস্ট খাওয়াবে আজ।

রাতে রোস্ট রান্না হলো। বেশ উদোম একটা পার্টি হলো।

তবে রাতের এক্সপেরিয়েন্স টা কাজের বটে। একটা বড়োগল্প দিব্যি নামিয়ে দেওয়া যায়। তবে ওদেরকে বারন করলাম এরপরে এগুলো না করতে। ওরা কান ধরে বললো আর কক্ষনো নয়।

লিখতে বসার আগে আমার দুটো সিগারেট খাওয়া অভ্যাস। সিগারেট দুটো খেয়ে লিখতে বসলাম।

টেবিলে আয়েশ করে বসেছি কিনা,হঠাৎ উপরের তলা থেকে নুপূরের শব্দ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *