চমৎপুর ট্রাভেলগ

অর্ক ভট্টাচার্য

ছোট্ট একটা হামিং বার্ড ঠিক নাকের কাছে এসে ভোঁ ভোঁ শব্দ করছিলো। ভোমরা ভেবে ভয়ে এক লাফ দিয়ে উঠলাম। ভাগ্যিস মা ধরে নিয়েছিল। নাহলে হয়তো চকোলেটের ডোবাটাতে পড়েই যেতাম। পড়লে যদিও হতো না কিছু। হাতে ধরা ছিল স্ট্রবেরি ফ্লেভার ক্যান্ডি কেন। পাশের মানি প্ল্যান্ট টা টেনে ঠিক উঠে পড়তাম। এখানে মানি প্ল্যান্টগুলোর ওপর লেখা আছে , ” টাকা তোলা বারণ” । কতদিন ধরে বাবাকে বলছি একটা এক্স বক্স কিনে দাও। উত্তরে এসেছে , “টাকা নেই। ” আর এখানে এতো টাকা গাছে ফলে আছে কিন্তু তোলার উপায় নেই। ঠিক আছে এই চমৎপুরে নাহয় বারণ আছে। কিন্তু গাছ লাগানো তে তো বারণ নেই। দু চারটে ডাল ভেঙে নিয়ে বসিয়ে দিলেই হলো। কিন্তু কে কার কথা শোনে।

এই চমৎপুরে ঘুরতে আসার জন্য অনেক বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছিলাম। বিশাল বড় একটা পার্ক। ডিজনিল্যান্ড এর মতো। সবার নাকি ভালো লাগে না , অথচ সবাই একবার চেষ্টা করে এখানে আসতে। একটা বন্ধু বলেছিলো যে এটা নাকি ভয়ঙ্কর জায়গা। বিশাল বিশাল মানুষ হাতে বড় বড় রামদা নিয়ে লাল রঙের ল্যাঙট পরে ছাই মেখে ঘুরে বেড়ায়। ও নাকি এক ঘন্টার বেশি থাকতে পারেনি। ও ব্যাটা বড্ডো ভীতু, অথচ ভূতের গল্প পড়তে ভালোবসে। মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে উঁকি মেরে ভূতের সিনেমা দেখে। তাই সব জায়গাতেই ভূত দেখে।

আমার ক্ষেত্রে কিন্ত ব্যাপারটা উল্টো। আমি গেট পেরোনোর পর থেকেই অবাক হয়ে গেছি জায়গাটা দেখে। মা বাবা আর কয়েক মিনিট। সামনের তথ্যকেন্দ্রে আমার নাম রেজিস্টার করে ,ওরা বেরিয়ে যাবে। ওই তথ্যকেন্দ্রের ওপারে আর বাবা মার এন্ট্রি নেই। ঘন্টা চার পাঁচ পর আমাকে আবার এই তথ্যকেন্দ্র থেকে তুলে নিয়ে যাবে।

নামটাম লিখে দেওয়ার পর আমার গলায় বাবার অফিস ব্যাজের মতো কিছু একটা ঝুলিয়ে ছেড়ে দিলো লোকটা। এক মুখ হাসি, বুড়ো লোকটাকে সান্টা ক্লসের মতো দেখতে হলেও লাল জামা পরে না। আমার লাল জামা কাপড় লোক দেখলেই কষ্ট লাগে। কি ভয়ে থাকে লোকগুলো , যখন তখন ষাঁড় এসে গুঁতিয়ে দিতে পারে।

ঘর থেকে একটা টানেল সোজা চলে গেছে। অনেক দূর। যার শেষ দেখা যাচ্ছে না। আমার সামনের ছেলেটা গট গট করে হাঁটা দিলো দেখে আমার আর কিছু ভয় থাকলো না। আমিও বাবা মা কে টাটা করে গিয়ে পা রাখলাম টানেলের মধ্যে। দূর থেকে মনে হচ্ছিলো শক্ত। কিন্তু পা দিতেই মনে হলো নরম রাবার দিয়ে তৈরী রাস্তা। টানেলের গা-টা সিনেমার স্ক্রিন এর মতো। নানা ভিডিও চলছে। সব একশান মুভি। স্পাইডারম্যান , সুপার ম্যান , এভেঞ্জার কি নেই। বাড়িতে কিছুই দেখতে দেয় না। সব সময় শুধু পড়া আর জ্ঞান শোনা। কি ইচ্ছা করছিলো শুধু বসে যাই, কিন্ত ওই সান্টার মতো লোকটা বলে দিয়েছিলো , “ওনলি ওয়ান রুল , কক্ষনো বসবে না। ”

হঠাৎ পেছনে একটা প্রচন্ড কান্না শুনে পেছন ফিরে দেখি আমার পরের ছেলেটা কিছুতেই টানেলে ঢুকছে না। টানেলের বাইরে দাঁড়িয়ে একবার করে এগোচ্ছে , আর চীৎকার করে পেছনে ফিরে যাচ্ছে। মনে হয় আমার ওই বন্ধুটার মতো কেস। আমার তো দিব্যি লাগছে। শুধু যদি সঙ্গে কেউ থাকতো আরো ভালো লাগতো। একা একা ঘোরাতে আমার বিশেষ ভালো লাগে না।

সামনের ছেলেটা যেন কাছে চলে এলো। আমি কি স্পিডে যাচ্ছি না ওর গতি ধীর হয়ে গেলো। কাছে যেতেই ছেলেটা ঘুরে আমার দিকে হাত বাড়ালো , ” হাই আমি সাগ্নিক। তুমি? ” “আমি অর্ণব। তুই বলতে পারিস। “
“হ্যাঁ রে , একা একা বোর হয়ে গেছি। রাস্তা যেন শেষ হতে চাইছে না। কখন থেকে ভাবছিলাম যদি কেউ এসে কথা বলে। ”
” টানেল তো প্রায় শেষ। ওই দ্যাখ। ”

সামনে একটা বিশাল খোলা মাঠ দেখা গেলো। কলকাতায় এরকম বড় মাঠ ভাবাই যায় না। আর আকাশটা নীল। কলকাতায় আকাশ কালো। বাবা গড়ের মাঠে নিয়ে গেলে ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল হল এখন ঝাপসা দেখায়। নীল আকাশের মধ্যে সাদা মেঘ আঁকতে ছোট বেলা থেকে শিখেছি বটে, কিন্তু সেই মামার বাড়ি শান্তিপুর না গেলে শরৎের নীল আকাশে মেঘের খেলা দেখতে পাওয়া যায় না। এদিকে তো দেখছি কাশফুল ফুটেছে। আর ঘাম নেই। সাগ্নিক বললো , “ব্যাপারটা কি বলতো ? এই তো ঘামে ভিজে প্যাচপেচে জায়গায় ছিলাম হঠাৎ কি হলো, সব এতো সুন্দর কি করে? আকাশ কি আর আলাদা হয় নাকি ? ”

“আরে ওখানে ক্রিকেট খেলছে সবাই। চল। ” আমরা দুজন দেখলাম সামনে বেশ কিছু ছেলে ক্রিকেট খেলছে। করকেট বলের মতো দেখতে ক্যাম্বিস বল। সবাই ব্যাট পাবে। একটা করে বল খেলার সুযোগ। যে ব্যাট করবে সে পরের বল করবে। ব্যাট যে করছে সে মারার পর বল যে হাতে যাবে সে পরের ব্যাট করবে। ফিলিডিং সাজানোই থাকবে, শুধু লোক পাল্টে যাবে। “কিন্ত তাহলে তো সবাই ব্যাট পাবে না। ভাগ্যও তো থাকবে। বল না গেলে কি করে ব্যাট পাবে। ” সাগ্নিক ফিসফিস করে বললো। আমি জানি আমার ভাগ্য খুব খারাপ। আমি ব্যাকাপ বোলার আর ব্যাকাপ ব্যাটসম্যান। স্কোরার শুনতে পেয়ে বললো , ” না না , উইকেট কিপার তো পাল্টাচ্ছে। যটা ছেলে আছে তার অর্ধেক বলের পরেও যারা ব্যাট পাবে না , তাদের উইকেট কিপার রাখা হবে। ”

আমরা কিছুক্ষন খেলার পর মনে হলো ক্রিকেট তো বাড়িতেও খেলি, যদিও ছয় মারতে পারিনা। কিন্তু এখানে এসে ক্রিকেট খেলে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। আমরা তখনও ব্যাট পাইনি। তাও বেরিয়ে এলাম। সাগ্নিক বললো , “বন্ধুরা বলেছিলো যা যা ইচ্ছা তাই এখানে করা যায়। যা বাড়িতে করতে পারিনা। কিন্তু এখানে তো দেখছি বিশাল মাঠ ছাড়া আর কিছু নেই। ” “ঐদিকে দেখ একটা লাইটহাউস। ওর ওপর উঠে দেখি। ” আমার বাড়ির কাছে একটা খুব উঁচু টেলিফোন টাওয়ার আছে। খুব ইচ্ছা ছিল ওপর থেকে কিরকম দেখা যায় সেটা দেখতে। সাগ্নিক বেশ দ্রুত চড়তে আরম্ভ করলো। আমার স্পিড একটু স্লো কিন্তু হাঁফিয়ে পড়লাম না। একটার পর একটা সিঁড়ি ভেঙে যখন ওপরে উঠলাম দেখি নীচে আর মাঠটা দেখা যাচ্ছে না। বিশাল সমুদ্রের মাঝখানে আমাদের এই লাইটহাউসটা। সাগ্নিক আঁতকে উঠলো , “নামবো কি করে রে। সিঁড়ি উধাও দেখছি।” আমি তখন দিগন্তে সূর্যোদয় দেখছি। সকালে কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতে পারিনা। কিন্ত ইচ্ছা খুবই সমুদ্রে সূর্যোদয় দেখতে। একটু একটু করে লাল হচ্ছে। মাথাটা ভোঁ করে উঠলো – “এই ভর দুপুরে সূর্যোদয় ?” সাগ্নিক বললো , “এতো উঁচুতে উঠেছি তাই অন্য শহরের সূর্যোদয় দেখতে পারছিস। কিন্ত নামবো কি করে? ” (ক্রমশ…)

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: