বাঙালীর ইংরেজি কথন

নিলয় বরণ সোম

রেগে গেলে বাঙালী যে ইংরেজিতে কথা বলে সে সবাই জানে । আর দৈনন্দিন জীবনে গড় বাঙালীর রাগ হবার যথেষ্টই কারণ থাকে । ধরুন , সরকারি আপিসের রিসিভিং বাবুটি যদি আপনাকে নিতান্তই অগ্রাহ্য করে, অথবা কোনো বিরসবদন সেলসম্যান যদি আপনার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করে, তাহলে কি আপনি কি আঙ্গুল উঁচিয়ে বলবেন না , ” ডু ইউ নো হু য়াম আই ? ঠিক ইংরেজি কোনটি হবে , হু য়াম আই হবে কি হু আই য়াম হবে সেই ডায়ালেকটিকে আপনি নাই বা গেলেন, আচ্ছা করে রাগ তো দেখানো গেল! এতেও কাজ না তার উপরওয়ালার কাছে আরো চোস্ত ইংরেজিতে বুলি ঝাড়ার অপশনটি তো রয়েই গেল!উপরওয়ালা আপনাকে ‘Bully’ ভাবলেই বা কি আসে যায়!

রাগকে পাশ কাটাই এবার । নার্সারি ওয়ানে ফর্ম তোলার লাইন । দু’হাজার সালের গোড়ার কথা – অনলাইন মানে তখন সশরীরে লাইনেই দাঁড়ানই বোঝাত । দক্ষিণ কলকাতার কোনো বিখ্যাত স্কুলের লাইনে আমি দন্ডায়মান । আমার পিছনের গার্জেন কোনো এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মী । উনি মেয়েকে একটি বিশেষ স্কুলে ভর্তি করেছেন- যাতে তারা ওকে গড়ে পিটে দিতে পারে, বিখ্যাত স্কুলটির জন্য । আমাদের উদ্দেশ্যে ওঁর বক্তব্য – “জানেন তো, আমার মেয়ে এমন ইংরাজি বলে, মাঝেমাঝে আমরাও বুঝতে পারি না !”আমার কেমন মনে হল,প্লে গ্রূপে ভর্তিপ্রার্থী কচিকাঁচাগুলো বাংলা ইংরেজি এস্পেরান্তো যে ভাষায় কথা বলুক না, তার সবটা বুঝতে পারার কোনো সঙ্গত কারণ আছে কি? তবে,কন্যা গর্বে গর্বিত পিতার সেই কথায় আমরা অন্য অভিভাবকরা কেউ জল ঢালি নি। আর, তখন তো এটাও কেউ বলত না, “ওরম মনে হয় !”

তবে আমাদের ছোটবেলায় ইংরেজি কথোপকথনের শিক্ষাটি একটু অন্যধারার ছিল ।প্রথমে নাম জিজ্ঞাসার পর অবধারিত ভাবেই পরের বাণটি আসত ,”হোয়াট ক্লাস ডু ইউ রিড ইন ?” কোন ক্লাসে রিড ইন সেটা বলার পর সাধারণত অব্যাহতি (gett।ng r।d) পাওয়া যেত , কারণ এরপর প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতা দুজনেরই বোধহয় কথ্য ইংরেজির ভান্ডার শেষ হয়ে যেত !তবে একটু কেতাবদুরস্ত লোকেরা একটু মাথা ঝুঁকিয়ে , হাত বাড়িয়ে , হাউ ডু ইউ ডু বলা শেখাতেন, এবং বলতেন যে এই প্রশ্নের উত্তরও তাই । বলা বাহুল্য , আই য়াম ওয়েল বা হাল আমলের আই এম গুড বলার চল তখন একেবারে ছিল না।

তবে অনেক সময় উচ্চশিক্ষিত লোকেরাও ইংরেজি বলা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন- কারণ দেশ কাল ভেদে কথা বলার ধরন বা বাগধারা পাল্টে যায় । একজন প্রথিতযশা ইতিহাসের অধ্যাপক স্যাম খুড়োর দেশে গিয়েছেন । এক ছুটির দিনে , ইনভার্সিটি ক্যাম্পাসে এক ছাত্রের সঙ্গে দেখা । উনি ছাত্রটির কুশল জিজ্ঞাসা করলেন । ছাত্রটি তার অসম্ভব ইয়াঙ্কি উচ্চারণে উত্তর দিল , “আই য়াম গুড !” হতভম্ব প্রবীণ অধ্যাপকের প্রতিক্রিয়া, ” আই ডিড নট আস্ক ইউ এনি মরাল কোয়েসয়েন !” তেমনই ,খুব সম্ভবত তারাপদ রায় আরেকটি সংকটের কথা বলেছিলেন । ডালের ইংরেজি পালস , এই জেনে বড় হওয়া বাঙালি লেন্টিল স্যুপে যে ডাল খুঁজে পায় না , তার একটি সরস বর্ণনা দিয়েছিলেন ।

বাগধারার ব্যাপারে এক কেলেঙ্কারির ইতিহাস আছে কলকাতার কোনো কলেজে ঘটা একটি অমর প্রেম নিবেদনের কাহিনীতে । ছেলেটির নাম ধরা যাক , তরুণ। মাঝারি মানের বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে অসাধারণ রেজাল্ট করে ভর্তি কোনো একটি মিশনারি কলেজে। সহশিক্ষার সেই কলেজে স্বাভাবিক ভাবেই বসন্তের সুপবন বইত এবং তার ছোঁয়া তরুনেরও লাগল । অনেক সাত পাঁচ ভেবে সে একদিন কাঙ্খিত নায়িকাকে প্রেম নিবদন করে বসলো। কিন্তু বাংলায় ভেবে , ইংরেজিতে বলা মস্ক করার পর, তার মুখ দিয়ে যে মধুর বাক্য নিঃসৃত হল, তা হল, ” দেভিনা , আই ওয়ান্ট তো মেক লাভ উইথ ইউ !” নায়িকা নাকি কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু একটি কটাক্ষপাত করে গটগট করে লাইব্রেরির দিকে হেঁটে গিয়েছিলো । সেও বোধকরি তরুনের ইংরেজি জ্ঞানের বহর নিয়ে এতটাই নিশ্চিত ছিল যে এমন মারকাটারি ডায়ালগের পরও কোনো শোর গোল করেনি ।

বাঙালীর ইংরেজি বলার আরেক সাগরেদ যে সারমেয় , সে কথাটি সহজেই অনুমেয়, হোক না তারা অবলা । টম, প্রিন্স বা জ্যাক নামের পোষা প্রাণীরা কি সুন্দর সিট্ ডাউন, কাম হেয়ার ইত্যাদি শুনে বুঝে বড় হয় ! তবে অনেক বাঙালি নিজের সন্তানদেরও এভাবেই বড় করে তোলেন, প্রায় ইংরেজি অথবা জগাখিচুড়ি ভাষায় । বছরখানেক আগে  কবি এবং লেখক শ্রীযুক্ত প্রদীপ রায় মহাশয় (যিনি প্রদীপ রায় গুপ্ত নাম লেখেন, জলার্ক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক )ফেসবুকেই তার একটি দুটি জলজ্যান্ত বর্ণনা দিয়েছিলেন । ঠিক ইংরেজি কথনের না দৃষ্টান্ত না হলেও, মিশ্র ভাষায় কথা বলার জলজ্যান্ত উদাহরণ পাওয়া যায় শ্রীযুক্ত রায়ের এই লেখায় । নমুনা হিসেবে একটিই যথেষ্ট । সারি সারি তরমুজ দেখে বিস্মিত শিশুপুত্রের প্রশ্নের উত্তরে মায়ের জবাব , “ওগুলোকে বলে ওয়াটার মেলন। আ কাইন্ড অব ফ্রুট। গত বছর তো দুদিন খেয়েছিলে। মনে নেই? সেই যে, কাটলে ভেতরটা একদম রেড?” তা সেই অবোধ শিশু তৎক্ষণাৎ সেই ‘ডার্ক গ্রীন ওয়াটারমেলন ‘ খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলে পর মায়ের প্রতিক্রিয়া , “এখন না সোনা, সামার আসুক, সামার না এলে ভেতরটা পানসে থাকে, টেস্টটা সুইট হয় না। তা-ছাড়া ওই দু-তিন কেজি ওয়েটের একটা ফ্রুট কি আমি ক্যারি করতে পারি? তোমার বাবাকে বলব।”

ইংরেজি বলার আরেকটি উপযুক্ত ক্ষেত্র গণপরিবহন, বিশেষত বাস বা মিনি বাস । সেখানে বিবাদের সূত্রপাত অবিশ্যি পা মাড়িয়ে দেয়া , গায়ে ঢলে পড়া অথবা কনুই দিয়ে গুঁতো মারা ,এই ধরণের অসাংবিধানিক কাজ দিয়ে । অসুবিধে হলে ট্যাক্সি চড়ার উপদেশটি হয়ত আজকাল ‘ওলা’ ওঠায় বদলে গেছে । এই অকৃত্রিম উপদেশটি বাংলায় বলা হলেও,কথার পিঠে ইংরেজিতেও ঢিসুম ঢুসুম চলে । একবার এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে বেশ কজন পুরুষের বিবাদ হচ্ছিলো । ভদ্রমহিলার এই রণরঙ্গিনী মূর্তি এক সহযাত্রীর মোটেই ভালো লাগে নি – উনি মন্তব্য করলেন, ” হাউ ক্যান ইউ সে সাচ ওয়ার্ডস, বিয়িং এ জেন্টল লেডি ? বাসে সকলেই উত্তেজিত ছিল, সুতরাং আমি সেই ভদ্রলোকের আর গ্রামারের ক্লাস নেই নি -নিলে নির্ঘাত মার খেতাম ।

হাল আমলে আরেকটি বিচিত্র রীতি প্রচলিত ভূভারতেই -শুধু বাঙালিরাই এর শিকার নন । যে কোনো পরিচিতি অনুষ্ঠানে দশ জনকে দাঁড় করিয়ে দিন – নাম জিজ্ঞাসা করলে তারা শুরু করবে মাইসেলফ অমুক, মাইসেলফ তমুক করে । এতো সেলফিশ হওয়া কি ভালো ! একথা শুনলেই কাস্টমার সার্ভিসের তরুণীটি তার পুরুষ সহকর্মীকে যেমন শুনিয়েছিল, তেমনি বলতে ইচ্ছে করে – ডু নট এ্যাংরি মি !”

তবে বাঙালীর ইংরেজি কথনের আরো মজার কাহিনী গুলো বোধহয় ইংরেজ আমলের । রাজনারায়ণ বসুর ‘সেকাল আর একাল’ গ্রন্থে এক রাজকর্মচারীর কথা আছে । তার দুর্নীতির খবর সাহেবের কাছে পৌঁছেছিল । ক্রুদ্ধ হয়ে সাহেব চোটপাট করতেই সেই ভদ্রমহোদয়ের বিনম্র নিবেদন, ” ইন মাই হাউস এভরিডে টোয়েন্টি লিভস ফল । লিটল লিটল পে , হাউ ম্যানেজ ?”

শেষ ঘটনা আবার ইন্টারভিউ, তবে ছেলের ভর্তি নয়, নিজের চাকরির । রাজ্য সরকারের একটি চাকরির জন্য ইন্টারভিউতে ডাক পড়েছে – অন্যান্য অনেকের সঙ্গে আমিও অপেক্ষা করছি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অফিসে । যেরকম হয় ,এক পদপ্রার্থীর সঙ্গে আলাপ হলো । ইন্টারভিউর মাধ্যম হিসেবে বাংলা বা ইংরেজি যে কোনো একটি নির্বাচন করা যাচ্ছিল । আমার সঙ্গী ইংরেজিতে স্নাতক ছেলেটি জানালো, সে বাংলাতেই বলবে । কারণ হিসেবে সে অনেকক্ষন সময় নিয়ে শুরু করলো, “ইফ আই স্পিক ইন ইংলিশ”, বলে প্রায় একটি বিজ্ঞাপন বিরতি । কিছুক্ষন ভেবে বলল , “ইট উইল নট বি”- আবার একটি দীর্ঘ বিরতি । বিরতি শেষে ঘাড় তুলে সে একটিই শব্দ উচ্চারণ করল , “অথেন্টিক !”
এর পর থেকে আমিও মাঝে মাঝে ভাবি, যা বলছি, ‘অথেন্টিক ‘ হচ্ছে তো ?

Nilay Baran Som

Nilay Baran Som

নিলয় বরণ সোমের জন্ম ১৯৬৫ সালে উত্তর পূর্ব ভারতের ত্রিপুরার সালেমায়I স্থায়ী বাসস্থান কলকাতায়I প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কর্মস্থল ত্রিপুরার বিভিন্ন মফস্বলে,উচ্চতর শিক্ষা কলকাতার দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে I কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরI ভারত সরকারের আয়কর বিভাগে ১৯৯০সাল থেকে কর্মরতI জীবিকাসূত্রে কলকাতা ছাড়াও চেন্নাই ও ডেপুটেশন সার্ভিসে আফ্রিকার দক্ষিণে বতসোয়ানায় কাজ করেছেনI লেখালেখি ছাড়া পড়াশুনা , আড্ডা, গান শোনা ও ভ্রমণে আগ্রহী। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকও লেখকের পছন্দের জায়গাI শৈশবে লেখালেখি শুরু করলেও কলেজ জীবনে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বঙ্গ সাহিত্য সমিতির সভানেত্রী , বাংলার অধ্যাপিকা প্রয়াত মৈত্রেয়ী সরকারের উৎসাহে ও অভিভাবকত্বে ছোট গল্প লেখা শুরু হয়। বর্তমানে মুক্তগদ্য ও রম্যরচনায় ব্যাপৃতI ছাত্রজীবন ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও বিভাগীয় সাময়িকী ও প্রবাসকালে পূজা সংকলনে লেখকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে 'কলেজ স্ট্রিট পত্রিকায়, ২০০১ সালেI দীর্ঘ বিরতির লেখালেখি ২০১৬-১৭ সালে শুরু I২০১৮ ও ২০১৯ এ অনুস্টুপ পত্রিকার শারদ সংকলনে লেখকের দুটি মুক্তগদ্য ও ২০১৯ সালে ফেসবুক গ্রূপ ' শনিবারের আসরের' ২০১৯ পূজা সংকলনে একটি রম্যারচনা প্রকাশ পায় I ওয়েবজিন 'সময়.ইন ' এর কয়েকটি সংখ্যায় লেখকের রম্য রচনা স্থান পেয়েছেI সৃজনাত্মক সাহিত্যের পাশাপাশি আয়কর আইন সংক্রান্ত বিষয়ে লেখক লেখালেখি করেন।২০১৩ সালে বিভাগের 'ট্যাক্সপেয়ার ইনফরমেশন সিরিজে' যুগ্মলেখক হিসেবে 'Royalty and Fees for Technical Services' শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ পায়I ২০১৯ সাল থেকে বিভাগীয় ওয়েবজিন 'ট্যাক্সলোগ'-এ লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়েছেI

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: