আপেলগাছ ও প্রেমেন মিত্তির

গৌরব বিশ্বাস

কাল রাতে একটা গল্প পড়েছি। তবে গল্প না বলে স্বপ্ন বলাই যুক্তিযুক্ত। শুনবেন সেই স্বপ্নের কথা ? বরং বলেই ফেলি। 

ফ্র্যাঙ্ক গাড়ি চালাচ্ছে। পাশে বসে স্ত্রী স্টেলা। ওদের দাম্প্যত্যের ২৫ বছর পূর্ণ হল আজ। স্টেলা এখন মধ্য চল্লিশ। ফ্র্যাঙ্ক পঞ্চাশের কাছাকাছি। যৌবনে স্টেলা ছিলেন অতীব সুন্দরী। মধ্যচল্লিশে সে রূপের আভাস পাওয়া যায় মাত্র। ফ্র্যাঙ্ককে অবশ্য এখনও সুদর্শন বলা চলে। স্টেলার অতীত জীবন সম্পর্কে বেশী কিছু জানি না। তবে ফ্র্যাঙ্কের অতীত আছে একটা। প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে যুবক ফ্র্যাঙ্ক মেগানকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি। এমন মামুলি ঘটনা প্রায় প্রত্যেকের জীবনেই থাকে। এই ঘটনার বছর খানেকের মধ্যেই স্টেলার সাথে সাতপাকে বাঁধা পড়েছিল ফ্র্যাঙ্ক। স্টেলার ভালোবাসা, প্রেম মেগানকে ভুলিয়েছে। 

দুজনে চলেছে পটের ছবির মতো সুন্দর ইংল্যণ্ডের কান্ট্রিসাইড ধরে। কোনো এক নিভৃত স্থানে একসাথে সময় কাটাবেন। বসন্তের শেষ এখন। এসময়ে কান্ট্রিসাইড রূপের ডালি মেলে বসে। সরু ফিতের মতো রাস্তাটা একে বেঁকে মিলিয়ে গেছে উপত্যকার মধ্যে। তার দু ধারে লার্ক, বীচ গাছের সারি। লার্কের মিষ্টি গন্ধে বাতাস আমোদিত। আহা, ছবি আকার জন্যে এমন জায়গাই তো খুঁজছিল স্টেলা। গাড়ি থামায় ফ্র্যাঙ্ক। ছবি আকার সরঞ্জাম নিয়ে গাড়ি থেকে নামে স্টেলা। বড় মনোরম স্থান। ফ্র্যাঙ্কও নেমে পড়ে। ফ্র্যাঙ্ক সাহিত্য রসিক। হাতে তার ইউরিপিডসের ‘হিপোলিটাস’। গিলবার্ট মুরের অনুবাদ। 

স্টেলা এগিয়ে গিয়েছিল কিছুদূর। যে রাস্তাটা মিশে গিয়েছে বনে, তার ধারেই একটা কবর দেখতে পেল সে। তাতে কোনো এপিটাফ নেই। মৃত ব্যক্তির নাম জানবার কোনো উপায় নেই। কালো ঘষা পাথরের কবর। পড়ে রয়েছে বড় অবহেলায়। তার উপর কেউ একগুচ্ছ বেগুনি ফুল রেখে গিয়েছে। রাস্তার ধারে এমন কবর? বড় অদ্ভুত ঠেকল স্টেলার। ও ডাক দিল ফ্র্যাঙ্ককে- “ oh! Look, Frank! A grave!” ফ্র্যাঙ্ক বোঝে এ ব্যক্তি হয়ত আত্মহত্যা করেছিল। তাই জোটেনি কোনো কবরস্থান। পড়ে রয়েছে অবহেলায়। কান্ট্রিসাইডের এমন মায়াবী প্রকৃতির মাঝে নিঃসঙ্গ এই কবর, ফ্র্যাঙ্কের মনে কাব্যরসের সঞ্চার করে। 

স্টেলা ছবি আঁকতে ব্যস্ত। একটু দূরে ফ্র্যাঙ্ক বই পড়ছে। কিন্তু পড়াতে মন বসছে না তার। এক অদ্ভুত অস্বস্তি তার মনে। বার বার তাঁর মনে হচ্ছে এ জায়গায় সে আগেও কখনো এসেছে। বই থেকে চোখ তুলে চারিপাশ ভালো করে দেখে নেয় সে। দূরে পাহাড়ের উপর মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। পাইন গাছের সারি। কোকিলের ডাক… তাঁকে এক ঝটকায় নিয়ে ফেলে ছাব্বিশ বছর আগের এমনই একদিনে। সদ্য তখন কলেজ পাশ দিয়েছেন ফ্র্যাঙ্ক। বন্ধু রবার্টের সাথে ওই সরু রাস্তা ধরেই উঠে আসছিলেন ফ্র্যাঙ্ক। ঘুরতে ঘুরতে পায়ে চোট লেগেছে তাঁর। কোনো সরাইখানায় বিশ্রাম না নিলেই নয়। কোথায় পান এখানে সরাইখানা। এমন সময় তার চোখে পড়েছিল রাস্তা ধরে বাস্কেট হাতে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে একটি মেয়ে। অপরিচ্ছন্ন গ্রাম্য বেশভূষা। ব্যতিক্রম তার স্বপ্নালু চোখ দুটি। আজানুলম্বিত কেশ। এই হল সেই মেগান। মেগানই তাদের নিয়ে এল সরাইখানায়। এ সরাইখানা তার কাকীর। সে কাকীকে সাহায্য করে। কাকী অবশ্য তার প্রতি খুব সহৃদয়, এমনটা নয়। মেগানকে ভালো লেগেছিল ফ্র্যাঙ্কের। মেগানেরও তাকে। সে বসন্তে উঠোনের আপেল গাছে ফুলেরা যেমন ফুটেছিল নিঃশব্দে তাদের ভালোবাসাও তেমনি বেড়ে উঠছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। কিন্তু ভালোবাসার কথা তারা কিভাবে বলবে পরস্পরকে? এমন ভালোবাসার কাছে শব্দরা অসহায়। একদিন দুপুরে মেগান যখন দাঁড়িয়েছিল আপেল গাছের তলায়, ফ্র্যাঙ্ক নির্নিমেষ তাকিয়েছিল তাঁর দিকে। তারপর ঠোঁট দিয়েছিল ঠোঁটকে আশ্রয়। ফ্রাঙ্ক মাথা রেখেছিল মেগানের বুকে। আপেল ফুল টুপটাপ ঝরে পড়েছিল। মেগানের আজানুলম্বিত কেশে তারা খুঁজেছিল আশ্রয়। ওদের প্রেম, চুম্বন, মান অভিমানের একাকী সাক্ষী আপেলগাছ। 

পথের শেষে সরাই খানার গেটটা চোখে পড়ল ফ্র্যাঙ্কের। গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। কতদিনকার স্মৃতি অর্গল ভেঙে ভাসিয়ে দিল ফ্র্যাঙ্ককে। এই তো সরাইখানা। ওই তো সেই চেয়ার। রাত্রে যার উপর চড়ে মেগানের কাছে সে চাবি চাইত। এক মুখ হাসি নিয়ে চাবি ছুঁড়ে দিত মেগান। একটু দূরে ওই যে পাথুরে নদী ঝিরঝিরে বয়ে চলেছে ওখানে স্নান করতে করতেই আপেল গাছকে প্রথম দেখেন ফ্র্যাঙ্ক। আর আপেল গাছ? আঃ, একরাশ ব্যাথা দলা পাকিয়ে ওঠে ফ্র্যাঙ্কের গলায়। আপেল গাছে ফুল ধরেছে সে বসন্তের মতোই। কিচ্ছুটি যে বদলায়নি। তিনি ভেবেছিলেন জীবন এগিয়ে গিয়েছে অনেকবছর। অথচ ছাব্বিশ বছর বাদে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেই একই জায়গায়। এ তো জীবন! ভেবেছিলেন তিনি, মেগানকে গেছেন ভুলে। আদৌ কি পরেছেন তিনি? তবে কেন এত কষ্ট! কিন্তু মেগান, সে কই? সে কি এখনও তারই জন্যে অপেক্ষারত? নিজের বিয়ের কথা ইচ্ছে করেই জানানি ফ্র্যাঙ্ক। কি ভাবে মেগানের সম্মুখীন হতেন তিনি? আর দাঁড়াতে পারেন না ফ্র্যাঙ্ক। ফিরতি পথ ধরেন। কিছুদূর এগিয়ে পথের ধারে তিনি জিরিয়ে নেন। মাঠের এক মজুরের সাথে গল্প জুড়ে দেন। গল্প করতে করতে কৌতুহলবশত ফ্র্যাঙ্ক জিজ্ঞেস করেন পথের ধারের কবরের প্রসঙ্গ। মজুর জানায়, কবরটি এক স্থানীয় মেয়ের। তার কাকীর সরাইখানায় সে কাজ করত। মেয়েটির সাথে ভালই পরিচয় ছিল বৃদ্ধের। মেয়েটিকে তিনি স্নেহ করতেন। তিনি আন্দাজ করেছিলেন মেয়েটির প্রেম ঘটিত বিপর্যয়। মেয়েটিকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন সে কথা। সে ছিল নিশ্চুপ। বৃদ্ধ শুধু দেখেছিলেন, রাত্রে যখন চাঁদ ওঠে, মেয়েটি তখন আপেল গাছের তলায় দাঁড়ায় তার প্রিয়তমের প্রতীক্ষায়। নিঃশব্দে ঝরে তার অশ্রু, আর আপেল ফুল ঝরে পড়ে তার আজানুলম্বিত কেশে। এমন এক মায়াবী সন্ধ্যেতেই সে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কথোপকথনেই সেই বৃদ্ধ জানায় মেয়েটির নাম- ‘ মেগান ডেভিড’। 

স্টেলা ফ্র্যাঙ্ককে খুঁজতে খুঁজতে হাজির হয় সেখানে। হাতে তার সদ্য সমাপ্ত ল্যান্ডস্কেপ। স্টেলা তার ল্যান্ডস্কেপ সামনে ধরে ফ্যাঙ্ককে জিজ্ঞেস করে-“ … there is something wanting, isn’t there”। ফ্র্যাঙ্ক কোনো উত্তর দেয় না। তার মনে গুনগুনিয়ে ওঠে ‘হিপোলিটাসের দুকলি- “ The Apple-tree, the singing and the gold”। তার মনে হয় মেগানের ছলছলে চোখ দুটি দেখছে তাকে। মেগানের আজানুলম্বিত সিক্ত কেশে আটকে রয়েছে আপেলফুল। গল্প শেষ হয় এখানেই। স্বপ্নের শেষে আপেলফুলের মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকে মন।

এগল্প আমাকে শুনিয়েছেন ব্রিটিশ গল্পকার জন গলসওর্দি। ১৯১৬ সাল নাগাদ লিখেছিলেন এ গল্প। নাম- ‘ Apple tree’ । অথচ সে গল্প ২০১৮ তেও পাঠকের মন ভিজাচ্ছে। ধ্রুপদী সাহিত্যের মহিমা এমনই। এ গল্প রচনার বছর আটেক বাদে এগল্পটি পড়ে বাক্যহারা হয়েছিলেন এক বাঙালী যুবক। একমাথা কোকাড়ানো চুলের মায়াবী দৃষ্টির ছেলেটিকে শিক্ষকেরা বড় স্নেহ করেন। একঘর ছেলের মধ্যে চোখে পড়বার মতো চেহারা। স্কুলের বাংলার পণ্ডিত রণেন্দ্র গুপ্তের বড় আশা তাকে নিয়ে। এমন ছোট বয়সেই এমন সাহিত্য প্রতিভা। ম্যাট্রিক পাশ দিয়ে সে যুবক ভর্তি হল স্কটিশচার্চ কলেজে। তখন দেশে নন-কোঅপারেশন চলছে। সমস্ত যুবকের মধ্যেই তখন সে উত্তেজনা। এ যুবকটিও ভেসে পড়লেন তাতে। ঘুরতে লাগলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পুরী থেকে বন্ধুকে চিঠি লিখলেন- “… আমি পড়াশুনা একদিনও করিনি-পারা যায় না। আমাদের মতো লোকের পড়ব বললেই পড়া অসম্ভব। হয়ত এবার একজামিন দেওয়া হবে না”। বাংলার ১৩৩১ , ইংলিশ সম্ভবত ১৯২৪ এর শরৎের এক দুপুরে এই যুবক প্রথম পড়লেন গলসওর্দির Apple tree। বন্ধুকে চিঠিতে লিখছেন, সেই গল্পপাঠের পাঠানুভূতি- “ কি কথা বলতে চাই বলতে পারছি না। বুকের ভিতর কি কথার ভিড় বন্ধ ঘরে মৃগনাভির তীব্র ঘ্রাণের মত নিবিড় হয়ে উঠেছে, তবু বলতে পারছি না। কতরকমের কত কথা- তার না পাই খেই না পাই ফাঁক! হাস্নাহানার বন্ধ কুঁড়ির মত টনটন করছে সমস্ত প্রাণ-কিন্তু পারছি না বলতে। কাল থেকে কতবার ছন্দে দুলিয়ে দিতে চাইলুম, পারলুম না। ছন্দ দোলে না আর। বোবা বাঁশি যেন আমি, ব্যাকুল সুরের নিশ্বাস শুধু দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে- বাজাতে পারছি না! কত কথা ভাই-যদি বলতে পারতুম! 

ব্রিটিশ গল্পকার জন গলসওর্দি

গলসওয়ার্দির Apple tree পড়ছিলুম-না, পড়ে ফেলেছি আজ দুপুরে। সেই না-জানা আপেল মঞ্জরীর সুবাস বুঝি এমন উদাস করেছে। তুই যেখানে পাস খুঁজে গলসওয়ার্দির Apple tree গল্পটা পড়িস…”। 
এই যুবকটি এর বহুবছর পর আবিস্কার করবেন ‘তেলেনাপোতা’। ‘তেলেনাপোতা আবিস্কার’ আর Apple tree দুইয়েতেই সেই মনখারাপের মিঠে সুবাস। যৌবনে আঘ্রাত আপেল ফুলের মিঠে সুবাসই কি তেলেনাপোতা আবিষ্কারের কান্ডারী!
আজ সেই যুবকটির জন্মদিন ( ৪ ঠা সেপ্টেম্বর ) । শুভ জন্মদিন প্রেমেন্দ্র মিত্র।।

ঋণস্বীকার- কল্লোল যুগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, এম.সি.সরকার। 
গলসওর্দির Apple tree যারা পড়তে চান, তাঁদের জন্য রইল- http://www.online-literature.com/john-galswor…/five-tales/3/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *