তর্পন

গৌরব  বিশ্বাস

আমাদের বাড়িতে মহালয়ার দিন খাওয়া দাওয়াটা জমে বেশ। তবে, কেউ যদি ভেবে থাকেন কাবাব রেজালার আখ্যান  শুনবেন কিংবা চিতলের মুইঠ্যা গলদা বাগদার প্রেমলীলায় লালায়িত হবেন, তবে তিনি নিরাশ হতে প্রস্তুত থাকুন। সেকথা আগেভাগেই জানিয়ে রাখলাম। ডায়াবেটিস, প্রেশার, কোলেস্টেরল আক্রান্ত মধ্যবিত্ত সংসারে যেখানে বছরের বেশীরভাগ দিন ডালে ভাতে পোনার ঝোলে, কদাচিৎ রবিবাসরীয় লেগপিস, বাড়িতে অতিথি এলে তবেই পাঠার গৃহে  প্রবেশের অনুমতি মেল্ল নাহলে, গাছপাঁঠাতেই রসনাতৃপ্তি সেখানে একদিনের তরে রাজকীয় রসনাবিলাসে বিশ্বাসী ছিলেন না আমার পিতৃদেব। রান্না হত অতি পরিচিত রান্নাই। রেসিপির সামান্য অদলবদলে তারা  হয়ে উঠত রহস্যময়।

বদল শুরু সকালের চা পর্বেই। প্লাস্টিকের কৌটের মারি বিস্কুটদের যাতনা দিয়ে সেদিন চায়ের দোসর হবে চানাচুর। কিসমিসওয়ালা মিশমিশে চানাচুর না পসন্দ। ব্রক্ষ্মতালু জ্বলে যাওয়া ঝাল চানাচুরও চলবে না। চানাচুর আনা হত সেই দোকানটা থেকে যে দোকানে সন্ধ্যের আড্ডা জমান পাড়ার মাতব্বর বৃদ্ধেরা, সাঁৎলা পড়া বাল্বের ঘোলাটে আলোয় টিনের চালের দোকানঘরকে আন্ধারিয়া কোঠা মনে হয়, ছোট একটা পতঙ্গ ধরতে লড়াই বেধে যায় দুটো শীর্ণকায় টিকটিকির, বাদাম ভাজার ফটফট শব্দে চমকে উঠে পালিয়ে যায় পোকাটি আর টিকটিকি দুটি বোকা চোখে তাকিয়ে থাকে বুড়ো দোকানির দিকে, কাঁচা পিয়াজ লঙ্কা সর্ষের তেলে মাখামাখি হয়ে যেখানে জন্ম নেয় বিচিত্র গল্পেরা, সে দোকানে গিয়ে ‘মাখা চানাচুরের’ নাম করলে আপনার দিকে একজোড়া ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি পড়বে। একে একে খুলতে থাকবে মোটা কাঁচের বোয়াম। কয়েক মুঠো ডালমুট, মটর ভাজা, সরু মোটা গাটিয়া আশ্রয় নেবে ছোট কড়াইয়ে। একটু করে যখন তপ্ত হবে ওদের শরীর, ঘোলাটে দৃষ্টির মালকিন তাতে নিক্ষেপ করবেন একমুঠো  বাদাম। তারপর এক চিলতে মরিচ মেখে আপনার বাড়ি যেতে ওরা প্রস্তুত। এমন বিশেষ অতিথিদের লাল চা সহযোগে আপ্যায়ন বড়ই বেইনসাফির। ঘন দুধের চায়ের উপর পুরু সর , তবেই না মেহমানের উপযুক্ত ইনসাফি! তারপর এক গাল চানাচুর মুখে ফেলে পেয়ালায় স্নেহ চুম্বনের তৃপ্তি দেবীর মহিষাসুর বধ তুল্য।

চা পর্ব শেষ হতেই পিতৃদেব ছুটতেন বাজারে। কোনোদিন সঙ্গে আমি। কানকো উছু করে, গা টিপে মাছ চেনা, গায়ের শির, মাথার ফুল দেখে কোন পটলটি সদ্য পটল তুলেছে তা চিনে নেওয়ার তালিম চলছে তখন। রসুই ঘরে ততক্ষণে তেলে ডুব মেরে লুচিরা শারদ প্রাতের সুয্যিমামার আকার ধারণ করেছে। সুয্যিমামার বর্ণটি যদি প্রত্যক্ষ করতে চান, তবে কামড় বসাতে হবে সঙ্গের হাঁসের ডিমের ডালনায়। ডিম একটু কড়া করে ভেজে ঝোলে দিতে হবে। কামড় দিলে সাদা অংশ রসালো মুচমুচে। কুসুমের রং  সুয্যিমামার মতোই। কিংবা চলতে পারে ছোলার ডালের মাখানি। এলাচ, দারচিনি শুকনো লঙ্কা থাকবে গোটা। সঙ্গে সাদা আলুর তরকারি।

একহাতে খববের কাগজ নিয়ে যখন পিতৃদেব মনোনিবেশ করেছেন লুচিতে, মাতৃদেবী ততক্ষণে বুঝে নিচ্ছেন বাজার। হঠাৎ মাতৃদেবীর অনুযোগ- “ সেকি! কারি পাতা আনোনি!” খানকতক লুচি নিঃশেষ করেই পিতৃদেব ছুটলেন কারি পাতার সন্ধানে। ওই পাতাটির বড় প্রয়োজন পড়েছে, কারণ আজ টম্যাটো, ফোঁড়ন সহযোগে রুইয়ের  টক ঝাল রসা রাঁধা হবে। যার ঝোল দিয়েই ভাত খাওয়া যায়।আমার পিতৃদেব যখন বছর দুয়েকের শিশু, ঠাকুরদা সে সময়ে গত হন। এ পদ নাকি তাঁর ভারি পছন্দের।  পিতৃদেব যখন দ্বিতীয় দফায় গিয়েছেন বাজার, রসুই ঘরে ভেজে রাখা মাছের মুড়ি মুগের ডালে স্নান সেরেছে সবে। গোলাপি আদুরে গায়ের চিংড়িরা মোচার চাদর গায়ে জড়িয়েছে। আমড়াদের আত্মাহুতি চলছে।

মহালয়া সোম-শুক্রবার পড়লে ওদিন নিরামিষ। যেমন আজকে। নিরামিষ পদ আমিষের বাড়া। সরু চালের ভাত, ঘি, আলুসিদ্ধ,  বেসনে চুবিয়ে লম্বা বেগুন ভাজা, আলু ফুলকপির ডালনা, কাঁচকলার কোপ্তা। মহালয়ার দিন মোগলাই, চাইনিজ খাওয়া যেতেই পারত। তাতে কিছু এসে যেত না।  কিন্তু পরম্পরা, ঐতিহ্য অতীত বড় মায়াবী। আমরা কোট হ্যাট পরে আধুনিকতার ভূত সাজি। অতীত করুণার হাসি হাসে। পিতৃদেব গত হয়েছেন প্রায় এক দশক। একবুক গঙ্গা জলে দাঁড়িয়ে তর্পনে বিশ্বেস আমার নেই। সকালের ধোয়া বেরুনো ফুলকো লুচি , সাদা আলুর তরকারি , দুপুরে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতে বাটিতে সাজিয়ে রাখা ঐতিহ্য মেখে মুখে তুলব যখন, সম্পূর্ণ হবে তর্পণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *