৬ দিনে সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড

অম্বর রায়

জুলাই এর ফার্স্ট উইক সবে মিলে 6 দিন ছুটি। কাতার এয়ারওয়েজ এ চাকরি করার সুবাদে টিকিটের সুবিধাটা আছেই, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়াতে যাবার নেশা। ঠিক করলাম সুইজারল্যান্ড যাব। যদিও সুইজারল্যান্ড ৬ দিন এ ডিটেইলস এ দেখা মুশকিল। তবুও বেরিয়ে পড়লাম। সাথে সহধর্মিণী আর আমার ৩ ব্ছরের স্পাইডারম্যান।
কস্টলি জায়গা সে বিষয়ে আগে থেকেই ধারণা ছিল বা অফিসে কলীগ দের থেকে শুনেছিলাম। তাই সবার আগে টাকা এক্সচেঞ্জ করলাম। দোহা এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইট এ সোজা জুরিখ।

প্রথম দিনঃ-

সময় কম থাকার জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এর ভরসা না করে একটা Car rent করে নিয়ে সোজা ইন্টারলেকন।

জুরিখ থেকে ইন্টারলেকন গাড়িতে প্রায় ২ ঘণ্টা, পাহাড়ী পথে প্রকৃতির সেই অপরূপ শোভা উপভোগ করতে করতে কখন যে পৌঁছে গেছি বুঝতেই পারিনি।

ছিলাম Wilderswil নামক একটা গ্রাম এ। সমস্ত একই রকমের কাঠেরবাড়ি ,ফুল দিয়ে সাজানো সবুজ পাহাড়ের গায়ে ঠিক যেন আঁকা ছবি।

শুরু করলাম এক্সপ্লোরেশন, ফার্স্ট ডেস্টিনেশন Schilthorn কেবল কার। কি অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

3 বারে কেবল কার চেঞ্জ করে পৌঁছে গেলাম ২৩৭০ মিটার উচ্চতায়।

একই রাস্তায় নেমে এসে সারাদিন নিজেদের মতো সময় কাটালাম সবুজ পাহাড়ের কোলে। পরেরদিন প্ল্যান ছিল Jangfrau যাবো, তাই টিকেট প্রিবুক করতে ছুটলাম ট্রেন স্টেশন। পরের দিন খুব সকালের টিকেট নিলাম কারণ ফিরে সারাদিন টা হাতে পাবো ঘোরাঘুরি করার জন্য।

দ্বিতীয় দিনঃ-

সকাল সকাল খাবার দাবার ব্যাগ এ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম স্টেশন যাবো, সকাল 7:10 এ ট্রেন।

3 বার ট্রেন চেঞ্জ করে পৌঁছলাম টপ অফ ইউরোপ, এই ট্রেন জার্নি টাও কিন্তু এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। 45° অ্যাঙ্গেল এ পাহাড়ের চড়াই এ ট্রেন যাচ্ছে।

কনকনে ঠান্ডা র মধ্যে বরফ নিয়ে খেলা , খাওয়া দাওয়া , ICE CAVE দেখা সব শেষ করে একই রাস্তায় যখন বাড়ির পথে তখন ঘড়িতে প্রায় 4 টে।

হাতে সময় যখন আছে তখন ইন্টারল্যাকেন এর লেক এ বোট ট্রিপ টাই বা বাদ যায় কেন। টিকেট কেটে উঠে পড়লাম পরিপাটি করে সাজানো cruise এ।

প্রায় দুই ঘণ্টার ট্রিপ অসাধারণ কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা হলো।

তৃতীয় দিনঃ-

সকাল বেলা ব্রেকফাস্ট করে বেরোলাম Luzern এর উদ্দেশ্যে, টার্গেট মাউন্ট টিটলিস (Titlis)।

ইন্টারলেকন থেকে 1 hour ড্রাইভে পৌঁছে গেলাম কেবল কার কাউন্টার, স্বাভাবিকভাবেই পথের পাহাড়ি সৌন্দর্য বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না।

টিকিট নিয়ে সোজা পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরে। কোন দিকটা ছেড়ে কোন দিকটা যে ক্যামেরায় ধরবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

অবশেষে ক্যামেরা রেখে মনের মণিকোঠায় রাখাই সহজ মনে হলো। উপরে গিয়ে দেখি নিতান্তই নিজের দেশ বলে মনে হচ্ছে, 95% লোকজনই ভারতীয়। এমনকি 70 পেরিয়ে যাওয়া মাসিমা মেসোমসাইও DDLG র শাহরুখ-কাজল হতে পিছপা হচ্ছেন না। (DDLG শুটিং ওখানেই হয়েছিল র মেমোরি হিসাবে একটা কার্ডবোর্ড স্ট্যাচু রাখা আছে )। সব শেষ করে যখন পাহাড়ের নীচে এলাম তখন প্রায় ৫ টা। চললাম LUZERN লেক দেখতে।

Chappel ব্রিজ এর অসাধারণ ফুলের ডেকোরেশন মুগ্ধ করলো।। Chappel ব্রিজ এর ধরে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইএ কামড় দিতে দিতে গিন্নী র plan এ আমস্টারডাম যাব ঠিক হলো।

যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। ticket বুক করলাম নেক্সট দিন খুব সকালেই জুরিখ থেকে আমস্টারডাম। সকাল বেলা এয়ারপোর্ট এ যাওয়া সহজ হবে ভেবে ড্রাইভ করে পৌঁছলাম জুরিখ। সস্তার হোটেল এ রাত কাটিয়ে সক্কাল বেলা এয়ারপোর্ট।

আনুমানিক খরচঃ-

গাড়ি ৩ দিন ৩০০ ইউরো
হোটেল ৮০ ইউরো প্রতি রাত্রি
Schilthorn কেবল কার- ৬৫ ইউরো/ ঘণ্টা
Jungfrau ১১৫ ইউরো/ ঘণ্টা
Titlis ১২৫ ইউরো/ ঘণ্টা
Lake cruise ৫০ এউর/ ঘণ্টা
প্লিস আরো কিছু details দরকার থাকলে সরাসরি এখানে যোগাযোগ করতে কুন্ঠাবোধ করবেন না।

এবার চলে যাব অ্যামস্টারডাম। ৬ দিনের ছুটির ৪ দিন তো সুইজারল্যান্ডেই কাটিয়েছি। বাকি হাতে দুদিন। তৃতীয় দিনে ফেরার টিকেট। প্রসঙ্গত বলে রাখি এটা আমার দ্বিতীয় বার অ্যামস্টারডাম আসা। তাই প্ল্যান করে নিয়েছিলাম বাকি থাকা শুধু দুটো জায়গা কভার করবো। কেউকেনহফ (Keukenhof) টিউলিপ বাগান এবং ডাচ ভেনিস ঘিথ্রন (Giethoorn) গ্রাম।

চতুর্থ দিনঃ-

সকাল 10 টায় ল্যান্ড করলো ফ্লাইট Amsterdam এর Schiphol এয়ারপোর্টে। যেহেতু একটু চেনা জায়গা তাই সহজেই বাইরে বেরিয়ে ট্রেন ধরে পৌঁছে গেলাম আমস্টারডাম সেন্ট্রাল মানে হার্ট অফ সিটিতে।

মূলত এই জায়গাটাকে কেন্দ্র করেই ট্যুরিজমটা চলে। শপিং থেকে শুরু করে ভিন্ন ধরনের খাবার দাবার সবই পাবেন এখানে। সেন্ট্রাল স্টেশনে দাঁড়িয়ে booking.com খুলে নিয়ারেস্ট একটা হোটেল বুক করলাম।

ইচ্ছা ছিল তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুলো রেখেই রওনা দেব Keukenhof গার্ডেন। সব ঠিক যে চলছিল কিন্তু বাধ সাধলো একটা ট্রাভেল এজেন্ট কাউন্টার।। বলে নাকি Keukenhof গার্ডেন বন্ধ। বুঝলাম নিতান্ত বোকামি করেছি। ভালো ভাবে জেনে আসা উচিত ছিল। (21st মার্চ to 19th মে 2019 খোলা ছিল) তবে ইন্টারনেট এর কোনো এক ওয়েবসাইটও আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। কারণ অনলাইন টিকিট booking একসেপ্ট করছিল। ভাগ্যকে বাহবা দিলাম টিকিট বুক না করার জন্য। তবে সারাদিনটা শপিং করে আর Canal cruize এ টাইম পাস করলাম। তবে hop on hop অফ বাস আছে, টিকিট কেটেই উঠে পড়া যেত কিন্তু প্রথম বারে এসে city tour হয়ে গিয়েছিল তাই শান্তিতে নৌকা বিহারেই মন দিলাম। এ প্রসঙ্গে সবাই কে suggest করবো এমন সময় cruise বুক korun যখন তখন ঠিক সন্ধে নামছে। তাহলে দিন এবং রাতের দুটোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

সন্ধে নামতেই বেশির ভাগ জায়গায় লক্ষ করলাম ছোট ছোট রেস্তোরাঁয় বসে সবাই মদ্যপানে ব্যাস্ত। ব্যক্তিগত ভাবে খুব একটা পছন্দ না হলেও পাশ্চাত্যে সংস্ক্রিতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে তার একটু ভাগিদার হতে মন্দ লাগলো না। তারপর রাত বাড়তেই দেখি পুরো ভিড় টার অধিকাংশই চলেছে একই দিকে, খানিকটা দুর্গাপুজোর “শ্রীভূমির” প্যান্ডেল এর মত।পরে বুঝলাম ওই দিকটাই সেই বিখ্যাত Redlight এরিয়া। যেটা আমস্টারডাম ট্যুরিজম এর একটা বহুচর্চিত অধ্যায়। শরীরী ব্যাবসারও যে অমন মুক্ত অঙ্গন হতে পারে তা এখানে না আসলে ভাবতেও পারতাম না। সকলের মতো আমরাও একটা চক্কর লাগলাম এই area তে। সব মিটিয়ে যখন হোটেল এ ঢুকলাম, ঘড়ির কাঁটার তখন রাত একটা।

পঞ্চম দিনঃ-

প্ল্যান অনুযায়ী Giethoorn ট্রিপ অনলাইনে আগেই বুক করে নিয়েছিলাম। গাইডেড বাস ট্রিপ। সাধারনত ওরা আপনাকে মেল করে আপনার হোটেল এর নিকটস্থ pick up point বলে দেবে। কথামতো সকাল 0700 তে যাত্রা শুরু।

Giethoorn হলো একটা উত্তর-পূর্ব Netherlands এর Overijssel নামক province এর একটা গ্রাম।

যেখানে মোড অফ ট্রান্সপোর্ট বলতে শুধু বাইসাইকেল আর বোট। বোট এর সর্বোচ্চ গতিবেগ 6km/hr।

তার সাথে শতাব্দী প্রাচীন উলুঘাসের ছাউনি দেওয়া সুন্দর সুন্দর বাড়ি সামনে ফুল দিয়ে সাজানো যেটা খুব সহজেই আপনাকে রূপকথার জগতে নিয়ে চলে যাবে।

নিঃশব্দতা সারা গ্রাম তাকে যেমন নাটকীয় ভাবে ছেয়ে আছে। কিছু হাঁসের কলকাকলি ছাড়া অন্য কিছু আওয়াজ আমাদের তো কানে এলো না।

অনেক এজেন্সি আছে 1 ঘন্টার বোট ট্রিপ করাবে, কিন্তু সেটার থেকে নিজে ছোট্ট একটা বোট ভাড়া করে একঘন্টা বা ঘণ্টা দুই ঘুরে নিন। নিজেকেই চালাতে হবে। ভয় পাবেন না। খুব এ সোজা, Minimum Instruction বোট মালিকই আপনাকে বলে দেবে।

পরিচ্ছন্নতার সুব্যাবস্থাপনা আপনাকে সত্যি মুগ্ধ করবে। বোট নিয়ে ঘোরার সময় আবারও ধন্দ, এই জলছবির মতো জায়গাটা কে মনে ধরবো নাকি ক্যামেরায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

Canal পার্শ্ববর্তী অনেক ছোট ছোট রেস্তোরা আছে, আপনি বোট পার্ক করে অনায়াসে মধ্যাহ্ন ভোজন করে নিতে পারেন(৪০ ইউরো দুজনের জন্য) পুরো গ্রামের মধ্যে একটাই মাত্র সুপার মার্কেট। ওটাই ছিল আমাদের মিটিং পয়েন্ট। ঠিক বিকাল 5 টায় গাইডের কথা মতো মিলিত হলাম সুপার মার্কেটের সামনে। দেড় ঘন্টায় ফিরে এলাম আমস্টারডাম।
পুরো সন্ধে তাই কাটলো নিজেদের মতো করে, lazy evening যাকে বলে আর কি। শেষে ভারতীয় রেস্তোরায় বসে বাঙালির ডাল ভাত দিয়ে শেষ হলো দিন।

শেষ দিনঃ-

পরের দিন ফ্লাইট বিকাল 4.30। তাই সক্কাল (0800hrs) বেলা হোটেলে চেকআউট করে নিলাম, লাগেজ হোটেল কাস্টডিতে রেখে চললাম Den Haag। সমুদ্রসৈকতে একটু ফ্রী time পাস করব বলে। হেগ হলো নেদারল্যান্ডের অন্যতম প্রাচীন শহর। আমস্টারডাম সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে 45 মিনিটের ট্রেন জার্নি করে Den Haag central। স্টেশন লাগোয়া ট্রাম ধরে ২০ মিনিটে সমুদ্রসৈকত। ঘন্টা 2 কাটিয়ে একই রাস্তায় আমস্টারডাম, সহধর্মিনীকে পুত্র সহ এয়ারপোর্ট পাঠিয়ে নিজে গেলাম হোটেল এ bag আনতে। পুনরায় ট্রেনে করে এয়ারপোর্ট।

আনুমানিক খরচঃ-

11 ইউরো তে রিটার্ন ট্রেন টিকেট স্কিফল এয়ারপোর্ট থেকে অ্যামস্টারডাম সেন্ট্রাল
হোটেল – আনুমানিক ১০০ ইউরো/রাত (জুন – জুলাই peak সিজন)
Hop on hop off – 35 ইউরো জনপ্রতি সিটি ট্যুর এর জন্য যার মধ্যে ১ ঘণ্টার canal cruise ধরা আছে।
(কানাল ট্যুর আলাদা করে নিলে ১০-১৫ ইউরো জনপ্রতি)
ডে ট্রিপ Giethoorn – ৯০ ইউরো জনপ্রতি লাঞ্চ ছাড়া এবং কানালের মধ্যে ১ ঘণ্টার বোট ট্রিপ সহ।
আরো কিছু day ট্রিপ আছে আমস্টারডাম থেকে
যেমন Zaanse, volendam, Rotterdam. সবই মোটামুটি ৫০ থেকে ৬০ ইউরো জনপ্রতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *