ঈশ্বর চেতনা ও ধর্মবোধ

শতরূপা বোস রায়

প্রত্যেক মানুষের জীবনে দৈব ভাবনা ও চেতনার বিকাশ ঘটে এক একরকম ভাবে। কখনও সেটি ভক্তের অপার ভক্তি, কখনও বা দুর্বলের মানসিক শক্তি। আবার কখনও  বা অনেক অসহায়তার ফল স্বরূপ অন্ধ বিশ্বাস। বেশির ভাগ পরিবারেই ঈশ্বর ভাবনা বা ভক্তি একটি অভ্যাস। সকাল বেলা স্নান সেরে ঠাকুরকে জল দেওয়া, ঠাকুরের আসন পরিষ্কার করা, ধুপ ধূনো জ্বালানো, সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানো এগুলো প্রতিনিয়ত সাংসারিক কাজের মধ্যে একটি। যে সব বাড়িতে ভক্তের সংখ্যা তুলনায় বেশি, ভক্তির বহিঃপ্রকাশও সে ক্ষেত্রে অনেক প্রবল। ইদানিং ধর্ম নিয়ে বহু তর্কের সৃষ্টি হয়েছে ভারতবর্ষে। যে দেশে কবি সকল ধর্ম বর্ণ, জাতির মানুষকে এই ভারতবর্ষের সাগরতীরে আহ্বান করে গেছেন সেই সর্ব ধর্ম সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মহামানবের ভারতবর্ষে আজ ধর্ম একটি আলোচ্য বিষয়। ভারতের পুরাতন ইতিহাস বা বেদান্তের আঁধারে ধর্ম এবং ঈশ্বরের দুটি একেবারে আলাদা সংজ্ঞা। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী ঈশ্বর জ্ঞান, ঈশ্বর চেতনা আর ধর্মান্ধতা দুটিকে এক করা যায় না কখনও। এ পার্থক্য বিদ্বজনে বুঝলেও সাধারণ মানুষ হয়তো বা আজকাল আর বোঝে না বোঝার চেষ্টাও করেনা । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভক্তির মধ্যে সমর্পনের থেকে ভয় জড়িত থাকে অধিক মাত্রায়। ঈশ্বর বিশ্বাসী মন যে সব ক্ষেত্রে ধর্মভীরু তার কি কোন ব্যাখ্যা সঠিক অর্থে পাওয়া গেছে? অথচ সাধারণের কাছে দুটির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আর ঈশ্বরকে ধর্মের বেড়াজালে আটকে রাখা হয়েছে বলেই হয়তো বা সাধারণ মানুষের কাছে ঈশ্বর আরাধনার অর্থ নির্দিষ্ট কোন ধর্ম পালন? 

একবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমের সমুদ্রপারে বসে এই অটোমোশনের যুগে, যেখানে ঈশ্বর একটি কনসেপ্ট মাত্র সেখানে এই রকম একটি বিষয় নিয়ে লিখতে বসার সময় বার বার মনে হয়েছে ধর্মালোচনার প্রসঙ্গটাই স্থানোপযোগী বা যুগোপযোগী নয়। অথচ আমাদের দেশে ধর্মানুসরণ এখনও বিভেদ তৈরী করে, মানুষের পরিচয় এখনও হিন্দু বা মুসলমান ধর্ম নির্দিষ্টি করে. মানবিকতা আর মনুষ্যত্বের পরিচয় মানুষের জন্য এই একবিংশ শতকেও যথেষ্ট নয়। ভাবতে অবাক লাগে, আজও সব ধর্মের ওপরে মানুষের শ্রেষ্ঠ আসন প্রতিষ্ঠা করার মতো মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। ভয় হয়, ইতিহাসের কোন স্তরে আমরা আজ দাঁড়িয়ে? আমাদের এই পথচলার গতিটা উর্ধগতি না নিম্নগামী? 
আমরা জন্মাবধি হিন্দু। বৈষ্ণবভাবাপন্ন, ধার্মিক, আচার বিচার, শ্রদ্ধা, ধ্যান, ঈশ্বর চিন্তা, গীতা পাঠ, গঙ্গা জল, তুলসী পাতা,গঙ্গা মাটি এই সব কিছু নিয়েই আমাদের নৈমিত্তিক পথ চলা। তবুও আমাদের বাড়িতে  নিত্য প্রার্থনার জন্য আড়ম্বর বিহীন পূজোর আয়োজনই যথেষ্ট ছিল। ঠাকুর দেবতা নিয়ে আমাদের পরিবারে বিশ্বাস আর সমর্পন, সৎ পথে থাকা, পরের উপকার করা ব্যাতিত অন্য কোন আড়ম্বর বা সংস্কার কখনও দেখিনি। নেদারল্যাণ্ডসে আসার পর থেকে পূজো সন্ধ্যাবাতি এগুলো থেকে অনেকটাই দূরে চলে এসেছি। ছোটবেলা থেকে শাক্ত আর বৈষ্ণব একাকার হয়েছিল মনের মধ্যে। অন্য ধর্মের বন্ধুদের খাতিরে গির্জা, মসজিদ, মন্দির আলাদা করে ভাবিনি কখনও। পরিবারের ধর্ম পালন করে এসেছি চিরকাল। সবাইকে সমান, অন্তত ধর্মের খাতিরে বিভেদ বিভাজন চোখের ওপরে দেখিনি কোনদিনও। 

নেদারল্যান্ডের আনাচে কানাচে অনেক মন্দির আছে. শ্বেত পাথরের নির্মিত মন্দির, শ্বেত পাথরের বিগ্রহ। রাম, সীতা, গণেশ, রাধা কৃষ্ণ হীরের গয়নায়, লাল সিল্কের আর জরির পোষাকের বিগ্রহ দেখলে জৌলুসে আপনিই নিজের ধর্মের প্রতি একটি আকর্ষণ জন্মায়। কিন্তু সে আকর্ষণ সম্পূর্ণ আলাদা। তাতে অন্তরের ভক্তির রেশ মাত্র নেই. ধর্মানুসন্ধানী মন, ধর্মের প্রচারে হয়ত বা শান্তি পায় সে আড়ম্বরে কিন্তু ঈশ্বর বিশ্বাসী মনে ভক্তির সঞ্চার হয়না। বার বার মনে হয় সত্যি তো “সারাটা দুনিয়া দেবালয় যার”, এই জৌলুসের মধ্যে তাঁকে বন্দী করে রেখে সত্যি তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা সম্ভব? 
এদেশে থাকতে থাকতে ধর্ম এবং ঈশ্বর সম্পর্কে একটা অদ্ভুত ধারণা তৈরী হয়েছে। ধর্ম আসলে কি ? আমাদের মূর্তি পূজো নাকি এদের সানডে মাস (Sunday mass), নাকি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া। বাস্তবকে মেনে নেওয়ার জন্য শক্তির দরকার হয়। ধর্ম চিন্তা, ধার্মিক প্রথাপালন, ধর্মজ্ঞান হয়তো বা সে শক্তি প্রদান করে। জীবনের একটা পথ সুনির্দিষ্ট করে। বিশ্বাসের পথ অবলম্বনের পথ। দৃষ্টান্তের পথ। একটা সংযম আনে জীবনে। ধর্ম আমাদের বাইরের জগতের কোলাহল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের অন্তরের সঙ্গে পরিচয় করায়। আর ঈশ্বর কি করেন? ঈশ্বরজ্ঞানে অন্তর্জ্ঞানও বৃদ্ধি পায়। নিজেকে জানার বা চেনার মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি তা থেকেই হয়তো বা নিজের মধ্যে মানব রূপী সত্ত্বাটাকে জাগিয়ে তোলার শক্তি আহরণ করা যায়। ঈশ্বর সাধনা কোনো ঐশ্বরিক অপার্থিবকে পাওয়ার জন্য না। ঈশ্বর জ্ঞান মানুষের সেবায় ঈশ্বর লাভ। ঈশ্বর জ্ঞান আসলে নিজের সঙ্গে নিজের পরিচয়। ঈশ্বর প্রাপ্তি হলো নিজেকে জাগতিক সকল বন্ধন থেকে মুক্ত করা. ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে সে মুক্তি আসবে কোথা থেকে? আর নিজেকে চেনার বা জানার প্রধান সোপান হলো মানব বোধ আর মনুষত্ববোধ। 
এদেশের মাটিতে ঈশ্বরের প্রকাশ ধুপ ধুনোয় নয়। ধর্মপ্রচারে নয়। এখানে ঈশ্বর প্রকট হন মানুষের মাঝে। প্রাত্যহিক জীবনের আলো আঁধারির খেলায় ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে যখন  নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে নির্জন কোনো জায়গায় গিয়ে বসি, সমস্ত জটিলতা থেকে নিজেকে বের করে এনে নিস্তব্ধতায় নিজের মনের কথা কানে ভেসে আসে তখন. ঠিক বেঠিক ন্যায় অন্যায় বিচার করবার আমি তো কেউ না। আমি তো শুধু নিজের কর্মের জন্য এই ভাবে পৃথিবীর এই প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে নিজেকে জানতে পেরে, দৈনন্দিনের সঙ্গে আপোষ করে অন্তরের শব্দ শুনি কান পেতে। সে আমায় মন্দ ভালোর কথা বোঝায়। বলে ক্ষমা পরম ধর্ম। বলে সহ্য করো।  বিশালত্বের মাঝে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার যখন জীবনকে আলিঙ্গন করি সব ভুলে, গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে ওঠে। আমার ঈশ্বর জ্ঞান হয়তো বা খুব স্থুল । আমি ধর্ম প্রাণও  নই।  আমি আচার বিচার মানি না। আমার মধ্যে হিন্দুত্বের বহিঃপ্রকাশ ঠিক কতখানি আমি তাও জানি না. তবে নিজের সঙ্গে জীবনের এই যুদ্ধে জিতে কোথায় যেন তার পরশ আসে। কখন কোথায় কিভাবে তা বলতে পারিনা। 
আমাদের দেশের মনীষীদের কথা গুলো আজ কত সহজে আমরা ভুলতে বসেছি। কত সহজ কথায়  ওনারা কত গভীর কথা বলে গেছেন। অথচ সেই সৌভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে মেতে উঠেছি কোন বিনাশের খেলায় আমি জানিনা। আত্মবলিদানে যে ঈশ্বর যে চেতনা জাগ্রত হয় তা ধর্মের নামে আত্মপ্রচারে হয়না, মানুষের মঙ্গলকামনায় সৌভ্রাতৃত্বের পথে মানুষকে পাশে পাওয়া যায়, আত্মার তৃপ্তি লাভ হয়, ধর্মানুসরণ করে, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে সেই মন্দ রূপী ঈশ্বর কি জাগ্রত হন? ঈশ্বর জ্ঞান অকৃপণ ভালোবাসায়, অগাধ বিশ্বাসে, অটল ভক্তিতে তার সঙ্গে ধর্মের কোথাও কোন মিল নেই। আমি আজ গ্লোবাল সিটিজেন। নানা জাতি, নানা পরিধান, নানা ধর্ম, নানা বর্ণের মাঝে আমার পরিচয় আমি আরেকজন মানুষ, আরেকজন নারী। আর আমার ঈশ্বর আমার অন্তরের বিশ্বাস, আমার ধর্মপালন নয়। কারণ আজ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি ছোটবেলায় শেখা সেই কথাগুলো, ঈশ্বর সর্বত্র। তাকে কোনো ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। মানুষের ধর্ম, মানুষের সেবায় — ঈশ্বর প্রাপ্তির মূল কেন্দ্র বিন্দু। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *