আমার টিয়া

শেলী নন্দী

ফার্স্টক্রাই থেকে শপিং সেরে এবার সোজা বাড়ী। গাড়ীটা পার্ক করা বেশ খানিকটা দূরে। বাড়ীতে রিমো আয়ার জিম্মায়। স্কুল থেকে ফিরে গেছে এতক্ষন।

ফোনটা বার করে বাবার খোঁজটা নিয়ে নিল মিতি। পরশু ডক্টর অ্যাপয়ৈন্টমেন্ট। যেতে হবে সঙ্গে।
নভেম্বরের ১৫ আজ তবুও শীতের মৃদুতা প্রকৃতির কোল জুড়ে।
কাজের আর শেষ নেই। নিজের জন্য একটু সময় পেয়েছে মিতি। যন্ত্রমানব হয়ে গেছে আজকাল সে। ছেলে বর নিয়ে ন বছরের দাম্পত্য। সংসার সমুদ্রে জীবনের সাঁতার যেন।

চৌমাথার বাদিকের রাস্তাটায় তখন পড়ন্ত দুপুরের আলো মাখা মানুষজন। রাসের মেলা বসে তারই দুপাশে। পসরা সাজো সাজো রবে সেজে উঠছে। জিলিপির দোকানদার তরিজুত করে জিবেগজা সাজাচ্ছে সারি সারি,পাশে হলুদ নিমকির ভিড়। মিতি এগোতে থাকে আর পিছোতে থাকে তার বয়স।

ছেলেবেলার সেই অভাব অভাব ছোপ মেশানো মফঃস্বলী জীবন। দিদির সাথে মেলায় গিয়ে জল বেলুন আর বাদাম ভাজা।
এখন পরিবর্তনের শিশির ভেজা উচ্চ মধ্যবিত্তের তকমা আঁটা জীবন।

উইকেন্ডে গাড়ী করে সিসিটু,মাল্টিপ্লেক্সে মুভি,প্যান্টালুন্সে শপিং আর দামী রেস্তোরাঁর বাতানুকূলে চাইনিজ বা কন্টিনেন্টালেও জীবনের জড়তা।

বাবার সাইকেল চেপে পার্কের মাঠ,ফেরার পথে মন্টুকাকুর দোকানের ফুলুরিরা আজ হারিয়ে গেছে। মায়ের হাতের আলুমাখায় বাগানের লংকা মাখার গন্ধটাও উধাও। পুজোর সময় বরাদ্দ মোগলাই পরোটা আর তার সাথে টকটক আলুর দম কত্তদিন খায়না মিতি।

প্রাচুর্যের প্রবেশ ঘটেছে দৈনন্দিন জীবনের সড়ক পথে কিন্তু গলিঘুজি গুলো ভালোলাগার ওম আর পায় না।
সব থেকেও কি যেন নেই। মিতির ঘড়িতে চারটে কুড়ি। আরো কিছুক্ষণ মেলাটায় এক পাঁক মারাই যায়। অর্ণব ফোন করবে না এখন। মিটিং আর অফিসের কঠোর চাপে বউ এর খোঁজ বড় একটা সে নেয়না।

কাচের কাপ প্লেটের দোকানটা সবে খুললো। স্তূপ করে রাখা নানাবিধ কাপগুলো বিক্রীর অপেক্ষায়। পছন্দসই একডজন কাপ কিনলো মিতি। এরপর চোখ আটকালো হরেক মালের দোকানটায়। ‘যা নেবেন দশ’ করে চেঁচাচ্ছে বাচ্চাটা। একটা চাবির রিং কিনলো মিতি—ছোট্ট কিন্তু বেশ সুন্দর।

খুশীর একটা হালকা আস্তরণ মিতির চোখেমুখে। একটু একটু করে ফিরে পাচ্ছে নিজেকে। আচার আর পাঁপড়ের দোকান থেকেও কিনলো বেশ কিছু জিনিস। রিমোর জন্য একটা খেলনা বন্দুক আর তীর ধনুক।
কয়েকটা বেশ সস্তার চটের ব্যাগ, ত্রিশ টাকার কানের দুল, ঘর সাজানোর জন্য চিনেমাটির ফুলদানি আরো অনেক কিছু।

কত্তদিন পর মিতি এমন স্বাধীন সুখে সস্তা শপিং করছে—নো ক্রেডিটকার্ড,নো ডেবিট কার্ড।

নাঃ আর নয় এবার ফিরতে হবে। সন্ধ্যা নেমেছে শহরের বুকে। ঠান্ডার আমেজ মেশানো তিরতিরে একটা হাওয়ায় শিহরিত আজ মিতি। মেলার বাইরে রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একজন বুড়োলোক। হাতে একটা লাঠি আর লাঠির চারদিকে বেশ কতগুলো সবুজ টিয়া। ভারী সুন্দর দেখতে তারা লাল ঠোঁট আর পেটে চাপ দিলে প্যাঁ প্যাঁ আওয়াজ ও করে।
—কত করে পাখিগুলো?
—দশ।
বুড়ো লোকটার পরনে খাটো ধুতি, গায়ে আধময়লা একটা জামা আর ছেঁড়া মাফলারে গলা আষ্টেপৃষ্টে জড়ানো। চোখগুলো কেমন ঘোলাটে।

দারিদ্র্যের স্পষ্ট ছাপ তার চেহারার আনাচে কানাচে। দশ টাকার টিয়া পাখি গুলো খু উ উ উব সস্তা লাগলো মিতির কাছে।

আটতলার তেরোশো স্কোয়ার ফিটের ব্যালকনিতে রয়েছে বেতের চেয়ার টেবিল আর অনেক ফুলের গাছ। দামী উইন্ডচাইম আর সুন্দর লাইট সেট। দুটো টিয়াপাখি বেশ মানাবে ওখানে।
—আমায় দুটো দিন।
খুচরো নেই। একটা একশো টাকার নোট দিল মিতি বুড়ো লোকটাকে।
কাশতে কাশতে লোকটা বললো
খুচরো দাও মা। সবে বৌনি কল্লাম গো।
—খুচরোতো নেই মোটেই।
বুড়ো লোকটা মনযোগ দিয়ে খুচরো খুঁজছে।
—আপনি রাখুন টাকাটা।
ফেরত দিতে হবে না।
—আরো আট টা নিয়ে যাও তালে।
না না। অতগুলো নিয়ে কী করবো?

মিতি পা চালায় গন্তব্যে। পেছনে তাকায় না আর। তার গাড়ীটা রাস্তার আলো গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে বেশ। মনখারাপের দরজা ঠেলে টিয়া পাখিদুটো মিতির ব্যালকনির অপেক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *