ইমিগ্রেশন, আমেরিকা ও দুর্গাপূজা

অর্ক ভট্টাচার্য

আমেরিকার ইমিগ্রেশনের সমস্যা নতুন নয়। টপকে আসাদের নিয়ে আদিখ্যেতা যেকোনো দেশের মতোই আমেরিকারও রাজনৈতিক নৈতিকতা। আমরা যারা বোরিং গ্রিন চ্যানেল দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপ মেপে মেপে এগোচ্ছি , তাদের শোনার জন্য কোনো মানুষ বা রাজনৈতিক পার্টি বসে নেই। আমরা হলাম মধ্যবিত্ত ইমিগ্র্যান্ট। উচ্চবিত্তরা আসে “একটু দেখে নিস ” এর হাত ধরে। নিম্নবিত্তরা আসে  “যা বলবেন করবো ” সহ্য করে।  আর এই মধ্যবিত্ত ইম্মিগ্র্যান্টরা মানে আমরা এখানে আসি, পোষানোর চেষ্টা করি , না পোষালে কেটে পড়ি। অনেকেই যদিও কেটে পড়ার বদলে কেটে যায়। সেই দুর্ভাগাদের কথা থাক। 

আমরা যেহেতু মধ্যবিত্ত ইমিগ্র্যান্ট তাই আমরা সবথেকে বেশি আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করি। দুর্গাপূজা যেহেতু বাঙালির বাঙালিয়ানার বা মানসিকতার এক ক্রীড়াভূমি বা রঙ্গমঞ্চ , তাই এই একটিমাত্র উৎসবেই সামগ্রিক দ্বন্দ্ব প্রস্ফুটিত হয়।   

প্রথমে একটু ছোট করে বলি আমেরিকার বারোয়ারী দুর্গাপূজা ঠিক কেমন হয়। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তবে বেশিরভাগ দুর্গাপূজা একটা ছাঁচে ফেলা, তার মূলেও সেই ইম্মিগ্রেশান।  এদেশে বেশ কিছুদিন ধরে বাস করতে থাকা বাঙালিদের ঠেকের মধ্যেই উদয় হয় কিছু উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের যারা সংগঠনপ্রিয় ও হুজুকে। এদের উদ্যোগেই শুরু হয় দুর্গাপূজা। এদের সাথে তাল মেলায় কিছু আমুদে ও পরিশ্রমী মানুষ। অনেক কষ্টে একটা মূর্তি জোগাড় করা হয়। আর সেই মূর্তিই বছর বছর পূজা হয়ে কারো বেসমেন্টে  সারা বছর প্যাকেটবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। ভাসান হয়না কখনো। সেই মূর্তি বেসমেন্ট থেকে বেরিয়ে স্থান পায় কোনো না কোনো স্কুল বা ব্যাঙ্কোয়েট হলে। সেখানেই কোনো একটা উইকেন্ড দেখে ( কখনো দেশের পূজার আগে বা কখনো দেশের পূজার পরে ) অকালবোধনের আভিধানিক অর্থের পূর্ণ ব্যবহার করে এই পূজা সম্পন্ন হয়।

পূজার আয়োজনের যে কি হাজার ঝক্কি তা হয়তো অনেকেই জানেন বা জানেন না । একে জটিল , তার সাথে মার্কিন নিয়মের প্রাচুর্য্য এসে বিশ্রী ভাবে জল আরো ঘুলিয়ে দেয়। সে জটিলতা নিয়ে না হয় পরে লিখবো। এটুকু বলতে পারি , যারা আয়োজন করে তারা নমস্য।

এবার ঢুকে যাই আমাদের টপিকে। ইমিগ্রেশন কি করে দুর্গাপূজায় রাজ করে। প্রথমত বুঝতে হবে পূজো কারা করে?  যারা এখানে স্থায়ী। ইমিগ্র্যান্ট ছিলেন কিন্তু এখন ন্যাচারালাইজড আমেরিকান সিটিজেন। মানে হঠাৎ করে ভিসা রিজেকশানের দশ দিনের মধ্যে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরে যেতে হবে না। লনওয়ালা পেল্লাই বাড়ির ই এম আই এর সমান ভাড়া দিয়ে ছোট্ট এপার্টমেন্ট এ যাদের থাকতে হয় না। যাদের বেসমেন্টে দূর্গা প্রতিমা রাখার পরও অনেক জায়গা পরে থাকে। অবশ্যই সদিচ্ছা থাকতে হবে , কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই সবার উপায় তো নেই। এই মানুষগুলোর আছে। এরা ইমিগ্রেশনের যুদ্ধ পেরিয়ে এখন ডট গুলো কানেক্ট করতে মন দিয়েছেন। এদের চিনবেন কি করে? এরা পূজার জোগাড় করেন। মাইক মোটামুটি এদের হাতেই থাকে। মহিলারা গরদ ও পুরুষরা খাদিতে থাকেন। সবার সাথে কথা বলেন এবং প্রচন্ড ব্যস্ততা দেখান, কারণ পূজা এনাদেরই।

দূর্গাপূজায় কারা যায়? তিনটে ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ফেলা যায় দর্শকদের । প্রথম , যারা সদ্য এসেছে , এবং পূজায় দেশে ফেরার ছুটি পায়নি , বা গেলে ফিরতে পারবে না এই ভয়ে বুকে পাথর চেপে সেজেগুজে এসে বসে পড়েছে । এদের না আছে চুলো , না আছে চাল। আজ এই রাজ্যে , কাল ওই রাজ্যে কোম্পানি নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে  । কখনো এইচ ওয়ান কখনো এল ওয়ান। এরা প্রত্যেক পূজা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে কাটায়।  পুজোর মণ্ডপে গিয়ে কিছুটা চেনা ঠাকুরের মুখ ছাড়া আর বিশেষ কিছু চিনতে পারেনা । এদের চিনবেন কি করে?  প্রথমত কলকাতায় চলা ফ্যাশন আর এখানে চলা ফ্যাশনে অন্তত এক বছর কি দু বছরের ফারাক। ব্যতিক্রম নিউ জার্সি , ওটা আমেরিকা অধিকৃত ভারতেরই এক রাজ্য ।  ওদের পূজা ছাড়া অন্য পূজায় যাদের দেখবেন এবারের পূজাবার্ষিকীর বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো ড্রেস করেছে তাদের বেশির ভাগ নতুন। এদের চাউনি ভীরু , আর মনে কাকুতি , “একবার কেও ডাকুক”। বেশ কনফিউসড লুক নিয়ে এরা মণ্ডপের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। কারণ মূর্তির সাথে থাকাটাই তাদের ফেমাস করে। এরা ফেসবুকে লাইভ হন। এবং “বিন দেয়ার ডান দ্যাট ” পোস্ট দেন। এরা প্রত্যেক পূজা ভিন্ন রাজ্যে কাটানোর জন্য একাধারে জ্ঞানী ও বিরক্ত।  আর তাই ফুটে ওঠে এঁদের একাকীত্বে।    

দ্বিতীয় ক্যাটাগরি হলো বেশ কিছুদিন ভিসাতে আছেন আর সদ্য গ্রিনকার্ড এপ্ল্যাই করেছেন। এখন শুধুই অপেক্ষা । এরা হলেন দরকাঁচা। না সিটিজেন , না নব্য ভিসা-ত। এরা ভাগ্যক্রমে এক জায়গায় বেশ কিছুদিন হলো আছেন। বাচ্চা কাচ্চারা স্কুলে পড়াশোনা করে। বাড়ি-টারি কেনার জন্য দেখা শুরু করছেন।  মোটামুটি ছোটোখাটো একটা গোষ্ঠী আছে। এরা ছোটো ছোটো দলে আসেন। দলের লোকেরা একে অপরকে অনেকাংশেই চেনে না। কারণ প্রথম ক্যাটাগরির লোকেদের নিয়েই এই দল তৈরী হয়। তাই প্রতিবছর এই দলের লোকজন পাল্টাতে থাকে। এরা নিজেদের মধ্যেই মশগুল থাকে। এখনো অনলাইনে শাড়ি কেনেন না। কিন্তু কিনবেন কিনবেন করছেন। মাঝে মাঝে পূজা দেন ও ব্যাকগ্রাউন্ডে ঠাকুর নিয়ে আর গ্রূপে ফটো তুলতে পছন্দ করেন।

আর তৃতীয় ক্যাটাগরি হলো গ্রিন কার্ড হোল্ডার। এখন অপেক্ষা সিটিজেনশিপ পাওয়ার। এঁদের প্রতি বছর একই গোষ্ঠীতে পাওয়া যায়। এদের পোশাকে প্রচন্ড ভারী গয়না ও দামি শাড়ির (ডিজাইনার , আমি ভাবি বাকিরা কি থান পরে ? ) প্রকাশ থাকে। সেলফির চূড়ান্ত চলতে থাকে। ঠাকুর তো একই , তাই ঠাকুর মোটামুটি ছবি থেকে বাদ যায়। নানা দেওয়ালে , নানা অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তোলাতে এদের আনন্দ। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত পূজা মণ্ডপে এদের দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন পোশাকে। বিকালের অনুষ্ঠানে লোকাল শিল্পীদের বেশিরভাগ এনারাই হন। পূজায় সবথেকে বেশি আনন্দ করতে যাদের দেখা যাবে তারাই এই ক্যাটাগরিতে পড়েন। এদের চেনা বিশেষ কষ্টকর না।

হাঁ , হাঁ করে তেড়ে আসবেন না। আগেই বলেছি সব কিছুর ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু এটা পরিষ্কার, যে নতুন আসা মানুষগুলো সত্যিই খুব একা। তাদের কেউ খেলতে নেয় না। তার কারণ আর কিছুই না , মানুষ দল বাঁধতে চায়। কিন্তু দলের লোক যদি ক্রমাগত দল পরিবর্তন করে তাহলে দল টিকবে কি করে। তাই ঠিক মিছরির দানা যেরকম রসের মধ্যে চিনিকেই চেনে, ঠিক তেমনই তারাই জোট বাঁধে যারা থাকে এবং থাকবে । দলে থেকে কেউ ছেড়ে চলে গেলে কষ্ট হয়। দল ভেঙে গেলে আরো কষ্ট। তাই যতদিন না কোনো স্থায়ীত্ব আসে,  ততদিন মানুষগুলো আটকে থাকে মোবাইলে , ফেসবুকে , আর পূজাবার্ষিকী তে।

ইমিগ্রেশন সে যেমনিই হোক না কেন , তা বেদনাদায়ক। সেই বেদনা পূজামণ্ডপে ফুঁড়ে ফুঁড়ে বেরোয়। প্রতিটা মুহূর্তে বাড়ির কথা মনে পরে। প্যান্ডেল মনে পরে। প্যান্ডেল হপিং মনে পরে। আর সেই নিয়েই চলতে থাকে কথোপকথন। সিটিজেন রা গ্রিন কার্ড দের জিজ্ঞাসা করে , ” এখানেই তাহলে পাকাপাকি তো ? ” গ্রিন কার্ড রা ভিসা হোল্ডার দের জিজ্ঞেস করে , “সামনের বছর থাকবি তো ? ” আর ভিসা হোল্ডাররা বাড়িতে ফোন করে জিজ্ঞেস করে , ” মা , কেমন কাটাচ্ছ পূজা ?”

2 thoughts on “ইমিগ্রেশন, আমেরিকা ও দুর্গাপূজা

  • September 30, 2019 at 11:11 pm
    Permalink

    khub shotti kichhu kotha puro nijer experience diye lekha bojha jachhe. Oshadharon!

    Reply
  • October 10, 2019 at 1:55 pm
    Permalink

    খুব ভালো লাগলো এই লেখাটা প​ড়ে। একটা অন্য আঙ্গিক​, একটা অন্য স্বাদ পেলাম​। নেদারল্যান্ডসে যদিও তিথি মেনে পুজো হ​য়​, কিন্তু অনেক সাদৃশ্য পেলাম​।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *