গ্যালিলিও

অঙ্কুশ

‘রিভার্স পেরেন্টিং-এখানে যত্নসহকারে মা-বাবাকে শিক্ষা দিয়ে মানুষ করে তোলা হয়।’

-সুকান্ত হোয়াট ইজ দিস?

বুধবার সকালের শিফটে অপূর্বর ম্যাথস পড়ানো থাকে। সন্ধ্যাবেলা সুকান্তর ফিজিক্স। অবশ্য সব ক্লাসই হয় ওদের ফ্ল্যাটের গ্রাউন্ড ফ্লোরে এই মিনি-ক্লাসটায়। অপূর্ব ম্যাথস,ও ফিজিক্স,অনিরুদ্ধ লাইফ সায়েন্স,সুচেতা আর্টস গ্রুপ। কলেজ শেষের পর চাকরীর প্রিপারেশনের পাশাপাশি চারজন মিলে কোচিং সেন্টারটা খুলেছে বছর দুই হলো। মাধ্যমিকের জন্য সব সাবজেক্টের কমপ্লিট প্যাকেজ। এক একটা ব্যাচে পঁচিশ জন। যত্ন দিয়েই পড়ায় ওরা।

সকালবেলা তাই একটু বেশিই বিছানায় গড়িয়ে কোচিংয়ে আসতেই অপূর্ব প্রশ্নটা ছুড়লো। বেশ কড়া সুরেই।

-এসব কী সুকান্ত? কীসব লিখছিস ফেসবুকে? জানিসনা এখন ম্যাক্সিমাম স্টুডেন্টের মা-বাবা ফেসবুকে? রাত থেকে অনেককটা ফোন এসেছে এ নিয়ে

-হুম আমারও এসেছে।

-তো কেনো লিখেছিস এসব যা ইচ্ছে তাই?

-ইচ্ছে হয়েছে, লিখেছি।

ব্যাপারটা হালকা করার চেষ্টা করে সুকান্ত। অপূর্বর সুর যদিও চড়ে যায় আরও।

-ইচ্ছে হয়েছে মানে? এখন কী আমরা সেই কলেজে আছি, যে ইচ্ছে হলো আর লিখে ফেললাম?

অফিসিয়াল গ্রুপ আছে। এতো ছাত্র। তাদের মা-বাবা। ভেবে লিখবি না?

এবার রাগ চড়ে সুকান্তর।

-কী ভেবে লিখবো? ভুল কী লিখেছি?

-মা-বাবাকে শিক্ষা দেওয়া? মানে?

-হ্যাঁ, দুবছর পড়িয়ে যা বুঝলাম,তাতে এটা খুব ক্লিয়ার যে বাচ্চাগুলোর যতটা না শিক্ষার দরকার আছে, মা-বাবার দরকার অনেক বেশী

দে আর ফাকিং সো ক্রেজি!

বাচ্চারা তো মাটি-বৃষ্টি-জীবন যা পারে সেখান থেকে শিখে নেয়। মা-বাবারা? শ্বাস ফেলার জন্যও পারমিশন নিতে হয় এদের। নিজের কাছে ভ্যালুই গড়ে ওঠেনি মা-বাবা এতো অপ্রেস ফিল করানোয়।

বাচ্চাগুলো কী প্রোডাক্ট? না বিসনেস চলছে? আমি টাকা দিচ্ছি,তুমি র‍্যাঙ্ক দাও। ফার্স্ট হও। সেকেন্ড হয়েছো কী,গেছো! আরও নম্বর…আরোও..তবেই না আমি গেট টুগেদারগুলোই নিজের বড়াই করে গর্ব করতে পারবো!

দে আর নট গিভিং এনি চান্স টু ডু মিসটেক। একটা ভুল করার সুযোগ নেই এদের। ভুল না করলে ঠিক বুঝবে কীকরে? সাইকেল চালাতে গিয়ে হাত না কাটলে তাবে না শিখবে সাইকেল!

দে আর ম্যাড,অপূর্ব। কিছু শুনবে না,বুঝবে না,নিজেও ছুটবে,বাচ্চাগুলোকেও মেশিন বানাবে। বাচ্চাগুলো শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায়না ভাই…

খুব কষ্ট হয় দেখে। কেমন শৈশব এটা? আমরা কী দিচ্ছি নেক্সট জেনারেশনকে?

-তো? কী করবি? তুই একা চেঞ্জ আনতে পারবি?

-নাহ,একদমই না। মা-বাবা চেঞ্জ না হলে বাচ্চা কখনো চেঞ্জ হবেনা। মা-বাবারই সবচেয়ে বেশী শিক্ষাটা দরকার ভাই।

-আর আমাদের কোচিংট হোয়াটসঅ্যাপ দেখেছিস? মা-বাবারা রীতিমতো ক্ষেপে গেছে। এখন কী করবি? এসব বক্তৃতা দিবি? ওরা শুনবে?

অনেক কষ্ট করে কোচিংটা একটু দাঁড়িয়েছে। হাতে টাকা আসছে। এটা নিয়ে কতো স্বপ্ন আমাদের…

-সব জানি রে। কিন্তু সব জেনেও এই সিস্টেমটা পার্ট হতে….

-খুব হিরো হওয়ার শখ জেগেছে না তোর? বিদ্যাসাগর? সমাজ পাল্টাবি?

-না ভাই,হিরো কীনা জানিনা,শুধু এমন কেউ হতে চাই যে হিরো আসার জন্য অপেক্ষা না করে…

-পাগলের মতো কথা বলছিস সুকান্ত তুই। খুব প্সতাতে হবে কিন্তু,এখনই ব্যবস্থা না নিলে….

-আয় তোকে একটা গল্প বলি

-ইয়ে,কী মজা। কীসের গল্প বাবা?

-গ্যালিলিওর

-গ্যালিলিও? ঐ যে দূরবীন আবিস্কার করেছিলো?

-হ্যাঁ,একদম ঠিক ধরেছিস। তার গল্প।

তো বাড়ির চাপে তিনি ডাক্তারী পড়তে ঢুকলেন। মন লাগেনা একেবারে। ভালো তো বাসতেন অঙ্ক আর মহাকাশবিজ্ঞান। ডাক্তারী ছেড়ে দিলেন। টুকটাক কাজ করতে লাগলেন আর ডুবে গেলেন গবেষনায়। আতসকাঁচ দিয়ে দূরবীন বানালেন।

তখন সবার বিশ্বাস ছিলো,সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে। তিনি নিজচোখে দূরবীনে দেখে বললেন এটা ভুল। সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরেনা,পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

চারিদিকে হইচই পড়ে গেলো। খ্যাতি আসলো।

কিন্তু ধর্মযাজকরা গেলেন রেগে। এটা তো বাইবেলের বিরোধী। বাইবেলকে অমান্য করার সাহস পায় কোথা থেকে?

তিনি চালিয়ে গেলেন গবেষনা। যুক্তিবাদী মন ভাঙতে লাগলো বছরের পর বছর ধরে সমাজের হাড়ে বসে যাওয়া ভ্রান্ত ধারনাগুলো…

ধর্মযাজকরা এনার গেলেন তুমুল ক্ষেপে। পোপকে ওরা নিজের মতো করে সব বললো।

পোপ বন্দী করার আদেশ দিলেন গ্যালিলিওকে। শেষবছরগুলো তার কেটেছে কারাবাসেই,প্রচন্ড কষ্টের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে চাপে পড়ে বিবৃতি দিতে বাধ্য হলেন যে তিনি মানসিক রোগে ভোগেন। এসব উৎকট চিন্তা তারই ফসল। তার গবেষনালব্ধ ফলগুলো তাই ভ্রান্ত ধারনা ছাড়া কিছু নয়।

-কিন্তু তিনি তো ঠিকই বলেছিলেন। পৃথিবীই তো সূর্যের চারিদিকে ঘোরে

-এটা বুঝতে আমাদের কতো বছর লাগলো। সহজ সত্যি গুলো যে কেনো মেনে নিতে পারিনা আমরা…

অতসীর আওয়াজ আসে পাশের ঘর থেকে।

শুনছো,অপূর্ব ফোন করেছে। খুব আর্জেন্ট নাকী,নাও ফোনটা নিয়ে যাও…

শীতের রাত। অমাবস্যা।

ফ্ল্যাটের ছাদটায় চুপ করে বসে থাকে সুকান্ত। ফেসবুকে লেখাটা কমপ্লিট। করে দেবে পোষ্ট?

‘আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ঐদিন আবেগের বশে বেশী কিছু না ভেবে মজা করতে গিয়ে ওরকম লিখেছিলাম। সিরিয়াস কিছু নয়। ক্ষমা করবেন। শুভরাত্রি।’

করে দেয় পোষ্ট। গত সাতদিনে অন্তত দশজন ছাত্রের মা-বাবা এসে ঝামেলা করে গেছে,ফোনে অভিযোগ অনেকের। সাজানো জিনিসটাই ভেঙে যেতে বসেছে…

নেট অফ করে ফোনটা রেখে দেয় পাশে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আকাশের তারাগুলো জুড়লে গ্যালিলিওর মুখ মনে হচ্ছেনা? হ্যাঁ তাইতো!

গ্যালিলিও হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। পরিহাস করছে,এটুকু সাহস করতে পারলিনা? আর মুখে এতো ভাষন দিস? কাজের বেলায় লবডঙ্কা?!

নিরাশ লাগে সুকান্তর। আবার তাকায়। না গ্যালিলিও হাসছে না। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সুকান্তও হাত বাড়িয়ে দেয়। গ্যালিলিও,তুমি তো গুরু আমার..শক্তি দাও একটুখানি…

যাহ,কোথায় হাত! কোথায় গ্যালিলিও! কটা তারা টিমটিম করিছে শুধু। নাহলে তো অন্ধকার সব। গাঢ় অন্ধকার…

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুকান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *