ফেক প্রোফাইল – ২

অঙ্কুশ

-হাই
-হ্যালো
-একটা কাজ করে দিতে হবে আপনাকে
-হ্যাঁ বলুন
-একটা গল্প লিখে দিতে হবে
-কিন্ত,আমার তো…
-টাকা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবেনা। আপনার যা চার্জ সব দেবো।
-বেশ। কি নিয়ে গল্প? খুলে বলুন একটু।

একটা মেয়ে। হিন্দু বনেদী বাড়ির। প্রেমে পড়ে একটা মুসলিম ছেলের। বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করে। দু-পক্ষের বাড়িই সেটা মেনে নেয়না।

ওরা দুজনে মিলে একটা ছোট্ট বাড়ী ভাড়া নেয়,সেটাকেই স্বর্গ বানায়। দুজন মিলে অনেক পরিশ্রম করে। টাকা হয়। বড়ো বাড়ী হয়।

যখন সব কিছু ঠিক হওয়া শুরু হয়েছে,তখনই ছেলেটা মেয়েটাকে ছেড়ে চলে যায়। অনেক ফিরতে বলেছি,কিছুতেই সে ফিরবেনা।

এটাই গল্প। গল্পটা পুরো করুন। আমি শেষটা জানতে চাই।

চ্যাট লেখা শেষ হয়। অনন্ত প্রোফাইলটা চেক করে একবার। মাঝবয়সী একজন মহিলা। একজন সুপুরুষের সঙ্গে প্রচুর ছবি রয়েছে। কিন্তু শেষ ছবি আট মাস আগে। তারপরে আর কোনো ছবি নেই।

রাতে গল্পটা নিয়ে বসে অনন্ত। কী কী হতে পারে? কেনো সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে হঠাৎ নেই হয়ে গেলেন ভদ্রলোক? যদি নাই পোষাতো তো এতো খেটে, এতো লড়াই করে সব গড়লেনই বা কেনো?

আচ্ছে হতেই তো পারে তিনি নতুন কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছেন! বা অনেকদিন সংসার করে বিরক্ত হয়ে গেছেন! মিডলাইফ ক্রাইসিস তো খুব কমন জিনিস।

আবার মেসেজ করে।
-আচ্ছা ওনার কি কোনো মেয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিলো?
-আমরা দুজনে খুব উদার ছিলাম একে অন্যের প্রতি। কোনোদিন কেউ কাউকে কারো স্বাধীনতায় হাত দিইনি। তবে ওর একজন কলিগের সঙ্গে একটু বেশী ভাব ছিলো ওর। সেটা নিয়ে কদিন বেশ ঝামেলাও হয়েছে আমাদের। কিন্তু কোনোবারই তেমন কিছু হয়নি। ওর ওপর বিশ্বাসটা ছিলো আমার।
-বেশ, এটুকুই জানার ছিলো।

আবার লিখতে বসে। নাহ, এটা শিওর ত্রিকোণ প্রেমের কেস। নাহলে কেনো খামোখা সাজানো একটা সংসার ছেড়ে আবার নতুন করে শুরু করবেন উনি?

হয়তো তিনি লড়াইটা করছিলেন, কিন্তু মনে মনে বিরক্ত ও হয়েছিলেন। টাকা-পয়সা আসতেই সরে গেছেন। আরও জিজ্ঞেস করা দরকার।

কিন্তু থাক। খুব বেশী পার্সোনাল এ গিয়ে লাভ নেই।

একটা গল্প লিখে ও। ও বরাবরই নন-এন্ডিং গল্পে বিশ্বাসী, রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন যেমন, শেষ হয়েও হইলো না শেষ!

পরদিন সকালে গল্পটা পাঠালো অনন্ত। মহিলাটি সিন করে। না, এবার অন্য কাজগুলো নিয়ে বসা দরকার।

সমস্যা শুরু হয় তারপরে।

মহিলাটি কিছুক্ষনে ম্যাসেজ করে, শেষটা তার পছন্দ নয়। শেষ এরকম হবে কেনো? ছেলেটাতো তো তাকে ঠকিয়েছে, ওর শাস্তি হওয়া দরকার। খুব কড়া শাস্তি।

লে হালুয়া!

-দেখুন আমি সবকিছুকে এভাবে জাজ করিনা। আপনার চোখে সে ঠকিয়েছে,কিন্তু আমার চোখে নিশ্চয় তার কোনো কারন ছিলো যেজন্য সে এটা করেছে। নিজের ভিতরে কোনো লড়াই। কোনো কিছু কারণ ছাড়া হয়না ম্যাডাম..

-একটা জীবন নষ্ট করে দিয়ে চলে গেলো সেটা ঠকানো নয়? আগে জানলে আমি কি সব ছেড়ে আসতাম? এখন আমি কি করবো একা একা?

-দেখুন আপনার অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার মনে হয় আপনার মুভ অন করা উচিত।

-মুভ অন? এই জায়গায় এসে? এতোদূর এগিয়ে? মাই লাইফ হ্যাজ বিন টার্নড ইনটু হেল।

আমি জানিনা। আমি প্রতিশোধ চাই। আমি এই গল্পের শেষ দেখেই ছাড়বো। আপনাকে গল্পটার শেষ নতুন করে লিখতেই হবে।

এবার বিরক্ত লাগছে রীতিমতো।

-দেখুন আমি কল্পনায় কতকগুলো জীবনকে সাজিয়ে গল্প লিখই ঠিকই,কিন্তু হওয়া-না হওয়ার ওপর আমার বিন্দুমাত্র হাত নেই। আমি কী করে কাওকে শাস্তি দিতে পারি? আমি কী ভগবান নাকী?

মহিলা নাছোড়বান্দা। মাথা ধরে আসছে উত্তর দিতে দিতে।

তারপরে কতকগুলো চ্যাটে বেশ কিছু অস্বাভাবিক জিনিস চোখে পড়া শুরু হয়। যা প্রথম প্রথম সন্দেহ ছিলো,সেগুলোই এবার আসল মনে হতে থাকে।

পুলিশে যায়। সব খুলে বলে ডিটেলসে। সাইবার সেল অ্যাড্রেস বার করে দেয়। ৫ জন পুলিশের টিম, ২ টো কুকুর আর ২ জন ফরেন্সিকের টিম মিলে রওনা দেয় গন্তব্যে।

বড়ো বাড়ি। বাগান। চুপচুপি করে ঢুকতেই একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে আসে। দরজা লক করা।

পিছনের গেট খোজা হয়। সেটাও লক। কিন্তু পাশেই একটা নীচু দেখে জানলা। সেটা পেরিয়ে ৩ জন নিশব্দে ঘরে ঢুকে।

এবার গন্ধ ভীষন চড়া হচ্ছে। একটা মিষ্টি গন্ধ, তার সঙ্গেই একটা বাজে পচা গন্ধ। গা গুলিয়ে ওঠে সবমিলিয়ে।

নাকে রুমাল দিয়ে এগিয়ে যায় মাঝের একটা রুমের দিকে। আওয়াজ আসছে সেদিক থেকেই।

ফাঁক হয়ে থাকা দরজাটা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হতভম্ব হয়ে যায় অনন্ত।

একটা বডি,অন্তত ৬-৭ মাস হবে, হাড় বেড়িয়ে গেছে, মাংস পচে গেছে অনেক জায়গায়। সেটাকে ধরে মহিলাটি বলে চলেছেন, কথা বলছোনা কেন, তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারোনা, আমাকে একা ছেড়ে কোথাও যেতে পারোনা তুমি। ওঠো, নাহলে ভালো হবেনা বলে দিচ্ছি…..

মহিলাটির এখন চিকিৎসা চলছে। উদ্ধারের পর বডিটার ফরেন্সিক টেস্ট হওয়ার পর বডিটার সৎকার হয়েছে।

ঘটনাটা চোখের সামনে দেখে বেশ অনেকদিন ডিস্টার্বড ছিলো অনন্ত।

সাইকোলজিস্টরা কেস টা যত্ন নিয়ে দেখেন। সারা বাংলায় ঘটনাটা বিশাল সারা ফেলে। ২৪ ঘন্টা খবরের চ্যানেলগুলোয় সেই এক খবর।

বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করার পর স্বামীর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছিলেন। সংসার এ এমন মশগুল হয়ে গেছিলেন যে,ভাবতেও পারেননি কখনো একা থাকতে হতে পারে। স্বামীর মৃত্যুটা তাই কোনোভাবে স্বীকার করতে পারেননি। একাকীত্ব দুমরে মুচরে শেষ করে দিয়েছিলো ভিতর থেকে… কখন যে মানসিক ভারসাম্যটা হারিয়েছেন….।

মানুষ একাই আসে… একাই যায়…

একা বাঁচতে জানাটা খুব জরুরী। খুব….

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: