হল্যান্ডের পুজোয় পেটপুজো

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

‘হল্যান্ডের হাল-হকিকত’ সিরিজে খাওয়াদাওয়া নিয়ে আমার আগের লেখাটার প্রতিক্রিয়া আশাতীতভাবে ভালো পেলাম​। সকল পাঠককে অনেক ধন্যবাদ আমার মতো আনকোরা লেখককে এতোটা ভালোবাসা দেওয়ার জন্যে। অবশ্য​, বাঙালীদের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে দুর্বলতা নিশ্চ​য়ই এর অন্যতম কারণ​। তাই, আর​-একটু টি-আর​-পি বাড়ানোর জন্যে এই সংখ্যায় খাওয়াদাওয়া তো থাকলই, সাথে জুড়ে দিলাম বাঙালীর আর​-এক প্রধান দুর্বলতা – দুর্গাপুজো।

আমার আগের লেখাটার লেখার সুর টেনেই শুরু করা যাক​। কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল নিশ্চ​য়ই আপনাদের অনেকেরই প​ড়া। ঈশ্বরী পাটনি যখন মা অন্নপূর্ণার স্বরূপ জানতে পারলেন​, এবং মা যখন ঈশ্বরীকে বর দিতে চাইলেন​, তখন –

“প্রণমিয়া পাটুনি কহিছে জোড়হাতে, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।”

আপনাদের বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে দুধে-ভাতে থাকা উন্নত জীবনযাপনের প্রতীকী। মা অন্নপূর্ণা, যিনি মা দুর্গার এক রূপ​, ওনার কাছে সমস্ত বাঙালী-জাতির প্রতিনিধি ঈশ্বরী পাটনি প্রার্থনা জানালেন দুধে-ভাতে থাকার​, অর্থাৎ খেয়ে-পরে ভালো থাকার​।

যাক​, প্রসঙ্গে আসি, যে জাতির প্রতিনিধি দেবীর কাছে অমরত্ব​-অর্থ​-প্রতিপত্তি ছেড়ে খেয়ে-পরে ভালো থাকার প্রার্থনা জানায়​, সেই দেবী যখন মাতৃরূপে তার কাছে আসে, তখন ভালো খাওয়াটা ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মানদন্ড হ​য়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া, বাঙলাদেশে দুর্গাপুজোর প্রধান উপলক্ষ – উমার পিতৃগৃহে আগমন​। মেয়ে শ্বশুরবাড়ী থেকে নিজের বাড়ীতে ফিরেছে, তাকে তো দু-বেলা ভালো খেতে দিতেই হবে। অত​এব​, দুই প্লাস দুই – দুর্গাপুজোতে খাওয়াদাওয়ার আয়োজনে যেন কোন ত্রূটি না থেকে যায়​!

কোথায় যেন শুনেছিলাম​, দু-ঘর বাঙালী এক জায়গায় থাকলে দুর্গাপুজো হ​য়​, আর তিন​-ঘর বাঙালী এক জায়গায় থাকলে দুটো দুর্গাপুজো হ​য়​। নেদারল্যান্ডসে সাকুল্যে চারটে দুর্গাপুজো, আর ভাগ্যক্রমে আমি তার মধ্যে একটা দুর্গাপুজোর সাথে আমি বেশ ওতপ্রোতভাবেই জ​ড়িত​। সেই পুজোয় পাঁচদিনে দু-বেলা মিলিয়ে প্রায় ৪০০০ পাত প​ড়ে। নেদারল্যান্ডসে বসে গুণমান বজায় রেখে কি ভাবে এতো মানুষের পুজোর খাওয়ার আয়োজন করা হ​য়​, সেই নিয়েই আজকের প্রবন্ধ​। নেদারল্যান্ডসের অন্যান্য পুজো, বা বিদেশের অন্যান্য পুজোতেও নিশ্চ​য়ই এমনই হ​য়​, কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে শুধু একটা পুজোর ব্যাপারেই লিখতে পারব​। আপনারা এই লেখাকে একটা স্যাম্পল চেক হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন​।

নেদারল্যান্ডসে দুর্গাপুজো – আয়োজনে হল্যান্ডে হৈচৈ। এই পুজোর ব​য়স তিন বছর হবে মাত্র, অর্থাৎ নিতান্তই শিশু। কিন্তু, ব​য়সে শিশু হলে কি হবে, আয়তনে বেশ বাড়ন্ত​। যেমন আগেই বললাম​, পাঁচদিনে দু-বেলা মিলিয়ে প্রায় ৪০০০ পাত প​ড়ে। তাই, আমরা, যারা আয়োজনের সাথে জ​ড়িত​, তাদের প্রধান আলোচনার বিষ​য় – পুজোর আনন্দ বজায় রাখতে এতোজন মানুষকে কি খাওয়াব​।

যেমন আগেও লিখেছিলাম​, নেদারল্যান্ডসে বাঙালী মেন্যু আয়োজন করা বেশ ঝকমারি কাজ​। তার উপরে পুজোর মেন্যু, যার সাথে সবারই কমবেশী নস্টালজিয়া জ​ড়িয়ে আছে, সঠিকভাবে সঠিক মাপে চার​-পাঁচদিনের জন্যে আয়োজন করা মানে প্রায় হারকিউলিয়ান টাস্ক​।

হৈচৈ-এর আয়োজনায় আগে প​য়লা বৈশাখ বা বিজ​য়া সম্মিলনীর মতো অনুষ্ঠান হ​য়েছে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে দুর্গাপুজোর কোনভাবে তুলনা চলে না। পুজো মানে খাওয়াদাওয়াতে বিশুদ্ধ বাঙালীয়ানার ছাপ থাকতেই হবে। লুচি-খিচুড়ি-লাব​ড়া-ছেঁচকির পাশাপাশি শুক্ত​-মোচার ঘন্ট​-পাতুরি, আর তার প্যারালাল মাছের কালিয়া-খাসির মাংস – এইসব না হলে পুজোর মজাটাই আদ্ধেক হ​য়ে যায়​। আর​, নেদারল্যান্ডসে বসে এই রসনাতৃপ্তির আয়োজন করা, না-মুমকিন নেহি, মুশকিল হ্যায়​। আর ওই মুশকিল-আশান করার মধ্যেই হৈচৈ-এর বিশেষত্ব​, যা আজকের এই সংখ্যার মূল বিষ​য়।

হৈচৈ-এর পুজোয় পেটপুজো (photo courtesy: The Pixel Fair)

পাঠকদের একটা মোটামুটি আন্দাজ দেওয়ার জন্যে আগামী দুর্গাপূজায় হৈচৈ-এর পুজোর মেন্যুটা দেওয়া যাক​।

শুক্রবার ৪ অক্টোবর​, মহাষষ্ঠী

ভাত​, আলু-পোস্ত​, ব​ড়ি ভাজা, বিউলির ডাল​, চিংড়ি মালাইকারি, কষা মুর্গি, ক​ড়াই পনির​, মালপোয়া

শনিবার ৫ অক্টোবর​, মহাসপ্তমী

লাঞ্চ – ভাত​, ধনেপাতা বাটা, শুক্তো, সর্ষে ইলিশ​, গন্ধরাজ চিকেন ফ্রাই, ছানার ডালনা, আলু-পটোল​, মাখা সন্দেশ​

ডিনার – হলুদ পোলাও, চিকেন ডাকবাংলো, মাটন কষা, নবরত্ন মিক্স​, পনির বাটার মশালা, গাজরের হালুয়া

রবিবার ৬ অক্টোবর​, মহাষ্টমী

লাঞ্চ – লুচি, আলুর দম​, খিচুড়ি, লাব​ড়া, বেগুনভাজা, টম্যাটোর চাটনি, পাঁপ​ড়​, পান্তুয়া

ডিনার – ভাত​, মুগের ডাল​, ধোকার ডালনা, মোচার ঘন্ট​, ঝুরি আলুভাজা, আনারসের চাটনি, আইসক্রীম​

সোমবার ৭ অক্টোবর​, মহানবমী

ভাত​, আলু-ফুলকপির ডাল​, রুইমাছের কালিয়া, এঁচোড়ের তরকারী, ফিস​-ফ্রাই, ছানার পায়েস​

মেন্যু তো হলো, এবার আপনার মনে নিশ্চ​য়ই প্রশ্ন আসছে – কে এবং কি ভাবে। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব​, তার আগে একটা তথ্য আপনাকে দেওয়া যাক​। হৈচৈ-এর পুজোতে সমস্ত খাবার টাটকা রান্না করা হ​য় পুজোমন্ডপের লাগোয়া রান্নাঘরে। অর্থাৎ, সপ্তমীতে আপনার পাতে ধোঁয়া-ওঠা ভাতের সাথে গরম​-গরম খাসির মাংস​, বা অষ্টমীতে আপনার পাতে গরম​-গরম লুচি! বেশ রোমাঞ্চকর​, তাই না?

লুচি, একদম হাতে-গরম​ (photo courtesy: The Pixel Fair)

নেদারল্যান্ডসে হাতে-গোনা কিছু ক্যাটারার আছেন​, যাঁরা আমাদের সাধ এবং সাধ্যের মেলবন্ধন করতে পারেন​। তাঁদের সাথে কথাবার্তা বলে, আমাদের মেন্যু-ইচ্ছায় অল্পবিস্তর রদবদল করে একটা অবস্থানে তো আসা গেল​। প্রত্যেক বেলায় গ​ড়ে ৪০০-৫০০ লোকের খাওয়াদাওয়া, তার বাজারের বহর তো তেমনই হবে। সুতরাং, চ্যালেঞ্জ দুই, কাঁচা বাজারের আয়োজন​। কিছু উদাহরণ দিলে মনে হ​য় আপনারা একটু আন্দাজ পাবেন​।

ধরুন​, ৮০ কিলো পাঁঠার মাংস লাগবে। প্রথমত​, এই ব্যাপক পরিমাণে মাংস কে যোগান দেবে। আর​, দ্বিতীয়ত​, সেই মাংস খেয়ে সবার ভালো লাগবে কি না।

তাই, হৈচৈ-এর ফুড​-অর্গানাইজার দাদা প্রথমে নিজের গ্যাঁট​-গচ্চা দিয়ে দোকান থেকে মাংস কিনে আরো ক​য়েকজন খাদ্য​-বোদ্ধাকে বাড়িতে ডেকে রেঁধে (মানে, দাদা রাঁধলেন না, বৌদি রাঁধলেন​) খাওয়ালেন​। যদি সবাই অ্যাপ্রুভ করলো, তো ভালো। নাহলে, অ্যালগোরিদমের ভাষায়​, গো টু স্টেপ ওয়ান​।

আরও পড়ুন…ওলন্দাজদের ভাঁড়ারঘরে

ইলিশ​, রুই ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই প্রসেস​। তবে, এইক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে, দেখেশুনে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকছে।

কিছুক্ষেত্রে আবার সেই সুযোগ থাকে না। যেমন ধরুন​, মিষ্টি পান​। আপনি ভরপেট ভাত​-শুক্তো-মাছ​-মাংস খেয়ে যদি একটু পান না পান (পান ইন্টেন্ডেড​), তাহলে চলে নাকি? তাহলে উপায়​? খোঁজ​-খোঁজ​, কে কলকাতা গেছে। গ​ড়িয়াহাটের বাজারে রেডিমেড মিষ্টি পান পাওয়া যায়​, সেটা প্রায় তিন​-চার কিলো আনানো হলো তাকে দিয়ে।

আর, যেসব ক্ষেত্রে সেই সুযোগও নেই? বুদ্ধদেব নেপাল থেকে বিহারে এসে বোধিলাভ করেন​, আর পনের​-কুড়ি কিলো পটল​ বা কলাপাতা-লাভের জন্যে হৈচৈ-এর ফুড​-কমিটি পৌঁছে যায় নেদারল্যান্ডসের নাম​-না-জানা জায়গার কোন হোলসেলারের গো-ডাউনে। কিংবা, ইন্টারনেটে খোঁজ​-খোঁজ​, কোন অনলাইন গ্রসারী যদি ব্যবস্থা করতে পারে।

পাতুরি বাঁধা চলছে (photo courtesy: The Pixel Fair)

সেই সূত্র ধরে আমার এক বন্ধু, যে কিনা হৈচৈ-এর পুজোর বাজারের টিমে আছে, একটা গল্প শোনাল​। আগের বছরের পুজোর আয়োজন চলছে, মেন্যুতে আছে মোচার ঘন্ট​। খবর পাওয়া গেল​, এক দক্ষিণ​-এশিয়ান দোকানে একদম প্রসেস্ড মোচার টিন পাওয়া যাচ্ছে, ১ কিলোর এক​-একটা টিন​। ব্যবস্থা করতে হবে ৩৫-টা টিনের। একদিন যাওয়া হলো আমস্টারডামের সেই দক্ষিণ​-এশিয়ান দোকানে। ৩৫-টা টিনের অর্ডার শুনে তো দোকানের ম্যানেজারের চক্ষু চ​ড়কগাছ​, এতো মোচার টিন মনে হ​য় ওনার পুরো কেরিয়ারে বিক্রি হ​য়নি! তো, উনি বললেন যে ব্যবস্থা করা যাবে, কিন্তু তার জন্যে যা সম​য় লাগবে তাতে পুজো পেরিয়ে যাবে। সেই দোকান থেকে মেরে-কেটে ৫-৬ টিনের ব্যবস্থা হবে।

তো, কি করা যায়​? খোঁজ করা হলো, গোটা নেদারল্যান্ডসে কোন-কোন শহরে ওই দোকানের শাখা আছে। হৈচৈ-এর সদস্যরা, যারা সেই-সেই শহরে থাকেন​, তাদের বলা হলো খোঁজ নিতে। দেন হাগ​, রটারড্যাম​, আইন্দোভেন ইত্যাদি শহর থেকে মিলিয়ে-মিশিয়ে অবশেষে জোগাড় করা হলো ৩৫ টিন মোচা। দোকানের নামটা আর উল্লেখ করলাম না, কিন্তু উল্লেখ করেও খুব​-একটা লাভ নেই। ওই দোকানে গেলে আপনি হ​য়তো এখনো মোচা পাবেন না, সব দিয়েই তো আগের বছর হৈচৈ-এর পুজোয় মোচার ঘন্ট হ​য়ে গেছে!

তবে, যেকোন খাবারের সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট হচ্ছে – আন্তরিকতা, যা আপনার খাদ্যের স্বাদ হাজারগুণ বাড়িয়ে দেয়​। আপনার প্রিয় দোকানের প্রিয় খাদ্যকেও ভালোবেসে বেড়ে দেওয়া ডাল​-ভাত যেকোন দিন দশ​-গোল দেবে। তাই, হৈচৈ-এর এই আয়োজনের মাঝেও ক​ড়া নজর থাকে, আন্তরিকতায় যেন কোন খামতি না থেকে যায়​। নাহলে, আজকের দিনে বিদেশের পুজোয় বালতি হাতে পরিবেশন আপনি আর কত জায়গায় দেখতে পাবেন​?

আর​-একটু নিন​? (photo courtesy: Arijit Sen)

যাক​, আর বেশী কথা বাড়াব না। সেই ঘ​ড়ি ডিটার্জেন্টের বিজ্ঞাপনের মতোই বলব​, “পেহলে ইস্তেমাল করে, ফির বিশ্বাস করে”।

হল্যান্ডে হৈচৈ-এর ওয়েবসাইট​: https://www.hoichoi.nl

আপনার আকাঙ্খা, প্রশ্ন​, সন্দেহ ইত্যাদি এখান থেকে নিরসন করতে পারেন​, বা লেখককে (অর্থাৎ, আমাকে) সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন​।

আর​, অবশ্যই, আমার অভিজ্ঞতা সীমিত​, তাই অন্যান্য পুজোর আয়োজনের উল্লেখ এই প্রবন্ধে করতে পারলাম না। ক্ষমা প্রার্থনীয়​।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *