বাজে ছেলে

অঙ্কুশ

সুকুমার অতীব ভালো ছেলে। পাড়ার ভালো ছেলেরা ভালো ছেলে হিসেবে যাকে দেখে অনুপ্রেরণা পায়, সেটা সুকুমার।

যেমন পড়াশোনায় ভালো, তেমন ক্যুইজ-জেনারেল নলেজ,ড্রয়িং, দাবা সবকিছুতে নম্বর এক। আর তার উপর ভীষন সাধাসিধে ভদ্র ছেলে। পাড়ায় মা-বাবা-কাকু-কাকীমা-দাদু-দিদা সবাই ছোটদের বকাবকি করার সময় সুকুমারের উদাহরণ টানবেনই টানবেন।

সেই সুকুমারের কয়েকদিন ধরে মনে হলো, ভালো ছেলে হয়ে মজা নেই। কিংশুক, অভীকরা লাস্টবেঞ্চে বসে কতো গল্প, টিফিন খায় লুকিয়ে। ক্লাস কামাই করে ফুটবল। কত হাসিখুশি সবসময়। ওর সবসময় চাপ।

মাধ্যমিক পাশ করার পর সবাই চুলে নতুন নতুন স্টাইল করছে। কেউ মিলিটারি ছাঁট,তো কেউ বড়ো চুল। ওরও একবার ইচ্ছা করলো সেই ছোট্টবেলার একইরকম চুলের স্টাইল ছেড়ে নতুন কিছু করার। কিন্তু সেলুনে যেতেই ফুসস! গৌতমকাকু যেই বললো, বাবা সুকুমার কী ভালোই না রেজাল্ট করেছো মাধ্যমিকে, তোমার মতো ছেলে হয়না বাবা, সব কিছুতে ভালো। ব্যাস, সেই এক বাটিছাঁট নিয়ে ঘরে ফিরেছিলো।

না,অনেক হয়েছে। বাজে ছেলে এবার হতেই হবে। যেমন করে হোক। বাজে ছেলে না হলে লাইফে মজা নেই।

কিন্তু বাজে ছেলে হবে কীভাবে?

বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো এবার। তাইতো! বাজে ছেলে হতে গেলে কী কী গুন লাগে?

সিগারেট? কিন্তু ছোট্ট থেকেই সিগারেটের গন্ধ শুকলেই গা গোলায় ওর।

তাহলে উপায়?

সেদিন ফিজিক্স টিউশন থেকে ফিরছিলো অন্বেষার সাথে। অন্বেষাও পড়াশোনায় খুব ভালো। ও কুলদীপের গার্ল্ফ্রেন্ড। কুলদীপ-ও-অন্বেষার সব টিউশন সেম। শুধু ওর বাবা ফিজিক্সের টিচার,তাই ফিজিক্স পড়েনা।

ভাবলো,যদি অন্বেষাকে প্রোপোজ করলে কেমন হয়? ও এমনিতেও রাজি হবেনা। কিন্তু ও যখন সবাইকে ব্যাপারটা বলবে, সবাই নিশ্চিত হয়ে যাবে সুকুমার বাজে ছেলে!

বললো। বেশ গুছিয়ে। শাহরুখ খানের বহু সিনেমা ও দেখেছে।

এ বাবা! অন্বেষা বলে কী! সে তো আনন্দে আত্মহারা! অন্বেষা নাকী অনেকদিন ধরে ওকে লাইক করে, কুলদীপের সঙ্গে তো এমনিই আছে।

লে হালুয়া!

বুঝতে পারছিলোনা কী হবে এবার!

বাজে ছেলে তো হওয়া গেলোই না,উপরে আরেক ঝামেলা!

৭ দিন খুব টেনশনে কাটলো ওর। ইউটিউব ঘেঁটে,গুগল করে রিসার্চ করলো বাজে ছেলে কীভাবে হতে হয়।

রবিবার সকালে ওর কেমিস্ট্রি টিউশন। ও এমনিতেই পড়া শুরুর অনেক আগেভাগে পৌছে যায় সব টিউশনে।

সিড়ি থেকে নামতে গিয়ে লোকটাকে দেখেই কেমন খটকা লাগলো ওর। ওই লোকটাই না?

হ্যাঁ তাই তো মনে হচ্ছে! সেই শ্যামবর্ণ,নাক বড়ো,কপালে ভাঁজ।

পরশুদিন পেপারে লোকটার ছবি দেখেছিলো। এলাকায় পরপর গয়না চুরি হচ্ছে। একটা চুরির সিসিটিভি ফুটেজে মুখটা পাওয়া গেছে।

একটা দারুন বদবুদ্ধি খেলে যায় সুকুমারের মাথায়। অর্চনা কাকীমাদের অনেক টাকা, গয়নাও অনেক,যদি ও নিজে গিয়ে হেল্প করে চুরিটা করতে আর যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে ওর বাজে ছেলে হওয়া নিশ্চিত!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। কিন্তু কনফার্ম করতে হবে তো এই সেই গয়নাচোরকাকু!

লোকটা এদিক-ওদিক মাপছিলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সুকুমার ওর স্বভাবমতো মিনমিনে ভদ্র গলায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আচ্ছা কাকু, আপনিই সেই গয়নাচোরকাকু না?’

ব্যস। চোর এর তো চোখ কপালে। এতো সম্মান দিয়ে জীবনে কেউ ওর সাথে কথা বলেনি।

নিশ্চিত এর অন্য ছক আছে।

তাড়াহুড়ো করে পালাতে যায়। একটা ভাঙা ইটে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। পকেট থেকে বেড়িয়ে আসে তিনটে সোনার হার।

মুদির দোকানের শ্যামলকাকু দেখে ধরে ফেলে চোরটাকে। আরো দোকানীরা জড়ো হয়। আস্তে আস্তে লোকের মেলা লেগে যায়।

ওরা যা রেগে ছিলো মেরেই ফেলতো। শ্যামলকাকুরাই জনতার রাগ সামলে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

ব্যাস,কী হলো কী না,খবর ছড়িয়ে পড়লো,সুকুমার এর বুদ্ধিতে ধরা পড়েছে গয়নাচোর। চারিদিকে ছড়িয়ে গেলো। ঘর থেকে বেরোলেই সুনাম। আরও একটা গুন যোগ হলো ওর সুগুনের লিস্টে।

কয়েকটা লোকাল খবরের চ্যানেল এসে ইন্টারভিউ নিয়ে গেলো। খবরের কাগজে ছোট্ট দেখে কলামও বেরোলো। জেলাশাসক এই বছরের ‘বীরত্ব পুরস্কার’ ওকে দেবে ঘোষনা করলো।

সুকুমারের মন খুবই খারাপ। নাহ,বাজে ছেলে হওয়া আর ওর হলোনা। উলটে বাজে ছেলে হতে গিয়ে আরও বেশী সু-কুমার হয়ে গেলো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *