ইয়োলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক – ১

সংশ্রিতা দেব

বড় শহরের জাঁক জমক দেখার থেকে প্রকৃতির কোলে ঘুরে বেড়ানো বা ছুটি কাটানো আমার কাছে অনেক বেশি আনন্দের। বহুদিন ধরে ইয়লোস্টোন ন্যাশানাল পার্ক দেখার ইচ্ছা, যেহেতু ড্রাইভিং ডিসট্যান্স নয় তাই হয়ে উঠছিল না। ছুটি ম্যানেজ করা, বড় ট্যুরের প্ল্যানিং করা ইত্যাদি অনেকটা সময় সাপেক্ষ, তাই করবো করছি করে যাচ্ছিলাম বহুদিন থেকেই, ‌অনেক চিন্তা ভাবনা করে অবশেষে সময় বের করে ট্যুর প্ল্যান টা করেই ফেললাম। 

অক্টোবর মাসের মিডিলে ইয়লোস্টোন যাচ্ছি শুনে অনেকেই বারণ করেছিল কারণ সবে ঠান্ডা পরতে শুরু করবে, স্নো ফল হতে পারে তারজন্য পার্কের কোনো কোনো জায়গা হয়ত বন্ধও থাকতে পারে, এত দুরে গিয়ে একটা কিছু মিস করা মানে অনেক বড় মিস; তাছাড়া স্নো ফলের মধ্যে পাহাড়ী রাস্তায় ড্রাইভ করা শক্ত, এসব কারণে অনেক বন্ধু-বান্ধব সাবধান করছিল কিন্তু আমি এবার যাবই আর দেরী করা যাবে না। 

ইয়লোস্টোন ন্যাশানাল পার্ক বিশ্বের তথা আমেরিকার সর্বপ্রথম ন্যাশানাল পার্ক। এটা ওয়াইমিং, মন্টানা, আইডাহো তিনটে স্টেট জুড়ে বিস্তৃত। ওয়াইল্ড লাইফ এবং ভলক্যানিক রিজিয়ানের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত এই পার্ক। আমাদের যাওয়ার প্ল্যান মন্টানা স্টেট হয়ে।

আমাদের ফ্লাইট ছিল সান হোসে থেকে সিয়াটেল, সিয়াটেল থেকে বোজম্যান। সকালের ফ্লাইটে সান হোসে থেকে সিয়াটেল পৌঁছালাম, তারপর গন্তব্য বোজম্যান, প্রপলার প্লেনে করে। ছোট্ট একটা প্লেন তাতে সব মিলিয়ে ১৫-২০ জন যাত্রী। একদম অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিয়ে  বোজম্যান এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। আমার দেখা সবচেয়ে ছোটো আর সাজানো এয়ারপোর্ট। একটা কি দুটো রেস্তঁরা, একটা ব্যাঙ্কের এটিএম, একটা কার রেন্টাল এরকম করে তৈরী হয়েছে বোজম্যান এয়ারপোর্ট। তখন রাত ৮ টা হবে, আমরা কার রেন্টাল থেকে গাড়ি রেন্ট নিয়ে সোজা চলে গেলাম হোটেলে, রাস্তায় রাতের খাওয়ার তুলে নিলাম। বাইরে খুব ঠান্ডা, গত কাল বা পরশু স্নো ফল হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সেই রাতটা বোজম্যানে কাটিয়ে সকাল ৭ টার সময় আমরা রওনা দেবো ইয়লোস্টোন পার্কের উদ্দেশ্যে। 

পরদিন সকালে উঠে বাইরে আসতেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম, পাহাড়ে ঘেরা বোজম্যান শহর, রাতে স্নো ফল হয়ে সাদা হয়ে আছে চারিদিকে, অপূর্ব সেই দৃশ্য। আমরা গাড়ি নিয়ে পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমাদের প্রথমে যেতে হবে বোজম্যান থেকে গার্ডিনার শহরে, সেই শহরের শেষ প্রান্তেই পার্ক। বোজম্যান থেকে ১ ঘন্টা ২০ মিনিটের ড্রাইভ গার্ডিনার শহর। আমরা সকাল সকালই পৌঁছে গেলাম। গার্ডিনারকে ঠিক শহর বলা চলে না, একটা ছোট্ট টাউন, পার্ক কাউন্টির মধ্যেই পরে এটা। তিন চারটে হোটেল, একটা দুটো গ্যাস স্টেশান, গুটি কয়েক রেস্তাঁরা, কিছু বাড়ি, একটা স্কুল ইত্যাদি নিয়ে খুব ছোটোর মধ্যে গড়ে উঠেছে গার্ডিনার। এই ছোট্ট আর সাজানো টাউন পার করে আমরা পার্কে প্রবেশ করলাম।

ড্রাইভ থ্রু করে টিকিট কালেক্ট করে পার্কে ঢুকলাম, প্রথমে কাঁচা রাস্তা দিয়ে শুরু হয়েছে পার্ক, কিছুটা গিয়ে পাকা রাস্তায় পড়লাম। চোখে পড়লো ওয়েলকাম সাইন, দূরে বরফে মোড়া পাহাড় দেখা যাচ্ছে। গাড়ির জানালা খুললেই সালফারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে পার্কের মধ্যে। ইয়লোস্টোন ন্যাশানাল পার্ক একটি ইন্টারন্যাশানাল বায়োস্ফেয়ার রিসার্ভ এবং এটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত। এখানে জিওথার্মাল এরিয়াতে হট গিসার বেসিন ছাড়াও প্রচুর হট স্প্রিং, বয়েলিং মাড পট, ফিউমারলস, লেকও দেখা যায়।

কিছুটা ড্রাইভ করতেই একের পর এক দেখার জায়গায় গাড়ি পার্ক করতে শুরু করলাম। প্রথমে দেখলাম ম্যামোথ হট স্প্রিং। দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণ জলস্রোত প্রবাহিত হয়ে লাইমস্টোন জমা করে সিঁড়ির আকার নিয়ে তৈরী হয়েছে এই হট স্প্রিং।

ম্যামোথ হট স্প্রিং (লোয়ার পার্ট)

দেখতে অনেকটা এম্পিথিয়েটারের মতো। ওই জলের মধ্যে নানা রকম শ্যাঁওলা জাতীয় উদ্ভিদ জন্মায় যার ফলে সাদা লাইমস্টোনের গায়ে লাল, সবুজ, কমলা ইত্যাদি নানা রঙের সৃষ্টি হয়ে অপূর্ব দেখতে লাগে। এর আপার ও লোয়ার দুটো ভাগ আছে। দুটো ভাগই দেখলাম আমরা।

ম্যামোথ হট স্প্রিং (আপার পার্ট)

এরপর একে একে নরিস গিসার বেসিন, ওয়েস্ট থাম্ব গিসার বেসিন, আপার গিসার বেসিন, লোয়ার গিসার বেসিন, মিডওয়ে গিসার বেসিন, বিস্কিট বেসিন, ব্লাক স্যান্ড বেসিন, গিবন গিসার বেসিন দেখলাম। এরমধ্যে নরিস গিসার বেসিন সবথেকে বড়, পুরানো আর উত্তপ্ত। এখানকার জল অ্যাসিডমিশ্রিত আর এখানে অ্যাসিডের গিসারও দেখা যায় যা খুব বিরল। পুরো এলাকাতে ফুটন্ত জল, অ্যাসিড, সালফারের গন্ধ; সব মিলিয়ে বেশ বিপজ্জনক মনে হয়।

নরিস গিসার বেসিন

কিছুটা এগিয়ে দেখতে পেলাম রোরিং মাউন্টেন; যেখান থেকে অনবরত রোরিং সাউন্ড হয়ে চলেছে আর ধোঁয়া বের হয়ে আসছে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৃষ্টি যতটাই সুন্দর ততটাই ভয়ংকর বলে মনে হচ্ছিল আমার। কেমন যেন ধ্বংসের আভাস পাওয়া যায় গোটা পরিবেশটার মধ্যে।

এরপর আমরা গেলাম গ্রান্ড প্রিসমাটিক স্প্রিং দেখতে। মিডওয়ে গিসার বেসিনের অন্তর্গত খুবই গভীর এবং অসাধারণ রঙের জন্য বিখ্যাত হট স্প্রিং এটি।মাইক্রোবায়াল ম্যাটের জন্য এই হট স্প্রিং রামধনুর রঙে রঙিন এবং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই রঙগুলির পরিবর্তন হতে থাকে। অপূর্ব সুন্দর এই হট স্প্রিংটিকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতি যেন রঙ তুলি দিয়ে ক্যানভাসে এঁকেছে। রাস্তায় আমাদের যাত্রাপথের পাশাপাশি বয়ে চলছিল ঘন-নীল স্বচ্ছ ফায়ারহোল নদী।চোখ পড়লো অনেকেই ফ্লাই ফিসিং করছে নদীর জলে নেমে।

গ্রান্ড প্রিসমাটিক স্প্রিং
ফায়ারহোল রিভার

এরপর বিরাট বড় বড় ভলক্যানিক ক্রেটার এরিয়া গুলোতে হট স্প্রিং, ছোটো ছোটো হট পুল, ছোটো ছোটো গিসার আর ইরাপশান দেখতে দেখতে এসে পৌছালাম ওল্ড ফেথফুল গিসার দেখতে। পৃথিবী বিখ্যাত এই গিসারের ইরাপসান ৯০ মিনিট পর পর হয় আর সেটা দেখতে বহু মানুষ জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছেন। আমরাও একটা বেঞ্চ দখল করে বসলাম এবং নিজেদের মধ্যে গল্প করতে লাগলাম, কোন কোন গিসার দেখলাম, কেমন লাগলো, এরপর কি দেখবো সেইসব নিয়ে।

আমাদের পাশে ৫/৬ বছরের একটা মিষ্টি ফুটফুটে আমেরিকান মেয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ সে খেলা থামিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, গাইস, ইটস নট গিসার ইটস গাইসার। নাও আই অ্যাম ইওর টিচার, ওকে? আমরাও খুব বাধ্য স্টুডেন্ডের মতো তার কথা মেনে নিলাম। সত্যি, পৃথিবীতে শিশুদের মতো নির্মল আর সরল আনন্দ কেউ দিতে পারে না। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওল্ড ফেথফুল গিসারের ইরাপশান শুরু হলো, অপূর্ব সেই দৃশ্য, একবার ইরাপশানের সময় ১০০ থেকে প্রায় ১৫০ কি তার কিছুটা বেশি হাইটে পৌঁছায় জলের উচ্চতা আর একবারে প্রায় ৪০০০ থেকে ৮০০০ গ্যালোন জল বের হয়। প্রায় ৪/৫ মিনিট ধরে চলে এই ইরাপশান। যুগ যুগ ধরে সঠিক সময় মেনটেন করে ইরাপশান হয়ে আসছে বলেই এর নাম হয়েছে ফেথফুল। খুবই বিষ্ময়কর এবং অসাধারণ সেই দৃশ্যের সৌন্দর্য্যে সম্মোহিত হয়ে আমরা পরের গন্তব্যের দিকে রওনা দিলাম। 

ওল্ড ফেথফুল গিসার

এরপর এলাম স্বচ্ছ নীল রঙের ইয়লোস্টোন লেক দেখতে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সবে ঠান্ডা পড়তে শুরু করাতে বোটিং বা কায়াকিং করতে কাউকে দেখলাম না।

ইয়লোস্টোন লেক

এই লেকের ওপরেই খুব বিখ্যাত এক হাইড্রো-থার্মাল ফিচার হলো ফিসিং কোন। ওয়েস্ট থাম্ব গিসার বেসিনের কাছে অবস্থিত এই ফিসিং কোন আসলে একটা উত্তপ্ত গিসার ছিল, বহুকাল আগে আদিবাসীরা লেক থেকে মাছ ধরে এই কোনের গরম জলে সেই মাছ সেদ্ধ করে খেত। তবে বর্তমানে লেকের জল বেড়ে যাওয়াতে গিসারের ইরাপশান বন্ধ হয়ে গেছে এবং ঠান্ডাও হয়ে গেছে গিসারটি। তাই এখন এখানে মাছ ধরা বা বয়েল করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ফিসিং কোন

এরপর আমরা গেলাম ফাউন্টেন পেন্ট পট বা বয়েলিং মাড পট দেখতে। এই এলাকাটিতে জলের পরিমাণ কম হওয়াতে মাটি এবং তার সাথে লাভা থেকে উৎপন্ন ছাই ইত্যাদি মিশে কাদায় পরিণত হয়েছে এবং সেই মাড বা কাদা অত্যন্ত ভূ-তাপের কারণে সবসময় ফুটছে। ফুটন্ত কাদার পুল দেখতে বেশ বিপজ্জনক।

বয়েলিং মাড পট বা ফাউন্টেন পেন্ট পট

এরপর ড্রাগন মাউথ কেভ হট স্প্রিং, মর্নিং গ্লোরি হট পুল, টারকুয়েস পুল, ওপাল পুল, সারজিং স্প্রিং, ক্লেপসিড্রা গিসার, রেড ভলক্যানো, বেলজিয়ান হট পুল, বিউটি হট পুল, ক্যাসেল গিসার কোন, ব্ল্যাক সান্ড গিসার ইত্যাদি নানা জিওথার্মাল ভলক্যানিক ফিচারস দেখতে দেখতে দিনের আলো শেষ হয়ে এলো।

রেড ভলক্যানো
ওপাল পুল
টারকুয়েস পুল
সারজিং হট স্প্রিং
হট স্প্রিং নেয়ার ওয়েস্ট থাম্ব বেসিন
মর্নিং গ্লোরি পুল
ক্যাসেল গিসার কোন

এবার আমাদের গার্ডিনার ফেরার পালা। ওখানে আমাদের হোটেল বুক করা ছিল, সারাদিন ঘুরে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যে বেলায় হোটেলে পৌঁছালাম। দিনভর পার্কের মধ্যে ঘোরাঘুরির ফলে বিশেষ কিছু খাওয়া হয় নি। সঙ্গে যা ছিল মানে বিস্কিট, কেক, ফল ইত্যাদি খেয়ে কাটিয়েছিলাম। তাই রাতে হেভি ডিনারের দরকার ছিল, কিন্তু গার্ডিনারে বিশেষ কোনো বড় রেস্তোঁরা নেই তাই ডেলি সান্ডুইচ দিয়ে রাতের খাওয়ার সেরে সোজা বিছানায় চলে গেলাম। 

(বাকি অংশ পরের পর্বে)

One thought on “ইয়োলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক – ১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *