বিরহী সানাই

লিওনিড দত্ত

বারাণসীর সরাই হরহরা মুসলিম পট্টির অলিগলির ভিতর ছোট্ট ঘরে তখন সন্ধ্যের ব্যস্ততা। নামাজ সেরে মসজিদের দিকে থেকে ফিরছেন অশীতিপর বৃদ্ধ। ঢলা পাতলুনে অজুর জল লেগে। গালে খোঁচা দাড়ি, মুখে প্রত্যাশিত অমলিন হাসি। দশাশ্বমেধ ঘাটে তখন শুরু হয়েছে গঙ্গা আরতি। বাঁদিকের রাস্তা ধরে সোজা গেলে বেনিয়া পার্ক। সেখান থেকে নাঈ সড়ক ধরলে শোনা যায় গঙ্গা পুজোর ধ্বনি। ডাইনের গলিটা দিয়ে ঢুকতেই দু’জন সেলাম ঠুকে গেল ‘আদাব উস্তাদজি’। ছোটছোট দোকানগুলো পেরিয়ে বৃদ্ধ ফিরলেন ছোট্ট ঘরে। মাটিতে শতরঞ্চি বিছিয়ে নিয়ে হাতে নিলেন সানাইটা।

আঙুল চাপা ষড়জে। রাত্রির প্রথম প্রহর গড়িয়ে এলো। পূর্ণিমার আলো এসে পড়ছে জানলার গরাদ বেয়ে। যেন শ্বেত সরোজের মত। আঙুল গড়িয়ে যায় গান্ধার ছুঁয়ে মধ্যমে। ঋষভে লেগে আরোহণী শাপ। গান্ধার বেয়ে তীব্র মধ্যম ছোঁয় ঈশ্বরী আবেগ। পঞ্চমে সারি দিয়ে বেয়ে চলে সরল দোলনের তার। যেন হৃদযন্ত্র বেয়ে চলা শুঁয়োপোকা – ধরতে গেলেই নিমেষে গুটিপোকা হয়ে যায় কোন যাদুতে। 

সা গা ক্ষা পা নি সা। ফিরতি পথে তার গুটিপোকা খুলে যায় প্রজাপতিতে। সব স্বর ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার চুম্বনরস নেয় শরীরে। যেন জ্যোৎস্নাময়ী কোন পরী, দিকভ্রান্ত হয়ে দিক খুঁজছে সব স্বরে। 
শ্রীমতী এসেছে কুঞ্জমাঝে। পা-ক্ষা-গা-ক্ষা-গা-রে-সা। একটু এগিয়েই পিছিয়ে আসছেন মধ্যম ছুঁয়ে। পঞ্চমে তার আবাস। যেন দ্বিধার দোল। অভিসারে চলেছেন ভরা জ্যোৎস্নায়। শ্যাম আসবে তো? সংশয়। তবু তার মন উচ্ছসিত। সজনী রাধিকা জড়িয়ে ওঠে সানাইয়ের প্রতিটি অঙ্গ।
‘ভরুঙ্গি পিয়া তোপে, তন মন ধন, সুখ স্বপনে’। বিদ্যাপতি এসে আশ্রয় নেয় তার রক্তচন্দনে। ঘৃতদাহের কাজলে তার আঁখি যেন ভরা দীঘি। তাতে ঠিকরে পড়ে ফিরে যাচ্ছে ভরা জ্যোৎস্না। নি-ধা-পা-মা-গা-মা-পা-নি-সা। এখানে অদ্ভুতভাবে শুদ্ধ মধ্যম লেগে রয়েছে – জ্যোৎস্নার ফেরায়। যেন সমস্ত কুঞ্জ শুদ্ধ হয়ে রয়েছে শ্রীমতীর অভিসারে। 
তবুও শ্যামের দেখা নেই। রাধিকার অঙ্গে শ্বেত চন্দন, গোড়ে মালা – যেন চণ্ডীদাসী পদ। সানাইয়ে অঙ্গ মিশিয়েছে গৌড় বঙ্গের সব পদকর্তা। বিরহ রস ফিরে আসে বসন্তের কড়ি মধ্যম থেকে, না সে গৌড় মল্লারের আঙিনার আলপনা? 
পঞ্চমের উপর আঙুল খেলে, যেন অণু-পরমাণু সব রসায়ন সে দোলনে যুক্ত। অবহট্টের সব অচেনা অক্ষর সেখানে আশ্রয় পায় নিমেষে। বিরহী শ্রীমতির রস ফিরে পায় তূণক ছন্দের বাঁধন। সানাইয়ের তাল দ্রুত হয়। বিরহ যেন শৃঙ্গার হয়ে আশ্রয় নেয় ঈশ্বরী আঙুলে। 
‘বৈরাগন বানুঙ্গি, সজনা বিছড়ে তনরঙ, সুখ স্বপনে’ 
আকাশ থেকে জ্যোৎস্না ছুঁয়ে পড়ে বিরহী চন্দনে…
বৃদ্ধের চোখের কোণে ছলছল বারি ধারা। গরাদ বেয়ে ফাল্গুনী চাঁদের আলো এসে পড়ে তাতে। এত দরদিয়া আবেগ – এত প্রেম কোথায় পেলেন আপনি? 
বৃদ্ধ হাসেন, উত্তর দেয় না।

তবু জানি, আপনি মারুবেহাগের আরোহণী শাপভ্রষ্ট শ্যামরূপী ঋষভ। তাই শ্রীমতীর বিরহে আজও শৃঙ্গার পান করে আপনার সানাই… 

One thought on “বিরহী সানাই

  • August 31, 2019 at 2:40 pm
    Permalink

    খুব ভাল লাগল।কত উচ্চাঙ্গের এই গল্পটি। ভারতীয় রাগ রাগিণীর সঙ্গে যে গল্পকারের নিবিড় সংযোগ আছে, বোঝা যায় । আরও গল্পের প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে এমন রচনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *