এমন এক দিনে

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
অনুবাদঃ- মিহিররঞ্জন মন্ডল

সোমবার ভোরের দিকে একে এইরকম গরম, তার উপর আবার বৃষ্টি নেই। হাতুড়ে দাঁতের ডাক্তার অরোলিয়ো এস্কোভারের খুব ভোরে ওঠা অভ্যাস। ঠিক ছ’ টায় সে ডাক্তারখানা  খুলল। কাচের আলমারির ভিতর থেকে প্লাস্টারের ছাঁচে ঢালা নকল দাঁতগুলো এবার বার করল। গোছাখানেক যন্ত্রপাতি নিয়ে পর পর সাজিয়ে রাখল। ডাক্তারের পরনে কলারবিহীন ডোরাকাটা শার্ট। গলার কাছটায় একটা সোনালি রঙের বোতাম দিয়ে আঁটা। কাঁধের উপর দিয়ে সাসপেন্ডার ঝুলছে কোমরের প্যান্টটাকে টেনে ধরে রাখার জন্য। ওর চেহারাটা চিমসে হলেও বেশ ঋজু। চোখের চাউনি কেমন যেন হাবা-কালা লোকেদের মতো। পরিবেশের সঙ্গে যা মোটেও খাপ খায় না।

জিনিসপত্র টেবিলের উপর গুছিয়ে রেখে অরোলিয়ো এবার তুরপুনটাকে চেয়ারের কাছে টেনে আনল। তারপর বসে নকল দাঁতগুলো পালিশ করতে আরম্ভ করল। যে কাজটা সে এখন করছে তা নিয়ে যেন ওর কোন চিন্তাভাবনা নেই।  কিন্তু একই ভাবে কাজটা সে করে যেতে লাগল। পা দিয়ে দাবিয়ে দাবিয়ে তুরপুনটা সে চালিয়ে চলল। এমনকী যখন দরকার নেই,তখনও।

আটটা বাজার পর সে এবার থামল। জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকাল আকাশের দিকে। পাশের বাড়ির ছাদে একটা খুঁটির উপর বসে একজোড়া বাজপাখি। রোদ পোহাচ্ছে। কাজ করতে করতে তার মনে হল দুপুরে খাওয়ার আগেই বোধহয় একবার বৃষ্টি হবে। কিন্তু কাজের তাল হঠাৎ কেটে গেল তার ওই এগারো বছরের ছেলেটার খনখনে গলার আওয়াজে।

‘ বাবা ‘ 

‘ কী হয়েছে? ‘   

‘ মেয়র এসেছেন।

‘ জানতে চাইছেন তুমি ওঁর দাঁতটা তুলে দেবে কি না। ‘ 

‘ বলে দে, আমি এখন এখানে নেই। ‘ 

অরেলিয়ো সোনাবাঁধানো একটা দাঁত নিয়ে তখন পালিশ করছিল। চোখদুটো কুঁচকে হাত বাড়িয়ে দূর থেকে দাঁতটাকে ধরে সে একবার পরখ করল। বসার ঘর থেকে ছেলেটা আবার বলল- 

‘ উনি বলছেন তুমি এখানেই আছ। তোমার গলা উনি শুনতে পাচ্ছেন।’     

জবাব না দিয়ে দাঁতের ডাক্তার আগের মতোই দাঁতটাকে খু্টিয়ে দেখতে লাগল। তারপর ওটাকে টেবিলের উপর রেখে বলল, ‘ যাহোক, হল একরকম! ‘     

পা দিয়ে সে তুরপুনটা কিন্তু সে চালিয়েই চলল। একবার জিনিসপত্র  রাখার কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে নকল দাঁত আটকে রাখার কয়েকটা আঙটা বের করল।     

‘ বাবা’

‘ আবার কী হল?, অবিচলিত হয়ে অরেলিয়ো জিজ্ঞেস করে।     

‘ উনি বলছেন ওঁর দাঁত তুলে না দিলে তোমায় গুলি করে মারবেন।’     

কোনরকম তাড়াহুড়ো  না করে, অত্যন্ত ধীরে সুস্থে দাঁতের ডাক্তার তুরপুন চালানো বন্ধ করল। ওটাকে চেয়ারের কাছ থেকে খানিকটা দূরে ঠেলে সরিয়ে দিল। তারপর টেবিলের নিচের ড্রয়ারটা টেনে খুলল। ওর মধ্যে রয়েছে একটা রিভলবার।

‘ ঠিক আছে, ওকে বল এখানে আসতে। এসে যেন আমায় গুলি করে মারে। ‘     

দরজার উল্টোদিকে সে চেয়ারটাকে এবার ঘুরিয়ে রাখল। ওর হাতটা রয়েছে এখন  ড্রয়ারের কানায়। এবার দরজার সামনে  মেয়রকে দেখা গেল। মেয়রের গালের বাঁ দিকটা পরিষ্কার করে কামানো। কিন্তু ডানদিকের গালটা যন্ত্রণায় ফুলেছে। তাতে পাঁচদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। নিষ্প্রভ দু’ চোখে যত রাজ্যের হতাশা। অরেলিয়ো তা লক্ষ্য করল। আঙুলের ডগা দিয়ে ড্রয়ারটা ঠেলে বন্ধ করে খুব নরম গলায় বলল, ‘ বসুন ‘।

‘ সুপ্রভাত ‘ মেয়র বললেন।     

প্রত্যুত্তরে দাঁতর ডাক্তারও সম্ভাষণ জানায়।

যন্ত্রপাতিগুলো এখনও গরমজলে ফুটছে। চেয়ারের পিছনে মাথা রাখার জায়গায়,  মেয়র মাথাটা হেলিয়ে দিলেন। একটু যেন আরাম বোধ হচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাসেও বেশ একটা ঠান্ডা ভাব। ডাক্তারের ঘরদোর খুবই সাধারণ। জিনিসপত্র বলতে চোখে পড়ছে কেবল একটা কাঠের পুরানো চেয়ার, তুরপুন আর কাচের আলমারির মধ্যে খানকয়েক চিনেমাটির বোতল। চেয়ারের পিছন দিকে একটা জানালা। তাতে কাঁধ সমান একটা কাপড়ের পর্দা ঝুলছে। দাঁতের ডাক্তারকে এগিয়ে আসতে দেখে মেয়র তাঁর নিজের পায়ের গোড়ালি দু’ টো শক্ত করে মেঝেতে চেপে রইলেন। তারপর মুখটা হাঁ করে খুললেন।

অরেলিয়ো মেয়রের মাথাটা চেপে আলোর দিকে ঘোরায়। ক্ষতিগ্রস্থ দাঁতটাকে ভালোভাবে একবার পরীক্ষা  করে। তারপর অতি সাবধানে আঙুলের মৃদু চাপে মেয়রের হাঁ করা মুখটা সে বন্ধ করে।     

‘ অ্যানিস্থিসিয়া ছাড়াই কিন্তু দাঁতটাকে তুলতে হবে ‘ অরেলিয়ো জানায়।     

‘ কেন? ‘     

‘ কারণ, দাঁতের গোড়ায় একটা ফোঁড়া হয়েছে।

মেয়র এখন ওর চোখের দিকে তাকালেন।’ ঠিক আছে তাহলে’ বলে উনি একবার হাসার চেষ্টা করলেন। দাঁতের ডাক্তার কিন্তু মোটেও হাসল না। জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ভরতি গামলাটা এনে সে টেবিলের উপর রাখল। এবার চিমটা দিয়ে গামলা থেকে সেগুলো একটা একটা করে টেনে বার করল। তারপর জুতোর ডগা দিয়ে মেঝের থুকদানিটা সরিয়ে দিয়ে বেসিনে হাত ধুতে গেল। মেয়রের দিকে না তাকিয়েই সে কাজগুলি করে যেতে লাগল। মেয়র কিন্তু ওর ওপর থেকে একবারের জন্য চোখ সরালেন না।

এটা নিচের পাটির আক্কেল দাঁত। অরেলিয়ো পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে  গরমজলে ফোটান ফোরসেপ দিয়ে দাঁতটাকে ভালভাবে চেপে ধরে। চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে আঁকড়ে রইলেন মেয়র। সর্বশক্তি দিয়ে মেঝেয় পা দু’ টো চেপে রাখলেন। পেটের ভিতরে যেন কেমন করছে। মেয়রের মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হল না। দাঁতের ডাক্তার কব্জি দিয়ে একটা মোচড় দিল। মনের মধ্যে ঘৃণা চেপে রেখে, নিতান্ত শান্ত অথচ তেতো গলায় বলল—

‘ কুড়িজন লোক আমাদের মারা গেছে। তার মূল্য তো আপনাকে এবার দিতেই হবে।’

দাঁতটা যে ওপড়ানো হচ্ছে মেয়র তা বেশ বুঝতে পারলেন। যন্ত্রণায় তাঁর চোখে জল এল। দাঁতটা যতক্ষণ তোলা না হল, ততক্ষণ দমবন্ধ করে বসে রইলেন। তারপর জলভরা চোখে ওপড়ানো দাঁতটাকে একবার দেখলেন। এটার জন্যই তিনি পাঁচ রাত ধরে এমন কষ্ট পেয়েছেন। কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।     

থুকদানিতে থুতু ফেলতে ফেলতে মেয়র ঘামতে লাগলেন। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। পরণের উর্দির বোতামগুলি সব খুলে ফেললেন। প্যান্টের পকেট থেকে রুমালটা বার করার চেষ্টা করলেন। দাঁতের ডাক্তার একটুকরো  পরিষ্কার কাপড় মেয়রের হাতে গুঁজে দিল।

‘ চেখের জলটা মুছে নিন ‘ অরেলিয়ো বলল।     

মেয়র তাই করলেন। উনি তখন কাঁপছিলেন। দাঁতের ডাক্তার বেসিনে যখন হাত ধুতে গেল তখন মেয়র ঘরের জরাজীর্ণ ছাদের দিকে তাকালেন। ঝুলের মধ্যে মাকড়সার জাল। তাতে মাকড়সা রয়েছে। ডিমটিমও পেড়েছে। জালে ক’ টা মরা পোকা। হাত মুছতে মুছতে দাঁতের ডাক্তার  ফিরে এল।

‘ বিছানায় শুয়ে থাকবেন। আর নুনজলে গলা ধোবেন,’ অরেলিয়ো মেয়রকে বলল।     

মেয়র উঠে দাঁড়ালেন। মিলিটারি কায়দায়  অভিবাদন জানিয়ে বিদায় নিলেন। পা টেনে টেনে এবার দরজার দিকে এগোলেন। উর্দির বোতামগুলো তখনও খোলা।     

‘ আপনার বিলটা পাঠিয়ে দেবেন ‘ মেয়র বললেন।     

‘ পাঠাবো কোথায়? আপনার কাছে না টাউন অফিসে? ‘ অরেলিয়ো জিজ্ঞেস করল।     মেয়র কিন্তু ওর দিকে ফিরেও তাকালেন না। দরজাটা বন্ধ করে দিতে দিতে বললেন—     ‘ যেখানে খুশি। ও ছাই একই ব্যাপার! ‘

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *