ওলন্দাজদের ভাঁড়ারঘরে

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

বাঙালী মাত্রেই ভোজনরসিক​। আর, হবে না কেন​, খাওয়ার এতো ভেরিয়েশন শুধুমাত্র বঙ্গদেশেই সম্ভব​। কোথায় যেন শুনেছিলাম​, “মাড়ওয়ার মনসুবে ডুবা, বাঙ্গাল ডুবা খানে মে, আউর হিন্দুস্থান ডুবা গানে মে”। বঙ্গজীবনের অঙ্গ শুধুমাত্র বোরোলিন ন​য়​, কবজি ডুবিয়ে খাওয়াও বটে। বাঙালী মা অন্নপূর্ণার পুজো করে। কবি ভারতচন্দ্র ঈশ্বরী পাটনীর মাধ্যমে মায়ের কাছে প্রার্থনা করছেন​, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”। এহেন জাতি খাদ্যরসিক না হ​য়ে যায় কোথায়​? রোজ দুবেলা সামান্য মাছ-ভাত হলেও চলে যায়​, কিন্তু রোববার সকালে লুচি-তরকারী আর দুপুরে খাসির মাংস না হলে এই বাঙালী জীবনই বৃথা।

এহেন বাঙালী জীবন কুড়ি বছরের উপরে অতিবাহিত করে আমি পাড়ি জমালাম নেদারল্যান্ডসে। খাদ্যরসিকের স্বর্গ যদি বঙ্গদেশ হ​য়​, তাহলে নেদারল্যান্ডস হচ্ছে নরকের কাছাকাছি।

এখন তাও অনেক দোকানে মিষ্টি জলের মাছ​, খাসির মাংস​, তদানুসারে মশলা ইত্যাদি পাওয়া যায়​, কিন্তু আজ থেকে বছর​-দশেক আগে, অর্থাৎ যখন আমি নেদারল্যান্ডসে এসেছিলাম​, তখন এইসব এতো সহজে পাওয়া যেত না। আমস্টারডামে একটা দোকান ছিল বটে, কিন্তু সবসম​য় সেখানে যাওয়া সম্ভব হতো না। অগত্যা, যা সহজলভ্য​, তাই দিয়েই রসনাতৃপ্তি করতে হতো।

সেই সূত্রে একটু ইতিহাসের জ্ঞান দিয়ে রাখি। যেমন আপনারা অনেকেই জানেন​, এককালে ভারতে ডাচ কলোনী ছিল​। ডাচেরা ভারতের বিশেষ কিছু অঞ্চল (প্রধানতঃ উত্তর প্রদেশ ও বিহার​) থেকে প্রচুর শ্রমিক নিয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনাম বলে একটি দেশে, সেখানে চাষ​-আবাদ ও অন্যান্য শারীরিক শ্রমের কাজ করানোর জন্যে। কলকাতায় গার্ডেনরিচে সুরিনামঘাট থেকে নাকি প্রথম জাহাজ ছেড়েছিল শ্রমিকদের নিয়ে সুরিনামের উদ্দেশ্যে, আর সেই থেকেই ওই ঘাটের নামকরণ​। যাই হোক​, কলোনিয়াল শাষণ উঠে যাওয়ার পরে সুরিনামবাসীদের ডাচ নাগরিকত্ব দেওয়া হ​য়​, এবং অনেকেই নেদারল্যান্ডসে এসে জীবনযাপন শুরু করেন​। তাই, সুরিনামীদের মধ্যে বেশীরভাগ ভারতীয় বংশোদ্ভুত​, এবং তাঁরা এখনো সেই ধারা বজায় রাখেন​।

সুতরাং, সুরিনামীদের খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে কিছুটা হলেও ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসের ছোঁয়া আছে, কিন্তু তা খুব নগণ্য​। চিকেন টিক্কা বা চিকেন কারি তাদের মেন্যুতে থাকলেও তার সাথে আপনি ভারতীয় চিকেন টিক্কা বা কারির খুঁজতে গেলে হতাশ হবেন​।

হ্যাঁ, নেদারল্যান্ডসে কিছু রেস্তোরাঁ খাঁটি ভারতীয় ম্যেনুর দাবী রাখে, তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক​। একবার তেমনই এক নামী রেস্তোরাঁ থেকে বিরিয়ানী অর্ডার করলাম​। আমি বিরিয়ানির অন্ধ ভক্ত​, তাই তার অপমান সহ্য করতে পারিনা। অত​এব​, বাক্স খুলে যখন দেখলাম মশলার গন্ধবিহীন মাংস​-ভাত-সদৃশ সেই বিরিয়ানীকে গার্নিশ করা হ​য়েছে কাজু-কিশমিশ দিয়ে, সেই মূহুর্তে ঠিক করে নিলাম​, আর যাই হোক​, এই দেশে ভারতীয় রেস্তোরাঁয় যাব না।

আর​, ডাচ ক্যুইজিন সম্বন্ধে লিখতে গেলে শব্দ কম প​ড়বে। ইয়ে, মানে, এতো কম লেখার আছে, যে সত্যি শব্দ কম প​ড়বে।

প্রাতঃরাশে পাঁউরুটি-হাগেলস্লাগ​, দুপুরে পাঁউরুটি-চীজ​-সালামি (আর​, এক বোতল দুধ​), আর রাত্রে আলুসেদ্ধ (যাকে এখানে বলে স্তাম্পোদ​)-সসেজ​-পালংশাক সেদ্ধ আর পাঁউরুটি – এই হলো মোটামুটি স্টেপল ডায়েট​। এই দেশ পাঁউরুটি-প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য​, বিভিন্ন ধরণের পাঁউরুটি আপনি এখানে পাবেন​।

আলুসেদ্ধ আর সসেজ – ডাচ ডিনার

আমার যতদূর অভিজ্ঞতা হ​য়েছে, ডাচেরা খুব​-একটা খাদ্যরসিক ন​য়​। আমি-আপনি যে খাওয়া খেয়ে বলব​, “বেকার​!”, ডাচেরা পরমানন্দে সেই খাওয়া খেয়েই বলবে, “Umm, lekker!” (অর্থাৎ, অতি উপাদেয়​)। তবে সমুদ্র​-তীরবর্তী দেশ হওয়ার সুবাদে এখানে সী-ফুড পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়​। তাই, টাটকা চিংড়ি বা সার্ডিন বা স্যামন আপনি অনায়াসে পেয়ে যাবেন​।

যদিও তার রেসিপি এখানে ওই থোড়​-ব​ড়ি-খাড়া – সার্ডিন হলে ভাজো, স্যামন হলে বেক করো, আর চিংড়ি হলে হাল্কা সেদ্ধ করে সস দিয়ে খাও। নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ হলো হেরিং। পাঁউরুটির সাথে কাঁচা হেরিং ডাচদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য​।

পাঁউরুটি ও কাঁচা হেরিং – নেদারল্যান্ডসের জাতীয় খাদ্য​

কিন্তু আমার​-আপনার মতো মাছে-ভাতে বাঙালীর কাছে কি ওইসব পোষায়​? মিষ্টি জলের মাছ​, অর্থাৎ আমরা যা খেয়ে অভ্যস্থ​, তা এখানে দুষ্প্রাপ্য না হলেও দুর্মূল্য তো বটেই। এক কিলো রুই মাছ ৯ ইউরো (প্রায় ৫৫০ টাকা), ইলিশ হলে তা ১৫-২০ ইউরোতে (প্রায় ২০০০ টাকা) গিয়ে দাঁড়ায়​। আর​, টাটকা মাছের স্বাদ বরফচাপা মাছে কোথায়​?

অগত্যা, এক্সপার্ট সাজেশন​, স্থানীয় মাছকেই নিজের রসনায় রাঙিয়ে নিন​। সার্ডিন আমার খুব প্রিয় মাছ​, ছাঁকা তেলে ভালো করে ভেজে নিলে ডাল-ভাতের সাথে ভালোই যায়​। স্যামন দিয়ে কষা করে কালিয়া-মতো করে নিতে পারেন​, খারাপ লাগবে না। তা ছাড়া চিংড়ি তো আছেই, নারকেলও পেয়ে যাবেন​, আর সেই দুটোর কম্বিনেশনে কি করতে পারেন সেটা নিশ্চ​য়ই আর বলে দিতে হবেনা। তা ছাড়া, টেস্ট করে দেখতে পারেন সী-বাস​। আলু-ফুলকপি দিয়ে ভেটকির রেসিপিতে রান্না করলে বেশ ভালোই লাগবে।

সী-বাস – অপারগের ভেটকি

মাছ ছেড়ে একটু অন্যদিকে যাওয়া যাক​। আমার আবার শাকসব্জি খুব​-একটা পছন্দ ন​য়​, তবে আমার স্ত্রী সবুজের ভক্ত (না না, পলিটিক্সে যাবেন না)। নেদারল্যান্ডসে সব্জি-বাজারও আটকে আছে চার​-পাঁচরকম অপশনের মধ্যেই। ফুলকপি-বাঁধাকপি-কর্গেট​-ব্রকোলি-বেগুন-স্প্রাউট​। আর​, ওই টুকটাক অ্যাসপারাগাস, লেটুস ইত্যাদি পাওয়া যায়​, তবে ওগুলো খায় না মাথায় দেয় সেটা আমি এখনো জানিনা। তাই, সব্জি মানেই ওই ফুলকপি দিয়ে আলু, আর আলু দিয়ে ফুলকপি। ইন্ডিয়ান গ্রসারীগুলোতে গেলে ভাগ্য ভালো থাকলে শুকনো পটল আর বুড়ো ঢ্যাঁড়শ পেয়ে যাবেন​, তবে সেগুলো আপনার রসনাতৃপ্তি করবে কি না, সেটায় সন্দেহ আছে। তবে, কর্গেটের সাথে কুঁচো-চিংড়ি (বা, স্রিম্প​) দিয়ে লাউ-চিংড়ির রেসিপিতে রাঁধতে পারেন​, মন্দ ন​য়​।

ইন্ডিয়ান গ্রসারীতে গেলে উচ্ছে, কুম​ড়ো, লাউ ইত্যাদি পাবেন​, সেটা আপনার স্বাদমতো এবং সাধ্যমতো নিতে পারেন​। আর​, যেটা এখানে পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যায়​, সেটা হচ্ছে – আলু। যাঁরা আলু খেতে ভালোবাসেন​, তাদের কাছে স্বর্গ যদি থাকে কোনখানে, তবে তাহা এইখানে। ৫০০ গ্রাম থেকে ৫ কিলোর বস্তা – কাটা, গোটা, ম্যারিনেট করা, বিভিন্ন সাইজের​, বিভিন্ন আকৃতির – দেখেশুনে বেছে নিলেই হলো।

আর​, মাংস মোটামুটি আপনি সব ধরণের পাবেন – ইনক্লুডিং পাঁঠার মাংস​। আমি আবার আগন্তুক​-এর মনমোহন মিত্রের মতো সর্বভুক এবং স্বল্পাহারী, তাই আমার সব ধরণের মাংসই চলে। কিন্তু, সাংসারীক সম্পৃতি বজায় রাখতে বাড়ীতে মুরগী ও পাঁঠা ছাড়া আর কিছুর প্রবেশ নিষেধ​। মুরগীর মাংস নিয়ে কোন কথা নেই (কারণ​, ওটাকে আমি ঠিক মাংসের পর্যায়ে ফেলতে পারি না), পাঁঠার মাংস নিয়ে দুইখান কথা আছে। প্রথমতঃ, এখানে কিন্তু মাটন বলতে ল্যাম্ব বোঝে। তাই, মাটন কিনে বাড়ি ফেরার আগে, বিশেষতঃ যদি আপনার ল্যাম্বে রুচি না থাকে, একবার ভালো করে জিজ্ঞাসা করে নেবেন​। এখানে মাটন পেতে গেলে আপনাকে ‘খেইতেনভ্লিশ’ (Geitenvlees) চাইতে হবে। দ্বিতীয়তঃ, এখানে কিছু ভারতীয় দোকানেও পাঁঠার মাংস বিক্রি করে। একটু দাম বেশী, কিন্তু ওখান থেকে কেনাই নিরাপদ​। নাহলে, অনেকক্ষেত্রে মাংস সেদ্ধ হতে-হতে আপনার লাঞ্চ​-টাইম এবং অ্যাপেটাইট – দুটোই গায়েব হ​য়ে যেতে পারে।

আর আপনি যদি আমার মতো সর্বভুক হন​, তাহলে অবশ্যই পর্ক চেখে দেখুন​। আপনার পছন্দের স্টেক​-হাউজে বসে স্পেয়ার-রিবস বা মিডিয়াম​-রেয়ার স্টেকের সাথে বিয়ার খাওয়ার মজাই আলাদা।

স্পেয়ার ​- রিবস: খেতে হ​য়​, নাহলে পিছিয়ে পড়তে হ​য়​

শেষ করার আগে ডাচ স্ন্যাক্স নিয়ে দু-চার কথা না বললেই ন​য়​। বিশেষতঃ, বিটারবলেন​। মাংসের চপের ছোট গোলাকৃতি ভার্শন​, খেতে বেশ ভালো। বিধিসম্মত সতর্কীকরণ​, বিটারবলেন কিন্তু বীফ এবং পর্কের মিশ্রণ​। তবে, গরম​-গরম বিটারবলেনের সাথে আড্ডা জমানো কিন্তু চপ​-মুড়িকে যে-কোন সম​য়ে টক্কর দিতে পারে।

যাক​, এই হলো নেদারল্যান্ডসে খাওয়া-দাওয়া ইন আ নাটশেল​। অনেক কথা পেটে চেপে রাখলাম​, সেটা বার করতে গেলে সেই শূন্যস্থান ভালো খাওয়া দিয়ে রিপ্লেস করাতে হবে। নিদেনপক্ষে, বিয়ার​-বিটারবলেন​-সমৃদ্ধ আড্ডা হলেও চলবে।

আপাততঃ, নিজে পড়ুন​, পাড়াপ্রতিবেশী-বন্ধুবান্ধব​-আত্মীয়স্বজনকে প​ড়ান​, আর রেসিপি-হিন্টগুলো বাড়ীতে বানিয়ে জানান কেমন লাগলো।

Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: