একলা

শেলী নন্দী

বাঁধাকপি আরেকটু ঝিরিঝিরি করে কাট না নমি—ফরমাশী গলায় বাক্য ছুঁড়ছেন প্রতিভা দেবী। 
আজ বিকেলে ছেলের বন্ধুরা আসবে তার বাড়ীতে। চিকেন পকোড়া আর বাঁধাকপির পকোড়া আর সাথে লস্যি। ছেলের আবদার আর মায়ের রন্ধন প্রীতি মিলেমিশে একাকার।

ছেলে প্রসূন এক বছর হল চাকরী সূত্রে পুনেতে। একমাত্র ছেলেহীন সংসারে এখন ছেলের বাবা আর মা। সুগার আর প্রেসারের হাতছানি এসে পড়েছে ইতিমধ্যে। বুঝে শুনে খাওয়ার তাগিদে ভাল মন্দ রান্না একপ্রকার অতীত। ছেলে আসার আনন্দে তাই মন ভরে রান্না আবার তরতাজা করেছে প্রতিভা দেবীকে।

রান্নাঘর আর সংসার ই তার পৃথিবী। আজকাল টিভি তে রান্নার শো গুলো খুব টানে তাকে কিন্তু তৎপরতার আলসেমিতে আর এগোনো হয় না। এটা ওটা রান্না করে পাশের বাড়ীর তনিমা অনিমাদের অনেক খাইয়েছে। এখন তারাও বহুদিন দেশছাড়া।
আজ সকালেই এক যুগ পর বানিয়েছিলেন হিং এর কচুরী আর ছোলার ডাল। সাথে নিজের হাতে বানানো রসমালাই।
———মা আমার সাথে পুনা চল। খুউউউব মিস করি 
তোমার হাতের ছোঁয়া। 
———তোর বাবা এই পৈতৃক ভিটে ছেড়ে নড়লে তো!
——আমার বড্ড একা লাগেরে খোকা। 
——জানিস ই তোর বাবাকে। 
——সারাটা জীবন শুধু চাকরী আর
রিটায়ার্ডের পর বই আর বাগান। 
———দমবন্ধ লাগে আজকাল।

প্রসূন মোবাইলে ফেসবুক পেজ নিয়ে খানিক খোঁড়াখুড়ি করছিল। মায়ের কথাগুলোর একলামি টা ধরা পড়লো কিনা কে জানে?
——একাকিত্ব যাপন একটা আর্ট বুঝলে গিন্নী
শোফায় বসে বই এ মুখ গুঁজে পড়ে থাকা বিমান বাবুর ফোঁড়নটি বিস্ফোরণের আকার নিলো না রান্নাঘরের প্রেসারের সিটির আহ্বানে।

দুপুরে খাবার টেবিল আলো করা সব উপাদেয় খাবার। চিংড়ির পাতুড়ীটা পরম তৃপ্তিতে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল প্রসূন। আমের চাটনির বাটি ছেলের পাতে এগিয়ে দিয়ে বললেন কাল তোর প্রিয় পুডিং বানাবো খোকা। 
——আচ্ছা খাবার আর রান্না ছাড়া তুমি কিছু ভাবতে পারো না গিন্নী?
——না পারি না। 
অভিমান জড়ানো গলায় আজ মিশেছে শ্লেষ।
ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখে আকুতি ঢাললেন দেবী। 
ছেলের নিশ্চুপ থাকাটায় আপাত আহত হলেও সামলে নিয়ে চলে গেলেন নিজের ঘরে। 
সন্ধ্যার পর একে একে আসতে থাকে প্রসূনের ব্ন্ধুরা। দীপ্ত ঈশান, তিতির,ফাগুন,চয়ন সবাই ছাদের নৈশ আড্ডায় বিভোর। 
যথা সময়ে কাকীমার হাতের তৈরী পাকোড়ায় আড্ডা জমাটি হয়। 
কাকীমা কত্তদিন পর তোমার হাতের পাকোড়া খেলাম। 
প্রসূন নেই আর তোমরাও বুড়ী কাকীমার খোঁজ নাও না। মাঝে সাঝে তো আসতে পারো। 

মায়ের অকারন অভিমান আজকাল গভীর হয়ে উঠেছে বুঝতে পারে প্রসূন কিন্তু আমল দেয় না অতটা। 
বিমান বাবু কাছেই এক লাইব্রেরি গেছেন নিত্য দিনের মত। 
ছাদে বন্ধু বান্ধবদের সাথে হইচই করছে ছেলে। 
নিজের ঘরে এসে আরো একা লাগে প্রতিভা দেবীর। না পাওয়ারা আজকাল ভীষণ রকম জ্বালাতন করে তাকে। জীবনের এই ধাপটায় এসে আইডেন্টি ক্রাইসিস থাবা বসায় অনেকাংশে। ঠেলেঠুলে ভীড় জমে অন্যদের উপেক্ষা। অবান্তর গুরুত্বহীনতা ফ্যাকাশে করে দেয় রোজকার জীবন যাপন। 
রাতের খাবার টেবিলে আজ পরোটা আর চিকেন কষা। 
বিমানবাবুর জন্য রুটি। তেলে ভাজা না পসন্দ তার। শরীরী সচেতনতায় অভ্যস্ত বিমানবাবু ছেলের সাথে অফিসের গল্পে মশগুল। 
মা কাল কিন্তু আমি দুপুরে থাকছিনা। ডানকুনি যাবো আবীরের বাড়ী। রাতে ফিরবো কিনা পরে ফোনে জানিয়ে দেবো। 
যাঃ কাল যে ভাবলাম তোর প্রিয় মোচার ঘন্ট বানাবো। পরশু ই তো চলে যাবি বাবা। 
হুম মা। সব খাবো ঠিক। 
ছেলেকে চাকরী ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে বলো না। ওয়ার্ক ফ্রম হোম তো আছেই।

সারাদিন বসে মায়ের হাতের তৈরী খাবার খাবে। 
টিপ্পনী ছুঁড়লেন বিমান বাবু। 
ফোনে কথা বলতে বলতে উঠে গেল প্রসূন ও। 
টেবিল জুড়ে পড়ে রইলো ব্রাত্য খাবারেরা। 
নিয়ম মতো কাজ সেরে নিজের ঘরে এলেন প্রতিভা দেবী। 
পরিপাটি বিছানায় ঘুমোচ্ছেন বিমান বাবু। ফ্যানের স্পীডটা আজ বেশ কম। পাশের ঘরে প্রসূন তখন ও জেগে। 
ল্যাপটপে চোখ ডুবিয়ে আধশোয়া ছেলে। 
—কখন ঘুমোবি বাবা?
—কিছু বলবে?
—হ্যাঁ । 
—কাল শুনি মা। একটু ইমপর্টেন্ট কাজ করছি। 
—হুমমম। 
ঘরের এসিটাও বেশ গরম আজ। 
আমসত্ব,নাড়ু ,আমতেল,চালতের আচার, চিঁড়ে ভাজা,গুড় বাদাম, ছাঁচ সন্দেশ সব একটা ব্যাগে গুছিয়ে দিয়েছেন প্রতিভা দেবী। রাত আটটার ফ্লাইটে পুনে উড়ে গেল প্রসূন। 
ঝাপসা চোখে আবার এক বুক একাকিত্ব নিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। 
জামরুল গাছের অবাধ্য ডালপালা গুলো কার্নিশের ধার বেয়ে ঝুঁকে পড়েছে বেশ খানিকটা। লেবুর আচারের শিশিটা তোলা হয়নি আজ। ত্রিফলার আলো এসে পড়েছে ওর গায়ে।

মাথাটা ভীষণ ভার হয়ে আছে প্রতিভা দেবীর। মনটা আরো। আবার সেই গিলে খাওয়া শূন্যতা। বাগান ঘেরা একতলা বাড়ীটা ছবির মত সাজানো। সাজানো আসবাব আর সাজানো পারিপাট্য। সাজানো জীবন খাতাতেও একঘেয়েমির নিস্তব্ধতা। 
ব্যস্ততার আঁকিবুকি জীবনে ছন্দ আনে। কেজো তাগিদ জীবন কে সম্পৃক্ত করে—এই বয়সটা সেটা বেশ জানান দেয়।

কড়া এক কাপ চায়ে মাথার ঝিম ভাবটা কাটলো বেশ। টিভির পর্দায় তখন স্টার জলসার আধিপত্য। ছেলের ঘরে এলেন প্রতিভা দেবী। পায়ে পায়ে একটা বিষণ্ণতার ছায়া। অগোছালো ঘর জুড়ে ছেলের অস্তিত্বের গন্ধ। টেবিলে রাখা তিনজনের ছবিটা বড্ড বেশী জ্যান্ত। 
দার্জিলিং এর পাহাড় ঘেরা ছবিটায় ইলেভেনের প্রসূন আজ অনেক ব্যস্ত —অনেক অন্য —অনেক অজানা। 
কর্মব্যস্ত ছেলে চলে গেছে প্রায় দিন সাতেক হল। রাতের দিকে ফোনাফুনিতে মা ছেলের কথা হয় অল্প বিস্তর। রবিবার গুলোয় মুখিয়ে থাকা প্রতিভা দেবী নিরাশ হন ছেলের ঔদাসীন্য দেখে। 
সযত্নে চর্চিত চারাগাছ বৃক্ষ হলে শাখা প্রশাখার বিস্তার অনিবার্য । 
——মা তোমায় তিতিরের বাড়ী থেকে ফোন করবে। 
ওর বৌদির জন্য। 
—মানে?
—তুমি বিকেলের দিকটায় তো বসেই থাকো। 
তিতিরের বৌদিকে একটু রান্না শেখাও না। 
তিতিরের ভোজন বিলাসী দাদার জন্য বৌদি তোমার কাছে হাত পাকাবে মা। 
খানিক হতভম্ব খানিক অপ্রত্যাশিত আনন্দে চোখ ভিজে যায় প্রতিভা দেবীর।

এরপর ফোনে কথা হয় তিতিরের বৌদি রুমেলার সাথে। আগামী সপ্তাহে সোম আর বুধ বিকেল ৫টা।

আরো দুজন ছাত্রী জুটেছে প্রতিভা দেবীর। প্রসূনের বন্ধুুর কাকীমা আর এক প্রতিবেশী।

বেশ একটা চনমনে উদ্যোগী ভাবে ঝলমলে কাটছে দিনগুলো। কুরিয়ারে ছেলের পাঠানো জিনিস দেখে আপ্লুত মা বেজায় খুশী। 
ননস্টিকের রঙীন ইউটেনসিলস আর অ্যাপ্রোন। 
রান্নাঘর সেজে উঠেছে আরো সুন্দর ভাবে। 
টিভিতে যেমনটা দেখায়। 
সাজোসাজো রব আমেজটাও বেশ উপভোগ্য। 
আরো উপভোগ্য প্রসূনের মায়ের প্রতি খেয়াল করা ভালবাসা। 
নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ লাগছে। 
একটা খুশী খুশী ভাব জড়িয়ে রাখছে তাকে সারাদিন। 
অনেক কিছু ভাবনা চিন্তারা ঘুরপাক খাচ্ছে আর একলা ভাব টা দৃরে সরে যাচ্ছে আজকাল। 
—তা গিন্নী কতজন ছাত্রী হল?
—তিনজন আপাতত । 
—বেশ বেশ। 
রান্নার দিদিমনি ফিজ্ কত নিচ্ছেন?
—তুমি বই পড় না অত কৌতূহল কেন?
—স্কুলের নাম টাম রাখবে না?
—তুমি ঠিক করে দাও। 
প্রতিভাস্ কিচেন———
হাতা খুন্তি ————
রন্ধনে বন্ধন ———
রান্নায় বান্নায়———
——থামো বাপু। ঢের হয়েছে। 
হাসির ফোয়ারা ধুয়ে দিচ্ছে গোটা ঘর। 
কিছু স্বপ্ন এভাবেই আকার পাবার অপেক্ষায় বাঁচার রসদ তৈরী করে। 
একলা জীবন এখন সোমবার বিকাল ৫টার অপেক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *