আইনস্টাইনঃ একজন “অবিশ্বাসী ধার্মিক” বিজ্ঞানী

সৌমেন পাত্র

আধুনিক যুগে যদি কোন একজন বিজ্ঞানীর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তিনি হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। সাধারণভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, তিনি খুব ধার্মিক তথা ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন। এরকম ধারণা গড়ে ওঠার কারণ হল, আইনস্টাইন বিভিন্ন সময়ে ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে বিভিন্ন আপাত-ইতিবাচক মন্তব্য করে গেছেন। যেমন – কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তার ধারণা মানতে পারেন নি বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “God does not play dice.” – ঈশ্বর পাশা খেলেন না! এছাড়া ধর্ম সম্পর্কে তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি হল, “Science without religion is lame, religion without science is blind.” – ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান খোঁড়া আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ। এইসব উক্তিগুলি থেকে তাঁকে একজন ঈশ্বরবিশ্বাসী ও ধার্মিক ব্যক্তি বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। আর এটাও আশ্চর্যের নয় যে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তাঁর এইসব উক্তিগুলি উদ্ধৃত করে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইকনকে নিজেদের মতপ্রচারের কাজে ব্যবহার করবেন।

কিন্তু সমস্যা হল, আইনস্টাইন আবার এমন কিছু উক্তিও করে গেছেন যেগুলি সরাসরি ঈশ্বরবিশ্বাসের বিরোধিতা করে এবং সেই কারণে আপাতভাবে উপরের উক্তিগুলির বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। নিচে এরকম কিছু উক্তি উদ্ধৃত করা হল।

“I do not believe in a personal God and I have never denied this but have expressed it clearly.”

“The idea of a personal God is quite alien to me and seems even naive.”

“The word God is for me nothing more than the expression and product of human weaknesses, the Bible a collection of honorable, but still primitive, legends which are nevertheless pretty childish.”

অর্থাৎ তিনি ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, যে ঈশ্বরের কথা বাইবেলে (কিংবা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে) বলা হয়ে থাকে। অথচ আমরা আগে দেখেছি, তিনি ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাস করেন। তার মানে সাধারণ মানুষ যেভাবে ঈশ্বর ও ধর্মকে দেখে, তিনি ঠিক সেই অর্থে ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাস করেন না। তাহলে তিনি ঠিক কী অর্থে ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাস করেন?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের আইনস্টাইনের বিদ্যাচর্চার ইতিহাসটা জানতে হবে। ধার্মিক ইহুদী পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁকে শৈশব থেকে বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ রীতিমতো পড়ানো হয়েছিল। একেবারে শৈশবে তিনি হয়তো সেসব বিষয় অক্ষরে-অক্ষরে বিশ্বাসও করতেন। কিন্তু কৈশোরের সূচনায় তাঁর মোহ ভেঙে যায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগ করেন কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁকে কিছু মিথ্যা বিষয় বিশ্বাস করিয়ে প্রতারিত করা হয়েছিল! কিন্তু পরবর্তী জীবনে তাঁর ধ্যানধারণা থেকে আমার অনুমান, শৈশবের ধর্মশিক্ষার সবকিছু তিনি নস্যাৎ করে দেন নি। বরং ধর্ম বলতে তিনি আজীবন যা বিশ্বাস করে গিয়েছিলেন, তার বীজ উপ্ত হয়েছিল ওই শৈশবের ধর্মশিক্ষার মধ্যেই।

ধর্ম বলতে আইনস্টাইন ঠিক যা বুঝেছিলেন, সেটা অত্যন্ত গভীর। নাস্তিকদের পক্ষে সেটা উপলব্ধি করা তো সম্ভব নয়ই, এমনকি অধিকাংশ সাধারণ আস্তিক ব্যক্তি, যারা কেবল মানসিক নিরাপত্তা লাভ করার জন্যই ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাঁদের পক্ষেও ব্যাপারটা বোঝা একইরকম কঠিন। একমাত্র যারা ধর্মের গভীরে গিয়েছেন, তাঁরাই এই মহান বিজ্ঞানীর ধর্মভাবনা বুঝতে পারবেন। ধর্মের একেবারে মূলে গেলে দেখা যাবে, ঈশ্বরে বিশ্বাস আদৌ ধর্মের অপরিহার্য শর্ত নয়। কেউ ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও সত্যিকারের ধার্মিক হতে পারেন। আবার কেউ ঈশ্বরে বিশ্বাস করেও প্রকৃত ধার্মিক নাও হতে পারেন। সাধারণত মানুষ মানসিক নিরাপত্তা লাভের জন্য ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। কিন্তু তিনি যদি ওখানেই থেমে থাকেন, তাহলে তাঁকে প্রকৃত অর্থে ধার্মিক বলা যাবে না এবং এদিক থেকে একজন নাস্তিকের সঙ্গে তাঁর কোন পার্থক্য নেই। বরং নাস্তিক একটা দিক থেকে তাঁর থেকে এগিয়েঃ তিনি ঈশ্বরের মতো একটা অযৌক্তিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত। তাহলে সত্যিকারের ধার্মিক হওয়ার উপায় কী? ঈশ্বরে বিশ্বাসী ব্যক্তি যখন ঈশ্বরের বিশালতার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করে নিজের অহংকে বিসর্জন দিতে সক্ষম হবেন, তখনই তাঁকে প্রকৃত অর্থে ধার্মিক বলা যাবে। অন্যথায় তিনি কেবলই একজন আস্তিক, ধার্মিক নন। ধর্মের গভীরতম বক্তব্য হল, আমাদের অহংবোধ আমাদের প্রধান সমস্যা। এই অহংবোধের কারণেই আমরা লোভী হই, স্বার্থপর হই, অন্যকে হিংসা করি, অন্যকে ভালোবাসতে পারি না। তাই ধর্মের মূল লক্ষ্য হল এই অহংবোধকে বিসর্জন দেওয়া। আর তার উপায় হল ঈশ্বরে বিশ্বাস। ঈশ্বর বিরাট-বিশাল আর আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, এটা উপলব্ধি করতে পারলে আমাদের অহংবোধ লুপ্ত হয়ে যাবে।

অহংবোধের বিসর্জনই যদি ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়, আর ঈশ্বরে বিশ্বাস যদি সেই উদ্দেশ্যসাধনের একটা উপায় হয়, তাহলে নিশ্চয় তার অন্য বিকল্প উপায় থাকাও সম্ভব। ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কিশোর আইনস্টাইন যখন পাশ্চাত্য দর্শনের পাঠে গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন, তখন একজন আধুনিক দার্শনিকের চিন্তাভাবনার মধ্যে তিনি সেই বিকল্প উপায়ের সন্ধান পেলেন। সেই দার্শনিকের নাম বারুখ স্পিনোজা, আইনস্টাইন আজীবন যার মতবাদ বিশ্বাস করে গেছেন। কী বলেছিলেন স্পিনোজা? তাঁর মতে মানুষের নিজেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুভব করার জন্য ঈশ্বরের কোন প্রয়োজন নেই। মানুষ যদি একবার এই বিরাট মহাবিশ্বের দিকে তাকায়, তাহলেই সে বুঝতে পারবে, সে কত ক্ষুদ্র। কী বিরাট এই মহাবিশ্ব, অথচ কী নিখুঁত তার শৃঙ্খলা! সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, পৃথিবী, পৃথিবীতে আবার প্রাণ – সবকিছু যেন নিখুঁত ছন্দে সাজানো। এই বিরাট শিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে একটা অনুভবই হওয়া স্বাভাবিক – ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা, ইংরেজিতে যাকে বলে awe! আর সেটা যার হবে, সে নিজেকে আর বড়ো ভাববে কি করে? তার অহংবোধ কোথায় হারিয়ে যাবে! স্পিনোজার কাছে তাই ঈশ্বর মানে কোন সর্বশক্তিমান চেতনা নয়, ঈশ্বর মানে এই বাস্তবের মহাবিশ্ব যার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে নিজের ক্ষুদ্রতাকে। কিশোর আইনস্টাইনের ভীষণ পছন্দ হল এই দর্শনটি। বাইবেলের ঈশ্বরের ধারণা তিনি মানতে পারেন নি, অথচ মনের কোথাও নিজের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করার ব্যাপারটা হয়তো তাঁর ভালো লেগেছিল। এখন বাইবেলের ঈশ্বরের জায়গায় স্পিনোজার ঈশ্বরকে বসিয়ে দিলে তাঁর সত্যনিষ্ঠতাও বাঁচল, আবার ধর্মের আসল উদ্দেশ্যও সফল হল।

কৈশোর পেরিয়ে যৌবন। দর্শন ছেড়ে আইনস্টাইন এবার বিজ্ঞানে বেশি করে মন দিলেন। আর কী আশ্চর্য! এখন তিনি আরও বেশি করে বুঝতে পারলেন, স্পিনোজা কতখানি সঠিক ছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণের হাত ধরে মহাবিশ্বের গভীরে প্রবেশ করে তিনি প্রতি মুহূর্তে আরও বেশি করে স্পিনোজা-কথিত শৃঙ্খলাকে উপলব্ধি করলেন, তার সামনে নতজানু হলেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর এই দর্শন আর তাঁর বিজ্ঞানচর্চা হাতে হাত ধরে চলেছে। পদার্থবিজ্ঞান ছিল তাঁর কাছে মহাবিশ্বের বিরাট শৃঙ্খলার পর্দা-উন্মোচন, যে শৃঙ্খলা তাঁকে তাঁর অহংবোধ বিসর্জন দিয়ে প্রকৃত ধার্মিক হতে সাহায্য করবে। সারাজীবন আইনস্টাইনের কাছে এই শৃঙ্খলাই ছিল ঈশ্বর আর এই শৃঙ্খলার কাছে নতজানু হওয়ার নামই ছিল ধর্ম।

এবার আশা করি, তাঁর ঈশ্বর ও ধর্ম সংক্রান্ত উক্তিগুলি বুঝতে আমাদের সমস্যা হবে না। তিনি যখন বলছেন, “God does not play dice”, তখন তিনি ঈশ্বর বলতে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলাকেই বোঝাচ্ছেন, যে শৃঙ্খলা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তাকে সমর্থন করে না। এই কারণেই তিনি বলতে পারেন, “Science without religion is lame, religion without science is blind.” কেননা তাঁর বিজ্ঞানচর্চার মূলে অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল তাঁর এই “ধর্ম”। আবার ঈশ্বর বলতে তিনি কেবলমাত্র মহাবিশ্বের শৃঙ্খলাকে বুঝতেন বলেই তিনি এটাও বলতে পারেন যে, তিনি ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, যে ঈশ্বর মানুষের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তিত। না, এরকম কোন ঈশ্বরে তিনি বিশ্বাস করতেন না। নিচের উক্তিগুলি থেকেই এটা প্রমাণ হবে –

“I believe in Spinoza’s God who reveals himself in the orderly harmony of what exists, not in a God who concerns himself with fates and actions of human beings.”

“What I see in Nature is a magnificent structure that we can comprehend only very imperfectly, and that must fill a thinking person with a feeling of humility. This is a genuinely religious feeling that has nothing to do with mysticism.”

“If something is in me which can be called religious then it is the unbounded admiration for the structure of the world so far as our science can reveal it.”

এই কারণেই তিনি ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে নিজেকে এমন একটি বিশেষণ দিয়েছিলেন, যা আপাতদৃষ্টিতে ধাঁধার মতো শোনায়। তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, “I am a deeply religious nonbeliever. This is a somewhat new kind of religion.” তিনি গভীরভাবে ধার্মিক কেননা তিনি নিজের অহংবোধকে বিসর্জন দিয়েছেন, কিংবা অন্ততপক্ষে বিসর্জন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি আবার অবিশ্বাসী কারণ তিনি প্রচলিত অর্থে ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। এটা একটা নতুন ধরণের ধর্ম যা প্রচলিত ধর্মের অযৌক্তিক দিকটাকে বাদ দিয়েও তার মূল উদ্দেশ্যটাকে বজায় রাখে।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করলে আশা করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আইনস্টাইনের কাছে এই ব্যাপারটা নতুন মনে হলেও তিনি নিশ্চয় জানতেন না যে, তাঁর আড়াই হাজার বছর আগে গাঙ্গেয় ভারতবর্ষে একজন দ্রষ্টা ঠিক এই কাজটিই আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে করেছিলেন – ঈশ্বর ও অন্যান্য অযৌক্তিক বিষয়কে বাদ দিয়ে অহংবোধ বিসর্জন দেওয়ার একটি অভিনব পন্থা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। আলবার্ট আইনস্টাইন গৌতম বুদ্ধের মতবাদ সম্পর্কে নিশ্চয় বিস্তারিত জানতেন না। নইলে স্পিনোজার পাশাপাশি তিনি হয়তো তাঁকেও জীবনে গ্রহণ করতে পারতেন।

Reference:
Richard Dawkins, The God Delusion
https://www.theguardian.com/…/physicist-albert-einstein-god…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *