সমুদ্রস্নান

সৌমেন খাঁ

ডায়মন্ড হারবার – বকখালি – হেনরী আইল্যান্ড – মৌসুনী আইল্যান্ড

ঠিক সময়ে বকখালি পৌঁছাতে পারবো না বলে বাড়ি থেকে একটু বেলা করেই বেড়িয়েছিলাম। দুপুর নাগাদ পৌঁছেছিলাম ডায়মন্ড হারবার। ওখানেই রাত টুকু কাটিয়ে একদম সকালে বকখালি যাওয়ার প্ল্যান ছিলো। সেই মতো ডায়মন্ড এ হোটেল হংসরাজ এ থেকে গিয়েছিলাম।

খুব পরিপাটী করে সাজানো গোছানো, সুইমিং পুল, বড় লন- বাগান, বার -রেস্তোরাঁ সহ সফিস্টিকেটেড বাজেট হোটেল। এ.সি. রুম ১৩০০। একদম ১১৭ নং ন্যাশানাল হাইওয়ের পাশেই।

সুপারি গাছের সারি, হোটেল হংসরাজ – ডায়মন্ড

বিকেল টা ডায়মন্ড এ গঙ্গার মিষ্টি হাওয়া খেয়ে আর ঢেউ গুণে ,গল্প করে কেটে গেলো। ফেরার পথে বেনফিস এর গাড়ি থেকে সুস্বাদু মাছ এর কয়েকটা গরম গরম পদ কিনে খেতে খেতে হোটেল এ ফিরলাম।

ডায়মন্ড এ সূর্যাস্ত

পরদিন খুব সকালে ডায়মন্ড থেকে কলকাতা – বকখালি সরাসরি বাস ধরে নামখানা নূতন ব্রিজ এর উপর দিয়ে একেবারে বকখালি। উঠলাম হোটেল শিখা তে। বাস স্ট্যান্ড এর একদম কাছেই,সমুদ্রতট হেঁটে ৫ মিনিট। ভালো, বাজেট হোটেল। ঈদের ভিড় শুরু হতে চলার জন্য রুম চার্জ একটু বাড়িয়েই বলছিল, শেষমেশ এ.সি. রুম এখানেও ১৩০০ নিল।

এখন বকখালি র সমুদ্রতট অনেক পিছিয়ে গেছে। ভাটার সময় তো কতটা হেঁটে গেলে তবে জলের দেখা মেলে, ভরা জোয়ারে গেলে তবে একটু ঢেউ গায়ে মাখা যায়। তবে কোলাহল থেকে দূরে নির্জনতা চাইলে আসতেই পারেন। দুপুরে খাওয়া দাওয়া পর্ব চুকিয়ে কুমীর প্রকল্প এবং ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখতে গেলাম।

ম্যানগ্রোভ – বকখালি

এই একটা জিনিস খুব ভালো লাগবে।কুমির প্রকল্প দেখার পর ওই রাস্তা তেই সোজা বাউন্ডারি র বাইরে গিয়ে বিস্তির্ণ অঞ্চল জুড়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ভিতর দিয়ে হাঁটতে এতো ভালো লাগবে যে আপনি ভুলেই যাবেন এই বহির্বিশ্বের সম্পর্কে।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন শুনতে পাবেন সমুদ্রের গর্জন, আপনাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আপনি একছুটে দেখতে গিয়ে দেখবেন যত সমুদ্রের দিকে আগাচ্ছেন ততই যেন সমুদ্র আপনার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে এগিয়ে যাচ্ছে, অবশেষে যখন ঝাউবনের আড়াল থেকে সমুদ্র কে দেখতে পাবেন দেখবেন এক অনাবিল আনন্দে আপনার মন প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মাঝে… বকখালি

আর তখনই সেই ঝাউবনের মধ্যে বালির উপরে আপনি বসে নিস্তব্ধ নির্জনতায় নিজেকে নূতন করে খুঁজে পেতে চাইবেন, নূতন করে চিনে নিতে চাইবেন। ওখান থেকে টোটো ভাড়া করে সমস্ত সাইট সিইং করা যায়।আমাদের হাতে সময় কম থাকায় শুধুমাত্র হেনরী আইল্যান্ড গিয়েছিলাম।

বোঝাপড়া ❤❤ ম্যানগ্রোভ ক্যানোপি, হেনরী আইল্যান্ড

এখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এর মৎস্য বিভাগ এর তত্ত্বাবধানে মৎস্যচাষ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ৫০ টাকা টিকিট। গাড়ি অনেকটা ভিতর  প্রায় সমুদ্র তট পর্যন্ত চলে যায়। আর একটি নির্জন দ্বীপ, ঠিক যেমন টি আপনি খোঁজেন নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।

মাঝির লাগি আছি জাগি…পাতিবুনিয়া ঘাটে, মৌসুনী যাওয়ার পথে চেনাই নদীর খেয়া ঘাট

পরদিন সকালে বকখালি থেকে বেড়িয়ে বাস এ করে ১০ মাইল বাজার স্টপেজ এ নেমে টোটো ভাড়া করে পাতিবুনিয়া ঘাট। ভাড়া ২০০ টাকা (আমরা ৪ জন ছিলাম)। এখানে চেনাই নদী পার হওয়ার জন্য আছে মেশিন নৌকা। বেশ চওড়া নদী, প্রায় ১০ মিনিট লাগে নৌকা তে। ভাড়া মাত্র ৪ টাকা/হেড। নদী পার হয়ে আবার টোটো। একদম সোজা মৌসুনী দ্বীপ এ গিয়ে নামিয়ে দেবে। ভাড়া ১০০ টাকা।

আমরা ছিলাম চয়ন দার বালুচরি বীচ টেন্ট ক্যাম্প এ। ১০০০/হেড ইনক্লুডিং থাকা খাওয়া। সুন্দর থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা। একদম অন্যরকম এক ভালোলাগার জায়গা।

বালুচরি বীচ টেন্ট থেকে, মৌসুনী

এখানে সমুদ্র অনেক শান্ত এবং কোলাহল মুক্ত। গাছের ছাওয়ায় টেন্টের মধ্যে থেকে, সমুদ্রের আওয়াজ শুনে জেগে ওঠা এবং ঘুমোতে যাওয়া। যতটা পারা যায় ততটাই নিজের কাছে ফিরে যাওয়া যায়। এখানে কাজের যে ছেলে গুলো আছে, এতো ভালো আর অতিথিবৎসল না এলে বুঝতে পারবেন না। সামুদ্রিক পরিবেশে প্রকৃতিকে, নিজেকে জানতে হলে বুঝতে হলে চিনতে হলে আপনাকে আসতেই হবে মৌসুনী তে। বিভিন্ন রকমের পাখির ডাক শুনতে শুনতে আর সমুদ্রের নোনা হাওয়া খেতে খেতে কিভাবে আপনার সময় কেটে যাবে বুঝতেই পারবেন না, এটা গ্যারান্টি।

সমুদ্রের গর্জনে চলমান জলজ (শঙ্খ) (সূত্র – লেখক)

বিকেলের দিকে ভাটায় যখন জল অনেকটা নেমে যায় তখন সমুদ্রের নিচের জীবন ভেসে ওঠে এখানে। আর সন্ধ্যায় আপনার জন্য আছে ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়ার উপাদান, লাল কাঁকড়া। এখানের কাঁকড়া গুলো তাজপুরের মতো চট করে গর্তে ঢুকে পড়তে পারেনা, কিংবা হয়তো চায় না। হয়তো ওরাও চায় আপনি ওদের পিছনে ছুটে ধরার চেষ্টা করে আপনার শৈশব কে , নিজেকে ধরার চেষ্টা করুন।

না, তাজপুর সী বীচে না, এটা হেনরী

একটা ছোট তথ্য দিয়ে রাখি ; মৌসুনী দ্বীপ যাওয়ার জন্য চেনাই নদীর যে খেয়া পার হতে হয় তা মোটামূটি ৩ টি রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায়। বকখালি গামী যে কোন বাসে বললেই ওরা ঠিক ঠাক জায়গায় নামিয়ে দেবে। তারপর টোটো/মেশিন ভ্যান যাতে খুশি যাওয়া যায়। যেটা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সে টা হলো, খেয়া দিনের মধ্যে মোটামুটি বেলা ১২ টা থেকে দুপুর ৩ টে পর্যন্ত বন্ধ থাকে।বি.দ্র. — যেখানেই যাবেন পানীয় জল কিনে খাবেন অবশ্যই। মৌসুনী তে খুব সম্ভবত প্যাকেজড ড্রিঙ্কিং ওয়াটার পাওয়া যায়না, তাই আগে থেকেই কিনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।

  • খরচ জনপ্রতি ৩০০০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা।
  • উইকেন্ড ট্রিপ (দুই দিন তিন রাত)।

সমস্ত ছবি ও ভিডিও লেখকের নিজস্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *