আমস্টারডামের রঙ – লাল-হলুদ

বাঙালীর আড্ডার গ্লোবালাইজেশন ঘটেছে। আমরা, যারা আশির দশকে জন্মেছি, অনেক বিবর্তনের সাথে সাথে আড্ডার এই বিবর্তনটাও বেশ স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করেছি। জীবন বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে মিসিং লিঙ্ক​, আমরা হচ্ছি তাই। ডায়াল​-আপ কানেকশন থেকে ফোর​-জি (বা, অধুনা ফাইভ​-জি), ডায়ালিং ল্যান্ডলাইন থেকে হালের স্মার্টফোন​, ২৫৬ এম​-বি ফ্লপি ডিস্ক থেকে এক টেরাবাইটের ইউ-এস​-বি ড্রাইভ – সবই আমাদের চোখের সামনে ফ্রেম​-বাই-ফ্রেম সিনেমার মতো ঘটে চলেছে। আড্ডার ইভোলিউশনেও সেই প্রগতি স্পষ্ট​।

প্রাক​-ইন্টারনেট যুগে আমাদের মূল ইনফর্মেশন সোর্স ছিল পাড়ার আড্ডা, ছোটবেলায় খেলার মাঠে, একটু উঠতি ব​য়সে চায়ের দোকানে। বলাই বাহুল্য​, ফেক নিউজ তখনকার আড্ডায় নিয়মিত ছিল​, আর এখনকার মতো চটজলদি গুগল করে ভেরিফাই করার উপায়ও ছিল না। তাই সরল মনে বিশ্বাস করে নিতাম বেশ কিছু অবিশ্বাস্য গল্প​। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক​।

চুনী গোস্বামী ডিফেন্স থেকে ড্রিবল করে বিপক্ষের গোলপোস্ট অবধি গেলেন​, কিন্তু গোল করলেন না। আবার ড্রিবল করতে-করতে নিজের গোলপোস্টে ফিরে এলেন​। আবার উঠলেন​, ড্রিবল করতে-করতে বিপক্ষ পোস্টে গেলেন​, আবার ফিরে এলেন​। এইরকম তিন​-চারবার করে তারপর ফাইনালি গোল করলেন​। সে এক রূদ্ধশ্বাস মূহুর্ত​, চা জুড়িয়ে যাচ্ছে, আমরা হাঁ করে গল্প গিলছি, কখন চুনী গোস্বামী গোল করবেন​!

কিন্তু সবসম​য় তো আর এমন উত্তেজক গল্প থাকত না, তখন আলোচনা একটু মশলাদার করতে আসতো প্রধানতঃ দুটো প্রসঙ্গ – এক​, বাঙাল​-ঘটি। আর​, দুই, ইস্টবেঙ্গল​-মোহনবাগান​। বেশীরভাগ সম​য়েই এই দুই ভিন্ন প্রসঙ্গ মিলেমিশে এক হ​য়ে যেত​।

মোদ্দা ব্যাপার​, আপনার আদি বাড়ী যদি বাংলাদেশে হ​য়, অর্থাৎ আপনি যদি বাঙাল হন​, তাহলে আপনাকে ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার হতেই হবে, যতই আপনার চিমা বা দীপেন্দুর খেলা ভালো লাগুক​। আর​, ঘটি ইজ ইক্যুয়াল টু মোহনবাগান সাপোর্টার​। আর​, বাঙালী হ​য়ে ডেম্পো-সালগাওকার বা রেলওয়েজকে সাপোর্ট করবেন​, সে কথা মুখে আনাও পাপ!

আমার আদি বাড়ী ম​য়মনসিংহ​, তাই সেই সূত্রে আমি হ​য়ে গেলাম ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার​। তখন ফুটবল অতো বুঝতাম না, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার পদ পাওয়ার পরে বোঝার চেষ্টা করতে শুরু করলাম​, নাহলে আলোচনায় ভাগ নিতে পারব না যে! আর​, সেই থেকেই হ​য়তো ফুটবলের প্রতি, ক্লাবের প্রতি ভালোবাসাটা মনের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করলো।

তারপর থেকে প্রত্যেকটা ডার্বি ম্যাচে গলা ফাটিয়েছি, আসিয়ান জেতার পরে লাল​-হলুদে পাড়া মাতিয়েছি, যুবভারতীতে হার-জিতের সাক্ষী হ​য়েছি। তারপর​, একটা সম​য় এলো, যখন জীবনের অন্যান্য প্রায়োরিটি ম্যানেজ করতে করতে অন্য শখগুলোর মতো খেলা দেখার পাগলামীটাও এখন শূন্যতে এসে দাঁড়িয়েছে।

কাট টু, মে বা জুন ২০১৯। অভ্র ফোন করে বললো, ইস্টবেঙ্গলের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন ১০০-টা শহরে ইস্টবেঙ্গল​-সমর্থকরা কিছু আয়োজন করার প্ল্যান করছে। প্রধান আয়োজক​, ইস্টবেঙ্গল ফ্যান ক্লাব (ই-বি-আর​-পি) এবং বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন​। যেহেতু আমি নেদারল্যান্ডসে এক বাঙালী সংগঠনের সাথে যুক্ত​, যদি আমি আমস্টারডামে ব্যবস্থাপনায় কোনভাবে সাহায্য করতে পারি। যুবভারতী, আসিয়ান​, ন্যাশনাল লিগ​, ডার্বি – এক-এক করে সিনেমার মতো চোখের সামনে ফিরে এলো। উত্তর দিলাম​, “নিশ্চ​য়ই, কি করতে হবে?

প্রথম কাজ​, নেদারল্যান্ডসে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের খুঁজে বার করা, এবং এই প্ল্যানিং-এর খবর দেওয়া। হোয়াটস্যাপে ম্যাসেজ ছাড়লাম​, বেশ কিছু উৎসাহী সমর্থক জুটে গেল এক​-এক করে। ৩ আগস্ট তারিখ পাকা হ​য়ে গেছে, এবার দরকার একটা উপযুক্ত ভেন্যু। কোথায় করা হবে, সেই নিয়ে ফোনে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা চললো – এমন একটা জায়গা হওয়া চাই যা আমস্টারডামের প্রতীকী।

অরুণাভ বললো, বোট ভাড়া করে ক্যানালে করলে কেমন হ​য়​? ভালো আইডিয়া, কিন্তু তাহলে পাব্লিক কানেক্ট হবে না। অগত্যা, তিনটে জায়গা বাছাই করা হলো – এক​, মিউজিয়ামপ্লেইন (রাইখস​-মিউজিয়ামের পাশে), ড্যাম স্কোয়ার (নেদারল্যান্ডসের রাজবাড়ীর পাশে) আর স্কিফোল এয়ারপোর্ট (আই-আমস্টারডাম লেখার পাশে)। পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন​, কোন উইন্ডমিলের পাশে কেন ন​য়​? উত্তর​: এখানে উইন্ডমিলগুলো বেশ দূর​, সেখানে পাব্লিক কানেক্ট করাটা মুশকিল​।

যাক​, পরবর্তী কাজ মিউনিসিপ্যালিটি থেকে অনুমতি জোগাড় করা, কারণ পাব্লিক প্লেসে এই ধরণের কিছু করতে গেলে অনুমতি ছাড়া করা যায়না। অনুমতির জন্যে মিউনিসিপ্যালিটিকে মেইল করলাম। উত্তর এলো, ড্যাম স্কোয়ার বা মিউজিয়ামপ্লেইনে করা যাবে না, কারণ ওইদিন গে প্রাইড আছে। ঠিক কথা, এই ব্যাপারটা একদম মাথা থেকে বেড়িয়ে গেছিল​। (গে প্রাইড আমস্টারডাম এক বিশাল আয়োজন​, বিস্তারিত জানতে হলে গুগল সার্চ করুন​।) যাক​, অবশেষে হাতের পাঁচ পরে রইল স্কিফোল এয়ারপোর্ট​, ওখানে পারমিশনের ঝঞ্ঝাটও নেই। তো, সেটাই ফাইনাল করা হলো।

ডেট ফাইনাল​, ভেন্যু ফাইনাল​, এইবার তো একটু প্রচার করতে হ​য়​! সেই প্রচার দেখে যদি আরো সমর্থক পাওয়া যায়​, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। অতএব, পোস্টার বানানো হল। ফেসবুকে, হোয়াটস্যাপে প্রচার হলো। অল সেট​, এখন অপেক্ষা শুধু সেই প্রতীক্ষিত দিনের​।

ইস্টবেঙ্গল ১০০ বছরপূর্তি উপলক্ষে আমস্টারডাম সমর্থকদের পোস্টার​

অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিন​। সকালবেলা উঠে স্নান​-ব্রেকফাস্ট সেরে সবাই একে-একে জ​ড়ো হলাম নির্ধারিত জায়গায়​। আমি আর অরিজিৎ আগেই পৌঁছে গেছিলাম​, তারপর এক​-এক করে অরুণাভ​, অভ্র​, সত্যম​, রক্তিম​, শাওন​, সৌভিক – সবাই এসে গেল​। অরুণাভ একটা সুন্দর গান বেঁধে এনেছিল​, অভ্র ইস্টবেঙ্গলের বিখ্যাত হুটিং করলো, সেখানে যোগ দিল সবাই। ফেসবুক লাইভ​, ছবি তোলা ইত্যাদি হলো। অনেক অচেনা মানুষ এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো, জানলো ইস্টবেঙ্গলের ব্যাপারে। অরুণিমা একটা সুন্দর কেক বানিয়ে দিয়েছিল​, সেটা কাটা হলো।

বেশীক্ষণ ন​য়​, ঘন্টাখানেকের আয়োজন​, তবে সেই অল্প সম​য়েই সবাই ফিরে গেলাম সেই স্কুল​-কলেজের জীবনে, যখন মাঠে বসে ইস্টবেঙ্গলের জন্যে গলা ফাটাতাম​।

আমস্টারডামের অনেক রঙের মধ্যে সেদিন উজ্জ্বল হ​য়ে উঠলো দুটো বিশেষ রঙ – লাল আর হলুদ​। জ​য় ইস্টবেঙ্গল​!

কেমন হলো আমস্টারডামে ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ​-পালন​? ইউটিউবে গিয়ে এই ভিডিওটা দেখলে হ​য়তো কিছুটা আন্দাজ পাবেন​। নিজে দেখুন​, বাড়ীতে, পাড়ায় সবাইকে দেখান​, আর জানাতে ভুলবেন না কেমন লাগল​।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *