কালীদার ধুন্ধুমার

চিরন্তন ঘোষ

অনেকেই জানেন আমি এক প্রখ্যাত ইস্কুলের কুখ্যাত ছাত্র, স্কুল জীবনে এক মাধ্যমিক ছাড়া একটা পরীক্ষাও লাল কালি ছাড়া কাটেনি! আমরা তখন ক্লাস এইটে পড়ি, থাকি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের সিনিয়র সেক্শনের সারদানন্দ ভবনে | উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এই ভবনের (নামি দামি ইস্কুলে যাকে বলে হাউস) মহারাজ (ওয়ার্ডেন সন্ন্যাসী) ছিলেন ‘ক্যাল-স্পেশালিস্ট’, খুব কম সংখক ছেলে আছে যারা এনার হস্তস্পর্শ লাভ করেনি | জনপ্রিয় ধারণা ছিল, মৃদুলদা আগে পাড়ার দাদা ছিলেন, শেষে পুলিশ বা গণধোলাই এড়াতে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন! মোটের ওপরে ওনার ভবনে কেউই প্রকাশ্যে মিচকেমো করতে সাহস দেখাতো না | হলে কি হবে, আমরা মনে মনে, শ্রী রামকৃষ্ণের আরাধ্য, মা কালির থেকে বেশি হনুমানজিকে কাছের লোক ভাবতাম আর তাঁকেই সাধ্যমত অনুকরণ করতাম!

এহেন ভবনে থাকতেন কালীদা, রোগা-ফর্সা এবং সর্বোপরি ভদ্রলোক মানুষ… ইস্কুলে অঙ্ক শেখাতেন আর ভবনের স্টাডি হল পরিদর্শন করতেন | না ঘাঁটালে, মোটামুটি অনুকম্পাশীল লোক… স্টাডি হলে যত ইচ্ছে বাথরুম, থুড়ি হাওয়া বা স্টক (লুকোনো খাবার) খেতে, যেতে দিতেন| অঙ্ক আটকে গেলে তো কোনো কথাই নেই, না বুঝিয়ে ছাড়তেনই না | তাই আমাদের মধ্যে যারা চামচিকে টাইপের, তারা কে. সি. নাগ নিয়ে ওনাকে ছেঁকে ধরতো আর বাকিরা গল্পের বই বা নিচু স্বরে গুলতানি চালাতাম … মোদ্দা কথা, একদিকে মৃদুলদার উদোম মার আর অন্য দিকে কালীদার হালকা প্রশ্রয় – দুই মেরু|

আমারদের ক্লাসমেট মিতাদ্রু ছিল কালিদার যোগ্য শিষ্য; শান্ত-শিষ্ট মার্জিত ছেলে, লেখা-পড়ায় ভালো, ব্যাপক টেবিল টেনিস খেলতো আর ফুটবল-ক্রিকেটও বেশ চালাতো | কিন্তু চাঁদেরও কলঙ্ক আছে, আমার বন্ধুবরের ছিল চুলের ঘ্যাম, বেশ পরিপাটি করে চুল আঁচড়াতো আর ঘাড়টা নিচু করে ঝটকা দিয়ে চুল সেট করে নিতো (আমরা তখন হেয়ার টস ব্যাপারটা জানতাম না)| এরকম ছেলের সাথে কারোর ঝগড়া লাগার কথা নয়, কিন্তু খেলার মাঠে আমার সাথে লাগলো | মাঠ থেকে ফেরার সময় একদল ছেলের মাঝে ওর মাথার পেছনে চাঁটি মেরেই লুকিয়ে পড়লাম, মিতাদ্রুও ভবনে ঢোকার আগেই আমাকে ল্যাং মারলো! 
শোধ-বোধ হয়েই গেছিলো, আমরা কাদা ভর্তি হাত-পা ধুয়ে টিফিন খেতে ডাইনিং হলে গেলাম | বেশ দেরি হয়ে গেছিলো, সব্বাই বসে পড়েছে, এমনকি ঢুকে বাঁদিকের শেষের বেঞ্চীতেও জায়গা নেই!

এবার বসার ব্যাপারটা একটু প্রাঞ্জল করতে হবে, ডাইনিং হল এ ঢোকার তিনটে দরজা ছিল | প্রথম দরজা দিয়ে মহারাজ, টিচাররা, ‘বেস্ট-ইম্প্রেশনরা’ (পড়ুয়া/চামচা/ভালো ছেলেরা) এবং সার্ভাররা (নেটওয়ার্কওলা নয়, যারা রান্না পরিবেশনের ডিউটি পেতো)ঢুকতো| মাঝের এবং শেষের দরজা দিয়ে ঢুকতাম আমরা, অর্থাৎ জনতা এবং যারা একটু আড়ালে থাকতে ভালোবাসে | প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকেই কপাটের ডান দিকে মহারাজের বেঞ্চি, সেখানে বেশির ভাগ সময়ই মৃদুলদা একা বসতেন, হয়তো বা অজিতদার সাথে | কখনো-সখনো, অন্য টিচাররা জড়োসড়ো হয়ে বসতেন মৃদুলদার পাশে | একমাত্র অশোকদা, মানে হেডমাস্টার মহারাজ, এলেই ওই বেঞ্চিতে নির্দ্বিধায় বসতেন | এই বেঞ্চির উল্টো দিকেই দুটো বেঞ্চি পিঠাপিঠি ছিল | এই দুটির মধ্যে যেটা মহারাজের বেঞ্চির মুখোমুখি, সেটাতে বসতেন টিচাররা (মৃদুলদার মুখোমুখী), শেষে একটি বা দুটিতে বেস্ট-ইম্প্রেশনরা | এর পেছনের পিঠোপিঠি বেঞ্চিতে, যারা সারভিং ডিউটি করতো তারা, আর অন্য কোথাও জায়গা না পাওয়া হতভাগ্যরা |

তাকিয়ে দেখি মুড়ি-তরকারি আর চপের দিন, জিভ ভিজে সকসকে! নোলা সামলাতে না পেরে, ধাঁ করে টিচারদের বেঞ্চির পেছনের সার্ভারদের খালি বেঞ্চিতে বসে পড়লাম | সার্ভাররা তখন রিপিট দিচ্ছে, অর্থাৎ বাঁচা-ছোঁচা মুড়ি আর জলমারা ঝোল পরিবেশন করছে | বরাত ভালো, থালা ভর্তি মুড়ি-তরকারি আর সার্ভারদের বরাদ্দ এক্সট্রা একটা চপও পেলাম! কেউ নজর দেবার আগেই চপ তিনটে মুখে জোর করে গুঁজে দিয়ে আয়েশ করে চিবুতে লাগলাম!

আমার বেঞ্চির ঠিক পেছনেই আড়াআড়ি দেখি মিতাদ্রু বসে, ভালোছেলেদের কোটায় | দেখেই মাথায় চিড়িক করে ল্যাং এর কথাটা খেলে গেল | প্রায়শ এই সময়ই কারেন্ট যেত, সেদিনও গেল… ব্যাস, শুরু হয়ে গেল ঝোল মাখানো মুড়ির দলা ছোঁড়া-ছুঁড়ি! আমি তাক বুঝে কিছু ছুড়লাম মিতাদ্রুর দিকে, ওর দিক থেকে কিছুই পাল্টা এলো না, বা অন্ধকারে আমার গায়ে লাগলো না | বেশ আশাহত হলাম, sure ওর গায়ে লাগেনি! দেখলাম আবছা আলোতে, চেঞ্জ ওভার (switching from electricity to generator power) দিতে সর্দার গোছের কেউই যায়নি মনে হলো… এদিকে জেনারেটার এর আওয়াজও শুরু হয়নি | রুমমেট “পক্সি” (জ্ঞানেশ্বর মিশ্রর) মত জয় হনুমান বলে, উঠে দাঁড়িয়ে ডান দিকে বেঁকে, পেছনে বসা মিতাদ্রুর চুলের মুঠিটা বেশ করে ঝাঁকিয়ে দিলাম ঝোল মাখা এঁটো হাতে! দিয়েই, তড়িৎগতিতে বসে, তারপর নিজের টেবিলের নিচে ঢুকে পড়লাম! কেউ কিছু বলবে না … যা খাবার ছোঁড়া ছুঁড়ি হচ্ছে! হটাৎ শুনি, একটা হাঁউ-মাউ শব্দ আমার পাশেই! সঙ্গে সঙ্গে দূরাগত জেনারেটারের শব্দ ও লাইট এলো… আমরা সকলে স্তম্ভিত, কালীদার চুলের মুঠি ধরা মিতাদ্রুর হাতে!

আলো আঁধারিতে খাবার ছোঁড়া ছুঁড়ির উৎপাতে, টহলদারি ছেড়ে কালীদা স্বভাব-সুলভ শান্ত ভাবে আমার পাশের জায়গায় বসে পড়েছিলেন (টিচারদের টেবিলের পেছনেই)| মনে হয় বেশ কিছু পুন্নি করেছিলাম আর মিতাদ্রুর মাথায় বাজ!

যে কালীদা সচরাচর কিছুই বলেন না, তিনি তিড়িং করে উঠে মিতাদ্রুকে ওর সাধের চুলের মুঠি ধরে যা ক্যাল দিলেন – তা মার কম, ধুন্ধুমারই বেশি! তার পরে ডাইনিং হল এর বাইরে কান ধরে নিলডাউনরত মিতাদ্রুর দিকে চোখ নাচিয়েছিলাম কিনা মনে পড়ে না|

পুনশ্চ: মিতাদ্রু বসু অতীব ভালো ছেলে, আমি ওর এক কণা হলেও জীবন সার্থক হয়ে যেত… কিন্তু ওর বিড়ম্বনা রূপে আজও আমরা নিকট বন্ধু! Sorry my friend, you were simply unlucky in your friendship

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: