শিব্রামীয়

গৌরব বিশ্বাস

আমি আপনি যতই স্বার্থত্যাগ আত্মত্যাগের বাণীতে আস্থা রাখি, বা মুখে সেই বুলি আওড়াই, আদতে আমরা সকলেই কমবেশী স্বার্থকামী। এদুনিয়ায় জন্মই হয়েছে স্বার্থপূরণের জন্য। আমার আপনার জীবনের একটা নির্দিষ্ট গৎ রয়েছে। ছাঁচ রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সেই ছাঁচে আমরা বেড়েছি। সেই ছাঁচ আমাদের মূলত অর্থনৈতিক সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শেখায়। আমাদের জীবনও হয়ত তাই গুটিকয়েক সুখ স্বপ্নে বিভক্ত। ভালো পড়াশুনো করে কেরিয়ার তৈরী। বিয়ে। সন্তান পালন। দাদু ঠাকুর্দা হয়ে নাতি পুতিদের নিয়ে চাঁদের হাট। তারপর দামী নার্সিংহোমে কয়েক লাখ টাকা বিল তুলে দুনিয়া ছেড়ে পলায়ন। আমাদের ক্ষেত্রে এমন গোছানো নির্ঝন্ঝাট জীবনের বুনিয়াদ গড়ে দেয় মোটামুটি ভদ্রস্থ ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স। ওটি ছাড়া এসব কথা ভাবতেও পারিনা আমরা। তবুও জীবনকে পরিপূর্ণ রূপে উপভোগ করতে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত থেকে রস নিংড়ে নিতে আমরা অপারগ। কারণ, আমাদের পিছুটান। অনেক কিন্তু, হয়ত, অথচ ,যদি’র  ফাঁসে ফেঁসে গেছি আমরা। জীবন গোছাতে গিয়ে আমাদের না পাওয়া গুলো নিয়ে কতই না কান্নাকাটি আমাদের! কিন্তু এদুনিয়ায় এমন কী কোনো মানুষ নেই, যে এ জীবনটা কাটিয়েছে নিজের শর্তে। সে জীবন পিছুটান হীন। সে জীবনে আকাঙ্ক্ষা নেই। সে জীবন কোনোদিন ভালো চাকরি কেরিয়ারের চিন্তা করেনি। সে জীবন রেকলেস বোহেমিয়ান বেহিসেবী। নির্লিপ্ত। সে জীবনে বৈরাগ্য। অথচ জীবন প্রতি মুহূর্তের থেকে রস নিংড়ে নিতে জানে। এ নিরাপদ জীবনের তুলনায় সে নিরাপত্তাহীন জীবন মুক্ত বিহঙ্গ। বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়।

আমার আপনার এমনভাবে বাঁচা সম্ভব নয়। জীবনের প্রতি এমন নিরাসক্ত ভঙ্গি অর্জন  করা যায় না। তা হয়ত থাকে রক্তে। এ বাঁচা শিব্রামীয় বাঁচা।

ছোট বেলাতেই  আমাদের সুশীল বাবুর অংকে শিখিয়ে দেওয়া হয়, মোট ইনকামের এত শতাংশ সংসার খরচে বরাদ্দ, এতটা ছেলে মেয়ের পড়াশুনা বাকিটা সঞ্চয় কিংবা বাজারের দাম বাড়লেও খরচ একই রাখার ফন্দি ফিকির। আর শিব্রামীয় বাঁচার অঙ্ক, শুনুন তবে।

কার্টুনিস্ট চন্ডী লাহিড়ী একবার বেরিয়েছেন শিররামের সাথে। শিবরাম কলেজ স্ট্রিট মার্কেট থেকে একতাল পাটালি কিনলেন। দুজনে চলেছেন মুক্তরাম বাবু স্ট্রিটে  শিবরামের মেসে। চন্ডী বাবু একটু এগিয়ে গেছেন। শিবরাম একটু পিছিয়ে পড়েছিলেন। চন্ডিবাবু লক্ষ্য করলেন, পাঁচ ছটা বাচ্চা শিবরামকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। আর শিবরাম এককেজি পাটালি ভেঙে ভেঙে দিচ্ছে তাদের। নিজের জন্য রাখলেন ছোট্ট এক টুকরো পাটালি। চন্ডী বাবু অবাক। শিবরাম হেসে বললেন-‘ খাবে কে? রাখলেই তো পিঁপড়ে।

চন্ডী বাবু জিজ্ঞেস করলেন-” তাহলে এক কেজি কিনলেন কেন?”

“বাচ্চারা পাটালি দিয়ে মুড়ি খাবে” হেসে উত্তর দিলেন শিবরাম।

” ফর্সা রঙ, গরদের পাঞ্জাবি, বুকে অর্ধেক বোতাম লাগানো নেই, অনেকটা খোলা, পরিশুদ্ধ ধুতি। পাঞ্জাবির হাতাটা আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত। হাতাতেও বোতাম লাগানো নেই”।  আনন্দ গোপাল সেনগুপ্তের স্মৃতিতে শিবরাম ধরা পড়েছেন এভাবেই। পোশাকের মতো স্বভাবেও তিনি বোহেমিয়ান। সঞ্চয় কাকে বলে শিবরাম জানতেন না। প্রকাশকের ঘর থেকে যা টাকা পেতেন, পকেটে পুরেই ছুটতেন রসনাতৃপ্তিতে এবং অবশ্যই সবান্ধবে। মুহূর্তে নি:শেষ সঞ্চয়।

শঙ্কু মহারাজ তখন লেখালেখির জগতে সদ্য পা রেখেছেন। মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্ৰথম বই। শঙ্কু মহারাজ তখন নিতান্তই যুবা।মিত্র ও ঘোষের অফিসের শিবরামের সাথে প্ৰথম পরিচয়। শঙ্কু মহারাজ একদিন দাঁড়িয়ে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সামনে। বাস ধরে বইপাড়া যাবেন। দেখলেন, শিবরাম হেঁটে আসছেন রাজ ভবনের দিক থেকে। বাঁ হাতের ঠোঙায় ছোলা ভাজা। ছোলা ভাজা চিবুতে চিবুতে এগিয়ে আসছেন শিবরাম। কাছে আসতেই শঙ্কু মহারাজ প্রণাম করলেন শিবরামকে। শিবরাম আশীর্বাদ করে জিজ্ঞেস করলেন-” তা তুমি এখানে দাঁড়িয়ে? যাবে কোথায়?”

“বইপাড়ায়”- উত্তর দিলেন শঙ্কু মহারাজ।

“সে তো আমিও যাচ্ছি। তা এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

“আজ্ঞে বাসের জন্য”।

শিবরাম শঙ্কু মহারাজের পিঠে হাত রেখে বললেন-” ডালহৌসি থেকে কলেজস্ট্রিট যাবে, তার জন্য বাসের কি দরকার? চলো হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যাক”।

শঙ্কু মহারাজ লজ্জিত হয়ে বললেন-” চলুন হেঁটেই যাওয়া যাক”।

শিবরাম নিজের ছোলার ঠোঙা থেকেই খানিকটা ছোলাভাজা শঙ্কু মহারাজের হাতে গুঁজে দিলেন।

শঙ্কু মহারাজ লিখছেন-“মনে মনে ভাবলাম আমি বাড়ি থেকে খেয়ে অফিসে এসেছি। অফিসে টিফিন করেছি আর তাঁর হয়ত দুপুরে খাওয়াই হয়নি। খিদে পাওয়ায় ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে পথ চলেছেন। সেই খিদের খাদ্য হাসিমুখে আমাকে দিয়ে দিলেন”।

শিবরাম একদিন দাঁড়িয়ে চেতলা হাই স্কুলের সামনে। 3B রুটের বাস ধরবেন। সঙ্গী সেই চন্ডী লাহিড়ী। বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ধরে যাওয়ার জোগাড়। শিবরাম এক টাকার বেগুনি কিনলেন। দুজনে মিলে খেলেন সেই বেগুনি। তাও আসে না বাস। আবার আট আনার বাদাম কিনলেন শিবরাম। চন্ডী লাহিড়ীকে দিলেন হুঁশিয়ারি-” একটা একটা করে বাদাম মুখে দেবে। কখন বাস আসবে ঠিক নেই”।

বাদামও ফুরিয়ে গেল। তাও দেখা নেই বাসের। এবার কেনা হল দু ঠোঙা মুড়ি। আবার শিব্রামীয় হুঁশিয়ারি-” একটি একটি করে মুড়ি মুখে দেবে”। অবশেষে মুড়ি শেষ হওয়ার আগেই বাস এল। দুজনে উঠলেন বাসে। একজন ছোট ছেলে ভিক্ষে করতে হাত পাতল শিবরামের সাথে। আর শিবরাম, প্রকাশক থেকে দুঃস্থ খালি হাতে ফেরান না কাউকে। শিবরাম দুটো মুড়ি ভর্তি ঠোঙা ছেলেটার হাতে দিলেন। সেই সাথে পুরো একটা সিকি। বললেন-” তেলেভাজা দিয়ে এই মুড়ি খাবি”।

আমি আপনি চিরজীবন সঞ্চয় করতে ব্যস্ত। আর শিবরামের অভিধানে ‘সঞ্চয়’ শব্দটা চিরকাল ব্রাত্য। এমনকি, আজকের দিনে যখন এ দুনিয়া ছাড়লেন তিনি এতটুকু দুঃখও সঞ্চয় করে যাননি কারও জন্য। শিবরামের মৃতদেহ ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হয়ে পড়ে রইল পিজি হাসপাতালে। সেদিনের কথা ধরা রয়েছে বাদল বসু(দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু) এর কলমে-” দিনটা আজও জ্বলজ্বল করে স্মৃতিতে।২৮শে আগস্ট ১৯৮০।কোনো একটা ছুটির দিন ছিল। হঠাৎ গৌরাঙ্গপ্রসাদ বাবু ফোন করলেন আমাকে। বললেন”শিবরাম বাবু নেই। ডেডবডি পিজি হাসপাতালে।”

আচমকা শোনা সেই মৃত্যু সংবাদ যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। বারবার শিবরাম বাবুর হাসিমুখ মনে পড়ছিল। আর মনে পড়ছিল  সেই অনবদ্য গৌরচন্দ্রিকা, “বুঝলেন বাদলবাবু…

কোনও মতে নিজেকে সামলে ছুটলাম পিজি হাসপাতাল। ওখানে গিয়ে শুনলাম, আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। মৃতদেহ চলে গিয়েছে ঠান্ডাঘরে। ঠান্ডাঘর! যেখানে বেওয়ারিশ দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয়?

আমি আর গৌরাঙ্গবাবু ছুটলাম হিমশীতল শবাগারে। হাসপাতালের এক কর্মচারী আমাদের নিয়ে গেলেন সেই জায়গায়, যেখানে মৃতদেহ রাখা হয়। সেই কর্মচারী এক-একটি ড্রয়ার টেনে একটা করে মৃতদেহ বার করেন আর জানতে চান, “এটা আপনাদের?”

কিছুতেই শিবরাম বাবুর মৃতদেহ আর পাইনা। কতগুলো মৃত মুখ যে দেখলাম, গুণে শেষ করা যাবে না। একটা সময় আমাদের মনে হচ্ছিল মৃত্যু সংবাদটা বোধহয় ঠিক নয়। এ-ও যেন শিবরাম বাবুরই এক রসিকতা! শিবরাম চক্রবর্তীর কখনও মৃত্যু  হতে পারে নাকি?

এমন সময় সেই ড্রয়ার বেরোলো। শিবরাম বাবুর প্রসন্ন মুখ।

শিবরাম বাবু সারাজীবন দু হাতে স্নেহ ভালোবাসা বিলিয়েছেন। কত অচেনাকে আত্মীয় করে নিয়েছেন। তবুও মৃত‍্যুর সময় সেই ভালোবাসার জনেদের কোনও স্নেহের স্পর্শ, দু’ফোঁটা চোখের জলও তাঁর বরাতে জোটেনি”।

সবার অগোচরে এমন করেই মিলিয়ে গেলেন শিবরাম। মানুষকে ভালো রাখবার ব্রত নিয়েছিলেন যে! দুঃখকে নীলকন্ঠের মতো পান করে ‘পান’ বিলিয়েছেন সর্বত্র। তাই কি বিলীন হয়ে গেলেন সবার অগোচরে? নাকি এমনিভাবে মিলিয়ে গিয়ে কোথাও তিনি রসিকতা করলেন স্বার্থগৃধ্নু সমাজকে!

ঋণ স্বীকার: শিব্রাম বনাম শিবরাম, মিত্র ও ঘোষ

পিওন থেকে প্রকাশক, বাদল বসু, আনন্দ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *