গোলাপ….

শেলী নন্দী

ঘড়ি বলছে ৭ টা বেজে ১০। ইস্ অনেকটা লেট হয়ে গেল। অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফর্ম গুলোতে চোখ বুলিয়ে পেন্ডিং ফোল্ডারে চালান করলো পামেলা। ডেস্কের ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা জিনিস গুলোকে রাখলো যথাস্থানে।

অফিস বয় বাপি কে ডেকে দিতে বলল একটা ট্যাক্সি।

লাঞ্চ বক্স টা ক্যান্টিনেই থাক আজ। ঝোলাঝম্প নিয়ে অ্যাপো তে যেতে ভালো লাগে!

ম্যানেজারের ঘর এ একবার উঁকি মারতে হল নিয়ম মাফিক। পাশের ডেস্কের রমেন দার সাথে কথা বলছিলেন তপব্রত রায়, পামেলার নতুন ম্যানেজার।

পামেলা কিছু বলতে যাবার আগেই বেস্ট অফ লাক্ বললেন মি: রায়। একরাশ বিস্ময় কে পাশ কাটিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলো পামেলা।”ডায়মন্ড প্লাজা চলুন আর হ্যাঁ ১ নং এক কাছে ফুলের দোকানের সামনে একটু রাখবেন। ” এখনো ফোন আসেনি রাজীবের। তারমানে ওর ও লেট। বেশ একটা স্বস্তি পেল যেন। হোয়াট্সাপে পিং করে দিল জাস্ট বেরোলাম।

না: রাজীব অনলাইন নেই। শীতটা পালিয়েছে এবার খুব তাড়াতাড়ি। খোলা জানলার হাওয়ায় চুল উড়ে এলোমেলা। ব্যস্ত শহরের পথ কেটে এগিয়ে যেতে লাগলো ট্যাক্সি। মাথাটা বেশ দপদপ করছে। বিকেলের চা টা আজ জুতের ছিল না।

ফোন টা বেজে উঠলো পামেলার। ওপারে মা এর গলা “পম্ কোথায় আছিস? “

“মা আমি রাস্তায়। বলেছিলাম না আজ গার্গীর সাথে বাইরে খাবো। চিন্তা কোরো না। বেশী রাত হবে না।”

এই কল্পিত গার্গী বহুবার বাঁচিয়েছে পামেলা কে। আর লুকোচুরি নয় ।এবার রাজীব পর্ব টা পেশ করতে হবে বাড়ীতে। দু জনের পরিচয়ের বয়স ৫ মাস মত। এটা তিন নং অ্যাপো। পামেলা র কেন জানি না মনে হয় এখন ই বিয়ে করা মানে কেরিয়ারের ক্ষতি।

দুজনের কেউ ই সে ভাবে ভাবছে না এখন ই। টুকরো টুকরো আলোচনা হলেও বিয়ে নিয়ে তেমন কোনো গা নেই দুজনের। আবার ফোন টা বেজে উঠলো পামেলার। ওপাশে রাজীব এবার। “আমার মিটিং সবে শেষ হল। এবার বেরবো। তুমি কতদূর? ”

“আধ ঘন্টা মত অ্যাপ্রক্স টু রিচ ডিপি।”

“ওকে আসছি আমি। বাই।” আজ রোস ডে। হয়তো রাজীব ও ওর জন্য গোলাপ নিয়ে আসবে। খুশী খুশী চোখে পামেলা অনেক অনেক গোলাপের মধ্যে হারিয়ে গেল।

১ নং এ নেমে লাল, হলুদ মিশিয়ে বেশ কয়েকটা গোলাপ কিনলো পামেলা। ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলো যত্ন করে।রাজীবকে একটু রোমান্টিক করে তুলতে হবে আজ। ব্যাগে রাখা ডিও টা ঢেলে নিল একটু।চুলটা হাতেই ঠিক করে নিল।লিপস্টিকের গোলাপীতে ভিজিয়ে নিল ঠোঁট।সাজুগুজু কমপ্লিট। রাজীব পামেলার মত বই এর খোলা পাতা নয়।বরং অনেকটাই খামে মোড়া চিঠির মত।বাইরে থেকে পড়তে পারা বেশ মুশকিল। একটা কোথাও দূরত্ব বজায় থাকে। আজ দূরত্ব মেটানোর কাজ টা পামেলাই করবে।

গোলাপ গুলো কেনার পর থেকেই একটা প্রেম প্রেম ভাব ভর করেছে পামেলার মধ্যে। ডিপি পৌঁছে বাইরে থেকেই ফোন করলো রাজীব কে।

ফোনটা বেজে গেল। ঘড়ি তে ৮ টা বেজে ১০।

ভিতরে ক্যাফে কফি ডে তে গিয়ে বসলো পামেলা।” লাগ জা গলের” টিউন টা দারুন একটা আবহ তৈরী করেছে ভেতরটায়। অবশেষে রাজীব এল। মুখে চোখে আনন্দের হিল্লোল।দেরী করানোর আক্ষেপ হিসেবে একটা ছোট্ট সরি।ব্যাস্….

সামনের চেয়ারে বসল রাজীব। “একটা দারুন খবর আছে। আজ ই মিটিং এর পর ফাইনালি জানলাম কোম্পানী আমায় ক্যালিফোর্নিয়া পাঠাচ্ছে ফর লং টার্ম।”

“লং টার্ম মানে কতদিন?”

ফাইভ ইয়ার্স মিনিমাম।

ও…. “আর ইউ নট্ হ্যাপী? ”

—অফকোর্স। বাট্ এতদিন….সব ছেড়ে এতদিন থাকতে পারবে?

“হোয়াই নট্? আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে।

এছাড়া আমি কোনো দিন ই হোম সিক্ নই। কুয়োর ব্যাঙ হয়েও থাকতে চাই না।”

অর্ডার দেওয়া কফি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। আর পামেলার মনে জমছে অভিমান এর বুদবুদ। ৫ মাসের এই প্রেম পর্ব টা তাহলে নিতান্তই আলাপচারিতা…..

অ্যাপোগুলো তার মানে টাইম পাস।পামেলা একটু কষ্ট খুঁজতে চায় রাজীবের চোখে কিন্তু রাজীবের চোখে এখন শুধুই বিদেশ পাড়ির উদ্বেলতা।

অনেক অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিল পামেলা। একটা গোলাপ, একটা ডিনার আর অনেক কথা মেশানো একটা সন্ধ্যে। ছন্দপতনের নীরব শব্দ টের পেল পামেলা। রাজীব কে? মন আর মাথার কাটাকুটি খেলায় উত্তর এল অনেক।

….. ফেসবুকে আসা আগন্তুক?

…….. ভালো বন্ধু?

…….. অবুঝ প্রেমিক?

…… ভাবী স্বামী?

….. না নিছক একজন স্বপ্নাভিলাসী এম টেক ইঞ্জিনীয়ার?

পামেলার নিজেকে ভীষণ বোকা মনে হল আজ আবার কিছুটা স্বার্থপর ও। রাজীবের স্বপ্নের সেও তো ভাগীদার। কিন্তু রাজীব কি সেটা মনে করে?

“আমায় মিস্ করবে না? “- দুম করে পামেলার ভেজা গলার প্রশ্ন। “ধুর পাগল, এই ফেসবুক হোয়াট্সাপের জমানায় কেউ কাউকে মিস্ করে? ভিডিও চ্যাট্ করবো তো”….. হাসি মাখা গলায় রাজীবের উত্তর টা মনে ধরল না পামেলার।

আর তো মোটে কয়েকটা ঘন্টা…

–কবে ফ্লাইট?

—“নেক্সট মান্ ডে। এর মধ্যে শিলিগুড়ি যেতে হবে বাবা মা র সাথে দেখা করতে। টাইম খুব কম।”

হুম্…

ডিনার হল। কথা হল।

রাজীব কে আজ ও পড়তে পেল না পামেলা। কেজো কথার মোড়কে ঢাকা রাজীব কে রোমান্টিক ও করা হল না। অনেক প্রশ্ন জন্ম নিলেও উত্তর পেল না। মাথার দপদপানি কমে বুকে এসে বাসা বাঁধলো। ট্যাক্সিতে তুলে দিল রাজীব।

……. বাড়ী পৌঁছে ফোন করে দিও।

……. সিওর।

ট্যাক্সি টার্ন নিলো ডান দিকে। রাজীব কে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল পামেলা। লাল হলুদ গোলাপ গুলো ব্যাগেই থাক….. যত্নে রাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *