ভাত

অঙ্কুশ

হোষ্টেলে আমার প্রথম রুমটায় যে রুমমেট ছিলো তার নাম ছিলো আজিজুল। পাতলা বেঁটে নিরীহ একটা ছেলে। পাঁচ ওয়াক্ত নাওয়াজ পড়তো। সমস্ত রীতিকানুন কঠোরভাবে মেনে চলতো।

আমাদের তখন বড়ো শহরের হাওয়া লেগেছে। নন্দন চত্বর এ রোজ আড্ডা হচ্ছে। আর সিগারেট।

আমি কবিতা লিখতাম। কয়েকটা কবিতা লিটল ম্যাগাজিনে জায়গা পেয়েছিলো,আর বেশির ভাগই ডাস্টবিনে। আমি আজিজুলকে পড়াতে চাইতাম। আজিজুল বাধা দিয়ে বলতো ও কবিতা-টবিতার কিচ্ছু বোঝেনা।

সেকেন্ড ইয়ারকে মেডিকেলে ‘হানিমুন ইয়ার’ বলে। চাপ বেশ কম। আমরাও বেশ আরও হাওয়া লাগাচ্ছি সময় নিয়ে। একটা ছোট্ট থিয়েটার দলেও ঢুকলাম।

আজিজুলকে দেখলাম,তখন থেকে ইনজেকশান দেওয়া-চ্যানেল করা শিখে নিয়ে সিনিয়রদের রিপ্লেসমেন্ট দিচ্ছে। বদলে বেশ কিছু কড়কড়ে নোট হাতে পাচ্ছে।

একদিন আজিজুলকে বললাম,আজিজুল ভায়া,একদিন কিন্তু টাকা অনেক থাকবে কিন্তু সময়টা আর পাবেনা। এটাই তো সময়। একটু বইটই পড়ো, রবীন্দ্রনাথ পড়ো, ঘুরতে যাও, আচ্ছা এতো কাছেই তো দীঘা, দীঘা গেছো কখনো?

পড়ে নিন…ভাড়াটে মা

যায়নি। আমি শুনে অবাক হয়েছিলাম। মানুষ এতোটা কুয়োর ব্যাঙ হয়ে কীকরে থাকতে পারে! আমার বাবা হাইস্কুলের হেডমাস্টার। পুজোয় একমাস ছুটি থাকে। সেই ছোট্ট থেকে পুজোয় একটা ট্যুর হবেই। কাছাকাছি দীঘা, দার্জিলিং, পুরী এগুলো তো কোন ছাড় পুরো সাউথ ইন্ডিয়া মোটামুটি কমপ্লিট। নেক্সট বার কাশ্মীর প্ল্যান হচ্ছে।

একদিন খাওয়ার পর গল্প শুরু হয়েছিলো। গল্পে গল্পে আজিজুল চলে গেলো ওর ছোটবেলায়। আমি যেনো চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছিলাম। ওদের অভাব,খিদেটা যেনো নিজে টের পাচ্ছিলাম।

ওরা চার ভাই-বোন। বাবা জমিজমা করতো অল্পসল্প। আর জাত মাতাল। যে অল্পটুকু লাভ হতো তার সবটাই খরচ করে দিতো দেশী কিনতে। বাধ্য হয়ে মা কয়েকটা বাড়ীতে আয়ার কাজ নিয়েছিলো।

একেক সময় এমন গেছে দিনের পর দিন ভাত জোটেনি। মুড়ি খেয়ে কাটিয়েছে। ভাত যেদিন রান্না হয়েছে, ভাতের মারটাও চেটেপুটে খেতো। কিচ্ছু ফেলে দেওয়ার প্রশ্ন উঠেনা।

আজিজুল বলছিলো, ভায়া এই কবিতা-গল্প-সিনেমা এগুলো তোমাদের মানায়, খালিপেটে কী আর কবিতা হয়?

পড়ে নিন…সত্যিকারের বন্ধুত্ব

এগুলো শুনে দুদিন মন খারাপ ছিলো। কোনো কবিতা লিখিনি কয়েকদিন।

ফাইনাল ইয়ার পাশ করার পর ইন্টার্নশিপ শুরু হয়। তখন একটা মোটামুটি ভালো বেতন পাওয়া যায়।

তো ফাইনাল ইয়ারের রেজাল্ট দেওয়ার কদিন আগে আজিজুলের মা মারা গেলো। রেজাল্টের পর আজিজুল খুব মন খারাপ করে বলেছিলো, ভালো সময়টা আসার আগেই মা টা ছেড়ে চলে গেলো। আমার সামনে ও কাঁদেনি, খুব কড়া মনের ছেলে কীনা, কিন্তু চোখটা খুব লাল ছিলো। নজর মিলাচ্ছিলো না।

এরপরে ১৫ বছর কেটে গেছে। আমি এমডি কমপ্লিট করে জেলা হাসপাতালে চাকরী করছি। আর কবিতা লেখাও চলছে জোরকদমে। ৪ টা বইও বার হয়ে গেছে এই কবছরে।

একদিন একটা আলোচনাসভায় অংশগ্রহন করতে মালদা মেডিক্যালে গেলাম। আমি জানতাম যে মালদায় একটা রুরাল হসপিটালে আজিজুল আছে। সভা তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো। আজিজুল কে ফোন লাগালাম। আজিজুল পুরো ডিটেলস দিয়ে খুব জোর করে বললো আজ রাতটা ওর বাড়ীতেই কাটাতে।

গাড়ী করে গেলাম ঠিকানায়। খুব সুন্দর একটা গ্রাম। পৌছে দেখলাম বেশ সুন্দর বাড়ী করেছে একটা।

আজিজুল দেখতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো। মুখে খুব আনন্দ। নাহ,আজিজুল একদমই পালটায়নি। সময়টাই যা পাল্টেছে।

ভাবীর সাথে দেখা হলো। একটা ৭ বছরের বাচ্চাও আছে। খুব দুরন্ত।

রাত্রে আজিজুল মাংস নিয়ে আসলো। আটশো গ্রাম! ২০০ গ্রাম করে মাথাপিছু! নাহ,আজিজুল একদম সেই একই আছে। একদম হিসাব করে চলা। আমাদের বাড়িতে তো এক কিলোর নীচে মাংসই আসেনা,বেশী কেও আসলে দু-আড়াইকিলো।

খুব সুন্দর খেলাম। ভাবীর রান্নার হাত খাসা মানতে হবে।

দেখলাম ভাত বেচে গেছে কিছুটা। আজিজুল সেটা ফেললোনা। হাঁড়িতে জল দিয়ে রেখে দিলো।

পরেরদিন আমি বেড়োবো। বেড়োনোর আগে সকালে ভাবী গরম গরম রুটি আর সবজি বানিয়ে হাজির।

আজিজুলকে দেখলাম,শুধু সবজিটুকু নিলো। আর গতকালের পান্তা ভাতটা লবন-লঙ্কা দিয়ে মেখে খেলো।

আজিজুলের এখন যথেষ্ট টাকা। ভাতের অভাব কোনোদিন আর হবেনা। কিন্তু কোথাও গিয়ে আমি ওর চোখে ঐ ছোট্টবেলায় ভাত না পাওয়ার টাটকা স্মৃতি দেখছিলাম। আজিজুল আরও দমিয়ে ভাত খেয়ে নিচ্ছিলো। ঠিক আমার বিয়ের দিন প্যান্ডেলের বাইরের ভিখারীটা যেভাবে যতোটা পারছিলো ভাত খেয়ে নিচ্ছিলো,সেভাবেই….

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: