ভিয়েতনামে নাপাম বোমার আঘাত

মিহিররঞ্জন মন্ডল

১৯৭২ সালের জুন মাস। ভিয়েতনামে তখন প্রচন্ড যুদ্ধ চলেছে। মার্কিনরা এতে মদত দিচ্ছে। একদিন সায়গনের কাছে ত্রাংবাং শহরে একটা নাপাম বোমা পড়ল। বোমা বিস্ফোরণের ফলে চারিদিকে আগুন ধরে গেল।
ন’ বছরের ভিয়েতনামী মেয়ে থাই কিম্ ফুকের জামাকাপড়ে তখন আগুন জ্বলছে। তাড়াতাড়ি পরণের সমস্ত জামাকাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে কিম্ ভয়ে ছুটতে লাগল। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল ” জ্বলে যাচ্ছে, জ্বলে যাচ্ছে। কিমের পিছনে আরও ক’টি বাচ্চা ছেলেমেয়ে– তারও তখন কাঁদতে কাঁদতে প্রাণভয়ে ছুটছে।
কাছেই ছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক তরুণ ফটোগ্রাফার নিক আট। ঘটনাটি তাঁকে দারুণ বিচলিত করল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি তাঁর ক্যামেরায় যুদ্ধের এই ভয়াবহ দৃশ্যটি ধরে ফেললেন।

ন’ বছরের ভিয়েতনামী মেয়ে থাই কিম্ ফুক তাড়াতাড়ি পরণের সমস্ত জামাকাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে ভয়ে ছুটতে লাগল

কিছুটা দূরেই কয়েকজন ফটোগ্রাফার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা কিমের গায়ে বেশ কিছুটা ঠান্ডা জল ঢেলে দিলেন। এরপর নিক –কিম্ ও অন্যান্য আহত শিশুদের নিয়ে ছুটলেন সায়গনের এক হাসপাতালে। কিমের পিছন দিকটা দারুণভাবে পুড়ে গিয়েছিল। থার্ড ডিগ্রি বার্ন। বাঁচার আশা ছিল না। যাইহোক, চিকিৎসায় কিম কোনরকমে বেঁচে গেল। কিন্তু ভালভাবে চলাফেরা করতে পারত না। এরপর তাকে ১৯৮১ সালে পশ্চিম জার্মানিতে পাঠান হল জটিল এক অস্ত্রোপচারের জন্য। সেখান থেকে বেশ কিছুটা সুস্থ হয়ে সে ফিরল।
এদিকে নিক আটের তোলা এই ছবিটি ঘটনার পরের দিন কাগজে বার হতেই চারিদিকে হৈচৈ আরম্ভ হল। এই যুদ্ধ শিশুদেরও রেহাই দিচ্ছে না। নিতান্তই অমানবিক।কীভাবে কিমকে সাহায্য করা যায় তা নিয়ে সারা বিশ্বে সাড়া পড়ে গেল। এইসব নিয়ে আবার শুরু হল রাজনীতি।
এদিকে এই অগ্নিদগ্ধ মেয়েটিকে যে মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল তার খবর কেউ রাখেনি। সে ভাবত এই পোড়া শরীরের দিকে কেউ চেয়েও দেখবে না। তার কোন বয়ফ্রন্ড জুটবে না। কেউ তাকে বিয়ে করতেও চাইবে না। কিন্তু নিজের মনকে শক্ত করে ঠিক করল সে আবার পড়াশোনা করবে। তাই সে ভিয়েতনামের মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তিও হল। কিন্তু তার পড়াশোনা সেভাবে হল না। সারাবিশ্বে সে এখন খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে। কাজে কাজেই বহু সাংবাদিক আসছেন নানা দেশ থেকে। তাদেরকে সাক্ষাৎকার দিতে দিতেই তার সময় চলে যাচ্ছে। সে এখন রাজনীতির পাশা খেলার গুটি।
অবশেষে ভিয়েতনাম সরকার তাকে পাঠাল কিউবায় ডাক্তারি পড়তে। ওখানে সে ডাক্তারি পড়ল ছয় বছর। কিউবায় পড়তে পড়তে এক ভিয়েতনামী ছাত্রের সঙ্গে তার আলাপ হয়। পরে তাকেই সে বিয়ে করে। এরপর দুজনে যখন পড়াশোনা শেষ করে ভিয়েতনামে ফিরছিল তখন তাদের প্লেন কানাডার এক বিমান বন্দরে জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য ঘন্টাখানেকের জন্য থেমেছিল। এই সুযোগে দুজনে পালিয়ে গিয়ে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করল। কারণ ওরা ভিয়েতনামে আর ফিরতে চায়নি। কানাডার নাগরিকত্ব পেয়ে ওখানেই থেকে গেল।

থাই কিম ফুক ও তার জ্বলন্ত শৈশব

সুখী নিশ্চিন্ত জীবন ফিরে পেয়েও সেদিনের ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা ভুলতে পারেনি কিম। সারা পৃথিবীতে যুদ্ধে সাংঘাতিকভাবে আহত হয়ে রয়েছে অসংখ্য শিশু। তাদের জন্য অবশ্যই কিছু দরকার। তারা যাতে তাদের শারীরিক বৈকল্য কাটিয়ে উঠে সমাজ জীবনের মূল স্রোতে ফিরতে পারে তার জন্য তাকে কিছু করতেই হবে। তাই যুদ্ধে আহত হয়ে কি যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে সে নিয়ে সে বিশ্বের নানা দেশে বক্তৃতা দিতে লাগল। এর ফলে বেশ কিছু অর্থ সংগ্রহ হল। গড়ে উঠল কিম ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশানাল।
যাঁর নির্দেশে বিমানের পাইলট কিমের শহরে সেদিন নাপাম বোমা ফেলেছিল, সেই ইউ এস আর্মির এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডার জন প্লামারের অবস্থা হয়েছিল শোচনীয়। পরের দিন খবরের কাগজে কিমের ছবি দেখে তিনি অনুশোচনায় ভেঙে পড়েছিলেন। এ তিনি কী করেছেন? সারা পৃথিবীতে এই অমানবিক কাজের জন্য তিনি ধিক্কৃত হচ্ছেন। তাই এই দুঃস্বপ্ন ভোলার জন্য প্রচুর মদ্যপান আরম্ভ করলেন। ব্যক্তিগত জীবন তছনছ হয়ে গেল। চাকরি ছেড়ে দিলেন।স্ত্রীর সঙ্গে হল বিবাহবিচ্ছেদ। পরে আবার বিয়ে করলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর সহায়তায় প্রায়শ্চিত্তের জন্য মানুষের সেবামূলক কাজকর্ম করতে করতে হয়ে গেলেন ধর্মযাজক। তিনি তখন রেভারেন্ট জন প্লামার।

নিক আট ও নাপাম গার্ল কিম

অনেকদিন পরে একবার ভিয়েতনাম প্রাক্তন সেনানীদের সভায় কিম তখন বক্তৃতা
দিচ্ছে। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন জন প্লামার। কথা প্রসঙ্গে সেদিনের সেই পাইলট যে ত্রাংবাং শহরে নাপাম বোমা ফেলেছিল তার সম্পর্কে কিম বলছিল, ” যদি সেই পাইলটকে পেতাম তাহলে তাকে বলতাম ইতিহাসকে আমরা হয়ত পাল্টাতে পারব না। কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যতের শান্তির জন্য আমরা তো কিছু ভাল পদক্ষেপ নিতেই পারি। “
এ কথা শুনেই জন প্লামার উঠে দাঁড়ালেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন তাঁর আদেশেই পাইলট সেদিন বোমা ফেলেছিল। তিনিই দোষী। পারলে কিম তাঁকে ক্ষমা করুন। কিম তাঁর হাত ধরে তাঁকে আশ্বস্ত করল।
ফটোগ্রাফার নিক আটও সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটিকে মনে রেখেছিলেন। অনেকদিন পরে একটা পার্টিতে নাপাম গার্ল কিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল।

(ঋণ স্বীকার– এই লেখাটির সঙ্গে দেওয়া সবকটি ছবিই ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: