উন্মুক্তের বন্দিনী

সাগ্নিক ভট্টাচার্য

ওদের বাড়ি থেকে দেখলে মনে হতো দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠটা যেন দিনের শেষের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে নিজের বেখেয়ালে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে নীল আকাশের সঙ্গে গিয়ে থেকেছে। ঘাসের সঙ্গে, হওয়ার সঙ্গে, ফুলের ওপর উড়ে বেড়ানো মৌমাছিগুলোর সঙ্গে খেলা করে যেন আকাশের গায়ে ঠ্যাশ দিয়ে একটু বিশ্রাম করে নিচ্ছে।

ছোটবেলায় এটাই ভাবতো এরিকা। তখন সেই মাঠ ছিল তার জগৎকে অতিক্রম করা একটা ব্যাপার। তার শিশুমনে, তাদের কুটিরকে ঘিরে থাকা সেই মাঠটাই ছিল ‘বিশাল’-এর পরিচয় — অনন্তের সংজ্ঞা। বাড়ি থেকে বেশি দূরে যাবার অনুমতি ছিল না। সে ছিল উন্মুক্তের বন্দিনী।

ক্রমে দিন বদলায়। ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যায় অনেক অকালের ঝড়, ভেসে যায় অনেক তুলোর মতো মেঘ, উড়ে যায় অনেক সশস্ত্র যুদ্ধবিমান। ছোট থাকতে এরিকা দেখেছিলো, আকাশের মধ্যে কালো মেঘের মতো, ঝড়ের মতো প্রবল গর্জন করে, তারা ভেসে যেত পূব থেকে পশ্চিমে — এক দিগন্তের কোল থেকে আরেক অনন্তের কোলে বিলীন হতো তারা। অনেক সময় রাতে, অনেক দূর থেকে শোনা যেত–কি যেন গোল বেঁধেছে। দ্যূম-দ্যাম-দুড়ুম শব্দ হতো। এরিকা শুধু শুনতে পেত। দেখতে পেত না।

কিন্তু সময়ের চক্রান্ত পন্ড করে কার সাধ্যি! এরিকার বয়স যেন সেই বন্দুকধারী, বুট-পরা সৈন্যদলের মতো কেবল এগিয়েই চলে। কোথায়? কে জানে। কিন্তু এরিকা আজ জানে।

জানে যে তার ছোটবেলার সেই মাঠটা আসলে অনন্তকে হার মানাতে পারে নি। তাদের বাড়ির পশ্চিমে ওই ছোট্ট টিলাটার ওপারেই রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া; যেখানে তাকে ধরা দিতে হয়েছে মানুষের সীমানাসৃষ্টির আদীম আবেশে। ওপারেও রয়েছে মাঠ। কিন্তু সে নাকি অন্য মাঠ। কেউ জানে না সে মাঠের কথা।

এরিকা সেই “অন্য” মাঠের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে; তার মনে পরে সেই বিমানগুলোর কথা। যা যায়, তা কি ওখানেই যায়? ওই কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে পশ্চিমের “অন্য” মাঠে? যা যায়, তা তো কই ফেরে না। সেই মাঠের মতোই আনিলে বিলীন হয়।

ভাবতে ভাবতে পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকায় এরিকা। দেখে: সাঁঝের দিগন্তের রঙ লাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *