স্বাস্থ্যব্যাবস্থার ভেতর থেকে

ডঃ অনুপম ব্রহ্ম

বেসিনে মুখ ধোওয়ার পর সামনে ঝোলানো আয়নার দিকে তাকানো যখন মুশকিল হয়ে যায়, অখন বুঝতে পারি ভেতরে ভেতরে যে কথাগুলো তৈরি হচ্ছে সেগুলো বলে না-বলে ফেলে রাখাটা অপরাধ। জানি অনেকের রাগ হবে, কাল সারাদিনে যা-যা কথা শুনতে হবে তা-ও আঁচ করতে পারছি, কিন্তু সেই ভয়ের থেকে আমার রাতের ঘুমের বেশি দরকার, তাই রাত দেড়টা’য় ল্যাপটপ খুলে বসতে হয়েছে।

প্রশ্নটা হল, সবাই নিজের কাজটা ঠিকমতো করছে তো? সবাই যদি সবার কাজ ঠিকমতো করে, তারপরও যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সেটা দুর্ঘটনা; না-হলে কিন্তু সেটা গাফিলতি। পোস্ট-অপারেটিভ পেশেন্টকে পর্যবেক্ষণে রাখার কথা। ঘন্টায়-ঘন্টায় তার পালস, ব্লাড প্রেশার পরীক্ষা করার কথা। অপারেশনের পরে অ্যানাস্থেশিয়ার প্রভাব কেটে যাওয়ার পর রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা- সেটা সর্বজনস্বীকৃত জটিলতা; সেরকম হাজারটা জটিলতা থাকতে পারে; সেই জটিলতাগুলো এড়ানোর কোনো উপায় নেই- ঠিক কথা, কিন্তু সেই জটিলতা যাতে তাড়তাড়ি চিহ্নিত করা যায়- তার জন্যে কিছু নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়মগুলো ঠিকমতো না-মানাটা গাফিলতি। জটিলতা চিহ্নিত করা গেলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই চিকিৎসা যে সবসময় কাজে দেবে- তাও নয়। কিন্তু ব্যবস্থাটা সময়মতো নেওয়া হল কিনা- সেখানেই গাফিলতির প্রশ্ন। এই গাফিলতি শুধু চিকিৎসকের তা-ও নয়। ওয়ার্ডে ডিউটি আছে- এমন সকলের।

পড়ে নিন এক সাধারন নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গি…ধর্মে আছি, জিরাফেও আছি..

কেন বলছি? কারণ আমি দু’রকমই দেখেছি। আই-সি-ইউ-তে কোনো খারাপ রোগী ভর্তি থাকলে সিনিয়র ডাক্তারবাবু একঘন্টা-দু’ঘন্টা ছাড়া ছাড়া ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন, বা আই-সি-ইউ-তে বেড খালি নেই- সেই অবস্থায় জেনারেল ওয়ার্ডে কোনো খারাপ রোগীর বেডের পাশে কোনো রেসিডেন্ট ডাক্তার ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এবং দরকারমতো যা-করার করছে-এরকম যেমন দেখেছি, তেমনই ডিউটির সময় দিব্যি ডক্টরস রুমে ঘুম চলছে, ফোন তো ছাড়, ওয়ার্ড মাস্টার দাদা কলবুক নিয়ে এসে ডাকাডাকি করেও তুলতে পারছে না- এমনও দেখেছি। বলতেও লজ্জা হয়, মদ খেয়ে এসে নেশার ঘোরে ডিউটি চলছে- এমনও আমার দেখা।

আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। সবসময় পরিকাঠামোর অভাব বললে চলবে না। পরিকাঠামোর উন্নতি নিশ্চয়ই দরকার। কোনো সরকারি হাসপাতালে পারসোনালাইজড কেয়ার দেওয়া সম্ভব নয় আমি জানি। কিন্তু যে-টুকু দেওয়া সম্ভব সে-টুকু হচ্ছে তো? যদি কোনো হাসপাতালে কোনো রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না-হয়- তাহলে রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হল এবং আমি এসে বললাম পরিকাঠামোর উন্নতি দরকার-সেটা ন্যায়সংগত; কিন্তু স্রেফ “রাতের বেলা ঝামেলা বাড়িয়ে কী লাভ?”-শুধুমাত্র এই যুক্তিতে যদি অন্য হাসপাতালে একটু জটিল কোনো রোগীকে রেফার করা হয়- তা-হলে সেটা অন্যায়। হ্যাঁ- এরকম আমার নিজের চোখে দেখা। “আর যদি রোগীর কিছু হয়, আর পাবলিক ঝামেলা করে, তখন আপনি দেখবেন?”-এই কথা শোনার আশঙ্কা নিয়েই বলছি- এটা অন্যায়।

পড়ে নিন একজন ডাক্তারের কলম থেকে… আমরা কি চাই? আমরা ডাক্তার

আর বেসরকারি হাসপাতালে তো পরিকাঠামোর উন্নতির কথা আসার প্রশ্নই নেই।

খারাপ লাগে তখন, যখন সারাজীবন একশো শতাংশ সৎ থেকে নিজের কাজ করে আসা ছেলেটাকে অন্য কারোর গাফিলতির দায় নিতে হয়। নিজেকে নিংড়ে দিয়ে টানা ছত্রিশ ঘন্টা কাজ করে আসা মেয়েটাকে যখন শুনতে হয়, জুনিয়র ডাক্তারগুলো কেবল ফাঁকি দিতে জানে- তখন তার কথা ভেবে কান্না পায়।

আসলে এই “ছাড় তো কিছু হবে না” মনোভাবটা ডাক্তারিতে চলে না। বলতে খারাপ লাগলেও বলতে হবে, শুনতে খারাপ লাগলেও শুনতে হবে- এই মনোভাবটা কিন্তু এই পেশায় ঢুকে পড়েছে। আমি শতাংশের হিসেব জানি না। কিন্তু এই মনোভাব ছড়াচ্ছে- সাবধান হওয়ার দরকার আছে।

পড়ে নিন একজন ডাক্তারী পড়ুয়ার কলম থেকে… আমি ডাক্তার। অসুরের অবতার

আর এই মনোভাব তৈরি হচ্ছে ছাত্র অবস্থাতেই। “আটটা’র লেকচারে যাব না-ছাড় তো কী হবে”, “প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখব না- ছাড় তো কী হবে”, “ইন্টারনাল পরীক্ষা দেব না- ছাড় তো কী হবে”- এটাই পরে বদলে যায় “ওয়ার্ড থেকে ডাকছে? আধ ঘন্টা পর যাব- ছাড় তো কী হবে?”, “পেশেন্ট পার্টি কথা বলতে চায়? কাল সকালে স্যারের সাথে কথা বলবে-ছাড় তো কী হবে?”-তে। আই-সি-ইউ, ওটি, বা লেবার রুমে মোবাইল ফোনে ছবি তোলা-টা কোনো কাজের কথা নয়। মোবাইল ফোন নিয়ে তো ঢোকারই কথা নয়। এথিকসের প্রশ্ন ছাড়াও রোগীর মধ্যে জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে-মাইক্রোবায়োলজি বিষয়টার প্রাথমিক পাঠ; অথচ ফেসবুক খুললেই এমন ছবির ছাড়াছড়ি। কেন? নিজের cool দেখানোর চেষ্টা? নিজের কাজটাই তো করছ ভাই-তার বেশি তো কিছু নয়। গত কয়েক বছরে পরীক্ষাগুলোতে টোকাটুকি ভীষণভাবে বেড়ে গেছে- এমনটা কোনো ম্যাডাম বা স্যার অস্বীকার করবেন কী?

কয়েক বছর আগে ডঃ অভিজিৎ চৌধুরি স্যার আনন্দবাজারে ডাক্তারি ছাত্রদের মধ্যে বেড়ে চলা এরকম মনোভাবের বিষয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন। তখন রাগ হয়েছিল। এখন বুঝতে পারি উনি কিন্তু সাবধান করে দিতেই চাইছিলেন। Aneek Chakraborty-দা সেটার উত্তরে আবার একটা প্রবন্ধ লিখে বুঝিয়েছিল সামগ্রিকভাবে একটা সামজিক অবক্ষয় চলছে। ডাক্তারি ছাত্ররা কোনো আলাদা প্রজাতি নয়, সেই সমাজের অংশ মাত্র।

পড়ে নিন এন আর এস মেডিকেল কলেজ এ আন্দোলনের প্রতিপাদ্য.. স্বাস্থব্যবস্থা অচলায়তন – সমাধান আশু প্রয়োজন

ঠিক এই কারণেই আজ এটা পাবলিক ফোরামে লিখছি। সকলের জানার দরকার আছে। নিট পরীক্ষায় যখন অনিয়ম হয়, তখন আপনি প্রতিবাদ করেন না। রিজার্ভেশনের নিয়মে অযোগ্য ছাত্র-ছাত্রীরা এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ পেশায় ঢোকার অধিকার পেয়ে যায়, আর আপনি টুঁ শব্দটাও করেন না। সুপ্রিম কোর্ট বা এম সি আই-য়ের ঠিক করে দেওয়া নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দালাল সংস্থাগুলো বুক ফুলিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়, “MBBS in Maharashtra, Karnataka, Madhya Pradesh. NEET Rank not required”- আপনি দেখেও চোখ বুজে থাকেন। শিক্ষক-চিকিৎসক নেই, রোগী নেই- এমন হাসপাতালও মেডিক্যাল কলেজ খোলার অনুমতি পেয়ে যায়- আপনার কিস্যু যায়-আসে না। পড়ানোর জায়গা নেই, পড়ানোর লোক নেই- এমন জেলা হাসপাতালকে রাতারাতি মেডিক্যাল কলেজে বলে ঘোষণা করে দেওয়া হয়- আপনি ঘুমোন। আপনার আজ “ডাক্তারগুলো পয়সা ছাড়া কিছু বোঝে না”-এসব বলার অধিকার নেই। যেদিন শুধুমাত্র মেধা ও পরিশ্রমের দিক দিয়ে যোগ্য মেয়েটা বা ছেলেটাই ডাক্তারি পড়তে পারবে- সমাজ হিসেবে এটা নিশ্চিত করতে পারবেন- সেদিন সমালোচনা করবেন।

ততদিন অবধি অন্তত যারা নিজের কাজটা ঠিকমতো করছে, তাদের কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে নামা ঘামটার মূল্য দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *