বাবা আর আমি

পের লাগেরকুইস্ট ( অনুবাদ – মিহিররঞ্জন মন্ডল )

আমার তখন সবে বছর দশেক বয়েস, আমার বেশ মনে আছে, বাবা এক রবিবারের বিকেলে আমার হাতটা ধরলেন। এবার আমরা বনে বেড়াতে  যাব আর পাখিদের গান শুনব। হাত নেড়ে মাকে বিদায় জানিয়ে ঝলমলে রোদে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মা ঘরেই রইলেন, রাতের খাবারদাবার তাঁকে করতে হবে। বেড়াতে বেরিয়ে পাখিদের গান শোনা আমাদের কাছে কোন ব্যাপার নয়। দারুণ কিছু করছি এমনও মনে হয় না। আমরা হলাম সুস্থ সচেতন মানুষ। বাবা আর আমি প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠেছি। এসবে আমরা অভ্যস্ত। এ নিয়ে হৈচৈ করার কিছু নেই। এটা শুধুই  এক রবিবারের বিকেল, বাবারও কাজকম্মো  নেই। এখন রেললাইন ধরে আমরা হাঁটতে লাগলাম। সাধারণত এভাবে লোকজনদের হাঁটতে দেওয়া হয় না। তবে বাবা আবার রেলে কাজ করেন কিনা, তাই তাঁর ক্ষেত্রে কোন  বাধা নেই। ঘুর পথে না গিয়ে, এভাবে যদি যাই,তাহলে আমরা সোজা বনে গিয়ে পৌঁছব।

বনের ধারে যেতে একটু পরেই আরম্ভ হল পাখির ডাক। ঝোপঝাড়ে শুরু হয়ে গেল যত রাজ্যের ফিঞ্চ, উইলো ওয়াবেল, ভরত পাখি আর চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। বনে পা দিলেই শুনবে তোমার চারপাশের পাখিদের কলকাকলি। গাছের তলায় বিছিয়ে আছে সাদা বনফুল। বার্চগাছে সবে গজিয়েছে নতুন পাতা।স্প্রুস গাছে ধরেছে মঞ্জরি। সুগন্ধে ভরে উঠছে চারপাশ। পায়ের তলার মাটি গরমে ভেপসে উঠেছে চারপাশে। চারিদিকে গুঞ্জন আর ব্যস্ততা। ভোমরা তাদের গর্ত থেকে বের হয়েছে। মিজ পতঙ্গেরা ঝাঁক বেঁধে আছে বনের জলা জায়গায়। ঝোপঝাড়  থেকে পাখিরা সুড়ুৎ করে বেরিয়ে এসে, তাদের খপ করে মুখে পুরে আবার  ফিরে যাচ্ছে।

কোথাও কিছু নেই, একটা ট্রেন হঠাৎ ছুটে এল। তাই রেললাইন ছেড়ে বাঁধের রাস্তায় আমাদের নামতে হল। দু আঙুলে মাথার টুপিটা তুলে ধরে বাবা ইঞ্জিন ড্রাইভারকে দেখালেন। ড্রাইভার তাঁকে স্যালুট করে নিজে হাতটা বাড়িয়ে দিল। খুব তাড়াতাড়ি সব ঘটে গেল। এরপর আবার আমরা চলতে শুরু করলাম। জুতো পরে রেললাইনে  নুড়ি মাড়িয়ে চলা বেশ অসুবিধা। তাই লম্বা লম্বা পা ফেলে কাঠের শ্লিপারের উপর দিয়ে আমরা হাঁটতে লাগলাম। স্লিপারে লাগানো আলকাতরা গরমে গলে উঠেছে। নাকে একে একে ভেসে এল গ্রিজ, লতাগুল্ম, আলকাতরা আর হেদার ফুলের গন্ধ। রোদ পড়ে রেললাইন ঝকঝক করছে। রেললাইনের দুপাশে টেলিগ্রাফের খুঁটি। পাশ দিয়ে গেলে ওর মধ্য থেকে আওয়াজ শোনা যায়। হ্যাঁ, একটা চমৎকার দিন। আকাশ একেবারে পরিষ্কার। কোথাও এক টুকরো মেঘ নেই। বাবা বললেন এমন দিনে তা থাকেও না   

 কিছুক্ষণ পরে আমরা চলে এলাম রেললাইনের  ডানদিকে একটা জইয়ের ক্ষেতে। বনের ভিতর গাছ কেটে খানিকটা ফাঁকা জায়গায় এক ছোট চাষি জইয়ের চাষ করেছে। ফসল ভালই ফলেছে। অভিজ্ঞ চোখে খুঁটিয়ে বাবা ক্ষেতটা একবার দেখলেন। বুঝলাম তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। শহরে জন্মেছি কিনা তাই এইসবের তেমন কিছু আমি জানি না। এরপর আমরা গিয়ে পৌঁছলাম নদীর উপর একটা সেতুর কাছে। নদীতে বেশিরভাগ সময় জল থাকে না, কিন্তু এখন জলে থই থই করছে। পাছে নদীতে পড়ে যাই সেই ভয়ে আমরা হাত ধরাধরি করে কাঠের স্লিপারের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। আর একটু এগোতেই দেখা গেল সবুজ গাছপালায় ঘেরা রেলের লাইন্সম্যানের কুঠির। চারপাশে আপেল আর গুজবেরির ঝোপ। আমরা ওখানে গিয়ে হাজির হলাম। ওরা আমাদের দুধ খেতে দিল। ওদের শুয়োর, মুরগি আর মুকুলে ভরা ফলের গাছ দেখলাম। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আমরা চাইছিলাম নদীর ধারে যেতে। অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে নদীটাকে বিশেষ করে আমাদের ভালো লাগে। কারণ আরও উজানে এমন একটা জায়গার পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেছে যেখানে বাবা আগে ছেলেবেলায় থাকতেন। সাধারণত এতদূর পর্যন্ত বেড়িয়ে আবার আমরা ফিরে যাই। অনেকটা হেঁটে আজও এই জায়গায় এসেছি। এটা পরের স্টেশনের কাছাকাছি। কিন্তু আমরা আর ওদিকে গেলাম না। টেলিগ্রাফের সিমাফোরের সংকেত বাবা একবার দেখে নিলেন। সবকিছু বাবা খেয়াল রাখেন।     

নদীর ধারে এসে দাঁড়ালাম।প্রখর রোদে কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে নদী। ছায়াঘন গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। প্রতিবিম্বিত হয়েছে পাশের বদ্ধ জলায়। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। বাঁধের ঢালে নেমে নদীর পাড় ধরে আমরা খানিক হাঁটলাম। বাবা আমাকে সেই জায়গাগুলো দেখালেন যেখানে বসে তিনি ছেলেবেলায় মাছ ধরতেন। পাথরের উপর সারাদিন  বসে  থাকতেন পার্চ মাছ ধরার আশায়। প্রায়ই মাছ টোপ গিলতো না। তবুও সে ছিল বড় সুখের সময়। এখন বাবা মোটেও সময় পান না। কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। খুশিতে হৈচৈ করতে লাগলাম। গাছের ছালের টুকরো স্রোতের মুখে ভাসিয়ে দিলাম। নুড়ি কুড়িয়ে আমরা নদীর জলে ছুড়তে লাগলাম– কে কতদূরে ছুড়তে পারে তা দেখার জন্য। হাসিখুশি আমুদে স্বভাবের আমরা দুজনেই– বাবা আর আমি। অবশেষে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আজকের মতো যথেষ্ট হয়েছে, এবার বাড়ি  ফেরার পালা। 

সন্ধ্যা নেমে আসছে। বদলে যাচ্ছে বনের চেহারা। এখনও ঠিক অন্ধকার হয়নি, তবে হব হব করছে। আমরা পা চালিয়ে চললাম। বাড়িতে মা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আমাদের রাতের খাবার নিয়ে বসে আছেন। মায়ের সব তাতে ভয় এই বুঝি কিছু  হল। কিন্তু, না কিছুই হল না। আমরা ঠিকই আছি।     

গোধূলির আলো ম্লান হয়ে এল। গাছগুলোকে কেমন অদ্ভূত লাগছে। মনে হচ্ছে আমাদের পায়ের প্রতিটি শব্দ তারা কান পেতে শুনছে।আমরা কে তারা যেন জানেই না। গাছের তলায় একটা আগুনে পোকা। অন্ধকারে ওখানে পড়ে আছে। জ্বলজ্বলে চোখে আমাদের দেখছে। ভয়ে বাবার হাতটা আমি চেপে ধরলাম। কিন্তু বাবা ওটা লক্ষ্যই করলেন না। এখন বেশ অন্ধকার। আবার আমরা নদীর উপর সেই সেতুর কাছে এলাম। নিচে জলস্রোত ভয়ঙ্কর গর্জে উঠছে। যেন আমাদের গিলে খেতে চাইছে। ওদিকে হাঁ করে রয়েছে নদীর খাদ। যাতে পড়ে না যাই তাই খুব সতর্কভাবে দুজনে শক্ত করে হাত ধরে স্লিপারের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ভাবলাম বাবা আমাকে কোলে তুলে নিয়ে জায়গাটা পার হবেন। কিন্তু তিনি কোন কথা বললেন না। বাবা বোধহয় চাইছেন আমি তাঁর মতো অবিচলিত থাকি আর এ নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন না করি।     

আমরা এগিয়ে চললাম। বাবা এখন অদ্ভূত রকমের শান্ত। মাপা পা ফেলে অন্ধকারে হেঁটে চলেছেন। কোন কথা বলছেন না, কিছু ভাবছেনও না। বুঝতে পারছি না এমন অন্ধকারে  বাবা কেন এত চুপচাপ হয়ে গেলেন। ভয়ে আমি চারপাশে তাকালাম। শুধুই  অন্ধকার। জোরে নিঃশ্বাস  নিতেও পারছি না। তাহলে এত বেশি অন্ধকার তোমার ভিতরে ঢুকে যাবে যা মারাত্মক। তুমি তক্ষুনি মারা পড়বে। আমার বেশ মনে আছে, আমি তখন এরকম ভাবছিলাম।      

মনে হচ্ছে বাঁধের ঢাল যেন সোজা নেমে গেছে রাতের মতো কালো অন্ধকারের গহ্বরে। টেলিগ্রাফের খু্ঁটিগুলো অশরীরির মতো আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মধ্যে থেকে এমন একটা ফাঁপা গুড়গুড় আওয়াজ হচ্ছে যেন মাটির নীচে পাতালের গভীর থেকে কেউ কথা বলছে। আর পোর্সিলিনের ঢাকনাগুলো ভয়ে জড়সড় হয়ে তা শুনছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কিছুই ঠিক নেই, কিছুই সত্যি না। সব কেমন গা- ছমছমে।

 ভয়ে বাবাকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলি, ‘ অন্ধকার এত ভয়ঙ্কর কেন বাবা?’     

‘না, বাবা অন্ধকার মোটেও ভয়ঙ্কর নয়’, আমার হাত ধরে তিনি বললেন।     

‘ হ্যাঁ, বাবা তাই। ‘     

‘ না- না খোকা তুই ওইরকম ভাবিস না। ভাববি কেন? মাথার উপর ঈশ্বর আছেন।’   

 নিজেকে কেমন যেন অসহায় বলে মনে হচ্ছে। আর আশ্চর্য!  বাবা নয় আমিই শুধু ভয় পাচ্ছি। বাবার কথায় ভয় আমার গেল না। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে যা বললেন তাতেও আমি সান্ত্বনা পেলাম না। মনে হল স্বয়ং ঈশ্বরও ভয়ঙ্কর। সর্বত্র  তিনি বিরাজ করছেন– এই অন্ধকারে, এইসব গাছের তলায়, গুড়গুড় করে আওয়াজ হওয়া ওই টেলিগ্রাফের খুঁটিতে হ্যাঁ, সব জায়গায় রয়েছেন তিনি। তবুও তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ না।   

 চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম। যে যার চিন্তায় আমরা মগ্ন। বুকের ভিতর টান ধরেছে। মনে হল ভিতরে অন্ধকার ঢুকে পড়ে হৃৎপিণ্ডকে মোচড় দিচ্ছে।     

যখন সবে আমরা একটা বাঁক ঘুরেছি, হঠাৎ পিছন থেকে শোনা গেল একটা বিকট আওয়াজ। আপনমনে আমরা হাঁটছিলাম, আওয়াজ শুনে হুঁশ হল। বাবা তাড়াতাড়ি আমাকে বাঁধের খাদে টেনে নামালেন। ধরে রাখলেন আমায় শক্ত করে। অন্ধকার ফুঁড়ে ঝমঝম করে ছুটে আসছে একটা ট্রেন– একটা কালো ট্রেন। ট্রেনের বগির সব আলোগুলো নেভানো। পাগলের মতো ছুটে এল দুরন্ত গতিতে। এটা কী ট্রেন? এখন তো এভাবে কোনও  ট্রেন আসার কথা নয়। আতঙ্কে আমরা চেয়ে রইলাম। বিশাল বড় ইঞ্জিন, বয়লারে গনগন করে আগুন জ্বলছে। বেলচা মেরে তাতে কয়লা দিতেই, অন্ধকারে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ছে। কী ভয়ানক দৃশ্য! আগুনের আলোয় দাঁড়িয়ে ড্রাইভার — নিষ্প্রভ,  নিশ্চল যেন একটা পাথরের মূর্তি। বাবা তাকে চিনতে পারলেন না। সে কে? তিনি তা জানেন না। লোকটা সোজা সামনের দিকে চেয়ে রয়েছে। শুধু অন্ধকার থেকে গভীরতর অন্ধকার যার কোন শেষ নেই, তার মধ্য দিয়ে ছুটে চলতে সে যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।  

ভীষণ ভয় পেয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে  আমি তখন  হাঁপাতে লাগলাম। দেখলাম ওই ভয়াবহ দৃশ্য। অন্ধকার ট্রেনটাকে যেন গ্রাস করে ফেলল। বাবা হাত ধরে  টেনে আবার রেললাইনে তুলে দিলেন। তাড়াতাড়ি আমরা বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। বাবা বলতে লাগলেন, ‘ অদ্ভূত ব্যাপার, ওটা কোন ট্রেন? ড্রাইভার কে তো আমি চিনতে পারলাম না। ‘ 

কিন্তু, আমার শরীর যে থরথর করে কাঁপতে আরম্ভ করেছে। এর অর্থ আমি বুঝতে পেরেছি। এসব  আমার– শুধু আমারই জন্য। এটা হল আমার অজানা সেই ভাগ্যরথ। বাবা এর কিছুই জানেন না। আমাকে আর তিনি আগলে রাখতে পারবেন না। বেশ বুঝতে পারছি এই পৃথিবী, এই জীবন এখন আমার। আমার মতো করেই তা চলবে। বাবার মতো  নয় যেখানে সবকিছুই সুরক্ষিত ও নিশ্চিত। এটা স্বপ্নের পৃথিবী নয়, এ হল বাস্তব জীবন।  জ্বলন্ত উল্কার মতো যা ছুটে চলেছে এমন এক অন্ধকারের দিকে যার কোন শেষ নেই।         

                            Father and I  

By Pär Lagerkvist

 (মূল সুইডিশ নয়, ইংরেজি থেকে অনুদিত)  পের ফাবিয়ান লাগেরকুইস্ট স্বনামধন্য নোবেলজয়ী সুইডিশ কথাসাহিত্যিক। ‘বারাব্বাস’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। মানুষের পরিত্রাতা একমাত্র ঈশ্বর এই মতবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই মানুষকে তার নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে হয়। ব্যক্তির অন্তর্নিহিত বাস্তবতাকে মান্যতা দিয়ে তিনি তাই অস্তিত্ববাদে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। 

The following two tabs change content below.
Avatar

Mihir Ranjan Mondal

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: