মধ্য রাতের উজ্জ্বল মেঘ এক বিস্ময়, কিন্তু ভয়ঙ্কর কেন?

অরুনেষ রায়

পৃথিবীর মেরু প্রদেশের কাছের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে অনেক দেরি করে সূর্য অস্ত যায়, ওঠে ভীষণ তাড়াতাড়ি। সূর্যোদয়ের আগে বা সূর্য অস্তাচলে গেলে, অর্থাৎ উষার আগে বা গোধূলির পরে, অনেক সময় দেখা যায় বেশ উজ্জ্বল নীল রঙের আশ্চর্য ঢেউখেলানো মেঘ। অত্যন্ত বিরল এই মেঘের পরিচিতি রাত্রোজ্জ্বল​ মেঘ বা Noctilucent clouds নামে। তবে শুধু সৌন্দর্য্যের বিস্ময় নয়, বারংবার এই মেঘের দেখা পাওয়া আসলে ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসা এক সমূহ বিপর্যয়ের জানান দেয়।

কোথায় দেখা যায় এই মেঘ ?

এই রাত্রজ্জ্বল মেঘ বা Noctilucent clouds, উৎপত্তি এবং বিস্তারে আমাদের পরিচিত সব মেঘের থেকেই আলাদা। Noctilucent কথার ল্যাটিন অর্থ “রাত্রোজ্জ্বল​” (Night Shining)। বায়ুমণ্ডলের সবথেকে উচ্চতম এই মেঘ, মেরুপ্রদেশের কাছাকাছি  ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রী অক্ষরেখার মধ্যে অবস্থিত দেশগুলোতে অর্থাৎ উত্তরে জার্মানি, নেদারল্যান্ড, সুইডেন, ফিনল্যাণ্ড, নরওয়ে — আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা ও রাশিয়ার কিছু অংশ এবং দক্ষিনে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে দেখা যায়। উত্তর গোলার্ধে দেখা যায় গ্রীষ্মকালে অর্থাৎ মে মাসের মাঝামাঝি থেকে অগাস্ট এর মাঝামাঝি অবধি। দক্ষিন গোলার্ধে মধ্য নভেম্বর থেকে ফেব্রূয়ারির মাঝামাঝি এই মেঘের আনাগোনা শুরু।  

মেরুপ্রদেশের কাছাকাছি  ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রী অক্ষরেখার মধ্যে অবস্থিত দেশগুলোতে দেখা যায় রাত্র-উজ্জল মেঘ

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাঝামাঝি মেসোস্ফিয়ারে অর্থাৎ ভূপৃষ্ট থেকে প্রায় ৭৬ থেকে ৮৫ কিলোমিটার উপরে এই মেঘের অবস্থান। সাধারন মেঘ যেখানে সর্বাধিক ১২ কিলোমিটার এর উপরে ওঠেই না, সেখানে এই মেঘের এ হেন অবস্থান বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যময়।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে রাত্র-উজ্জল মেঘের অবস্থান (ডানদিকে)
কিভাবে সৃষ্টি হয় এই রাত্র-উজ্জ্বল মেঘ?

এরোনমি অফ আইস ইন দি মেসোস্ফিয়ার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রহস্যময় এই মেঘের মূল উপাদান হলো জলীয় বাষ্প, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা, এবং খুব নিম্ন তাপমাত্রা। বায়ুমণ্ডলের মেসোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা খুব কম প্রায় -৯০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। হিমাঙ্কের থেকে ৯০ ডিগ্রি নিচে থাকে বলে জলীয় বাস্প থাকে বরফের সূক্ষ্ম কণা বা ক্রিস্টাল হিসেবে। এই মেঘ শুধুমাত্র বরফ থেকেই সৃষ্টি হতে পারে, যদি এতে সামান্যতম ধূলিকণাও না থাকে। এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের দেখতে পাওয়া সাধারণ মেঘ কিন্তু ধূলিকণা ছাড়া সৃষ্টি হতেই পারে না। 

ষড়ভুজাকৃতি বরফের ক্রিস্টাল

আরও পড়ুন…ইতালির বুকে আশ্চর্য এক দৈত্য গুহা

বায়ুমণ্ডলের এতো উপরে ধূলিকণা বা জলীয় বাষ্প ঠিক কিভাবে আসে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সন্দিহান। যদিও আন্দাজ করা হয় যে সামান্য জলীয় বাষ্প ভূপৃষ্ট থেকে বায়ুমণ্ডলের সব স্তর পেরিয়ে ধীরে ধীরে মেসোস্ফিয়ারে জমা হয়। অথবা মিথেন গ্যাস রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলেও এই জলীয় বাষ্পের সৃষ্টি করে। উল্কাপাত বা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট সূক্ষ্ম ধূলিকণার কিছু অংশ মেসোস্ফিয়ারে থেকে যায়। আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় এই অদ্ভুত রাত্রোজ্জ্বল​ মেঘ। আবার অনেক সময় জেট প্লেন বা রকেট উৎক্ষেপণ এর ফলে সৃষ্ট বাষ্প থেকেও এই মেঘের সৃষ্টি হওয়া খুবই সম্ভব।  

উপরের ছবিতে দেখতে পাওয়া প্রথম তিনটি ছবি প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি যার মধ্যে দুটি সুইডেন ও একটি এস্তোনিয়া থেকে তোলা হলেও নিচের কলাম এর ডানদিকেরটি আমেরিকার ফ্লোরিডা স্পেস-এক্স এর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এর সময় সৃষ্টি হওয়া রাত্র-উজ্জ্বল মেঘ। শেষেরটি অবশ্যই কৃত্রিম ভাবেই সৃষ্টি।

আমরা এই মেঘ শুধু রাতেই দেখতে পাই কেন?

এই রাত্রোজ্জ্বল​ মেঘের ঔজ্জ্বল্য খুব বেশি নয় এবং ঘনত্ব ও খুবই কম। আর সেকারণেই শুধু মাত্র ভোরের আগে অথবা সন্ধ্যের পরে, যখন সূর্য প্রায় দিগন্তরেখার নিচে ৬ ডিগ্রী থেকে ১৬ ডিগ্রীর মধ্যে অবস্থান করে। সূর্যের এই নিম্ন এবং আপাতদৃষ্টিতে অদৃশ্য অবস্থানে আলোর বিচ্ছুরণ হয়। বিচ্ছুরণে সৃষ্টি হওয়া নীল আলো এই ভীষণ উঁচু মেঘে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়। নিচের ছবিতে আমরা সেটাই দেখতে পাচ্ছি।  

রাত্রজ্জল মেঘ দেখা যায় যখন সূর্য প্রায় দিগন্তরেখার নিচে ৬ ডিগ্রী থেকে ১৬ ডিগ্রীর মধ্যে অবস্থিত
কিন্তু রাত্রজ্জল মেঘের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর কেন?

আপাতদৃষ্টিতে সুন্দর এই মেঘের ঘন ঘন আবির্ভাব কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে মোটেই সুখদায়ক নয়। গবেষণায় জানা গেছে, যে বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রাত্রোজ্জ্বল​ মেঘের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ার এক নিবিড় সম্পর্ক আছে।  বায়ুমণ্ডলের মিথেন গ্যাসের সঙ্গে জলের হাইড্রোক্সিল আয়নের (জল ভেঙে দুই ধরণের আয়ন তৈরি হয়, ধনাত্মক হাইড্রোজেন ও ঋণাত্মক হাইড্রোক্সিল) বিক্রিয়ায় তৈরি হয় জল। মেসোস্ফিয়ারের অতি নিম্ন তাপমাত্রায় জল সঙ্গে সঙ্গে রূপান্তরিত হয় সূক্ষ্ম বরফকণায়। এই বরফকণাই রাত্রোজ্জ্বল​ মেঘের উপস্থিতি বাড়িয়ে দেয়।

গ্রীনহাউসে আমাদের পৃথিবী

এই মিথেন গ্যাস গ্রীনহাউস গ্যাস। বায়ুমণ্ডলের গড় উষ্ণতা বাড়ানোর জন্য বিশেষভাবে দায়ী এই গ্যাসটি বিশ্ব-উষ্ণায়ন এ এক মারাত্মক ভূমিকা নেয়। শুধু তাই নয়, জলীয় বাষ্পও এই বিশ্ব উষ্ণায়নে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। আর সে কারণেই পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এই মেঘের বারংবার দেখা পেয়ে বেশ চিন্তিত। এই মেঘ গত ২০ বছর আগেও বিশেষ দেখা যেত না। কিন্তু বর্তমানে এর প্রাবল্য বেশ বেড়েছে। আর তাই দেখতে সুন্দর হলেও এই Noctilucent clouds বা রাত্রোজ্জ্বল​ মেঘের প্রাবল্য বিজ্ঞানীদের এবং আমাদের সকলের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আর তাই পরিবেশ দূষণ কমান, পৃথিবীকে ভালো রাখুন, নিজে ভালো থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *