ওলন্দাজ দেশে কিংকর্তব্য

নেদারল্যান্ডস​-প্রবাসী ভারতীয়দের বিরূদ্ধে অভিযোগ – তারা স্থানীয় রীতি-রেওয়াজের সাথে সম্পৃক্ত হ​য়ে উঠতে পারেনা। সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য না হলেও আংশিকভাবে সত্য তো বটেই। দশ বছরের ওপরে নেদারল্যান্ডস​-প্রবাসের অভিজ্ঞতা থেকে নবাগত বন্ধুদের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ দিতে এই প্রবন্ধের অবতারণা​।

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

‘ডাচ ডাইরেক্টনেস’​-এর ধারণা মোটামুটি আমাদের সকলেরই আছে। আমার ভারতীয় ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত (ভারতে বেশীরভাগ কারিকুলাম তো তাই-ই) পোলায়েটনেস​​-এর ঘেরাটোপে প্রথম​-প্রথম তাই এখানকার ওপেন ও ডাইরেক্ট ভাবপ্রদান বেশ রূঢ় মনে হতো। কিন্তু, পরে উপলব্ধি করলাম যে, সোজা কথা সোজা করে বলাটা পেছন থেকে কাঠি করার থেকে ঢের ভালো। ভারতীয়দের ব্যাপারে ডাচেরা প্রায়শঃ বলে থাকে, “কম্যুনিকেশন ইজ নট ক্লিয়ার​।” তার প্রধান কারণ কিন্তু এই সোজা কথাকে সোজাভাবে না বলার অভ্যাস​।

তাই, কর্তব্য ১: মন আর মুখ আলাদা রাখবেন না।

যেটা মনে আসছে, পরিষ্কার করে বলুন । বিধিসম্মত সতর্কীকরণ​: আনপার্লামেন্টারী কথা ঘনিষ্ঠমহল ছাড়া ব্যবহার করলে তার ফল নিজেই ভোগ করুন​। লেখককে দোষারোপ করবেন না।

ডাচেদের সাথে ভারতীয়দের একটা বিষ​য়, যাকে বলে, পোলস অ্যাপার্ট​। সেটা হলো, নিয়মানুবর্তিতা। আমাদের জন্মগত অভ্যাস, কি ভাবে নিয়ম​-কানুন একটু ভেঙেচুরে জুড়ে নিলে আমাদের লাভ হবে। আর​, ডাচেরা ঠিক তার উল্টো, যতই অসুবিধা হোক না কেন​, নিয়মের থেকে একচুলও এদিক​-ওদিক হবে না। এখানে কুকুর পোষা থেকে জঞ্জাল ফেলা – সবকিছুই নিয়ম মেনে চলে। আমি ভালো-খারাপ বিচারের দায়িত্ব নিচ্ছি না, কিন্তু নিয়মের এদিক​-ওদিক হলে এখানে বেশ মোটা অঙ্কের জরিমানা বরাদ্দ​। তা ছাড়া, সমস্ত ভারতীয়দের ওপরে স্ট্যাম্প লেগে যায় দু-একজনের ভুলের জন্যে।

সুতরাং, কর্তব্য ২: নিয়ম জানুন​, এবং নিয়ম মানুন​।

বি.দ্র​. যদি আপনার মনে হ​য় যে কোন নিয়ম বিশেষ কোন কারণে আপনার পক্ষে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না​, তবে সেটা প্রসেস অনুসরণ করে, প্র​য়োজনীয় আলোচনা করে ও অনুমোদন নিয়ে তবেই করুন​। আপনার নির্দিষ্ট ‘gemeente’ বা পুরসভা আপনাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে।

আর একটি বিষ​য়, যেটা নিয়ে অনেক ডাচ কলিগ​-বন্ধুদের অভিযোগ শুনেছি, ভারতীয় সম​য়ানুবর্তিতা। আমাদের দেশের দু-ঘন্টা লেট ট্রেনকে “ইন​-টাইম​” বলার কালচার মেনে আমরাও দশ​-পনেরো মিনিট পরে মিটিঙ​য়ে পৌঁছে বলি, “ফ্যাশনেবলি লেট​”। কিন্তু ডাচদের কাছে সেটা “গুনাহ​”! আর, সত্যি বলতে গেলে, আপনার ফ্যাশনেবলি লেটের চক্করে আরো পাঁচজনের সম​য় নষ্ট করাটা কিন্তু অন্যায়​।

অত​এব​, কর্তব্য ৩: নিজের এবং অন্যের সম​য়ের দাম দিন​।

যদি কোন অপ্রত্যাশিত কারণে আপনি সম​য়ে না পৌঁছাতে পারেন​, আগে থেকে টেলিফোন বা ইমেলে সবাইকে জানিয়ে দিতে চেষ্টা করুন​।

আমরা অচেনা মানুষের সাথে সৌজন্য​-বিনিম​য়ে খুব​-একটা সচ্ছন্দ বোধ করি না। কলকাতার রাস্তায় হঠাৎ অচেনা কেউ যদি আমাকে দেখে “নমস্কার দাদা, কেমন আছেন​?” জিজ্ঞাসা করে​, আমিও হ​য়তো ভাববো যে নিশ্চ​য়ই কোন বদ​-মতলব আছে। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে সেটাই সাধারণ অভ্যাস​। চেনা-মুখ হলে তো বটেই, অচেনা কারোর সাথে চোখাচোখি হ​য়ে গেলেও সৌজন্য​-সম্ভাষণ সাধারণ ভদ্রতা। আমরা অনেক সম​য়েই হ​য়তো চোখ নামিয়ে চলে যাই, সেটা কিন্তু একপ্রকার অপমান হিসাবেই গ্রাহ্য করা হ​য়​।

অর্থাৎ, কর্তব্য ৪: সৌজন্য​-বিনিম​য়ে সচ্ছন্দ হোন​।

আর​, যদি সেই সৌজন্য​-বিনিম​য় আপনি ডাচ ভাষায় করতে পারেন​, তবে তো সোনায় সোহাগা!

ডাচ ভাষায় কিছু প্রাথমিক সৌজন্য​-বার্তা:

goedemorgen = সুপ্রভাত​

goeden avond = শুভ সন্ধ্যা

tot morgen  = কাল দেখা হবে

eet smakelijk = আপনার খাওয়া উপভোগ করুন​

নিয়মানুবর্তিতা সম্পর্কে আর দু-এক কথা না বললেই ন​য়​। নেদারল্যান্ডসে আসার পরে অনেকেই নিজের মতো করে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন​। ভারতীয় খাওয়া, জামাকাপ​ড়​, প​ড়াশুনা ইত্যাদি – যাতে সাথী ভারতীয়দের উপকার হ​য়​। খুব ভালো ব্যাপার​, আর নেদারল্যান্ডস সরকারও এই ধরণের উদ্যোগকে সর্বতোভাবে সমর্থন করে থাকে। কিন্তু একটাই নিয়ম​​, আপনাকে এখানকার চেম্বার অফ কমার্স (কামার ভ্যান কুপহান্দেল​)-এ আপনার ব্যবসার রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে, এবং প্রতি তিনমাস অন্তর সেলস ট্যাক্সের ডিক্লারেশন দিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশতঃ, অনেকেই তা করেন না। তাতে ক্ষতি কিন্তু আপনারই। কেন​? সে কথা অন্য কোন পর্বে লিখব​। বা, আপনারা সরাসরি আমাকে জিজ্ঞাসাও করে নিতে পারেন​।

কিন্তু, ভুলবেন না, কর্তব্য ৫: যদি আপনি কোন ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবছেন​, বা শুরু করেছেন​, অবশ্যই চেম্বার অফ কমার্সে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিন​। খুবই সহজ পদ্ধতি, আর খরচ মাত্র ৩৫ ইউরো।

(Kamer van Koophandel website: https://www.kvk.nl/english/)

এ ছাড়া ছোটবেলায় সোশ্যাল সায়েন্স ক্লাসে যা যা শিখেছিলেন​, এবং প্রতিনিয়ত যা ভালো গুণ আপনি অভ্যাস করে আসছেন​, সেগুলো তো থাকলোই।

এই পর্ব শুধু নিজে প​ড়বেন না, অন্যকেও প​ড়ান​। আপনাদের ভালো লাগলে, আপনার অথবা আপনার কোন বন্ধুর কোন উপকার হলে আমি নেদারল্যান্ডস​-সম্বন্ধিত আরো কিছু বিষ​য় নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে পারি। আপনাদেরও কোন পরামর্শ বা বিশেষ কোন অনুরোধ থাকলে জানাতে ভুলবেন না যেন​!

The following two tabs change content below.
Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।
Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: