ওলন্দাজদের যেমন দেখেছি..

অগ্নিভ সেনগুপ্ত​

প্রত্যেক দেশের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে, যা সেই দেশের গায়ে লেগে থাকে। না, বাস​-গাড়ীর ধোঁয়া বা ফুল​-গাছের গন্ধ ন​য়​, আলাদা একটা গন্ধ​। অনেকদিন সেই দেশে থাকতে-থাকতে আপনি সেই গন্ধের সাথে এতোটা একাত্ম হ​য়ে যান​, যে আলাদা করে সেটা বুঝতে পারেন না। কিন্তু কোন নতুন দেশে গেলে, বা অনেকদিন পরে কোন দেশে ফিরলে আপনি পরিষ্কার সেই গন্ধটা ধরতে পারবেন​।

প্রথম যেদিন স্কিফোল এয়ারপোর্টে নেমেছিলাম​, সেদিন নেদারল্যান্ডসের সেই গন্ধটা পেয়েছিলাম​। একটা স্যাঁৎস্যাঁতে জোলো গন্ধ। যেমন এখন বছরে একবার যখন কলকাতায় নামি, তখন একটা ধাতব গন্ধ পাই যেটা ওখানে স্থায়ীভাবে থাকার সম​য়ে কখনো পেয়েছিলাম বলে মনে প​ড়ে না। যে কোন দেশে গেলেই আমাদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো প্রথমে সেই গন্ধটার সাথে আমাদের স্নায়ুকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে। যদি খাপ খেয়ে গেল​, বেশ​। আর, খাপ না খেলেই, শেষ​!

যাক​, আমার ক্ষেত্রে গন্ধটার সাথে মোটামুটি শরীর অ্যাডজাস্ট হ​য়ে গিয়েছিল​। দ্বিতীয় পদক্ষেপ​, দেশের রোজনামচার সাথে, রোজের সংস্কৃতির সাথে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করানো। সত্যি বলতে, সেই চেষ্টা এখনো চলছে।

ছোট থেকে হস্টেলে থাকার সুবাদে আমার প্রবৃত্তি অনেকটা জলের মতো, যে পাত্রে যাই, সেই পাত্রের আকার ধারণ করি। কিন্তু, প্রথম সাক্ষাতে তো বটেই, আজ ১০ বছরের বেশী নেদারল্যান্ডসে কাটানোর পরেও বেশ কিছু কালচারাল শক-এর সাথে প্রতিনিয়ত সাক্ষাৎ হ​য়ে চলেছে। আমার সেই অভিজ্ঞতায় আপনাদের অংশীদার করতেই আজকের পর্ব​।

কলকাতা থেকে এসেছি, সেখানে সবাইকে অমুক​-দা, তমুক​-দি বলে ডাকার অভ্যাস। যদিও কর্পোরেট সংস্থায় কাজ করার সুবাদে ব​য়সে অনেক ব​ড়ো লোকজনকে নাম ধরে ডাকা ধাতস্থ করেছিলাম কিছুটা, কিন্তু নেদারল্যান্ডসে এসে প​ড়লাম মহা ফ্যাসাদে। বেশীরভাগ সহকর্মীরা প্রায় বাবা-কাকার ব​য়সী, তাদের নাম ধরে সম্বোধন করতে ভারী অস্বস্তি হতো প্রথম​-প্রথম​। যাক​, সে তো ছোট ব্যাপার​।

টিম লিডের সাথে আলাপ হলো। বেশ অমায়িক ভদ্রলোক​। স্মোকিং ব্রেকে ঘরোয়া আলোচনায় জিজ্ঞাসা করলাম​, বাড়ীতে কে কে আছে। উত্তর পেলাম​, “মি, অ্যান্ড মাই হাজব্যান্ড​”। তখন সদ্য কলেজ থেকে বেড়িয়েছি, চাকরীতে ঢুকেই অনসাইট​, তাই ওই এল​-জি-বি-টি-কিউ রাইটস ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞান ছিল না। তাই, ভদ্রলোকের সহবাসী হাজব্যান্ডের কথা জেনে বেশ ব​ড়ো একটা ধাক্কা খেলাম​।

অবশ্য সেই ধাক্কা ক্ষণস্থায়ী, জানলাম যে নেদারল্যান্ডসের ৪% জনসংখ্যা এল​-জি-বি-টি কম্যুনিটির অন্তর্গত​। ৯৩% ডাচ নাগরিক সমকামীদের সাধারণ জীবনযাত্রার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আপনারা হ​য়তো জানলে অবাক হবেন​, যেখানে ভারতবর্ষে সবে আগের বছর সমকামকে বৈধ ঘোষণা করা হ​য়েছে, সেখানে নেদারল্যান্ডসে ১৮১১ সাল থেকে নেপোলিয়নিক কোডের স্থাপনায় সমকাম বৈধ​।

গে প্রাইড আমস্টারডাম​: ছবি সূত্র – ইন্টারনেট​

নেদারল্যান্ডস মোটের ওপরে বেশ উদারমনস্ক দেশ​। এখানে সম্পর্ক​, যৌনতা ইত্যাদি নিয়ে গোঁড়ামি নেই। এখানে অনেক মানুষই সারাজীবন লিভ​-ইন করেন​, বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ না হ​য়েই সংসার-ধর্ম পালন করেন​। আর​, বিয়ের আগে লিভ​-ইন তো মোটামুটি সবাই-ই করেন​।

এখানে সন্তানের ব​য়স ১৮ হ​য়ে যাওয়া মানেই সে বাবা-মায়ের সংসার ছেড়ে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেবে, সেটাই সাধারণ দস্তুর​। ফলস্বরূপ​, যেমন একদিকে সম্পত্তির ভাগ​-বাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা নেই, অন্যদিকে ব​য়সকালে বহু মানুষ একাকীত্বের শিকার হ​য়ে থাকেন এখানে।

তাই বলে কি সন্তানরা বাবা-মায়ের প্রতি যত্নশীল ন​য়​? যতদূর আমার অভিজ্ঞতা হ​য়েছে, তা কিন্তু ন​য়​। এনারা সপ্তাহে একদিন অন্ততঃ বাবা-মায়ের সাথে সম​য় কাটান​। তা ছাড়া, ব​য়স্ক মানুষদের জন্যে সরকার থেকেও অনেক ধরণের সহযোগিতা পাওয়া যায়​। আপনি এখানে প্রায়শই দেখবেন​, যে ব​য়সে আমাদের দেশে ব​য়স্ক মানুষেরা বিছানা থেকে উঠতে অক্ষম​, সেই ব​য়সের মানুষ এখানে সাইকেল চালিয়ে দোকান​-বাজার করছেন​।

ব​য়স তো একটা সংখ্যামাত্র​! ছবি সূত্র – ইন্টারনেট

তবে, আমার অভিজ্ঞতায় ডাচেরা কিছুমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক​। বাবা-মা-বন্ধুবান্ধব​-স্বামী-স্ত্রী ইত্যাদি সম্পর্কের পাশাপাশি এদের জীবনে ‘মি-টাইম​’-এর প্রাধান্য বেশ প্রবল​।

আর, সেই সূত্র ধরে বলে রাখা ভালো, সিডিউল মেনে চলায় ডাচদের জুড়ি মেলা ভার​। এই ব্যাপারটাকে তারা প্রায় অবসেশনের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধব তো বটেই, বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও এখানে অ্যাপ​য়েন্টমেন্ট নিয়ে যেতে হ​য়​। প্রায় প্রত্যেকেই ক্যালেন্ডারে সুন্দরভাবে নিজেদের অ্যাপ​য়েন্টমেন্টের হিসাব রাখে, এবং বেশ নিষ্ঠাভরে তা পালন করে।

সেই সূত্রে একটা অভিজ্ঞতা বলি। অফিসে তখন কি-একটা ইম্প্লিমেন্টেশন চলছে, কিছু একটা ইস্যু এসেছে যার জন্যে অন্য একজনের সাহায্য দরকার​। তাকে ফোন করা হলো, ভাগ্যক্রমে তিনি ফোন তুললেন। ইস্যুটা শুনে বললেন​, “বেশ​, কিন্তু এখন তো আমি কিছু করতে পারবো না। এখন আমার কুকুরকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার টাইম​। দু-ঘন্টা বাদে ফোন করুন​।” আমরা তো শুনে অবাক​! ভারতীয় কোম্পানি হলে হ​য়তো এতক্ষণে ভদ্রলোকের চাকরি চলে যেত​, কিন্তু এখানে অন্যের পার্সোনাল জীবনকে এবং সিডিউলকে শ্রদ্ধা করা সাধারণ সংস্কৃতির অঙ্গ​।

আর​, সম​য়ানুবর্তিতার হাত ধরেই আসে নিয়মানুবর্তিতা। যেমন আগের এক পর্বে লিখেছিলাম​, এখানে নিয়মের অন্যথা করা মানেই বিপর্য​য়​। নিয়মভঙ্গের প্রধান শাস্তি – বেশ মোটা অঙ্কের জরিমানা। অবশ্যই সব নিয়ম জানা সবার পক্ষে সম্ভব ন​য়​, বিশেষতঃ আপনি যদি অন্য দেশ থেকে আসেন​। তাই, অনেকে দেখে শেখে, আবার অনেকে ঠেকে শেখে।

যেমন​, আমার এক বন্ধুর সদ্য এক অভিজ্ঞতার গল্প শোনাই। দোষের মধ্যে, বেচারা সাইকেল চালাতে-চালাতে ফোনে কথা বলছিল​। অনেক সাইকেল​-আরোহীই ফোনে কথা বলা, হোয়াটস্যাপ ইত্যাদি সাইকেল চালাতে চালাতে করে থাকে, আর পরিণামস্বরূপ দুর্ঘটনাও ঘটে। তাই, ১ জুলাই ২০১৯ থেকে সরকারী নিয়ম – সাইকেল চালাতে-চালাতে ফোন ব্যবহার করা আইনতঃ দন্ডনীয়​। আমার বন্ধুটি সেই আইন সম্বন্ধে অবগত ছিল না, বেচারার ৯৫ ইউরো গচ্ছা দিয়ে নিয়মশিক্ষা হলো। পুলিশকে আপনি যতই বোঝান যে ভুল হ​য়ে গেছে, নিয়মটা জানা ছিল না ইত্যাদি, ওনাদের একই উত্তর, “সরি স্যার​, রুল ইজ রুল​।”

তবে, কিছু ক্ষেত্রে এই নিয়মানুবর্তিতা এবং ক্যালেন্ডার​-মাপা জীবন বেশ বিরক্তিকর​, মনে হ​য় যেন একরাশ রোবটের মাঝে বাস করছি।

নেদারল্যান্ডসের যে ব্যাপারটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, তা হচ্ছে এখানকার লোকজনের মধ্যে শো-অফ নেই। ডাচেরা স্বভাবগতভাবে একটু সঞ্চ​য়ী, অহেতুক প​য়সা নষ্ট করেনা। (শুধু নিউ ইয়ার ইভে বা প্রিয় ফুটবল ক্লাব জিতলে চার​-পাঁচ হাজার ইউরোর ফায়ার- ওয়ার্কসে উড়িয়ে দিতে আমি অনেককেই দেখেছি)। তাই, মোটামুটি একটা বাড়ি, সাধারণ একটা গাড়ী, বছরে দু-বার ঘুরতে যাওয়ার মধ্যেই এদের জীবন চলে যায়​। আমেরিকা-ইংল্যান্ডে শুনেছি তিনমহলা বাড়ী আর দামী গাড়ী ছাড়া আপনি সমাজে মেশার উপযুক্ত হ​য়ে ওঠেন না, কিন্তু এখানে সেই শর্ত নেই। তা ছাড়া, নেদারল্যান্ডসের নিয়ম – বিশেষ অঞ্চলে আপনি বিশেষ ধাঁচের বাড়ীই বানাতে পারবেন​। একতলা বাড়ীর পাশেই অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর অনুমতি এখানে নেই। শহরের সৌন্দর্য্য়ায়ন​ বজায় রাখার জন্যে এখানে বাড়ী বানানো বা নবীকরণের নিয়মও, বলাই বাহুল্য​, বেশ ক​ড়া।

তবে কলকাতা থেকে নেদারল্যান্ডসে আসার পরে আমার সবচেয়ে ব​ড় শক লেগেছিল খাওয়াদাওয়া নিয়ে। এখানে লোকজন একদমই ভোজনরসিক ন​য়​। লাঞ্চে পাঁউরুটির মাঝে দু-টুকরো চিজ​, আর ডিনারে আলুসেদ্ধ আর সসেজ – এতেই এখানকার লোকজনের খাওয়া হ​য়ে যায়​। তবে, এখানে ভারতীয় বংশদ্ভুত সুরিনামীদের খাওয়াদাওয়ায় একটু আলাদা, মানে একটু-আধটু মশলা দেওয়া। ইদানীং যদিও প্রচুর ভারতীয় রেষ্টুরেন্ট খুলেছে এখানে, কিন্তু সেখানেও মূলতঃ কম মশলাদার খাবারই বানানো হয়​, যাতে সবাই সেই খাওয়া উপভোগ করতে পারে।

খাওয়াদাওয়া নিয়ে অন্য কোন পর্বে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল​। এই পর্বে আপাততঃ এইটুকুই, আপনাদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলাম​।

The following two tabs change content below.
Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।
Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: